কুরাআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৩
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-৮
সূরা লাইল
সূরা আল লাইল আল-কুরআনের ৯২ তম সূরা। এর আয়াত সংখ্যা ২১টি এবং এর রূকুর সংখ্যা ১টি। লাইল শব্দের অর্থ রাত্রি। আল লাইল সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। তাই এটি মাক্কী সূরা।
নামকরণ :
সূরার প্রথম শব্দ ওয়াল লাইল – কে এই সূরার নাম গণ্য করা হয়েছে।
নাযিলের সময় – কাল
পূর্ববর্তী সূরা আশ শামসের সাথে এই সূরাটির বিষয়বস্তুর গভীর মিল দেখা যায়। এদিক দিয়ে এদের একটিকে অপরটির ব্যাখ্যা বলে মনে হয়। একই কথাকে সূরা আশ শামসে একভাবে বলা হয়েছে আবার সেটিকে এই সূরার অন্যভাবে বলা হয়েছে। এথেকে আন্দাজ করা যায় , এ দু’টি সূরা প্রায় একই যুগে নাযিল হয়।
বিষয়বস্ত্ত :
তিনটি বিষয়ের শপথ করে আল্লাহ বলছেন যে, কর্মপ্রচেষ্টার দিক দিয়ে পৃথিবীতে মানুষ দু’ধরনের হয়ে থাকে। এক ধরনের লোক তারাই, যাদের সত্তাকে সরলপথে চলার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এরাই সফলকাম এবং তাদের তিনটি গুণাবলী উল্লেখ করা হয়েছে (১-৭ আয়াত)। আরেক ধরনের লোক আছে, যাদের সত্তাকে বক্রপথে চলার জন্য সহজ করে দেওয়া হয়েছে। এরা ব্যর্থকাম এবং এদের তিনটি দোষ চিহ্নিত করা হয়েছে। অতঃপর তাদের পরিণতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে (৮-১৬)। সবশেষে আল্লাহর সন্তোষভাজন ব্যক্তিদের চরিত্র ও তাদের প্রতিদান বিবৃত করা হয়েছে (১৭-২১ আয়াত)।
আগের সূরা ও পরের সূরার সাথে সম্পর্ক
৯১ তম সূরা আশ শামছ এর শুরুর দিকে দিনের প্রকাশ হওয়া ও রাতের ঢেকে যাওয়া বিষয়টা এসেছে। ৯২ তম সূরা আল লাইল এও প্রায় একই ভাবে বিষয়দুটি এসেছে একটু ভিন্নভাবে।
সূরা আশ শামছ এ আকাশ ও পৃথিবী এর কথা এসেছে কিন্তু পরের সূরায় পুরুষ ও নারীর কথা এসেছে। এই দুই ধরনের বিষয়ের মধ্যে বেশ মিল বিদ্যমান। আকাশ হতে বৃষ্টি আকারে পানি পড়ে এবং তার কারনে পৃথিবীতে জীবন (মানুষ ও গাছপালা) এর ধারা চলতে থাকে। অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবী একসাথে কাজ করে জীবন এর ধারাকে চালিয়ে নিয়ে যায়। তেমনিভাবে পুরুষ ও নারী একসাথে কাজ করে জীবন এর ধারাকে চালিয়ে নিয়ে যায়।
সূরা আশ শামছ এর ৯ নং আয়াতে নাফসের পরিশুদ্ধির কারনে সফলতার কথা বলা হয়েছে এবং পরের সূরা আল লাইল এ সেই পরিশুদ্ধি কারীদের বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল বর্নিত হয়েছে (আয়াত ৫,৬,৭)। এই সূরার ১০ নং আয়াতে নাফসকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার সুফল ও না করার কারনে ব্যর্থতার কথা বলা হয়েছে এবং সূরা আল লাইল এ সেই সফলতা ও ব্যর্থতার কারন বিস্তারিতভাবে বর্নিত হয়েছে ৮,৯ ও ১০ নম্বর আয়াতে।
সূরা আশ শামছ এ অবাধ্যতা, বিদ্রোহ পতনের অন্যতম কারন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে (আয়াত ১১) এবং পরের সূরায় অর্থ লোভ পতনের অন্যতম কারন হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে (আয়াত ১১)। সূরা আশ শামছ এ আল্লাহর নিদর্শন (উটনী) থেকে দূরে থাকতে বলা হয়েছে কিন্তু অপরাধীরা কাছে এসে তা লঙ্ঘন করেছে। আর পরের সূরায় আল্লাহর নিদর্শন (আল কুরআন/হেদায়াত) এর কাছে আসতে বলা হয়েছে কিন্তু অপরাধীরা দূরে চলে গিয়ে তা লঙ্ঘন করেছে।
৯১ তম সূরায় আল্লাহর নবী সামূদ জাতির অপরাধীদের সতর্ক করেছেন (আয়াত ১৩) আর পরের সূরায় আল্লাহ নিজেই মুহাম্মাদ (সঃ) ও তার পরবর্তি জাতিদের সতর্ক করেছেন (আয়াত ১৪)। আশ শামছ এ হতভাগ্য ব্যাক্তির চরিত্র বর্নিত হয়েছে (আয়াত ১২) এবং দুনিয়ায় তার পরিনতির কথা বলা হয়েছে (আয়াত ১৪)। পরের সূরা আল লাইল এ হতভাগ্য ব্যাক্তির চরিত্র ও আখিরাতে পরিনতির কথা বর্নিত হয়েছে (আয়াত ১৫, ১৬)
৯১ তম সূরা আশ শামছ এর শেষে আল্লাহ শাস্তি দেওয়ার কথা বলেছেন ক্ষোভের সাথে (আয়াত ১৪,১৫) কিন্তু পরের সুরায় আল্লাহ শাস্তি থেকে দূরে রাখার ফলে বাঁচিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন সন্তুষ্টির সাথে (আয়াত ১৮)। সূরা আশ শামছ এ আল্লাহর শাস্তির ক্ষেত্রে পরিমান ও ভয়াবহতার কথা বলা হয়েছে (আয়াত ১৪) কিন্তু পরের সূরায় পুরষ্কারের ক্ষেত্রে কোন পরিমান এর কথা বলা হয়নি, অর্থাৎ মানুষ আসলে চিন্তাও করতে পারে না সেই পুরস্কারের পরিমানের কথা কারন আল্লাহ অশেষ পুরষ্কার দানকারী।
সূরা আল লাইলে মূলত ভালো মানুষের একটি স্তর (সাহাবী) এর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পরের ২ টি সূরায় সরাসরি মুহাম্মাদ (স) এর কথা এসেছে। ৯৩ তম সূরা দুহায় মুহাম্মাদ (স) কে সান্তনা দেওয়া হয়েছে ও তাঁর প্রতি অনুগ্রহ বর্ননা করা হয়েছে।
এখানে রাত্রি ও দিবসের শপথ করার মাধ্যমে এ দু’টির গুরুত্ব বুঝানো হয়েছে। এখানে উভয়ের দু’টি প্রধান বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে। যে দু’টি বৈশিষ্ট্য সকলের নিকটে স্পষ্ট। অর্থাৎ রাত্রির বৈশিষ্ট্য হ’ল ‘আচ্ছন্ন করা’। আর দিনের বৈশিষ্ট্য হ’ল ‘অন্ধকার ঠেলে দিন প্রকাশিত হওয়া’। কিন্তু কেবল এটুকু বুঝানোর জন্য শপথ করা হয়নি। বরং এতে জ্ঞানীদের জন্য রয়েছে গভীর তাৎপর্য এবং রয়েছে সৌরবিজ্ঞানের মূল্যবান উৎস। কেবল এখানেই নয়, বরং কুরআনে বর্ণিত সকল শপথই বিজ্ঞানের উৎস কেন্দ্র। যেমন এখানে রাত্রির শপথ করা হয়েছে ‘আচ্ছন্নকারী’ হিসাবে। এর তাৎপর্য কি?
প্রথমতঃ রাত্রি ও দিনের প্রতিটিই কিছু বস্ত্তকে আচ্ছন্ন করে ও কিছু বস্ত্তকে প্রকাশ করে। যেমন রাত্রি আকাশের চাঁদ ও নক্ষত্ররাজিকে প্রকাশ করে দেয়। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের সবকিছুকে আচ্ছন্ন করে। পক্ষান্তরে দিন আকাশের নক্ষত্ররাজিকে আচ্ছন্ন করে। কিন্তু ভূপৃষ্ঠের সবকিছুকে প্রকাশ করে দেয়। এর মধ্যে পৃথিবীর আহ্নিক গতির বৈজ্ঞানিক তথ্যের সন্ধান রয়েছে। যা ২৪ ঘণ্টায় একবার নিজের অক্ষের উপরে ঘুরে থাকে। লাটিমের মত ঘূর্ণনের সময় পৃথিবীর যে অংশ সূর্যের দিকে পড়ে, সেই অংশে দিন হয় এবং অপরাংশে রাত হয়। সেকারণ আচ্ছন্নকারী হ’ল রাত্রি, দিন নয়। কেননা দিন অর্থাৎ সূর্য সদা প্রকাশিত। বস্ত্ততঃ এটি কুরআনের বিস্ময়কর তথ্যসমূহের অন্যতম।
দ্বিতীয়তঃ রাতের বেলায় যা কিছু প্রকাশিত হয় ও আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়, তা হ’ল আল্লাহর বিশাল সৃষ্টিসমূহের সারৎসার মাত্র। কিন্তু দিনের বেলায় যা আমাদের সামনে প্রকাশিত হয়, তা হ’ল ঐসব সৃষ্টির তুলনায় সরিষাদানা সমতুল্য। আর তা হ’ল পৃথিবী নামক এই ছোট্ট গ্রহটি। যার সবকিছু আমরা বড় ও স্পষ্ট দেখি হাতের কাছে থাকার কারণে। পক্ষান্তরে আকাশের বড় বড় নক্ষত্ররাজিকে আমরা ছোট দেখি, দূরে এবং নাগালের বাইরে থাকার কারণে।
দিবস ও রাত্রির এই আসা-যাওয়ার মধ্যে মানুষের দুনিয়াবী জীবন ও পরকালীন জীবনের দৃষ্টান্ত লুকিয়ে রয়েছে। মানুষ যতক্ষণ বেঁচে থাকে, ততক্ষণ সে কূয়ার ব্যাঙের মত কেবল তার আশপাশের ছোট্ট দুনিয়াটুকু দেখে। কিন্তু মৃত্যুর পরে বিশাল এক জগতের দৃশ্য তার সামনে ভেসে ওঠে, যার কোন সীমা-পরিসীমা নেই। যার সৌন্দর্যের কোন তুলনা নেই। ঠিক যেমন সূর্যাস্তের পর রাতের পর্দা উন্মোচিত হ’লে আমাদের সামনে ভেসে ওঠে লক্ষ-কোটি নক্ষত্রশোভিত সীমাহীন আকাশের এক অনিন্দ্যসুন্দর ক্যানভাস। একথাটাই আল্লাহ বলেছেন এভাবে- ‘তুমি তো এই দিন সম্পর্কে উদাসীন ছিলে। এখন আমরা তোমার থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। ফলে আজ তোমার দৃষ্টি সুতীক্ষ্ণ’ (ক্বাফ ৫০/২২)।
ঘুমের স্বপ্নজগত থেকে জেগে উঠে মানুষ যেমন সবকিছু নতুন দেখে, দুনিয়ার এ স্বপ্নজগত শেষে মৃত্যুর পরে সে দেখবে নতুন এক বিস্ময়কর জগত। সে তখন পরকালের অনন্ত জীবনের বাসিন্দা হবে। ইহকালের সাথে তার কোনই সম্পর্ক থাকবে না। যেমন সূর্য ডুবে গেলে দিনের সাথে রাতের কোন সম্পর্ক থাকে না। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের সামনে পর্দা থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত’ (মুমিনূন ২৩/১০০)। কবরের ঐ জগতকে এজন্যই বলা হয় ‘বরযখী জগত’। অর্থাৎ পর্দার জগত। ওখানে গিয়ে দুনিয়ার কারুর কোন উপকার বা ক্ষতি কেউ করতে পারে না। যারা ছবি-মূর্তি, প্রতিকৃতি বা কবরপূজা করে এবং মৃত ব্যক্তির নিকটে বা তার অসীলায় কিছু কামনা করে, তারা অলীক কল্পনার পিছনে ছুটে মাত্র। তারা কুরআনের বিরোধিতা করে এবং প্রকাশ্য শিরকে লিপ্ত হয়।
রাত্রির আচ্ছন্ন করা এবং দিবসের আলোকিত হওয়ার শপথ করে আল্লাহ এই দু’য়ের কল্যাণকারিতার বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার প্রতি যেমন বান্দার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তেমনি দুনিয়ায় নেক আমলের মাধ্যমে আখেরাতে মুক্তি হাছিলের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন।
এ কথার জন্যই রাত ও দিন এবং নারী ও পুরুষের জন্মের কসম খাওয়া হয়েছে। এর তাৎপর্য এই হতে পারে যে, যেভাবে রাত ও দিন এবং পুরুষ ও নারী পরস্পর থেকে ভিন্ন ও বিপরীত ঠিক তেমনই তোমরা যেসব কর্মপ্রচেষ্টা চালাচ্ছে সেগুলোও বিভিন্ন ধরনের এবং বিপরীত। কেউ ভালো কাজ করে, আবার কেউ খারাপ কাজ করে। হাদীসে আছে, “প্রত্যেক মানুষ সকাল বেলায় উঠে নিজেকে ব্যবসায়ে নিয়োজিত করে। অতঃপর কেউ এই ব্যবসায়ে সফলতা অর্জন করে এবং নিজেকে আখেরাতের আযাব থেকে মুক্ত করে; আবার কেউ নিজেকে ধ্বংস করে।” [মুসলিম: ২২৩]
অত্র দু’টি আয়াতে সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের তিনটি গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। এক- যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে। দুই- আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বেঁচে থাকে এবং তিন- ‘উত্তম বিষয়’ অর্থাৎ তাওহীদের কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-কে মনেপ্রাণে সত্য বলে বিশ্বাস করে।
ইবনু মাসঊদ (রাঃ) বলেন, আয়াত দু’টি আবুবকর (রাঃ) সম্পর্কে নাযিল হয়। আর এটাই সকল মুফাসসির বলেন । ইবনু জারীর ‘আমের বিন আব্দুল্লাহ ইবনে যুবায়ের (রাঃ) হ’তে বর্ণনা করেন যে, আবুবকর (রাঃ) মক্কায় থাকাকালে ইসলাম কবুলকারী বৃদ্ধা ও নারীদের তাদের মনিবদের নিকট থেকে খরিদ করে মুক্ত করে দিতেন। এতে আপত্তি করে তাঁর পিতা আবু ক্বোহাফা বলেন, বেটা! আমি দেখছি তুমি কেবল দুর্বলদের মুক্ত করছ। যদি তুমি শক্তিশালী ও সাহসী পুরুষ লোকদের মুক্ত করতে, তাহ’লে তারা তোমাকে সাহায্য করত ও তোমার পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলতো। জবাবে আবুবকর (রাঃ) বলেন ‘হে পিতা! আমি তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি চাই’। রাবী ‘আমের বলেন, আমার পরিবারের লোকেরা আমাকে বলেছেন যে, আলোচ্য আয়াতটি উক্ত প্রসঙ্গেই নাযিল হয়েছিল’। (ইবনু জারীর ৩০/১৪২ পৃঃ; কুরতুবী, ইবনু কাছীর।)
উল্লেখ্য, হযরত ‘আমের হলেন, হযরত আসমা বিনতে আবুবকর (রাঃ)-এর পৌত্র এবং আবুবকর (রাঃ)-এর নাতি আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের (রাঃ)-এর পুত্র।
وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَىঅর্থ ‘উত্তম কালেমাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে’। ইবনু আববাস, যাহহাক প্রমুখ বলেন, কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-কে সত্য বলে বিশ্বাস করে। ক্বাতাদাহ বলেন, আল্লাহর পথে ব্যয় ও আল্লাহভীরুতার উত্তম প্রতিদানে বিশ্বাস পোষণ করে (ইবনু কাছীর)। সবগুলি কাছাকাছি মর্ম বহন করে। কেননা তাওহীদে বিশ্বাসী না হলে কেউ পরকালীন ছওয়াবে বিশ্বাসী হবে না এবং নিঃস্বার্থভাবে সৎকর্ম করবে না।
আমরা সিরাতে মুস্তাক্বীম-এর পথ প্রদর্শন করব এবং সেপথে চলা তার জন্য সহজ করে দেব। যায়েদ বিন আসলাম বলেন, ‘সরল পথের জন্য’ অর্থ ‘জান্নাতের জন্য’। কেননা জান্নাতের পথই সরল পথ বা ছিরাতে মুস্তাক্বীম। আর এ পথের শেষ ঠিকানাই হ’ল জান্নাত।
আয়াতে سَ অর্থ ‘সত্বর’ যা এসেছে تحقيق বা নিশ্চয়তা বুঝানো জন্য। অর্থাৎ তার দ্বীন ও দুনিয়ার সকল কাজ আল্লাহ সহজ করে দিবেন। যেমন তিনি বলেন, وَمَنْ يَتَّقِ اللهَ يَجْعَلْ لَهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার কাজ-কর্ম সহজ করে দেন’ (তালাক ৬৫/৪)।
আলোচ্য আয়াতে যে তিনটি গুণের বিনিময়ে জান্নাতের পথ সহজ করে দেবার ওয়াদা করা হয়েছে, মূলতঃ ঐ গুণাবলী তারাই হাছিল করেন, যাদেরকে আল্লাহ জান্নাতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। ফলে সৎকর্ম করা তাদের মজ্জাগত স্বভাবে পরিণত হবে। এদের পক্ষে জাহান্নামের কাজ করাটাই কষ্টকর এমনকি অসম্ভব হবে।
এটি দ্বিতীয় ধরনের মানসিক প্রচেষ্টা। মহান আল্লাহ এখানে তাদের তিনটি কর্ম উল্লেখ করে বলেছেন যে, আল্লাহ যা নির্দেশ দিয়েছেন তা তাঁর পথে ব্যয় করার ব্যাপারে কৃপণতা করে তথা ফরয-ওয়াজিব-মুস্তাহাব কোন প্রকার সদকা দেয় না, আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বনের পরিবর্তে, তার প্রতি ইবাদত করার পরিবর্তে বিমুখ হয়ে নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে এবং উত্তম কলেমা তথা ঈমানের যাবতীয় বিষয়কে মিথ্যা মনে করে; তার জন্য কঠিন পথে চলা সহজ করে দিব। এখানে কঠিন পথ অর্থ কঠিন ও নিন্দনীয় অবস্থা তথা খারাপ কাজকে সহজ করে দেয়ার কথা বলা হয়েছে প্রথম ধরনের প্রচেষ্টাটির সাথে প্রতি পদে পদে রয়েছে এর অমিল। কৃপণতা মানে শুধুমাত্র প্রচলিত অর্থে যাকে কৃপণতা বলা হয় তা নয়, বরং এখানে কৃপণতা বলতে আল্লাহর ও বান্দার হকে সামান্য কিছু হলেও ব্যয় না করা বুঝাচ্ছে।
আর বেপরোয়া হয়ে যাওয়া ও অমুখাপেক্ষী মনে করা হলো তাকওয়া অবলম্বনের সম্পূর্ণ বিপরীত স্তর। তাকওয়া অবলম্বনের কারণে মানুষ তার নিজের দূর্বলতা এবং তার স্রষ্টার প্রতি মুখাপেক্ষীতার মর্ম বুঝতে পারে। এ-জন্য আল্লাহ্ তা’আলা আখুশি হন এমন কোন বিষয়ের ধারে কাছেও যায় না, আর যাতে খুশি হন তা করার সর্বপ্রচেষ্টা চালায়। আর যে ব্যক্তি নিজেকে তার রবের অমুখাপেক্ষী মনে করে, সে বেপরোয়া হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা’আলা কোন কাজে খুশি হন। আর কোন কাজে নাখোশ হন তার কোন তোয়াক্কা করে না। তাই তার কাজকর্ম কখনো মুত্তাকীর কর্মপ্রচেষ্টার সমপর্যায়ের হতে পারে না। উত্তম কালমায় মিথ্যারোপ করা অর্থ ঈমানী শক্তিকে নষ্ট করে দিয়ে ঈমানের কালিমা ও আখেরাতের কথা মিথ্যা গণ্য করা।
পূর্বের আয়াতে জান্নাতী বান্দাদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা শেষে এবার জাহান্নামীদের তিনটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এক- তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করার বিষয়ে কৃপণতা করবে। দুই- আল্লাহর অবাধ্যতায় বেপরওয়া হবে এবং তিন- তাওহীদের কালেমায় মিথ্যারোপ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর বাণীর অবাধ্যতা করবে। তাদের জন্য কঠিন পথ অর্থাৎ জাহান্নামের পথ সহজ করে দেয়া হবে। অসৎকর্ম করা তখন তাদের মজ্জাগত হয়ে যাবে। এদের পক্ষে জান্নাতের কাজ করাটা কষ্টকর এমনকি অসম্ভব হবে।
এই যে, যারা তাদের প্রচেষ্টা ও শ্রম প্রথমোক্ত তিন কাজে নিয়োজিত করে, (অর্থাৎ আল্লাহর পথে দান করা, আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করা এবং ঈমানকে সত্য মনে করা) তাদেরকে আমি সৎ ও উত্তম কাজের জন্যে সহজ করে দেই। পক্ষান্তরে যারা তাদের প্রচেষ্টা ও শ্রমকে শেষোক্ত তিন কাজে নিয়োজিত করে, আমি তাদেরকে খারাপ ও দুর্ভাগ্যের কাজের জন্য সহজ করে দেই। এ আয়াতগুলোতে তাকদীরের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া আছে। হাদীসে এসেছে, আলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমরা বাকী আল-গারকাদে এক জানাযায় এসেছিলাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও সেখানে আসলেন, তিনি বসলে আমরাও বসে গেলাম। তার হাতে ছিল একটি ছড়ি। তিনি সেটি দিয়ে মাটিতে খোচা দিচ্ছিলেন।
তারপর বললেন, “তোমাদের প্রত্যেকের এমনকি প্রতিটি আত্মারই স্থান জান্নাত কিংবা জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে গেছে। প্রত্যেকের ব্যাপারেই সৌভাগ্যশালী কিংবা দূর্ভাগা লিখে দেয়া হয়েছে। তখন একজন বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি আমাদের লিখা গ্রন্থের উপর নির্ভর করে কাজ-কর্ম ছেড়ে দেব না? কারণ, যারা সৌভাগ্যশালী তারা তো অচিরেই সৌভাগ্যের দিকে ধাবিত হবে, আর যারা দূৰ্ভাগা তারা দূর্ভাগ্যের দিকে ধাবিত হবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, যারা সৌভাগ্যশালী তাদের জন্য সৌভাগ্যপূর্ণ কাজ করা সহজ করে দেয়া হবে, পক্ষান্তরে যারা দূৰ্ভাগা তাদের জন্য দূর্ভাগ্যপূর্ণ কাজ করা সহজ করে দেয়া হবে। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেন।” [বুখারী: ৪৯৪৮, মুসলিম: ২৬৪৭]
বখীলের ধন-সম্পদ যেমন তার জীবদ্দশায় কোন কাজে লাগে না, তার মৃত্যুর পরেও কোন কাজে লাগে না। কেননা মৃত্যুর পূর্বে সে মাল কমে যাওয়ার ভয়ে কোনরূপ ছাদাক্বায়ে জারিয়া করে যায় না। সে নিজের জন্য কিছু খরচ করে না, পরের জন্য তো প্রশ্নই ওঠে না। ফলে মৃত্যুর পরে সে কিছুই পায় না। তার আমলনামা শূন্য থাকে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা যে বিষয়ে কৃপণতা করেছিল, ক্বিয়ামতের দিন সেগুলিই তাদের গলায় বেড়ী হবে…’ (আলে ইমরান ৩/১৮০)।
ক্বিয়ামতের দিন সে আফসোস করে বলবে, ‘আমার মাল আমার কোন কাজে আসল না’। ‘আমার রাজনৈতিক ক্ষমতা ধ্বংস হয়েছে’ (হা-ক্কাহ ৬৯/২৮-২৯)। আবু যর গেফারী (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূল (সাঃ) কা‘বা গৃহের ছায়ায় বসেছিলেন। এমন সময় আমাকে দেখে তিনি বললেন, ‘কা‘বার মালিকের কসম! অধিক ধনশালীরা ক্ষতিগ্রস্ত। তিনি বলেন, এরা ক্বিয়ামতের দিন নিঃস্ব হবে। কেবল তারা ব্যতীত, যারা নেকীর কাজে ছাদাক্বা করেছে’। তিনি বলেন, তুমি ছাদাক্বা কর যখন তুমি সুস্থ, লোভী, দারিদ্র্যভীরু ও ধনী হওয়ার আকাংখী থাক। মৃত্যু ওষ্ঠাগত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো না। তিনি আরও বলেন, ‘কৃপণতা ও ঈমান কোন বান্দার অন্তরে কখনো একত্রিত হ’তে পারে না’। আল্লাহ বলেন, ‘হে আদম সন্তান! তুমি দান কর। আমি তোমাকে দান করব’। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘তুমি দান কর। গণনা করো না। তাহ’লে আল্লাহ তোমাকে দান করার সময় গণনা করবেন। ধরে রেখ না। তাহ’লে আল্লাহ তোমার ব্যাপারে (রহমতকে) ধরে রাখবেন। অতএব অল্প হলেও তুমি সাধ্যমত দান কর’। তিনি বলেন, তোমরা ছাদাক্বা কর। কেননা এমন একটি যামানা তোমাদের নিকট আসছে, যখন মানুষ ছাদাক্বা নিয়ে ঘুরবে। কিন্তু তা নেওয়ার মত লোক পাবে না। তারা বলবে, গতকাল পেলে নিতাম, আজ আমার প্রয়োজন নেই’।
হিদায়াত ও প্রদর্শিত সরল পথ প্রদর্শনের দায়িত্ব আল্লাহ তা’আলার। এ আয়াতের আরেকটি অর্থ হতে পারে, আর তা হলো, হেদায়াতপূর্ণ সরল পথ আল্লাহ তা’আলার সান্নিধ্যে পৌছে দেয়, যেমনিভাবে ভ্রষ্টপথ জাহান্নামে পৌছে দেয়। পবিত্র কুরআনে অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন, “আর সোজা পথ (দেখাবার দায়িত্ব) আল্লাহরই ওপর বার্তায় যখন বাঁকা পথও রয়েছে।” [সূরা আন-নাহল: ৯]
এখানে ‘আখেরাত’কে আগে আনা হয়েছে তার গুরুত্ব ও নিশ্চয়তা বুঝানোর জন্য। তাছাড়া দুনিয়াতে কর্তৃত্ব অনেকের থাকতে পারে। কিন্তু আখেরাতে কর্তৃত্ব এককভাবে আল্লাহর। যেমন তিনি বলেন, ‘(আল্লাহ সেদিন জিজ্ঞেস করবেন) আজ কর্তৃত্ব কার? কেবলমাত্র আল্লাহর; যিনি একক ও পরাক্রমশালী’ (মুমিন/গাফের ৪০/১৬)।
অর্থাৎ আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি ও পরিচালনা এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক মালিকানা কেবলমাত্র আল্লাহর হাতে। এই মালিকানায় কেউ সামান্যতম শরীক নয়। আল্লাহ বলেন, ‘অতএব পবিত্র তিনি, যার হাতে রয়েছে সবকিছুর রাজত্ব এবং তাঁর দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে’ (ইয়াসীন ৩৬/৮৩)। বস্ত্ততঃ সুপথে চলা ও পথভ্রষ্ট হওয়ার মধ্যে আল্লাহর কোন লাভ-ক্ষতি নেই। বরং এতে কেবল বান্দারই কল্যাণ ও অকল্যাণ নিহিত রয়েছে।
এ লেলিহান আগুনের ভয়াবহতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন যে জাহান্নামীর সবচেয়ে হাল্কা আযাব হবে তার অবস্থা হচ্ছে এই যে, তার পায়ের নীচে আগুনের কয়লা রাখা হবে এতেই তার ঘিলু উৎরাতে থাকবে।” [বুখারী: ৬৫৬১, মুসলিম: ২১৩]
এখানে আল্লাহ নিজেই জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করছেন। এর মধ্যে তিনটি বিষয় প্রতিভাত হয়। (১) জাহান্নাম যে অবধারিত সত্য সেটা দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে (২) এর দ্বারা জাহান্নামের শাস্তির ভয়াবহতা বুঝানো হয়েছে (৩) রাসূল (সাঃ)-এর ভয় প্রদর্শন মূলতঃ আল্লাহরই ভয় প্রদর্শন, সেকথা বলে দেওয়া হয়েছে।
তিনি নিজে কখনো সশরীরে মানুষের কাছে এসে ভয় দেখান না। অন্যত্র ‘আমরা’ বহুবচনের পদ ব্যবহার করলেও আল্লাহ এখানে ‘আমি’ একবচন পদ ব্যবহার করেছেন দৃঢ়ভাবে একথা বলে দেওয়ার জন্য যে, রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর মুখ দিয়ে কুরআনের যে সকল বাণী মানবজাতির উদ্দেশ্যে বর্ণিত হয়, তা সবই সরাসরি আল্লাহর বাণী। এমনকি যে সকল হাদীছ তিনি বর্ণনা করেন, মর্মগত দিক দিয়ে সেগুলিও আল্লাহর বাণী। কেননা শারঈ বিষয়ে তিনি নিজে থেকে কোন কথা বলেন না, যতক্ষণ না তাকে ‘অহি’ করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তিনি নিজ থেকে কোন কথা বলেন না’। ‘যা বলেন তা ‘অহি’ ব্যতীত কিছুই নয়, যা তাঁর নিকটে করা হয়’ (নাজম ৫৩/৩-৪)।
আল্লাহ তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন মানবজাতিকে জান্নাতের সুসংবাদ দানকারী ও জাহান্নামের ভয় প্রদর্শনকারী হিসাবে। সেমতে মক্কায় নবুঅতী জীবনের শুরুতে যখন আল্লাহর হুকুম হ’ল, ‘তুমি তোমার নিকটাত্মীয়দের ভয় প্রদর্শন কর’ (শো‘আরা ২৬/২১৪), তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সর্বপ্রথম স্বীয় আত্মীয়-পরিজনকে জাহান্নামের ভয় প্রদর্শন করেন।
পূর্বের আয়াতে الْأَتْقَى -এর বিপরীতে এখানে الْأَشْقَى এসেছে। অর্থাৎ সর্বাধিক হতভাগা। যাদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত হয়ে আছে। তাদের বৈশিষ্ট্য হ’ল ‘সে প্রথমে অহি-র বিধানে মিথ্যারোপ করে, অতঃপর বিধান মান্য করা থেকে পিঠ ফিরিয়ে নেয়’।
আবু জাহল, উমাইয়া বিন খালাফ ও তাদের ন্যায় দুষ্টু লোকদের উদ্দেশ্যে আয়াতটি নাযিল হয় (কুরতুবী)। কেননা এরা ছিল মক্কার সবচেয়ে দুরাচার নেতৃবৃন্দ। যারা রাসূল (সাঃ)-এর প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল এবং তাঁকে সত্য জেনেও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল। তবে আয়াতটির মর্ম সকল যুগের হতভাগাদের জন্য প্রযোজ্য। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর যারা দুর্ভাগা হবে, তারা জাহান্নামে যাবে’ (হূদ ১১/১০৬) ‘পক্ষান্তরে যারা ভাগ্যবান হবে, তারা জান্নাতে যাবে’ (হূদ ১১/১০৮)।
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে কেবল তারা ব্যতীত যারা অস্বীকার করে। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কারা অস্বীকার করে? রাসূল (সাঃ) বললেন, যারা আমার আনুগত্য করে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যারা আমার অবাধ্যতা করে, তারাই অস্বীকার করে’।
আবু ইসহাক আয-যাজ্জাজ বলেন, মুর্জিয়াগণ এই আয়াতকে দলীলরূপে গ্রহণ করে বলে থাকে যে, ‘জাহান্নামে কেবল কাফেররাই প্রবেশ করবে’। মুমিনরা নয়। কেননা তাদের নিকট হৃদয়ে বিশ্বাস অথবা মুখে স্বীকৃতিই মুমিন হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আমল শর্ত নয়। কারণ আমল ঈমানের অংশ নয়’। অথচ এই আয়াত থেকে তাদের দলীল নেবার কোন সুযোগ নেই। কেননা জাহান্নামীদের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। তার মধ্যে একটি হ’ল মুনাফিকদের জন্য। যারা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে (নিসা ৪/১৪৫)। আল্লাহপাক জাহান্নামীদের নানাবিধ শাস্তির কথা বলেছেন। আল্লাহ যার জন্য যেরূপ শাস্তি নির্ধারণ করবেন, তাকে সেভাবেই শাস্তি দিবেন। আল্লাহ বলেছেন, শিরকের গোনাহ তিনি মাফ করবেন না। এছাড়া বাকী সকল গোনাহ তিনি যাকে ইচ্ছা মাফ করবেন (নিসা ৪/৪৮,১১৬)। এক্ষণে ঐসব পাপী যারা শিরক করেনি, তাদের কারু যদি পাপের শাস্তি তিনি না দিবেন, তাহ’লে ‘তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন’ বলার তো কোন অর্থ হয় না’ । অতএব প্রকৃত কথা এই যে, কবীরা গোনাহগার মুমিন যদি তওবা না করে মারা যায়, তাহ’লে পাপের শাস্তিস্বরূপ সে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর শাফা‘আতে এবং আল্লাহর বিশেষ রহমতে তারা পরবর্তীতে ক্রমে ক্রমে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে যাবে তাদের খালেছ ঈমানের বদৌলতে, যদি সেটা থাকে।
الْأَتْقَى আধিক্য জ্ঞাপক বিশেষ্য (اسم تفضيل) হয়েছে تقوى থেকে। যার অর্থ সর্বাধিক আল্লাহভীরু। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে শুদ্ধ চরিত্র সর্বাধিক আল্লাহভীরু ব্যক্তিকে। এতে বুঝা যায় যে, কেবল ঈমান আনলেই সে জাহান্নাম থেকে দূরে থাকবে না। বরং তাকে যথার্থভাবে মুত্তাক্বী হ’তে হবে। সেকারণ ঈমানদারগণকে ডাক দিয়ে আল্লাহ বলেন, – ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যথার্থ ভয়। আর অবশ্যই তোমরা মরো না সত্যিকারের মুসলিম না হয়ে’ (আলে ইমরান ৩/১০২)।
বিশ্বাস, আল্লাহভীতি ও কর্মে বাস্তবায়ন- তিনটি বিষয়কে এখানে একত্রিত করে বলা হয়েছে। যাতে বুঝা যায় যে, শুধু বিশ্বাস দিয়ে আমল হয় না, বরং আমলের জন্য চাই আল্লাহভীতি। বিশ্বাস আছে কিন্তু আল্লাহভীতি নেই, সে ব্যক্তির আমলে খুলূছিয়াত নেই। অতএব তাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে না।
تَزْكِيَةً ‘পবিত্র করা’ সেখান থেকে يَتَزَكَّى ‘সে পবিত্রতা অর্জন করে’। অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার মাল-সম্পদ খরচ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে তাঁরই দেখানো পথে আত্মশুদ্ধি ও মালশুদ্ধির জন্য। এর মধ্যে কোনরূপ শ্রুতি বা লোক দেখানো উদ্দেশ্য থাকে না। আল্লাহ বলেন, ‘(হে রাসূল!) তুমি তাদের ধন-সম্পদ হ’তে যাকাত গ্রহণ কর, যা দ্বারা তুমি তাদের পবিত্র করবে ও পরিশুদ্ধ করবে এবং তুমি তাদের জন্য দো‘আ কর। নিশ্চয়ই তোমার দো‘আ তাদের জন্য প্রশান্তির কারণ। আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ’ (তওবা ৯/১০৩)। এর মধ্যে ইঙ্গিত রয়েছে যে, ঐ ব্যক্তি অপচয় করে না বা কার্পণ্য করে না। বরং মালশুদ্ধির জন্য আল্লাহর পথে ব্যয় করে। যেমন আল্লাহ বলেন, আর যখন তারা ব্যয় করে তখন তারা অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্য করে না। বরং তারা এতদুভয়ের মধ্যম পন্থায় থাকে’ (ফুরক্বান ২৫/৬৭)।
এখানে সেই মুত্তাকী ব্যক্তির আরো বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে। সে যে নিজের অর্থ যাদের জন্য ব্যয় করে, আগে থেকেই তার কোন অনুগ্রহ তার ওপর ছিল না, যার প্রতিদান বা পুরস্কার দিচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে তাদের থেকে কোন স্বাৰ্থ উদ্ধারের অপেক্ষায় তাদেরকে উপহার-উপঢৌকন ইত্যাদি দিয়ে ব্যয় করছে; বরং সে নিজের মহান ও সর্বশক্তিমান রবের সন্তুষ্টিলাভের জন্যই এমন-সব লোককে সাহায্য করছে, যারা ইতোপূর্বে তার কোন উপকার করে নি এবং ভবিষ্যতেও তাদের উপকার পাওয়ার আশা নেই। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, এ আয়াতটি আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুর শানে নাযিল হয়েছে।
আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহু মক্কা মুআযযিমার যে অসহায় গোলাম ও বাঁদীরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এই অপরাধে তাদের মালিকরা তাদের ওপর চরম অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাচ্ছিল তাদেরকে মালিকদের যুলুম থেকে বাচাঁবার জন্য কিনে নিয়ে আযাদ করে দিচ্ছিলেন। যেসব দাসকে আবুবকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু প্রচুর অর্থ দিয়ে ক্রয় করে মুক্ত করে দেন, তাদের কোন সাবেক অনুগ্রহও তাঁর উপর ছিল না, যার প্রতিদানে এরূপ করা যেত; বরং তার লক্ষ্য মহান আল্লাহ তা’আলার সস্তুষ্টি অন্বেষণ ব্যতীত কিছুই ছিল না। এ ধরনের মুসলিম সাধারণ দুর্বল ও শক্তিহীন হত। একদিন তার পিতা আবু কোহাফা বললেনঃ তুমি যখন গোলামদেরকে মুক্তই করে দাও, তখন শক্তিশালী ও সাহসী গোলাম দেখেই মুক্ত করো, যাতে ভবিষ্যতে সে শত্রুর হাত থেকে তোমাকে রক্ষা করতে পারে। আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ কোন মুক্ত-করা মুসলিম থেকে উপকার লাভ করা আমার লক্ষ্য নয়। আমি তো কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্যেই তাদেরকে মুক্ত করি।
এখানে সেই মুত্তাকী ও আল্লাহভীরু ব্যক্তির আন্তরিকাতার আরো বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে৷ সে নিজের অর্থ যাদের জন্য ব্যয় করে , আগে থেকেই তার কোন অনুগ্রহ তার ওপর ছিল না , যার বদলা সে এখন চুকাচ্ছে অথবা ভবিষ্যতে তাদের থেকে আরো স্বার্থ উদ্ধারের জন্য তাদেরকে উপহার উপঢৌকন ইত্যাদি দিচ্ছে এবং তাদেরকে দাওয়াত খাওয়াচ্ছে৷ বরং সে নিজের মহান ও সর্বশক্তিমান রবের সন্তুষ্টিলাভের জন্য এমন সব লোককে সাহায্য করছে , যার ইতিপূর্বে তার কোন উপকার করেনি এবং ভবিষ্যতেও তাদের উপকার করার কোন আশা নেই৷ এর সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত হচ্ছে হযরত আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম ও বাঁদীদের আযাদ করার কাজটি৷ মক্কা মু’আযযমার সে অসহায় গোলাম ও বাঁদীরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং এই অপরাধে তাদের মালিকরা তাদের ওপর চরম অকথ্য নির্যাতন ও নিপীড়ন চালাচ্ছিল হযরত আবু বকর ( রা) তাদেরকে মালিকদের জুলুম থেকে বাঁচাবার জন্য কিনে নিয়ে আযাদ করে দিচ্ছিলেন৷ ইবনে জারীর ও ইবনে আসাকির হযরত আমরে ইবনে আবদুল্লাহ যুবাইরের এই রেওয়ায়াতটি উদ্ধৃত করেছেন : হযরত আবু বকরকে এভাবে গরীব গোলাম ও বাঁদীদেরকে গোলামী মুক্ত করার জন্য অর্থ ব্যয় করতে দেখে তাঁর পিতা তাকে বলেন , হে পুত্র ! আমি দেখছি তুমি দুর্বল লোকদের মুক্ত করে দিচ্ছো , যদি এ টাকাটা তুমি শক্তিশালী জোয়ানদের মুক্ত করার জন্য খরচ করতে তাহলে তারা তোমার হাতকে শক্তিশালী করতো৷ একথায় হযরত আবু বকর ( রা) তাঁকে বলেন : আব্বাজান ! আমি তো আল্লাহর কাছে এর প্রতিদান চাই ৷”
যে ব্যক্তি পূর্বে বর্ণিত গুণাবলী অর্জন করবে, সে ব্যক্তি সত্বর আল্লাহর সন্তোষ লাভে ধন্য হবে। আর তা হ’ল- (ক) সর্বাধিক আল্লাহভীরু হওয়া এবং (খ) স্রেফ আত্মশুদ্ধি ও মালশুদ্ধির জন্য আল্লাহর ওয়াস্তে ব্যয় করা’। এখানে سوف এসেছে تحقيق বা নিশ্চয়তাবোধক অর্থে। অর্থাৎ অবশ্যই সে অচিরে আল্লাহর সন্তোষভাজন হবে অশেষ ছওয়াব লাভের মাধ্যমে। যেমন তিনি বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা যেমন একটি শস্যবীজ, যা থেকে উৎপন্ন হ’ল সাতটা শিষ, প্রত্যেক শিষে উৎপন্ন হ’ল একশ’ শস্যদানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে আরো বর্ধিত করে দেন। বস্ত্ততঃ আল্লাহ প্রশস্ত দাতা ও সর্বজ্ঞ’ (বাক্বারাহ ২/২৬১)। বস্ত্ততঃ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার চূড়ান্ত প্রতিদান হ’ল আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।
এই শেষ বাক্যটি মুত্তাকীদের জন্য, বিশেষ করে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর জন্যে একটি বিরাট সুসংবাদ। আল্লাহ তাকে সন্তুষ্ট করবেন-এ সংবাদ এখানে তাকে শোনানো হয়েছে।
ফুটনোট
- আলোচ্য সূরায় চারটি বিষয়ের শপথ করা হয়েছে- রাত ও দিনের এবং নর ও নারীর।
- চারটি বিষয়ের শপথের পর উল্লেখ করা হয়েছে যে মানুষ তার প্রচেষ্টার আলোকে দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়।
- একভাগ হলো জান্নাতী সৎকর্মশীল ব্যক্তি। ৫,৬ নং আয়াতে সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের তিনটি গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। এক- যারা আল্লাহর পথে ব্যয় করে। দুই- আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ থেকে বেঁচে থাকে এবং তিন- ‘উত্তম বিষয়’ অর্থাৎ তাওহীদের কালেমালা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-কে মনেপ্রাণে সত্য বলে বিশ্বাস করে।
- জান্নাতী বান্দাদের তিনটি বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা শেষে এবার জাহান্নামীদের তিনটি বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করা হচ্ছে যে, এক- তারা আল্লাহর পথে ব্যয় করার বিষয়ে কৃপণতা করবে। দুই- আল্লাহর অবাধ্যতায় বেপরওয়া হবে এবং তিন- তাওহীদের কালেমায় মিথ্যারোপ করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর বাণীর অবাধ্যতা করবে। তাদের জন্য কঠিন পথ অর্থাৎ জাহান্নামের পথ সহজ করে দেয়া হবে।
- উপরোক্ত দুটিভাগে জান্নাতী সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য তাদের চলার পথকে আল্লাহ্ সহজ করে দেন এবং অপরপক্ষে জাহান্নামী ব্যক্তিদের জন্য চলার পথ কঠিন করে দেন।
- ১১-২১ আয়াতগুলোতে এই দুইপ্রকার মানুষদের বিষয়ে আরো বিস্তারিত বলা হয়েছে।