নোট ২ঃ সূরা আবাস

কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৬
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্বঃ ২

সূরা আবাসা

সূরা আবাসা কোরআনের ৮০তম সূরা। আয়াত সংখ্যা ৪২ এবং রুকু সংখ্যা ১। সূরাটি মাক্কী সূরা এবং সূরার নামেরে অর্থ عبس (আবাসা) – তিনি ভ্রুকুঁচকালেন।

 

নামকরণ

এই সূরার প্রথম শব্দ عَبَسَ কে এর নাম হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

 

বিষয়বস্ত্ত

সূরাটিতে চারটি বিষয় আলোচিত হয়েছে-

এক- সমাজের দুর্বল শ্রেণীর জনৈক অন্ধ ব্যক্তি থেকে মুখ ফিরিয়ে জনৈক অহংকারী ও ধনশালী সমাজনেতার প্রতি মনোযোগ দেওয়ার কারণে রাসূল (সাঃ)-কে তিরস্কার (১-১০ আয়াত)।

দুই- কুরআনের গুরুত্ব ও মর্যাদা বর্ণনা (১১-১৬ আয়াত)।

তিন- অবিশ্বাসীদের ধিক্কার দিয়ে মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তার প্রতিপালনের ইতিহাস বর্ণনা (১৭-৩২)।

চার- অবশেষে তাদের পরিণতি হিসাবে পুনরুত্থান দিবসে কারু প্রফুল্ল বদন ও কারু মসীলিপ্ত চেহারা বর্ণনা (৩৩-৪২)।

 

শানে নুযূল:

একদা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) কুরায়েশ নেতাদেরকে ইসলামের শিক্ষা, সৌন্দর্য ও আদর্শ সম্পর্কে অবহিত করছিলেন এবং সেদিকে গভীর মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিনি আশা করছিলেন যে, হয়তো আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকেই ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য দান করবেন। ঐ সময়ে হঠাৎ আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) নামক এক অন্ধ সাহাবী তাঁর কাছে এলেন। ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) বহু পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। প্রায়ই তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে হাযির থাকতেন এবং ধর্মীয় বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। মাসআলা মাসায়েল জিজ্ঞেস করতেন। সেদিনও তার আচরিত অভ্যাসমত এসে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে প্রশ্ন করতে শুরু করলেন এবং সামনে অগ্রসর হয়ে তাঁর প্রতি তার মনোযোগ আকর্ষণ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু মহানবী (সঃ) তখন একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এ জন্যে তিনি আব্দুল্লাহ্ (রাঃ)-এর প্রতি তেমন মনোযোগ দিলেন না। তাঁর প্রতি তিনি কিছুটা বিরক্তও হলেন। ফলে তার কপাল কুঞ্চিত হলো। এরপর এই আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়। আল্লাহ্ তা’আলা স্বীয় রাসূল (সঃ)-কে সম্বোধন করে বলেনঃ হে রাসূল (সঃ)। তোমার উন্নত মর্যাদা ও মহান চরিত্রের জন্যে এটা শোভনীয় নয় যে, একজন অন্ধ আমার ভয়ে তোমার কাছে ছুটে এলো, ধর্ম সম্পর্কে কিছু জ্ঞান লাভের আশায়, অথচ তুমি তার দিক হতে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অহংকারী ও উদ্ধতদের প্রতি মনোযোগী হয়ে গেলে? পক্ষান্তরে সে ব্যক্তি তোমার কাছে এসেছিল, তোমার মুখ থেকে আল্লাহর বাণী শুনে পাপ ও অন্যায় হতে। বিরত থাকার সম্ভাবনা ছিল তার অনেক বেশী। সে হয়তো ধর্মীয় বিধি-বিধান পালনের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করতো। অথচ তুমি সেই অহংকারী ধনী লোকদের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ নিবদ্ধ করলে এ কেমনতর কথা? ওদের সৎ পথে নিয়ে আসতেই হবে এমন দায়িত্ব তো তোমার উপর নেই। ওরা যদি তোমার কথা না মানে তবে তাদের দুষ্কৃতির জন্যে তোমাকে জবাবদিহি করতে হবে না। অর্থাৎ ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে বহু ছোট, ধনী-গরীব, সবল-দুর্বল, আযাদ-গোলাম এবং পুরুষ ও নারী সঝই সন। তুমি সবাইকে সমান নসীহত করবে। হিদায়াত আকার হাতে রয়েছে। আল্লাহ যদি কাউকে সৎ পথ থেকে দূরে রাখেন তবে তাৰ বুহস্য তিনিই জানেন, আর যদি কাউকে সৎপথে নিয়ে আসেন সেটার বৃহস্যও তিনিই ভাল জানেন।

 

হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) যখন এসেছিলেন তখন রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) উবাই ইবনে খালুফের সাথে কথা বলছিলেন। এরপর থেকে নবী (সঃ) হযরত ইবনে উন্মি মাকতুম (রাঃ)-কে খুবই সম্মান করতেন এবং তাঁকে সাদর সম্ভাষণ জানাতেন।

 

হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) বলেনঃ আমি ইবনে উম্মি মাকতূম (রাঃ)-কে কাদেসিয়ার যুদ্ধে দেখেছি যে, তিনি বর্ম পরিহিত অবস্থায় কালো পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।

 

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেনঃ যখন ইবনে উন্মি মাকতুম (রাঃ) এসে রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বললেনঃ “আমাকে দ্বীনের কথা শিক্ষা দিন”, তখন কুরায়েশ নেতৃবৃন্দ রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর সামনে উপস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) তাদেরকে ধর্মের কথা শোনাচ্ছিলেন আর জিজ্ঞেস করছিলেনঃ “বল দেখি, আমার কথা সত্য কি-না?” তারা উত্তরে বলছিলঃ “জ্বী, আপনি যথার্থই বলছেন। তাদের মধ্যে উত্বা ইবনে রাবীআহ, আবু জাহল ইবনে হিশাম এবং আব্বাস ইবনে আবদিল। মুত্তালিবও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) মনে প্রাণে চাচ্ছিলেন যে, এরা যেন মুসলমান হয়ে যায় এবং সত্য দ্বীন গ্রহণ করে। এমনি সময়ে ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ) এসে বললেনঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমাকে কুরআনের কোন একটি আয়াত শুনিয়ে আল্লাহর কথা শিক্ষা দিন!” ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ)-এর কথা রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর কাছে অসময়োচিত মনে হলো, তিনি মুখ ফিরিয়ে কুরাইশ নেতৃবৃন্দের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। তাদের সাথে কথা শেষ করে ঘরে ফেরার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-এর মাথা ছিল নীচু, চোখের সামনে ছিল অন্ধকার। এই আয়াত ততক্ষণে নাযিল হয়ে গেছে। তারপর থেকে নবী (সঃ) ইবনে উম্মি মাকতুম (রাঃ)-কে খুবই শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন এবং অত্যন্ত মনোযোগের সাথে তাঁর কথা শুনতেন। আসা-যাওয়ার সময়ে জিজ্ঞেস করতেন যে, তাঁর কোন প্রয়োজন আছে কি-না, কোন কথা আছে কি-না এবং কোন কিছু তিনি চান কি-না।

عَبَسَ  অর্থ  ‘মুখ বেযার করা’। تَوَلَّى অর্থ ‘মুখ ফিরিয়ে নেয়া’। এখানে ‘মুখ ফিরিয়ে নিল’ বলতে রাসূল (সাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু عَبَسْتَ ও تَوَلَّيْتَ ‘মধ্যম পুরুষ’ ব্যবহার না করে ক্রিয়া দু’টিতে নাম পুরুষ (صيغة غائب) ব্যবহার করা হয়েছে রাসূল (সাঃ)-এর মর্যাদার প্রতি খেয়াল রেখে। কেননা কোন সম্মানী ব্যক্তির ত্রুটি নির্দেশ করার জন্য তাকে সরাসরি না বলে ইঙ্গিতে বলাটাই ভদ্র পন্থা।

এই অন্ধ লোকটি হলেন প্রসিদ্ধ মুওয়াযযিন ছাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম (রাঃ)। অনেকে তাঁর নাম আমর (عمرو) বলেছেন। পিতার নাম ক্বায়েস বিন যায়েদাহ। তবে মায়ের বেটা হিসাবেই তিনি প্রসিদ্ধ। তিনি হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রাঃ)-এর মামাতো ভাই এবং প্রথম দিকে ইসলাম কবুলকারী মুহাজিরগণের অন্যতম।

এখানে ‘সে’ অর্থ অন্ধব্যক্তি আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূম। আল্লাহ তা’আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে বলছেন: হে মুহাম্মাদ, আপনি কী করে জানবেন, হয়তো এই অন্ধ ব্যক্তি, যার প্রতি আপনি ভ্রূকুঞ্চিত করেছেন, সে يَزَّكَّى (ইয়াযযাক্কা) অর্থাৎ পরিশুদ্ধ হতো। ‘পরিশুদ্ধ হওয়া’ বলতে দ্বীনের আলোকে হৃদয় পরিশুদ্ধ হওয়া বুঝানো হয়েছে। আর হৃদয় পরিশুদ্ধ হলে মানুষ গোনাহ থেকে পরিশুদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ হয়।

يَذَّكَّرُ অর্থ ‘তোমার বক্তব্য থেকে সে উপদেশ গ্রহণ করতো’। الذِّكْرَى অর্থ ‘উপদেশ বা ওয়ায’। যা মানুষকে আখেরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় এবং দুনিয়ার সংঘাতবিক্ষুব্ধ মানসিক অবস্থা থেকে সাময়িকভাবে হলেও মুক্তি দেয়। এর ফলে মানুষ আল্লাহর বিধানসমূহ মানতে উদ্বুদ্ধ হয় এবং হারাম সমূহ থেকে বিরত হয়। এ কারণেই বলা হয়েছে ‘অতঃপর সে উপদেশ তার উপকার করত’। অবশ্য হৃদয়ে সিলমোহর করা হঠকারী লোকদের কথা স্বতন্ত্র।

অত্র আয়াতদ্বয়ে ‘অন্তর পরিশুদ্ধ’ (يَزَّكَّى) -কে ‘উপদেশ দানের’ (يَذَّكَّرُ) পূর্বে আনা হয়েছে। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে, উপদেশদাতার সঙ্গলাভ আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য অধিক আবশ্যক। কেননা উপদেশদাতার নিজস্ব আচরণ ও তার চরিত্রমাধুর্য উপদেশ গ্রহিতার হৃদয়ে সর্বাধিক প্রভাব বিস্তার করে।

اسْتَغْنَى অর্থ ‘শক্তি ও ধন-সম্পদের অধিকারী হওয়ার কারণে যে ব্যক্তি কুরআন শ্রবণ ও হেদায়াত লাভ থেকে বেপরওয়া’। যে সমাজনেতার সঙ্গে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) অতি মনোযোগ দিয়ে কথা বলছিলেন এবং যার কারণে অন্ধ আগন্তুকের দিক থেকে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন, সেই ধনী অহংকারী ব্যক্তিটি কে সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। অনেকে বলেছেন অলীদ বিন মুগীরাহ। কেউ বলেছেন উমাইয়া বিন খালাফ, কেউ বলেছেন উবাই ইবনে খালাফ, কেউ বলেছেন উৎবা, শায়বাহ প্রমুখ একাধিক কুরায়েশ নেতা ।

কেননা হেদায়াতের মালিক তুমি নও (ক্বাছাছ ২৮/৫৬)। তোমার দায়িত্ব কেবল পৌঁছে দেয়া (শূরা ৪২/৪৮)। এরপর যদি কেউ পরিশুদ্ধ না হয় ও দ্বীন কবুল না করে, তাতে তোমার কোন দোষ হবে না। একথার মধ্যে আলেমগণের জন্য বিশেষ উপদেশ রয়েছে। তারা যেন শাসক ও ধনিক শ্রেণীর প্রতি অধিক মনোযোগী না হন। কেননা এই দু’টি শ্রেণী সাধারণত তাদের দুনিয়াবী স্বার্থের বাইরে কিছুই চিন্তা করতে পারে না। মানুষ এদের আনুগত্য করে কেবল দুনিয়াবী স্বার্থে। পক্ষান্তরে আখেরাতের পথপ্রদর্শক হিসাবে আলেমগণের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাবোধ থাকে অন্তরের অন্তঃস্থল হতে। দুনিয়াদাররা সর্বদা চায় আলেমগণকে তাদের স্বার্থে কাজে লাগাতে। আলেমরাও চান তাদেরকে হেদায়াত করতে। এটা স্রেফ আহবান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে। তার বেশী নয়। তাদের প্রতি অধিক মনোযোগী হলে শয়তানী খপপরে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে। ফলে ঐ আলেম তার দুনিয়া ও আখেরাত দুটোই হারাবেন। দুনিয়া বলতে আমরা সম্মান ও মর্যাদাকে বুঝিয়েছি। যা আলেমদের প্রধান সম্বল। কেননা টাকা-পয়সা সাধারণতঃ জাহিলদের বেশী থাকে। পক্ষান্তরে কোন মুত্তাক্বী আলেম দুনিয়ার বিনিময়ে আখেরাত হারাতে পারেন না।

‘পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি তোমার নিকটে দৌড়ে এল’। ‘এমন অবস্থায় যে সে (আল্লাহকে) ভয় করে’।

যে ব্যক্তি বলতে অন্ধ সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতূমকে বুঝানো হয়েছে। যিনি দ্বীন শেখার তীব্র ক্ষুধা নিয়ে এবং পূর্ণ আল্লাহভীতি সহকারে দৌড়ে এসেছিলেন রাসূল (সাঃ)-এর নিকটে।

تَلَهَّى অর্থ ‘তুমি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলে এবং অন্যের দিকে লিপ্ত হলে’। অর্থাৎ আল্লাহ চান দ্বীনের দাওয়াতের ক্ষেত্রে সবাইকে সমান দৃষ্টিতে দেখতে। ধনী-গরীব, উঁচু-নীচু কোন ভেদাভেদ করা যাবে না। সকলকে সমভাবে দাওয়াত দেওয়ার পর আল্লাহর উপরে তাওয়াক্কুল করতে হবে। তিনি যাকে খুশী হেদায়াতের আলোকে আলোকিত করবেন ও যাকে খুশী হেদায়াত থেকে বঞ্চিত করবেন।

অত্র আয়াতগুলিকে গরীবদের প্রতি দাওয়াতের ব্যাপারে অধিক মনোযোগী হওয়ার ও তাদেরকে দাওয়াতের মজলিসে সাদর অভ্যর্থনা জানানোর উপদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ধনী-গরীব সকলের প্রতি সমান ব্যবহারের ইসলামী আদব বিধৃত হয়েছে ।

সকলের প্রতি সমভাবে দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারে রাসূল (সাঃ)-কে তা’লীম দেওয়ার পর এবার কুরআনের প্রকৃত মর্যাদা ও গুরুত্ব তুলে ধরে আল্লাহ বলেন (১১-১৬ আয়াত)।

অর্থাৎ এমনটি কখনো করবেন না। যে সব লোক আল্লাহকে ভুলে আছে এবং যারা নিজেদের দুনিয়াবী সহায়-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অহংকারে মত্ত হয়ে আছে, তাদেরকে অযথা গুরুত্ব দিবেন না। ইসলাম, আহি বা কুরআন এমন কিছু নয় যে, যে ব্যক্তি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে তার সামনে নতজানু হয়ে তা পেশ করতে হবে। বরং সে সত্যের যতটা মুখাপেক্ষী নয় সত্যও তার ততটা মুখাপেক্ষী নয়। বরং তাদেরই ইসলামের মহত্তের সামনে নতজানু হতে হবে।

ذَكَرَه অর্থ اتعظ بالقران ‘কুরআন দ্বারা উপদেশ গ্রহণ করুক’ (কুরতুবী)। ইবনু কাছীর বলেন, ‘যে ব্যক্তি চায় তার সকল কাজকর্মে আল্লাহকে স্মরণ করুক’। আর আল্লাহকে স্মরণ করা মানেই তাকে ভয় করা, তাঁর বিধান মান্য করা ও অন্যায় থেকে বিরত হওয়া। যে ব্যক্তি মুখে কেবল ‘আল্লাহ’ শব্দে যিকর করে অথবা বিশাল তসবীহ ছড়া হাতে নিয়ে গণনা করে। অথচ অন্তরে আল্লাহকে ভয় করে না, বাস্তবে তাঁর বিধান মানে না ও অন্যায় থেকে বিরত হয় না, সে ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করে না। অত্র আয়াতে বুঝা যায় যে, মানুষ তার কর্মে স্বাধীন। সে ইচ্ছা করলে কুরআন থেকে উপদেশ গ্রহণ করতে পারে, ইচ্ছা করলে না-ও পারে। এর মধ্যে অদৃষ্টবাদী জাবরিয়াদের প্রতিবাদ রয়েছে।

 

এটা তো লিপিবদ্ধ আছে- সম্মানিত ফলকসমূহে। ‘যা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, পবিত্র’।

অন্যত্র এসেছে, َ ‘বরং সেটি হল মর্যাদাপূর্ণ কুরআন’। ‘যা সুরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ’ (বুরূজ ৮৫/২১-২২)। এতে বুঝা যায় যে, কুরআন বহু পূর্বেই লিখিত। যা বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে। উদ্দেশ্য যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব দেওয়া এবং বিষয়বস্ত্তকে শ্রোতার নিকটে যুক্তিসিদ্ধ করা ও তার হৃদয়ে গ্রথিত করা। আর মানুষের স্বভাব যেহেতু সকল যুগে সমান, সেহেতু কুরআনী সমাধান সকল যুগের জন্য প্রযোজ্য।

 سفرة শব্দটি سافر এর বহুবচন হতে পারে। তখন অর্থ হবে লিপিকার বা লেখক। আর যদি سفرة শব্দটি سفارة থেকে আসে, তখন এর অর্থ দূতগণ। এই শব্দ দ্বারা সাহাবীদেরও উদ্দেশ্য হতে পারে। প্রথমটিই অধিক শুদ্ধ। সহীহ হাদীসে السَّفَرَةُ الْكِرامُ البَرَرَةُ এর তাফসীর ফেরেশতাদেরই উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘কিরাতে বিশেষজ্ঞ কুরআন পাঠক সম্মানিত নেককার দূতদের (ফেরেশতাদের) সাথে থাকবে। আর যে ব্যক্তি বিশেষজ্ঞ নয় কিন্তু কষ্টে সৃষ্টি পড়ে সে দ্বিগুণ সওয়াব পাবে। [বুখারী: ৪৯৩৭, মুসলিম: ৭৯৮] [ইবন কাসীর]

চরিত্রের দিক দিয়ে তাঁরা হলেন সম্মানিত; অর্থাৎ, শ্রদ্ধেয় এবং বুযুর্গ। আর কর্মের দিক দিয়ে তাঁরা পুণ্যবান ও পবিত্র। এখান থেকে জানা যায় যে, কুরআন বহনকারী (হাফেয এবং আলেমগণ)-কেও চরিত্র এবং কর্মের দিক দিয়ে ‘কিরামিম বারারাহ’র মূর্ত-প্রতীক হওয়া উচিত। (ইবনে কাসীর) হাদীসেও ‘সাফারাহ’ শব্দ ফিরিশতাদের জন্য ব্যবহার হয়েছে। নবী (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যে কুরআন পাঠ করে এবং তাতে সুদক্ষ হয়, সে ‘কিরামিম বারারাহ’র সাথে – অর্থাৎ, সম্মানিত পুণ্যবান ফিরিশতাগণের সাথী হবে। আর যে কুরআন পাঠ করে কিন্তু কষ্টের সাথে (আটকে আটকে) পাঠ করে তার জন্য ডবল সওয়াব রয়েছে।’’ (সহীহ বুখারী তাফসীর সূরা আবাসা, মুসলিম নামায অধ্যায়, কুরআনে সুদক্ষ হওয়ার মাহাত্ম্যের পরিচ্ছেদ)

 

কুরআন মজীদের এই ধরনের বিভিন্ন স্থানে মানুষ শব্দটি মানবজাতির প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য ব্যবহৃত হয়নি। বরং সেখানে মানুষ বলতে এমন সব লোককে বুঝানো হয়েছে যাদের অপছন্দনীয় গুণাবলীর নিন্দা করাই মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে। কোথাও অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ঐসব অপছন্দনীয় গুণাবলী পাওয়া যাওয়ার কারণে “মানুষ” শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আবার কোথাও এর ব্যবহারের কারণ এই দেখা দিয়েছে যে, বিশেষ কিছু লোককে নির্দিষ্ট করে যদি তাদের নিন্দা বা তিরস্কার করা হয় তাহলে তার ফলে তাদের মধ্যে জিদ ও হঠধর্মিতা সৃষ্টি হয়ে যায়। তাই এক্ষেত্রে উপদেশ দেবার জন্য সাধারণভাবে কথা বলার পদ্ধতিই বেশী প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়।

আল্লাহর বাণী {مَا أَكْفَرَهُ} এর দুটি অর্থ হতে পারে: একটি হলো, তার কুফরির ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করা, অথচ আল্লাহ তার প্রতি কতই না অনুগ্রহ করেছেন এবং তার কাছে আল্লাহর কতই না নেয়ামত রয়েছে। আর দ্বিতীয় অর্থটি হলো: ‘কোন জিনিস তাকে কুফরি করতে বাধ্য করল?’ অর্থাৎ, ‘কোন বিষয়টি তাকে অবিশ্বাসী বানাল?’ কুফরী অর্থ এখানে সত্য অস্বীকার হয়, নিজের উপকারীর উপকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করাও হয়, আবার নিজের স্রষ্টা, মালিক, প্রভু ও রিযিকদাতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহীর মতো আচরণ করাও হয়।

অত্র আয়াতগুলিতে মানুষের সৃষ্টিতত্ত্ব বর্ণিত হয়েছে, যাতে অবিশ্বাসীরা তা স্মরণ করে ফিরে আসে এবং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ও অনুগত হয়। আল্লাহ বলেন, অবিশ্বাসীরা কি একথা ভেবে দেখে না যে, কি বস্ত্ত হতে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন? বলেই আল্লাহ জবাব দিচ্ছেন- শুক্রবিন্দু হতে।

 قدّره অর্থাৎ সুপরিমিত করেছেন, তার গঠন-প্রকৃতি, আকার-আকৃতি সুপরিমিতভাবে সৃষ্টি করেছেন। قدّره শব্দের এরূপ অৰ্থও হতে পারে যে, মানুষ যখন মাতৃগর্ভে সৃষ্টি হতে থাকে তখন আল্লাহ তা’আলা তার কাজ, বয়স, রিযিক, ভাগ্য ইত্যাদি তকদীর নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। তাছাড়া পূর্ব থেকেই প্রতিটি মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করা আছে তার গায়ের রং কি হবে, সে কতটুকু উচু হবে, তার দেহ কতটুকু কি পরিমাণ মোটা ও পরিপুষ্ট হবে। এত সব সত্বেও সে তার রবের সাথে কুফরী করে।

 অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলা স্বীয় ক্ষমতা-বলে মাতৃগর্ভে মানুষকে সৃষ্টি করেন। তারপর তিনিই তার অপার শক্তির মাধ্যমে মাতৃগর্ভ থেকে জীবিত ও পুর্নাঙ্গ মানুষের বাইরে আসার পথ সহজ করে দেয়। ফলে দেহটি সহী-সালামতে বাইরে চলে আসে এবং মায়েরও এতে তেমন কোন দৈহিক ক্ষতি হয় না। এছাড়া আয়াতের আরেকটি অর্থ হচ্ছে, দুনিয়ায় তিনি তার জন্য নিজের জন্য ভালো বা মন্দ, কৃতজ্ঞতা বা অকৃতজ্ঞতা আনুগত্য বা অবাধ্যতার মধ্যে সে কোন পথ চায় তা তার সামনে খুলে রেখে দিয়েছেন এবং পথ তার জন্য সহজ করে দিয়েছেন। ফলে সে শুকরিয়া আদায় করে সৎপথ গ্রহণ করতে পারে, আবার কুফরী করে বিপথে যেতে পারে। [দেখুন: ইবন কাসীর]

এখানে مَاتَ ‘মৃত্যু হয়’ না বলে أَمَاتَهُ ‘তার মৃত্যু ঘটান’ বলার মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, মানুষের মৃত্যু আল্লাহর হুকুমে হয়ে থাকে।

 

فَأَقْبَرَهُ ‘অতঃপর তাকে তিনি কবরস্থ করান’ বলার মধ্যে মানুষের লাশকে সসম্মানে কবর দেওয়ার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টির সেরা রূপে সম্মানিত করেছেন (বনু ইসরাঈল ১৭/৭০)। মৃত্যুর পরেও তার সম্মান বজায় থাকে। তাই তার লাশ যাতে মাটিতে পড়ে না থাকে এবং শিয়াল-কুকুর বা শকুনে খেয়ে অমর্যাদা না করে, সেজন্য তাকে সসম্মানে ও যথার্থ সমাদরে গোসল দিয়ে পূর্ণ মানবিক মর্যাদায় কবরস্থ করতে হবে।

 

 

অর্থাৎ মৃত্যুর পর আল্লাহ্ তা’আলাই মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। একমাত্র তিনিই এগুলো করার ক্ষমতা রাখেন। তারপরও মানুষ তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর হক আদায় করে না। [সা’দী] আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, দুই ফুঁৎকারের মধ্যবর্তী সময় হবে চল্লিশ। আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর সাথীরা বলল, চল্লিশ দিন? আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আমি এটা বলতে অস্বীকার করছি, তারা বলল, চল্লিশ বছর? তিনি বললেন, আমি এটা বলতেও অস্বীকার করছি। তারা বলল, তাহলে কি চল্লিশ মাস? তিনি বললেন, আমি এটাও বলতে অস্বীকার করছি। তবে মানুষের সবকিছু পঁচে যায় একমাত্র মেরুদণ্ডের নিম্নভাগের একটি ছোট্ট কোষ ব্যতীত। তার উপরই আবার সৃষ্টি জড়ো হবে।” [বুখারী ৪৮১৪, মুসলিম: ২৯৫৫]

অর্থাৎ ক্বিয়ামত হবে না বলে অবিশ্বাসীরা যে কথা বলে, তা কখনোই সঠিক নয়। বরং প্রকৃত কথা এই যে, মানুষ কখনোই আল্লাহর নির্দেশ মানেনি। সে কখনোই তার ওয়াদা এবং কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করেনি। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) এ আয়াতটি পাঠ করে বলতেন, ‘মানুষ কখনোই তার ওয়াদা পূর্ণ করেনি, যা আদমের পিঠ থেকে বের করে তাদের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল’ (কুরতুবী)। অর্থাৎ সেদিন আল্লাহ যখন আমাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন ألَسْتُ بِرَبِّكُمْ ‘আমি কি তোমাদের পালনকর্তা নই’? তখন জওয়াবে আমরা বলেছিলাম, بَلَى হ্যাঁ (আ‘রাফ ৭/১৭২)। কিন্তু দুনিয়ায় এসে শক্তি-সামর্থ্যের মালিক হয়ে সবকিছু অস্বীকার করছি আর বলছি আল্লাহ নেই, ক্বিয়ামত নেই, পরকালে জওয়াবদিহিতা নেই। অতএব খাও-দাও ফূর্তি করো। মুজাহিদ ও ক্বাতাদাহ বলেন, ‘মানুষকে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা আদেশ করা হয়েছে, সে তা পূর্ণ করে না’ (কুরতুবী)।

এখানে সাধারণভাবে সকল মানুষকে ধিক্কার দিয়ে বলা হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য হল ‘অবিশ্বাসী মানুষ’ (الإنسان الكافر)। কেননা অবিশ্বাসীরা আল্লাহর নিকটে কৃত ওয়াদা পালন করে না। আল্লাহর দ্বীন কবুল করে না। আল্লাহর দেওয়া ফরয-ওয়াজিব, হারাম-হালাল কিছুই মানে না। পক্ষান্তরে সত্যিকারের বিশ্বাসী মুমিন নর-নারীগণ সাধ্যমত আল্লাহর আদেশ-নিষেধসমূহ মান্য করে চলেন।

 

মানবসৃষ্টির সূচনা উল্লেখ করার পর মানুষ যে খাদ্যের নেয়ামত ভোগ করে, এখানে সেগুলো সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অর্থাৎ খাদ্য সম্পর্কে তার একবার চিন্তা করা প্রয়োজন- কিভাবে এই খাদ্য উৎপন্ন হয়। আল্লাহ যদি এর উপকরণগুলো সরবরাহ না করতেন তাহলে কি জমি থেকে এই খাদ্য উৎপন্ন করার ক্ষমতা মানুষের ছিল? এসব নেয়ামতসমূহ তিনি মানুষকে দিয়েছেন যাতে মানুষ কিয়ামতের প্রস্তুতির জন্য এর সাহায্যে আল্লাহর ইবাদত করে। [কুরতুবী]

উপরে বর্ণিত আয়াতসমূহে মানুষের প্রতি আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহরাজির বর্ণনা দিয়েছেন। সাথে সাথে পুনরুত্থানের পক্ষে দলীল পেশ করেছেন যে, আমরা যেভাবে মৃত যমীন থেকে জীবন্ত উদ্ভিদরাজি বের করে আনি, অনুরূপভাবে মানুষের মাটি হয়ে যাওয়া দেহকে ক্বিয়ামতের দিন পুনর্জীবিত করব।

২৪ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘মানুষ একবার তাকিয়ে দেখুক তার খাদ্যের দিকে’। তিনি কেন এটা বললেন? তার কারণ খাদ্য হল মানুষের বেঁচে থাকার প্রধান মাধ্যম। খাদ্যের মাধ্যমেই মানুষের দেহে শক্তি ও মাথায় বুদ্ধির যোগান হয়। দেহের প্রবৃদ্ধির যাবতীয় উপাদান ও প্রাণশক্তি আল্লাহ বিভিন্ন খাদ্যের মধ্যে সঞ্চিত রেখেছেন। এক এক খাদ্যের এক এক গুণ ও ক্ষমতা দান করেছেন। অতএব মানুষ যখন খাদ্য গ্রহণ করবে, তখন যেন সে চিন্তা করে যে, এই খাদ্য তার গুণ-ক্ষমতাসহ তার প্লেটে কে পাঠালো ও কিভাবে এলো।

বৃক্ষরাজির এই অমূল্য অবদান কি কেউ ভুলতে পারবে? আল্লাহ যে সৃষ্টি জগতের পালনকর্তা এটা কি তার অন্যতম প্রকৃষ্ট প্রমাণ নয়? এজন্যই তো কুরআনের সার নির্যাস সূরায়ে ফাতিহার প্রথম আয়াতেই প্রতি সালাতের প্রতি রাক‘আতে আমরা পড়ি ‘আলহামদুলিল্লাহি রবিবল ‘আলামীন’- ‘কৃতজ্ঞতাপূর্ণ যাবতীয় প্রশংসা জগতসমূহের প্রতিপালকের জন্য’। এখানে খালেক বা সৃষ্টিকর্তা না বলে রব বা পালনকর্তা বলার উদ্দেশ্য হল এই যে, অবিশ্বাসী কাফের-মুশরিকরা আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা হিসাবে মানলেও পালনকর্তা হিসাবে মানতে চায় না। ফেরাঊন এজন্য নিজেকে ‘রব’ দাবী করেছিল। কিন্তু ‘খালেক’ দাবী করেনি।

উপরে বর্ণিত আয়াতগুলিতে (২৪-৩২) কিভাবে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমে আল্লাহ মৃত যমীনকে সজীব করেন এবং সেখান থেকে মানুষ ও গবাদিপশুর জন্য খাদ্য-শস্য ও ফল-ফলাদি উৎপন্ন করেন ও বাগ-বাগিচা ও বন-জঙ্গল সৃষ্টির মাধ্যমে জীবকুলকে বাঁচিয়ে রাখেন- সবকিছু বর্ণনা করার পর অবশেষে ক্বিয়ামতের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন (৩৩-৪২ আয়াত)

 

 

 

الصاخة শব্দটির মূল অর্থ হলো, “এমন কঠোর ডাক যার ফলে মানুষ শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলে।” এখানে কিয়ামতের দ্বিতীয় শিংগাধ্বনির কথা বলা হয়েছে। যা পুনরুত্থানের শিঙ্গায় ফুঁক দেয়া বোঝায়। এই বিকট আওয়ায বুলন্দ হবার সাথে সাথেই মরা মানুষেরা জীবিত হয়ে উঠবে এবং কেয়ামতের মাঠে উপস্থিত হবে।   

 

কাতাদা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, প্ৰত্যেক মানুষ তার ভ্রাতার কাছ থেকে এবং পিতা মাতা স্ত্রী এবং সন্তানদের কাছ থেকে সেদিন মুখ লুকিয়ে ফিরবে। দুনিয়াতে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা ভ্ৰাতাদের মধ্যে হয়। এর চেয়ে বেশী পিতা-মাতাকে সাহায্য করার চিন্তা করা হয়। এবং স্বভাবগত কারণে এর চেয়েও বেশী স্ত্রী এবং সন্তানদের সাথে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আয়াতে নীচ থেকে উপরের সম্পর্ক যথাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে। [দেখুন: ইবন কাসীর] হাদীসে বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ একেবারেই উলংগ হয়ে উঠবে। একথা শুনে তাঁর পবিত্র স্ত্রীদের মধ্য থেকে কোন একজন ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের লজ্জাস্থান কি সেদিন সবার সামনে খোলা থাকবে? জবাবে রাসূলুল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই আয়াতটি তিলাওয়াত করে বলেন, সেদিন অন্যের দিকে তাকাবার মতো হুশ ও চেতনা কারো থাকবে না। [নাসাঈ: ২০৮৩, তিরমিযী: ৩৩৩২, ইবনে মাজাহ: ৪২৭৬, মুসনাদে আহমাদ: ৬/৮৯]।  প্ৰায় এই একই ধরনের বিষয়বস্তু বর্ণিত হয়েছে সূরা মা’আরিজের ১০ থেকে ১৪ পর্যন্ত আয়াতে।

সেখানে লোকদের দুটি দল হবে। এক দলের চেহারা আনন্দে চমকাতে থাকবে। তাদের মন নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্ত থাকবে। তাদের মুখমণ্ডল সুদর্শন এবং উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারা হবে জান্নাতি দল। আর একটি দল হবে জাহান্নামীদের। তাদের চেহারা মসিলিপ্ত, কালিমাময় ও মলিন থাকবে।

হাদীস শরীফে আছে যে, তাদের ঘাম হবে তাদের জন্যে লাগামের মত। তারা ধূলি-মলিন অবস্থায় পড়ে থাকবে। এরা সেই দল যাদের মনে কুফরী ছিল এবং আমল ছিল পাপে পরিপূর্ণ। যেমন অন্য এক জায়গায় আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা জন্ম দিতে থাকবে শুধু দুষ্কৃতিকারী কাফির।” (৭১:২৭)

সেখানে লোকদের দুটি দল হবে। এক দলের চেহারা আনন্দে চমকাতে থাকবে। তাদের মন নিশ্চিন্ত ও পরিতৃপ্ত থাকবে। তাদের মুখমণ্ডল সুদর্শন এবং উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। তারা হবে জান্নাতি দল। আর একটি দল হবে জাহান্নামীদের। তাদের চেহারা মসিলিপ্ত, কালিমাময় ও মলিন থাকবে।

হাদীস শরীফে আছে যে, তাদের ঘাম হবে তাদের জন্যে লাগামের মত। তারা ধূলি-মলিন অবস্থায় পড়ে থাকবে। এরা সেই দল যাদের মনে কুফরী ছিল এবং আমল ছিল পাপে পরিপূর্ণ। যেমন অন্য এক জায়গায় আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃ (আরবি) অর্থাৎ “তারা জন্ম দিতে থাকবে শুধু দুষ্কৃতিকারী কাফির।” (৭১:২৭)

ফুটনোট

সূরার সূচনা হয় এক অত্যন্ত ব্যক্তিগত ও শিক্ষণীয় ঘটনার বর্ণনার মাধ্যমে। আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-কে এক অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য স্নেহময় ভর্ৎসনা করছেন।

Ø ঘটনার প্রেক্ষাপট:

একদিন রাসূলুল্লাহ (ﷺ) মক্কার প্রভাবশালী কুরাইশ নেতাদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, এই আশায় যে, তাদের ইসলাম গ্রহণ ইসলামের প্রসারে সহায়ক হবে। ঠিক সেই মুহূর্তে একজন অন্ধ সাহাবী, আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম (রাঃ), তাঁর কাছে এসে দ্বীন সম্পর্কে জানার জন্য আকুলভাবে প্রশ্ন করতে থাকেন। দাওয়াতের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে এই বাধাদানে রাসূল (ﷺ)-এর চেহারায় অনিচ্ছাকৃতভাবে বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে।

আল্লাহ এই আপাতদৃষ্টিতে সামান্য ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে কিছু চিরন্তন ও গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি স্থাপন করেন। তিনি বলেন: “সে ভ্রূকুঞ্চিত করল এবং মুখ ফিরিয়ে নিল, কারণ তার কাছে এক অন্ধ ব্যক্তি আগমন করেছিল।”

এরপর আল্লাহ তাঁর রাসূলকে (ﷺ) কিছু গভীর প্রশ্ন করেন, যা দাওয়াতের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে দেয়:

  • “আর তুমি কিসে জানবে, হয়তো সে পরিশুদ্ধ হতো?”
  • “অথবা সে উপদেশ গ্রহণ করত এবং সেই উপদেশ তার উপকারে আসত?”

Ø অগ্রাধিকারের মূলনীতি:

আল্লাহ বলেন: “পক্ষান্তরে, যে ব্যক্তি অমুখাপেক্ষী (ধনী ও প্রভাবশালী), তুমি তার প্রতি অধিক মনোযোগী হচ্ছ।” অথচ সে পরিশুদ্ধ না হলে তোমার কোনো দায়িত্ব নেই।

“আর যে ব্যক্তি তোমার কাছে দৌড়ে আসল, এবং সে (আল্লাহকে) ভয়ও করে, তুমি তার প্রতি অমনোযোগী হলে!”

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর কাছে মানুষের সামাজিক মর্যাদা বা সম্পদের কোনো মূল্য নেই। বরং যার অন্তরে হেদায়েতের আকাঙ্ক্ষা ও আল্লাহভীতি রয়েছে, সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

Ø কুরআনের মর্যাদা এবং মানুষের অকৃতজ্ঞতা

এই ব্যক্তিগত উপদেশের পর, আল্লাহ এবার এই উপদেশবাণী—কুরআনের—মর্যাদা ও গুরুত্ব তুলে ধরেন।

কুরআনের পরিচয়:

  • “কখনোই নয়! নিশ্চয়ই এ তো এক উপদেশবাণী।”
  • “সুতরাং, যার ইচ্ছা, সে তা গ্রহণ করুক।”
  • “এটি লিপিবদ্ধ আছে সম্মানিত সহিফাসমূহে,”
  • “যা উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন, পবিত্র,”
  • “মহিমান্বিত, পুণ্যবান লেখকদের (ফেরেশতাদের) হাতে।”

এই মহিমান্বিত কিতাবের বিপরীতে আল্লাহ এবার মানুষের এক চরম অকৃতজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন: “ধ্বংস হোক মানুষ, সে কতই না অকৃতজ্ঞ!”

 নিজের সৃষ্টি এবং আল্লাহর অনুগ্রহের দিকে দৃষ্টিপাত

মানুষ কেন এত অকৃতজ্ঞ? আল্লাহ তাকে তার নিজের তুচ্ছ উৎস এবং তার উপর বর্ষিত অগণিত অনুগ্রহের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যা তার অহংকারকে চূর্ণ করে দেয়।

সৃষ্টির উৎস: “তিনি তাকে কী জিনিস থেকে সৃষ্টি করেছেন? এক শুক্রবিন্দু থেকে। তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন এবং অতঃপর তার পরিমাপ নির্ধারণ করেছেন।”

জীবনের পথ: “অতঃপর তিনি তার জন্য পথ সহজ করে দিয়েছেন।”

চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তন:“এরপর তিনি তার মৃত্যু ঘটান এবং তাকে কবরে স্থান দেন। অতঃপর যখন তিনি ইচ্ছা করবেন, তখন তাকে পুনরুত্থিত করবেন।”

কিন্তু এতকিছুর পরও, মানুষ তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে না।

 

খাদ্যের দিকে দৃষ্টিপাত: আল্লাহ বলেন,

  • “অতএব, মানুষ তার খাদ্যের দিকে তাকিয়ে দেখুক!”
  • “আমিই প্রচুর পরিমাণে পানি বর্ষণ করি।”
  • “অতঃপর আমি ভূমিকে বিদীর্ণ করি।”
  • “এবং তাতে উৎপন্ন করি শস্য, আঙ্গুর, শাক-সবজি, জয়তুন, খেজুর,”
  • “এবং ঘন সন্নিবেশিত উদ্যানসমূহ,”
  • “আর ফলমূল ও তৃণলতা।”

এই সবকিছুই মানুষের ও তার চতুষ্পদ জন্তুর জীবন ধারণের জন্য।

Ø মহাগর্জন এবং চূড়ান্ত পলায়ন

এই অগণিত অনুগ্রহের বর্ণনার পর, সূরাটি এবার সেই অবশ্যম্ভাবী দিনের এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে, যেদিন এই সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।

    মহাগর্জন: “অতঃপর যখন সেই মহাগর্জন (দ্বিতীয় ফুৎকার) আসবে,”

চূড়ান্ত পলায়ন:

  • “সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে,”
  • “এবং তার মাতা ও তার পিতার কাছ থেকে,”
  • “আর তার স্ত্রী ও তার সন্তানদের কাছ থেকে।”
  • “সেদিন প্রত্যেক ব্যক্তির এমন এক অবস্থা হবে, যা তাকে অন্য সবকিছু থেকে বিমুখ করে রাখবে।”

Ø দুই ধরনের চেহারা এবং চূড়ান্ত পরিণতি

সেই চূড়ান্ত দিনে মানুষ দুটি দলে বিভক্ত হয়ে যাবে, যাদের চেহারা দেখেই তাদের পরিণতি বোঝা যাবে।

১. উজ্জ্বল চেহারা (জান্নাতবাসী):

  • “সেদিন কিছু চেহারা হবে উজ্জ্বল,”
  • “সহাস্য, আনন্দিত।”

২. ধূলিমলিন চেহারা (জাহান্নামবাসী):

  • “আর সেদিন কিছু চেহারার উপর থাকবে ধূলিমলতা,”
  • “কালিমা সেগুলোকে আচ্ছন্ন করে ফেলবে।”
  • “এরাই হলো কাফির, পাপাচারী।”