প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-১৩

কুরাআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৩

প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-১৩

সূরা আল-মুনাফিকুন‌

সূরা আল-মুনাফিকুন‌ কুরআনের ৬৩ তম সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ১১ এবং রূকু সংখ্যা ২। সূরা আল-মুনাফিকুন মদীনায় অবতীর্ণ হয়েছে।

ঐতিহাসিক পটভূমি

কোন কোন বর্ণনা থেকে বুঝা যায় যে, এ ঘটনাটি তাবুক যুদ্ধের পরে সংঘটিত হয়েছিল। [আস-সুনানুল কুবরা, নাসায়ী: ১১৫৯৭ তিরমিযী: ৩৩১৪] কিন্তু বিশিষ্ট ঐতিহাসিকদের বর্ণনা অনুযায়ী পঞ্চম হিজরীতে ‘বনী-মুস্তালিক’ যুদ্ধের সময় এ আয়াত সংক্রান্ত ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল। [তিরমিযী: ৩৩১৫, মুসনাদে আহমাদ ৩/৩৯২, ইবনে হাজার: মুকাদ্দিমাহ ফাতহুল বারী ১/২৯৫, ৬/৫৪৭, ইবনে সা’দ: তাবাকাতুল কুবরা: ৪/৩৪৯] আর এটাই সবচেয়ে বিশুদ্ধ মত। কারণ, ঘটনায় বর্ণিত আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই তাবুকের যুদ্ধে অংশগ্রহণ থেকে বিরত ছিল। ঘটনাটির সার সংক্ষেপ হল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনী মুস্তালিক যুদ্ধে বের হওয়ার পর সাহাবায়ে কিরাম পানির ব্যাপারে কষ্ট পাচ্ছিলেন। এরপর যখন মুসলিম মুজাহিদ বাহিনী একটি কুপের কাছে সমবেত ছিল, তখন একটি অগ্ৰীতিকর ঘটনা ঘটে গেল। একজন মুহাজির ও একজন আনসারীর মধ্যে পানি ব্যবহার নিয়ে ঝগড়া শুরু হয়ে হাতাহাতির সীমা অতিক্রম করে পারস্পরিক সংঘর্ষের পর্যায়ে পৌছে গেল।

মুহাজির ব্যক্তি সাহায্যের জন্যে মুহাজিরগণকে এবং আনসারী ব্যক্তি আনসার সম্প্রদায়কে ডাক দিল। উভয়ের সাহায্যার্থে কিছু লোক তৎপরও হয়ে উঠল। এভাবে ব্যাপারটি মুসলিমদের পারস্পরিক সংঘর্ষের কাছাকাছি পৌছে গেল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ পেয়ে অনতিবিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌছে গেলেন এবং ভীষণ রুষ্ট হয়ে বললেন, مَابَالُ دَعْوَى جَاهِلِيَّةٍ অর্থাৎ ‘এ কি মূর্খতাযুগের আহবান।’ দেশ ও বংশগত জাতীয়তাকে ভিত্তি করে সাহায্য ও সহযোগিতার আয়োজন হচ্ছে কেন? তিনি আরও বললেন, دَعُوهَا فَإِنَّهَا مُنْتِنَةٌ ‘এই শ্লোগান বন্ধ করা। এটা দুৰ্গন্ধময় স্লোগান৷” অর্থাৎ এই দেশ ও বংশগত জাতীয়তা একটা মূর্খতাসুলভ দুৰ্গন্ধময় স্লোগান। এর ফল জঞ্জাল বাড়ানো ছাড়া কিছুই হয় না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই উপদেশবাণী শোনামাত্রই ঝগড়া মিটে গেল। এ ব্যাপারে মুহাজির জাহজাহ ইবনে সা’দ আল-গিফারী এর বাড়াবাড়ি প্রমাণিত হল। তার হাতে সিনান ইবনে ওবরা আল-জুহানী আল-আনসারী। রাদিয়াল্লাহু আনহু আহত হয়েছিলেন। ওবাদা ইবনে সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে মাফ করিয়ে নিলেন। ফলে ঝগড়াকারী জালেম ও মজলুম উভয়ই পুনরায় ভাই ভাই হয়ে গেল।

মুনাফিকদের যে দলটি যুদ্ধলব্ধ সম্পদের লালসায় মুসলিমদের সাথে আগমন করেছিল তাদের নেতা আবদুল্লাহ ইবনে উবাই যখন মুহাজির ও আনসারীর পারস্পরিক সংঘর্ষের খবর পেল, তখন সে একে মুসলিমদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করার একটি সুবর্ণ সুযোগ মনে করে নিল। সে মুনাফিকদের এক মজলিসে, যাতে মুমিনদের মধ্যে কেবল যায়েদ ইবনে আরকম উপস্থিত ছিলেন, আনসারকে মুহাজিরগণের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে বলল, তোমরা মুহাজিরদেরকে দেশে ডেকে এনে মাথায় চড়িয়েছ, নিজেদের ধন-সম্পদ ও সহায়-সম্পত্তি তাদের মধ্যে বণ্টন করে দিয়েছ। তারা তোমাদের রুটি খেয়ে লালিত হয়ে এখন তোমাদেরই ঘাড় মটকাচ্ছে। যদি তোমাদের এখনও জ্ঞান ফিরে না আসে, তবে পরিণামে এরা তোমাদের জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। কাজেই তোমরা ভবিষ্যতে টাকা-পয়সা দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করো না। এতে তারা আপনা-আপনি ছত্ৰভঙ্গ হয়ে চলে যাবে। এখন তোমাদের কর্তব্য এই যে, মদীনায় ফিরে গিয়ে সম্মানীরা বহিরাগত এসব বাজে লোকদের বহিষ্কার করে দিবে। সম্মানী বলে তার উদ্দেশ্য ছিল নিজের দল ও আনসার এবং বাজে লোক বলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম। যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ কথা শোনা মাত্রই বলে উঠলেনঃ আল্লাহর কসম, তুই-ই বাজেলোক লাঞ্ছিত ও ঘৃণিত। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ প্রদত্ত শক্তিবলে এবং মুসলিমদের ভালবাসার জোরে মহাসম্মানী।

যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু মজলিস থেকে উঠে সোজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে গেলেন এবং আদ্যোপান্ত ঘটনা তাকে বলে শোনালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে সংবাদটি খুবই গুরুতর মনে হল। মুখমণ্ডলে পরিবর্তনের রেখা ফুটে উঠল। যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু অল্পবয়স্ক সাহাবী ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বললেনঃ বৎস দেখ, তুমি মিথ্যা বলছি না তো? যায়েদ কসম খেয়ে বললেনঃ না। আমি নিজ কানে এসব কথা শুনেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার বললেনঃ তোমার কোনরূপ বিভ্ৰান্তি হয় নি তো? যায়েদ উত্তরে পূর্বের কথাই বললেন। এরপর মুনাফিক সরদারের এই কথা গোটা মুসলিম বাহিনীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। তাদের মধ্যে এছাড়া আর কোন আলোচনাই রইল না। এদিকে সব আনসার যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে তিরস্কার করতে লাগলেন যে, তুমি সম্প্রদায়ের নেতার বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করেছ এবং আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছ। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বললেনঃ আল্লাহর কসম, সমগ্ৰ খাযরাজ গোত্রের মধ্যে আমার কাছে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই অপেক্ষা অধিক প্রিয় কেউ নেই। কিন্তু যখন সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বিরুদ্ধে এসব কথাবার্তা বলেছে, তখন আমি সহ্য করতে পারিনি। যদি আমার পিতাও এমন কথা বলত তবে আমি তাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর গোচরীভূত করতাম।

অপরদিকে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু এসে আরয করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে অনুমতি দিন আমি এই মুনাফিকের গর্দান উড়িয়ে দেই। কোন কোন রেওয়ায়েতে আছে ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ কথা বলেছিলেনঃ আপনি আব্বাদ ইবনে বিশারকে আদেশ করুন, সে তার মস্তক কেটে আপনার সামনে উপস্থিত করুক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ ওমর, এর কি প্রতিকার যে, মানুষের মধ্যে খ্যাত হয়ে যাবে আমি আমার সাহাবীকে হত্যা করি। অতঃপর তিনি ইবনে উবাইকে হত্যা করতে বারণ করে দিলেন। এই ঘটনার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাধারণ অভ্যাসের বিপরীতে অসময়ে সফর শুরু করার কথা ঘোষণা করে দিলেন এবং নিজে ‘কাসওয়া’ উষ্ট্রীর পিঠে সওয়ার হয়ে গেলেন। যখন সাহাবায়ে কেরাম রওয়ানা হয়ে গেলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে ডেকে এনে বললেনঃ তুমি কি বাস্তবিকই এরূপ কথা বলেছি? সে অনেক কসম খেয়ে বললঃ আমি কখনও এরূপ কথা বলিনি। এই বালক (যায়েদ ইবনে আরকাম) মিথ্যাবাদী। স্বগোত্রে আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের যথেষ্ট সম্মান ও প্রতিপত্তি ছিল। তারা সবাই স্থির করল যে, সম্ভবতঃ যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু ভুল বুঝেছে। আসলে ইবনে উবাই এ কথা বলেনি।

মোটকথা, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আব্দুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের কসম ও ওযর কবুল করে নিলেন। এদিকে জনগণের মধ্যে যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর বিরুদ্ধে ক্রোধ ও তিরষ্কার আরও তীব্র হয়ে গেল। তিনি এই অপমানের ভয়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকতে লাগলেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সমগ্র মুজাহিদ বাহিনীসহ সারাদিন ও সারারাত সফর করলেন এবং পরের দিন সকালেও সফর অব্যাহত রাখলেন। অবশেষে যখন সূর্যকরণ প্রখর হতে লাগল, তখন তিনি কাফেলাকে এক জায়গায় থামিয়ে দিলেন। পূর্ণ একদিন একরাত সফরের ফলে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত সাহাবায়ে কেরাম মনযিলে অবস্থানের সাথে সাথে নিদ্রার কোলে ঢলে পড়লেন। বর্ণনাকারী বলেনঃ সাধারণ অভ্যাসের বিপরীতে তাৎক্ষণিক ও অসময়ে সফর করা এবং সুদীর্ঘকাল সফর অব্যাহত রাখার পিছনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উদ্দেশ্য ছিল আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ঘটনা থাকে উদ্ভূত জল্পনা-কল্পনা হতে মুজাহিদদের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেয়া, যাতে এ সম্পর্কিত চর্চার অবসান ঘটে।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পুণরায় সফর শুরু করলেন। ইতোমধ্যে উবাদা ইবনে সামেত রাদিয়াল্লাহু আনহু আবদুল্লাহ ইবনে উবাইকে উপদেশাচ্ছলে বললেনঃ তুমি এক কাজ কর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে উপস্থিত হয়ে অপরাধ স্বীকার করে নাও। তিনি তোমার জন্যে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করবেন। এতে তোমার মুক্তি হয়ে যেতে পারে। ইবনে উবাই এই উপদেশ শুনে মাথা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। ওবাদা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু তখনই বললেনঃ আমার মনে হয়, তোমার এই বিমুখতা সম্পর্কে অবশ্যই কুরআনের আয়াত নাযিল হবে।

এদিকে সফর চলাকালে যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু বার বার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে আসতেন। তার দৃঢ়বিশ্বাস ছিল যে, এই মুনাফিক লোকটি আমাকে মিথ্যাবাদী বলে গোটা সম্প্রদায়ের দৃষ্টিতে হেয় প্রতিপন্ন করেছেন। অতএব আমার সত্যায়ন ও এই ব্যক্তির মিথ্যার মুখোশ উন্মোচন সম্পর্কে অবশ্যই কুরআন নাযিল হবে। হঠাৎ যায়েদ ইবনে আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু দেখলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মধ্যে ওহী অবতরণকালীন লক্ষণাদি ফুটে উঠছে। তার শ্বাস ফুলে উঠছে, কপাল ঘৰ্মাক্ত হয়ে যাচ্ছে এবং তার উষ্ট্রী বোঝার ভারে নুয়ে পড়ছে। যায়েদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু আশাবাদী হলেন যে, এখন এ সম্পর্কে কোন ওহী নাযিল হবে। অবশেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই অবস্থা দূর হয়ে গেল।

যায়েদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমার সওয়ারী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছ ঘেঁষে যাচ্ছিল। তিনি নিজের সওয়ারীর উপর থেকে আমার কান ধরলেন এবং বললেন, “হে বালক, আল্লাহ তা’আলা তোমার কথার সত্যায়ন করেছেন”। আর সম্পূর্ণ সূরা আল-মুনাফিকুন আবদুল্লাহ ইবনে উবাইয়ের ঘটনা সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। [পুরো ঘটনাটি কোথাও একত্রে বর্ণিত হয়নি। ভিন্ন ভিন্ন অংশ হিসেবে নিম্নোক্ত গ্রন্থসমূহ দেখা যেতে পারে। বুখারী: ৪৯০০, ৪৯০২, ৪৯০৫, মুসলিম: ২৫৮৪, ২৭৭২, নাসায়ী, ৯৭৭, তিরমিযী: ৩৩১২, ৩৩১৩, ৩৩১৪, ৩৩১৫, মুসনাদে আবি ইয়া’লা: ১৮২৪, মুসনাদে আহমাদ: ৩/৩৩৮, ৪/৩৬৮, ৩৭৩, ইবনে হিব্বান: ৫৯৯০, দালায়েলুন নাবুওয়ত লিল বাইহাকী: ৪/৫৩-৫৫, সীরাতে ইবনে হিশাম: ৩/৬৯, সীরাতে ইবনে কাসীর: ৩/১০৩]

আলোচ্য বিষয়বস্তুঃ

১ম অংশে (আয়াত ১-৩) আল্লাহ তাআলা মুনাফিকদের একটা পরিচয় (মিথ্যাবাদী, আল্লাহর পথ থেকে নিজেরা দূরে থাকা ও অন্যদেরও দূরে রাখা, কুফরী করা) দিয়েছেন।

২য় অংশে (আয়াত ৪-৬) আল্লাহর রসূল (সঃ) এর সাথে মুনাফিকদের আচরন এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রতি মুহাম্মাদ (সঃ) এর আচরন কেমন হওয়া উচিত এবং আল্লাহর প্রিয় নবীর প্রতি তাদের এই ব্যবহারের কারনে আল্লাহ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন (ক্ষমা প্রার্থনা গ্রহনযোগ্য হবে না)।

৩য় অংশে (৭-৮) আয়াতে আল্লাহ মুনাফিকদের সম্পর্কে আবার বলেছেন ও তাদের চরিত্র (কৃপনতা, অহংকার) ও পরিকল্পনা (মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি ও তাদের অসম্মান করা) ফাস করে দিয়েছেন।

তাদের ওই পরিকল্পনার বিপরীতে সূরার শেষ অংশে (আয়াত ৯-১১) আল্লাহ উপদেশ দিয়েছেন অর্থ ব্যায়ের ব্যাপারে। মুনাফিকদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো তারা নিজেরা আল্লাহর পথে অর্থ ব্যয় না করে থামে না বরং অন্যকেও অনুৎসাহিত করে। আল্লাহ এই অংশে ক্লিয়ার করলেন যে, এই ধন-সম্পদের চেয়ে আল্লাহর স্মরন ও তাঁর জন্য তা ব্যয় করা অনেক অনেক বেশি দরকারি। ‘ইনফাক’ (আল্লাহর পথে ব্যয় ) ‘নিফাক’কে দূরে রাখতে সহায়তা করে।

 

আগের সূরার সাথে সম্পর্ক

আগের সূরা (৬২ তম সূরা আল জুমুয়াতে) আল্লাহর গুনে গুণান্বিত হয়ে মুহাম্মাদ (স) এর মিশন বাস্তবায়ন এর রুপরেখা বর্ননা করা হয়েছে। এই মিশন বাস্তবায়ন করার সময় সবচাইতে ক্ষতিকর ও বিপদজনক সম্প্রদায় হলো মুনাফিক। সুতরাং তাদের পরিচয়, কার্যাবলী, পরিকল্পনা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের প্রতি মুহাম্মাদ (সঃ) এর আচরন কেমন হওয়া উচিত এবং তাদের প্রতি আল্লাহ নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে মুহাম্মাদ (স) এর মিশন বাস্তবায়নে দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এই সূরা (৬৩ তম সূরা আল মুনাফিকুন)।  

অর্থাৎ যে কথা তারা মুখে বলেছে তা আসলে সত্য ৷ কিন্তু তারা মুখে যা প্রকাশ করছে নিজেরা যেহেতু তা বিশ্বাস করে না, তাই তাঁর রসূল হওয়ার যে সাক্ষ্য তারা দেয় সে ব্যাপারে তারা মিথ্যাবাদী ৷ এখানে একথাটি ভালভাবে বুঝে নিতে হবে যে, দুটি জিনিসের সমন্বয়ের নাম সাক্ষ ৷ এক, যে মূল বিষয়টির সাক্ষ দেয়া হয় সেটি ৷ দুই, সেই বিষয়টি সম্পর্কে সাক্ষদানকারীর বিশ্বাস ৷ এখন বিষয়টি যদি আসলে সত্য হয় এবং সাক্ষ দানকারী মুখে যা বলছে তার বিশ্বাসও যদি তাই হয়, তাহলে সে সবদিক দিয়েই সত্যবাদী হবে ৷ আর বিষয়টি যদি মিথ্যা হয়, কিন্তু সাক্ষদাতা সেটিতে সত্য বলে বিশ্বাস করে তাহলে একদিক দিয়ে আমরা তাকে সত্যবাদী বলবো ৷ কেননা সে তার বিশ্বাসকে বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সত্যবাদী ৷ কিন্তু আরেক দিক দিয়ে তাকে মিথ্যাবাদী বলব ৷ কেননা , সে যে বিষয়ের সাক্ষ দিচ্ছে তা প্রকৃতপক্ষে ভুল ৷ অপরদিকে বিষয়টি যদি সত্য হয় কিন্তু সাক্ষদাতার বিশ্বাস তার পরিপন্থী হয় তাহলে সঠিক বিষয়টির সাক্ষ্য দেয়ার কারণে আমরা তাকে সত্যবাদী বলব ৷ কিন্তু সে মুখে যা প্রকাশ করছে তার বিশ্বাস না হওয়ার কারণে আমরা তাকে মিথ্যাবাদী বলব ৷ যেমন কোন ঈমানদার ব্যক্তি যদি ইসলামকে সত্য বলে তাহলে সে সবদিক দিয়ে সত্যবাদী ৷ কিন্তু একজন ইহুদী যদি ইহুদী ধর্মের ওপর বিশ্বাসী থেকে ইসলামকে সত্য বলে তাহলে তার কথা সত্য কিন্তু তার সাক্ষ মিথ্যা বলে গণ্য করা হবে ৷ কেননা, সে তার বিশ্বাসের পরিপন্থী সাক্ষ্য দিচ্ছে ৷ আর সে যদি ইসলামকে বাতিল বা মিথ্যা বলে তাহলে আমরা তার একথা মিথ্যা বলবো ৷ কিন্তু সে যে সাক্ষ দিচ্ছে তা তার নিজের বিশ্বাস অনুসারে সত্য ৷

অর্থাৎ, তারা যে কসম খেয়ে বলে, তারা তোমাদের মতই মুসলিম এবং মুহাম্মাদ (সাঃ) আল্লাহর রসূল। আসলে তারা তাদের এই কসমকে নিজেদের ঢাল বানিয়ে রেখেছে। এর মাধ্যমে তারা তোমাদের হাত থেকে বেঁচে যায় এবং কাফেরদের মত তারা তোমাদের তরবারির আওতায় পড়ে না।

 

فَصَدُّوا عَن سَبِيلِ اللَّهِ আয়াতাংশের অর্থ “তারা নিজেরা আল্লাহর পথ থেকে বিরত থাকে” যেমন হয়, তেমনি “তারা অন্যদেরকে আল্লাহর পথ থেকে বিরত রাখে”ও হয় ৷ তাই অনুবাদে আমরা দুটি অর্থই উল্লেখ করেছি ৷ প্রথম অর্থটি গ্রহণ করলে আয়াতাংশের অর্থ হবে এসব শপথের মাধ্যমে তারা মুসলমানদের মধ্যে নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত করে নেয়ার পর ঈমানের দাবী পূরণ না করার এবং আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য থেকে পাশ কাটিয়ে চলার ব্যাপারে সুযোগ সৃষ্টি করে নেয় ৷ দ্বিতীয় অর্থটি গ্রহণ করলে আয়াতাংশের অর্থ হবে, এসব মিথ্যা শপথের আড়ালে তারা শিকারের সন্ধানে থাকে, মুসলমান সেজে থেকে ভিতর থেকেই মুসলমানদের জামায়াতের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে ৷ মুসলমানদের গোপনীয় বিষয়সমূহ জেনে নিয়ে তা শত্রুদের জানিয়ে দেয়, ইসলাম সম্পর্কে অমুসলিমদের মধ্যে খারাপ ধারণা সৃষ্টি করতে এবং সহজ সরল মুসলমানদের মনে সন্দেহ -সংশয় ও দ্বিধা -দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে তারা এমন সব কৌশল অবলম্বন করে যা কেবল মুসলমান সেজে থাকা একজন মুনাফিকের পক্ষেই সম্ভব ৷ ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুরা ঐ সব কৌশল কাজে লাগাতে পারে না ৷

 

এ আয়াতে ঈমান আনার অর্থ বুঝানো হয়েছে ঈমানের স্বীকৃতি দিয়ে মুসলমানদের মধ্যে শামিল হওয়াকে আর কুফরের অর্থ বুঝানো হয়েছে আন্তরিকভাবে ঈমান না আনা এবং মৌখিকভাবে ঈমান আনার পূর্বে যে কুফরের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল সেই কুফরের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকাকে ৷ কথাটির প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, তারা যখন খুব ভালভাবে বুঝে শুনে সোজাসুজি ঈমানের পথ অবলম্বন অথবা পরিষ্কাভাবে কুফরের পথ গ্রহণের পরিবর্তে মুনাফিকীর এই নীতি ও পন্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিল তখন আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে তাদের অন্তরের ওপর মোহর মেরে দেয়া হলো এবং একজন সত্যবাদী, নিষ্কলুষ, সৎ ও ভদ্র মানুষের মত নীতি ও পন্থা অবলম্বন করার সামর্থ ও শুভবুদ্ধিই আল্লাহ তা’আলা তাদের থেকে ছিনিয়ে নিলেন ৷ এখন তাদের জ্ঞান ও উপলব্ধির যোগ্যতাই হারিয়ে গিয়েছে এবং নৈতিক অনুভূতির মৃত্যু ঘটেছে ৷ রাতদিনের এই মিথ্যা প্রতি মূহূর্তের এই প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি এবং কথা এবং কাজের এ স্থায়ী বৈপরীত্য-যার মধ্যে তারা নিজেদেরকে জড়িয়ে ফেলেছে -তা যে কত হীন ও লাঞ্ছনাকর অবস্থা , সে উপলব্ধিটুকু পর্যন্ত এখন তাদের আসে না ৷

আল্লাহর পক্ষ থেকে কারো অন্তরে মোহর মেরে দেয়ার অর্থ কুরআন মজীদের যেসব আয়াতে অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে আলোচ্য আয়াতটি তার একটি ৷ এসব মুনাফিকের অন্তরে আল্লাহ তা’আলা মোহর মেরে দেয়ার কারণে ঈমান তাদের অন্তরে প্রবেশ করতে পারেনি এবং তারা বাধা হয়ে মুনাফিক রয়ে গিয়েছে -ব্যাপারটি তা নয় ৷ বরং বাহ্যিকভাবে ঈমান প্রকাশ করা সত্ত্বেও যখন তারা কুফরির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন আল্লাহ তা’আলা তাদের অন্তরে মোহর মেরে দিয়েছেন ৷ এ সময়ই তাদের থেকে নির্ভেজাল ঈমান ও তা থেকে জন্মলাভকারী নৈতিক আচরণ করার সামর্থ ও শুভবুদ্ধি ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে এবং তারা নিজেদের জন্য যে মুনাফিকী ও মুনাফিকী চরিত্র পছন্দ করেছিল তার সামর্থ ও বুদ্ধিই তাদের দান করা হয়েছে ৷

 

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বর্ণনা করেন যে, আবদুল্লাহ ইবনে উবাই অত্যন্ত সুঠাম দেহী, সুস্থ, সুদর্শন ও বাকপটু ব্যক্তি ছিল ৷ তার সাঙ্গপাঙ্গদের অনেকও তাই ছিল ৷ এরা সবাই ছিল মাদীনার নেতৃস্থানীয় লোক ৷ তারা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মজলিসে যখন আসতো তখন দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে বসতো এবং রসিকতাপূর্ণ কথাবার্তা বলতো ৷ তাদের দেহাবয়ব ও চেহারা -আকৃতি দেখে আর কথাবার্তা শুনে কেউ কল্পনাও করতে পারতো না যে, সমাজের এসব সম্মানিত লোকেরা চরিত্রের দিক দিয়ে এত নীচ ও জঘন্য হতে পারে ৷

তারা দেয়ালে ঠেকান কাঠের খুঁটির মতই- অর্থাৎ এরা যারা দেয়ালের গায়ে হেলান দিয়ে বসে তারা মানুষ নয়, বরং কাঠের গুড়ি ৷ তাদেরকে কাষ্ঠখণ্ডের সাথে তুলনা করে বুঝানো হয়ে ছে যে, নৈতিক চরিত্র মানুষের মূল প্রাণসত্তা, সেই প্রাণসত্তাই তাদের মধ্যে নেই ৷ তারপর তাদেরকে দেয়ালগাত্রে হেলান দিয়ে খাড়া করা কাষ্ঠখন্ডের সাথে তুলনা করে এ কথাও বলে দেয়া হয়েছে যে, তা একেবারেই অকেজো , অপদার্থ ৷ কেননা, কাঠ কেবল তখনই উপকারে আসে যদি তা ছাদে অথবা দরজায় বা আসবাব তৈরীর কাজে ব্যবহার করা হয় ৷ দেয়াল গাত্রে হেলান দিয়ে রাখা কাষ্ঠখন্ড কোন উপকারেই আসে না ৷

তাদের বাহ্যিক চালচলন ও আচার আচরনণ দেখে প্রতারিত হয়ো না ৷ এ ব্যাপারে সবসময় সতর্ক থাকো যে, এরা যে কোন সময় বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে ৷

আল্লাহ তাদেরকে ধ্বংস করুন!- এটা বদদোয়া নয়, বরং তারা যে আল্লাহর গযবের উপযুক্ত হয়ে গিয়েছে এবং সে গযব যে অবশ্যই নাযিল হবে-এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তারই ঘোষণা ৷ এও হতে পারে যে, আল্লাহ তা’আলা এ বাকাংশটি আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেননি এবং আরবী বাকরীতি অনুসারে , অভিশাপ ও তিরস্কার অর্থে ব্যবহার করেছেন ৷ আমাদের নিজস্ব ভাষায় আমরা যেমন বলিঃ ওর সর্বনাশ হোক, কি জঘন্য মানুষ সে ৷ এখানে “সর্বনাশ” শব্দটি দ্বারা তার জঘন্যতার তীব্রতা প্রকাশ করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, বদদোয়া করা নয় ৷

তাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে!- তাদেরকে ঈমানের পথ থেকে মুনাফিকীর পথে কে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তা বলা হয়নি ৷ একথাটি স্পষ্ট করে না বলার কারণে আপনা থেকেই যে অর্থ প্রকাশ পায় তা হলো, তাদের এই এলোপাতাড়ি ও অস্বাভাবিক আচরণের চালিকাশক্তি একটি নয়, বরং বহু সংখ্যক চালিকাশক্তি এর পেছনে সক্রিয় রয়েছে ৷ তাদের পেছনে এই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে শয়তান, অসৎ বন্ধু-বান্ধব এবং তাদের কুপ্রবৃত্তির আকাংখাসমূহ ৷ কারো স্ত্রী, কারো সন্তান-সন্তুতি , কারো নিজ গোত্র ও গোষ্ঠীর অসৎলোকজন তাকে এ পথে চলতে বাধ্য করছে ৷ আবার কাউকে তার হিংসা , বিদ্বেষ ও অহমিকা এ পথে তাড়িত করেছে ৷

 

তারা ইসতিগফারের জন্য রসূলের কাছে আসে না শুধু তাই নয়, বরং এ কথা শুনে অহংকার ও গর্ব মাথা ঝাঁকুনি দেয় ৷ রসূলের কাছে আসা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করাকে নিজেদের জন্য অপমানজনক ও মর্যাদাহানিকর মনে করে আপন অবস্থানে অনড় থাকে ৷ তারা যে ঈমানদার নয় এটা তার স্পষ্ট প্রমাণ ৷

একথাটি সূরা তাওবাতে (যা সূরা মুনাফিকূনের তিন বছর পর নাযিল হয়) আরো অধিক জোর দিয়ে বলা হয়েছে৷ সেখানে আল্লাহর তা’আলা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ করে মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেছেনঃ “তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর আর না করো, এমনকি যদি তাদের জন্য সত্তরবারও ক্ষমা প্রার্থনা কর তবুও আল্লাহ কখনো তাদেরকে মাফ করবেন না ৷ কারণ, তারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে৷ আল্লাহ ফাসিকদের হিদায়াত দান করেন না ৷ (আত তাওবা, আয়াত ৮০) পরে আরো বলা হয়েছেঃ তাদের কেউ মারা গেলে তুমি কখনো তার জানাযা পড়বে না এবং তার কবরের পাশেও দাঁড়াবে না ৷ এরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং কাফেক অবস্থায় মারা গেছে ৷ (আত তাওবা, আয়াত ৮৪) ৷

এ আয়াতটিতে দুটি বিষয় বর্ণনা করা হয়েছে ৷ এক, মাগফিরাতের জন্য দোয়া শুধু হিদায়াত প্রাপ্ত লোকদের জন্যই ফলপ্রসূ ও কল্যাণকর হতে পারে ৷ যে ব্যক্তি হিদায়াতের পথ থেকে সরে গিয়েছে এবং যে ব্যক্তি আনুগত্যের পরিবর্তে গোনাহ ও অবাধ্যতার পথ অবলম্বন করেছে তার জন্য কোন সাধারণ মানুষের দোয়া তো দূরের কথা আল্লাহর রসূল নিজেও যদি তার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন তবুও তাকে ক্ষমা করা যেতে পারে না ৷ দুই, যারা আল্লাহর হিদায়াত পেতে আগ্রহী নয় তাদের হিদায়াত দান করা আল্লাহর নীতি নয় ৷ কোন ব্যক্তি নিজেই যদি আল্লাহর হিদায়াত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকে বরং তাকে হিদায়াতের দিকে আহবান জানালে মাথা ঝাঁকুনি দিয়ে অহংকার ভরে সে আহবান প্রত্যাখ্যান করে তাহলে আল্লাহর কি প্রয়োজন পড়েছে যে, তার পিছনে পিছনে নিজের হিদায়াতের ফেরি করে বেড়াবেন এবং তোষামোদে করে তাকে সত্যপথে নিয়ে আসবেন ৷

 

মুহাজির জাহজাহ ইবনে সা’দ আল-গিফারী ও আনসারী সিনান ইবনে ওবরাহর ঝগড়ার সময় আবদুল্লাহ ইবনে উবাই-ই এ কথা বলেছিল। আল্লাহ তা’আলার পক্ষ থেকে এর জওয়াব দেওয়া হয়েছে যে, নির্বোধরা মনে করে মুহাজিরগণ তাদের দান খয়রাতের মুখাপেক্ষী এবং ওরাই তাদের অন্ন যোগায়। অথচ সমগ্র নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের ধন-ভাণ্ডার আল্লাহর হাতে। তিনি ইচ্ছা করলে মুহাজিরগণকে তোমাদের কোন সাহায্য ছাড়াই সবকিছু দিতে পারেন। ইবনে উবাইয়ের এরূপ মনে করা নির্বুদ্ধিতা ও বোকামীর পরিচায়ক। তাই আল্লাহ্ তা’আলা এ স্থলে “তারা বোঝেনা” বলে বুঝিয়েছেন যে, যে এরূপ মনে করে, সে বেওকুফ ও নির্বোধ।

সম্মান ও আধিপত্য কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য। অতঃপর তিনি নিজের পক্ষ হতে যাকে চান সম্মান ও আধিপত্য দান করেন। আর তিনি তো তাঁর রসূলদের এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নকারীদেরকে সম্মান ও উচ্চ মর্যাদা দান করেন। এ সম্মান তাদেরকে দান করেন না, যারা তাঁর অবাধ্য। এখানে মুনাফিকদের কথা খন্ডন করে বলা হয়েছে যে, সমস্ত ইজ্জতের মালিক বা অধিকারী কেবলমাত্র মহান আল্লাহ এবং সম্মানিত কেবল সে-ই, যাকে তিনি সম্মান দান করেন। সে নয়, যে নিজেকে সম্মানী মনে করে বা যাকে বিশ্ববাসী সম্মানী মনে করে। আর আল্লাহর নিকট সম্মান লাভ কেবল ঈমানদাররাই করবেন; কাফের ও মুনাফিকরা নয়।

 

 

এখানে আল্লাহ্ তা’আলা খাঁটি মুমিনদেরকে সম্বোধন করে সতর্ক করছেন যে, তোমরা মুনাফিকদের ন্যায় দুনিয়ার মহব্বতে মগ্ন হয়ে যেয়ো না। যেসব বিষয় মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহ থেকে গাফেল করে, তন্মধ্যে দুটি সর্ববৃহৎ-ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি। তাই এই দুটির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। নতুবা দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ-সম্ভারই উদ্দেশ্য। আয়াতের সারমর্ম এই যে, ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততির মহব্বত সর্বাবস্থায় নিন্দনীয় নয়। কিন্তু সর্বদা এই সীমানার প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে যে, এসব বস্তু যেন মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে দেয়। এখানে ‘আল্লাহর স্মরণের’ অর্থ কোন কোন তফসীরবিদের মতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, কারও মতে হজ ও যাকাত এবং কারও মতে কুরআন। হাসান বসরী রাহেমাহুল্লাহ বলেনঃ স্মরণের অর্থ এখানে যাবতীয় আনুগত্য ও ইবাদত।

এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জিজ্ঞাসা করল, কোন সদকায় সর্বাধিক সওয়াব পাওয়া যায়? তিনি বললেনঃ “যে সদকা সুস্থ অবস্থায় এবং ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ্য করে- অর্থ ব্যয় করে ফেললে নিজেই দরিদ্র হয়ে যাওয়ার আশংকা থাকা অবস্থায় করা হয়।” তিনি আরও বললেনঃ “আল্লাহর পথে ব্যয় করাকে সেই সময় পর্যন্ত বিলম্বিত করো না। যখন আত্মা তোমার কণ্ঠনালীতে এসে যায় এবং তুমি মরতে থাক আর বলঃ এই পরিমাণ অর্থ অমুককে দিয়ে দাও, এই পরিমাণ অর্থ অমুক কাজে ব্যয় করা।” [বুখারী: ১৩৫৩, মুসলিম: ১০৩২, মুসনাদে আহমাদ: ১/৩৯৬]

হযরত ইবনে আব্বাস (রা) এই আয়াতের তফসীরে বলেন: যে ব্যক্তির যিম্মায় যাকাত ফরয ছিল কিন্তু আদায় করেনি অথবা হজ্জ ফরয ছিল কিন্তু আদায় করেনি, সে মৃত্যুর সম্মুখীন হয়ে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে বাসনা প্রকাশ করে বলবে : আমি আবার দুনিয়াতে ফিরে যেতে চাই অর্থাৎ মৃত্যু আরও কিছু বিলম্বে আসুক যাতে আমি সদকা-খয়রাত করে নেই এবং ফরয কর্ম থেকে মুক্ত হয়ে যাই। فَأَصَّدَّقَ وَأَكُنْ مِنَ الصَّالِحِينَ – অর্থাৎ কিছু অবকাশ পেলে এমন সৎ কর্ম করে নেব, যদ্দ্বারা সৎ কর্ম পরায়ণদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। যেসব ফরয বাদ পড়েছে, সেগুলো পূর্ণ করে নেব এবং যেসব হারাম ও মাকরুহ কাজ করেছি, সেগুলো থেকে তওবা করে নেব। কিন্তু আল্লাহ তা’আলা বলে দিয়েছেন যে, মৃত্যু আসার পর কাউকে অবকাশ দেওয়া হয় না। সুতরাং এই বাসনা নিরর্থক।

মুনাফিকের পরিচয়

মুনাফিক শব্দটি নফক শব্দ থেকে গঠিত। নফকের অর্থগুলো হলোঃ ১.গর্ত,  ২.ছিদ্র,  ৩.সুড়ঙ্গ, ৪.বের হওয়া,  ৫.খরচ করা,  ৬.ব্যয় করা।

৭.কারো মতে, ‘নাফেকুল ইয়ারবু’ (পাহাড়ি ইঁদুর) থেকে মুনাফিক শব্দটি গঠিত। পাহাড়ি ইঁদুরকে ‘নাফেকুল ইয়ারবু’ বলা হয়। কারণ পাহাড়ি ইঁদুর অত্যন্ত ধূর্ত হয়, এরা পাহাড়ে অনেক গর্ত খনন করে। এদের মারার জন্য এক গর্তে পানি বা অন্য কিছু দিলে অন্য গর্ত দিয়ে বের হয়ে পালিয়ে যায়, ফলে এদের সহজে মারা যায় না। মুনাফিকও অনুরূপ ধূর্ত। তাদের সহজে চেনা যায় না।

আল্লাহ সুরা বাকারার ৮ থেকে ২০ পর্যন্ত মোট ১৩টি আয়াত মুনাফিকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে নাজিল করেছেন। তা ছাড়া বিভিন্ন সুরায় আরো অনেক আয়াতে মুনাফিকদের আলোচনা করেছেন।  তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো-

 

১. মিথ্যা বলাঃ সহীহাইন (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) গ্রন্থে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “মুনাফিকের আলামত তিনটি, তন্মধ্যে একটি হল সে যখন কথা বলে তখন মিথ্যা বলে।”

“যখন মুনাফিকরা আপনার কাছে আসে, তখন তারা বলে, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি সত্যই আল্লাহর রাসূল।” হ্যাঁ, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা জানেন যে আপনি সত্যই তাঁর রসূল এবং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা সত্যই মিথ্যাবাদী।” (আল মুনাফিকুন: ১)

 

২. বিশ্বাসঘাতকঃ আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেন নি? তারা তাদের কিতাবধারী কাফের ভাইদেরকে বলেঃ তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশ থেকে বের হয়ে যাব এবং তোমাদের ব্যাপারে আমরা কখনও কারও কথা মানব না। আর যদি তোমরা আক্রান্ত হও, তবে আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব। আল্লাহ তা’আলা সাক্ষ্য দেন যে, ওরা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী। যদি তারা বহিস্কৃত হয়, তবে মুনাফিকরা তাদের সাথে দেশত্যাগ করবে না আর যদি তারা আক্রান্ত হয়, তবে তারা তাদেরকে সাহায্য করবে না। যদি তাদেরকে সাহায্য করে, তবে অবশ্যই পৃষ্ঠপ্রদর্শন করে পলায়ন করবে। এরপর কাফেররা কোন সাহায্য পাবে না। (সূরা হাশর ১১-১২)।

 

৪. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করাঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “মুনাফিকের তিনটি আলামত; যখন সে কথা বলে সে মিথ্যা বলে, যখন সে প্রতিশ্রুতি দেয় সে সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং যখন তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন সে আত্মসাৎ করে।” (হাদিস বুখারি ও মুসলিম)।

 

৫.  ইবাদত পালনে অলসতাঃ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেছেন, “…বস্তুতঃ তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিল ভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।” (আন নিসাঃ ১৪২)

মুনাফিক যদি মসজিদে বা মুসুল্লায় যায়, তাহলে সে তার পা টেনে টেনে নিয়ে যাবে যেন শিকল দিয়ে বাঁধা। এ কারণে, যখন সে মসজিদে বা মুসুল্লায় পৌঁছায়, তখন সে শেষ সফ (সারি) তে বসতে পছন্দ করে। সালাতে ইমাম কী পাঠ করেন তা সে জানে না বা খেয়াল থাকে না।

 

৬. রিয়াঃ অন্যদের উপস্থিতিতে মুনাফিক খুশুতে নামায পড়েন, কিন্তু যখন তিনি একা থাকেন, তিনি তার সালাত শেষ করার জন্য তাড়াহুড়া করেন। যখন মাজেলিসে অন্যদের সাথে থাকে, তখন তার ভালো আখলাক ও জুহদ দেখা যায়। একইভাবে তার বক্তৃতা, কথাবার্তা হয় খুব মৃদু। যখন একা থাকে তখন সে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কর্তৃক নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত থাকে। “…বস্তুতঃ তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিল ভাবে লোক দেখানোর জন্য।…” (আন নিসাঃ ১৪২)

 

৭. আজ্ঞাবহ এবং ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিদের নিন্দা করাঃ তারা জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ লোকেদের উপহাস করে, তুচ্ছ মন্তব্য এবং নিন্দা করে।  তারা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করার জন্য মুমিন ব্যক্তিদের দ্বারা সম্পাদিত কাজগুলোকে ছোট করে।

সে সমস্ত লোক যারা ভৎর্সনা-বিদ্রূপ করে সেসব মুসলমানদের প্রতি যারা মন খুলে দান-খয়রাত করে এবং তাদের প্রতি যাদের কিছুই নেই শুধুমাত্র নিজের পরিশ্রমলব্দ বস্তু ছাড়া। অতঃপর তাদের প্রতি ঠাট্টা করে। আল্লাহ তাদের প্রতি ঠাট্টা করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক আযাব। (সূরা তাওবাহ ৭৯)

 

৮. আল-কুরআন, আস-সুন্নাহ এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিয়ে ঠাট্টা করাঃ আর যদি তুমি তাদের কাছে জিজ্ঞেস কর, তবে তারা বলবে, আমরা তো কথার কথা বলছিলাম এবং কৌতুক করছিলাম। আপনি বলুন, তোমরা কি আল্লাহর সাথে, তাঁর হুকুম আহকামের সাথে এবং তাঁর রসূলের সাথে ঠাট্টা করছিলে?

ছলনা কর না, তোমরা যে কাফের হয়ে গেছ ঈমান প্রকাশ করার পর। তোমাদের মধ্যে কোন কোন লোককে যদি আমি ক্ষমা করে দেইও, তবে অবশ্য কিছু লোককে আযাবও দেব। কারণ, তারা ছিল গোনাহগার। (সূরা তাওবাহ ৬৫-৬৬)

 

৯. দুমুখো স্বভাবের : তারা দুমুখো আচরণ করে। বাহ্যিকভাবে নিজেদের মুমিন বলে পরিচয় দেয় অথচ তাদের ভেতরে ঈমান নেই।  মুনাফিক শুধু মৌখিকভাবে ঈমানের স্বীকৃতি দান করে, কিন্তু অন্তরে মোটেও বিশ্বাস লালন করে না। “আর মানুষের মধ্যে এমন কতিপয় লোক আছে, যারা বলে আমরা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান এনেছি, অথচ তারা মুমিন নয়।”(সুরা বাকারা,আয়াত : ৮)

 

১০. প্রতারক ও ধোঁকাবাজ : তারা খুবই ধূর্ত প্রতারক ও ধোঁকাবাজ। আল্লাহ ও মুমিনদের সঙ্গে তারা প্রতারণা করে। তারা মনে করছে, এতে তারা সফলকাম ও বিজয়ী হচ্ছে, অথচ প্রকারান্তরে তারাই প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত হচ্ছে। সত্য পথ থেকে দূরে গিয়ে পথভ্রষ্ট হচ্ছে এবং তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। “আল্লাহ ও ঈমানদারদের তারা ধোঁকা দিতে চায়, আসলে তারা অন্য কাউকে ধোঁকা দিচ্ছে না, বরং নিজেদেরই প্রতারিত করছে, অথচ তাদের সে অনুভূতি নেই।”(সুরা : বাকারা, আয়াত : ৯)

 

১১. তাদের অন্তর অসুস্থঃ সুস্থতার সীমা থেকে বের হয়ে গেলেই অসুস্থতা বলা হয়। মুনাফিকদের বিশ্বাসে সন্দেহ, অস্বীকৃতি ও মিথ্যা থাকার কারণে তাদের কলবকে অসুস্থ কলব বলা হয়। অসুস্থতা হলো সুস্থতার বিপরীত। দ্বিমুখী আচরণ একটি কঠিন ব্যাধি। আর খাঁটি বিশ্বাস হলো সুস্থতা। ঈমান আনার পর যারা দ্বিমুখী আচরণ করে, তারা মূলত অসুস্থ। “তাদের হৃদয়ে রয়েছে ব্যাধি। অতঃপর আল্লাহ সে ব্যাধিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছেন, তাদের মিথ্যাচারের দরুন তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।”(সুরা : আল বাকারা, আয়াত : ১০)

 

১২.নিজেদের শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী মনে করেঃ মুনাফিকরা সমাজে বিভিন্ন ধরনের ফ্যাসাদ ও অশান্তি সৃষ্টি করে থাকে, অথচ তারা প্রচার-প্রপাগান্ডায় নিজেদের শান্তি প্রতিষ্ঠাকারী বলে পরিচয় দেয়। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘আর যখনই তাদের বলা হয়, পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি কোরো না, তারা উত্তরে বলে—”আমরাই তো সংশোধনকারী ও শান্তিকামী।”(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১)

 

১৩. ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারীঃ ইসলাম শান্তির জীবন ব্যবস্থা। মুনাফিকরা ইসলাম ও সামাজিক শান্তির বিরোধিতা করে অশান্তি সৃষ্টি করে। কিন্তু নিজেদের ভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতার কারণে অনুভব করতে পারছে না। “সাবধান! এরাই ফ্যাসাদ সৃষ্টিকারী, কিন্তু তাদের সে অনুভূতি নেই।” (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১২)

 

১৪. মুমিনদের নির্বোধ মনে করেঃ মুনাফিকরা নিজেদের বুদ্ধিমান, ধূর্ত, চতুর ও চালাক মনে করে। আর মুমিন, মুত্তাকি ও নেককারদের নির্বোধ ও বোকা বলে মনে করে। অথচ আল্লাহর কাছে তারাই বোকা ও নির্বোধ।

“যখন তাদের বলা হয়, অন্য লোকদের ন্যায় তোমরাও ঈমান আনো, তখন তারা বলে, আমরা কি সেই নির্বোধ লোকদের মতো ঈমান আনব? আসলে তারাই তো নির্বোধ, কিন্তু তাদের সে জ্ঞান নেই।”(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৩)

 

১৫. বাধ্যতার বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ায়ঃ মুনাফিকদের তাদের ভ্রষ্টতার জন্য তাৎক্ষণিক ভাবে শাস্তি না দেওয়ায় এবং দুর্নীতিপরায়ণ হয়েও পার্থিব জগতে সুখ-শান্তিতে কালাতিপাত করার সুযোগদানের ফলে তাদের ভ্রষ্টতা আরো গভীরে অনুপ্রবেশ করে।  “বস্তুত তাদের আচরণের কারণে আল্লাহই তাদের সঙ্গে তামাশার ব্যবস্থা করছেন এবং তাদের অবাধ্যতার কারণে তাদের কে বিভ্রান্তিতে ঘুরে বেড়ানোর অবকাশ দিচ্ছেন।” (সুরা বাকারা-১৬)  “আমি শাস্তি না দিয়ে সুযোগ দিই পাপ বৃদ্ধির জন্য।” (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৭৮)

 

১৬. ভ্রষ্টতা ক্রয় করেঃ মুনাফিকরা দুনিয়ার লালসায় হেদায়েতের বিনিময়ে ভ্রষ্টতাকে গ্রহণ করে। তারা হেদায়েতের ওপর ভ্রষ্টতাকে অগ্রাধিকার দেয়। মানুষ যে জিনিসকে ভালোবাসে ও পছন্দ করে, সে জিনিসই ক্রয় করে। মুনাফিকরা ঈমান বিক্রি করে নিফাককে ক্রয় করে—অর্থাৎ ঈমানের ওপর নিফাককে প্রাধান্য দেয়।  “তারা এমন লোক, যারা হেদায়েতের পরিবর্তে ভ্রষ্টতাকে ক্রয় করে নিয়েছে। সুতরাং তাদের এ ব্যবসা লাভজনক হয়নি; আর তারা হেদায়েতও পায়নি।” (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬)

তারা বোঝে না যে দুনিয়ার ক্ষণিকের লাভের জন্য আখিরাতকে বিসর্জন দেওয়া ঠিক হবে না।

 

১৭.তারা আলোর কাছে আসে নাঃ আল্লাহর রাসুল দ্বীনের আলো তথা কুরআন নিয়ে এসেছেন এবং সর্বত্র দ্বীনের আলো প্রজ্বলিত করেছেন। কিন্তু মুনাফিকরা সে আলো থেকে উপকৃত হতে পারেনি। “তাদের উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির মতো, যে আগুন জ্বালিয়েছে; কিন্তু যখন তা তার চারপাশ আলোকিত করল, তখন আল্লাহ তাদের আলো অপসারিত করে তাদের ঘোর অন্ধকারে ফেলে দিয়েছেন, যাতে তারা কিছুই দেখতে পায় না।”(সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭)

 

১৮.তারা বধির, মূক ও অন্ধ : মুনাফিকরা হক কথা শোনার ব্যাপারে বধির, তারা হক কথা শোনে না, সত্য কথা বলার ব্যাপারে মূক ও বোবা এবং সত্য কথা বলে না। সত্য ও ন্যায়ের পথে চলার ব্যাপারে অন্ধ। আল্লাহ সুবিধাভোগীদের অবস্থা বর্ণনা করেন বলেন ; “তারা বধির, বোবা ও অন্ধ। তারা (হকের দিকে) আদৌ ফিরে আসবে না।” (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮)

 

১৯. তারা সন্দেহপ্রবণ, দ্বিধাগ্রস্ত ও সুবিধাবাদীঃ মুনাফিকরা সুবিধা ভোগের জন্য ইসলামে দাখিল হয়; কিন্তু ইসলামের বিধিবিধান পালন ও ইসলামের আনুগত্যের কষ্ট স্বীকার করতে রাজি নয়। আল্লাহ ইরশাদ করেন,  “(তাদের উদাহরণ হলো) বর্ষণমুখর ঘন মেঘের মতো, যাতে রয়েছে ঘোর অন্ধকার, বজ্রের গর্জন ও বিদ্যুতের চমক; বজ্রধ্বনিতে মৃত্যুভয়ে তারা তাদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দেয়; আল্লাহ এসব সত্য প্রত্যাখ্যানকারী লোকদের সর্বদিক দিয়ে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন।

অর্থাৎ তারা আল্লাহর আয়ত্তের ভেতরে আছে, তিনি তাদের সম্পর্কে জানেন।” (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯)

 

২০.আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টিকারীঃ মুনাফিকরা মানুষদেরকে আল্লাহর দিকে আসতে দেয় না। তারা নানাভাবে বাধা সৃষ্টি করে। আল্লাহ ইরশাদ করেন; “তারা আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে। তারা যা করছে, তা খুবই মন্দ।” (মুনাফিকুন, আয়াত : ২)

 

২১.অহংকারীঃ মুনাফিকরা অহংকারী ও দাম্ভিক। আল্লাহ ইরশাদ করেন, “আপনি তাদের দেখবেন যে তারা অহংকার করে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” (সুরা : মুনাফিকুন, আয়াত : ৬)

 

২২.মুনাফিকগণ আল্লাহর পথে খরচ করতে বাধা দেয়ঃ ওরাই তো তারা যারা বলে  ”আল্লাহর রসূলের সঙ্গে যারা রয়েছে তাদের জন্য খরচ করোনা যে পর্যন্ত না তারা সরে পড়ে।’’ আর মহাকাশমন্ডলের ও পৃথিবীর ধনভান্ডার তো আল্লাহর ই, কিন্ত মুনাফিকগোষ্ঠী বোঝে না”। (৬৩: ৭)

 

২৩. তারা সব সময় অন্যায় কাজের আদেশ দেয়ঃ “মুনাফিক পুরুষরা ও মুনাফিক নারীরা — তাদের কতকজন অপর কতকজনের মধ্যেকার। তারা অসৎ কাজের নির্দেশ দেয় আর সৎকাজে নিষেধ করে, আর তারা নিজেদের হাত গুটিয়ে নেয়। তারা আল্লাহ্কে ভুলে গেছে, তাই তিনিও তাদের ভুলে গেছেন। নিঃসন্দেহ মুনাফিকরা নিজেরাই দুষ্কৃতিকারী”। (৯: ৬৭)

 

১. মুনাফিকগণ জাহান্নামীঃ“তারা ব্যতীত যারা তওবা করে ও শোধরায়, আর আল্লাহ্কে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে, আর তাদের ধর্মকে আল্লাহর জন্য বিশুদ্ধ করে, — তারা তবে মুমিনদের সাথে, আর শীঘ্রই আল্লাহ্ মুমিনদের দিচ্ছেন এক বিরাট পুরস্কার”। (৪: ১৪৫)

“হে নবী! অবিশ্বাসীদের ও মুনাফিকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো, আর তাদের প্রতি কঠোর হও। আর তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম। আর মন্দ সেই গন্তব্যস্থান”। (৯: ৭৩)

অর্থঃ”যেন আল্লাহ্ পুরস্কৃত করতে পারেন সত্যপরায়ণদের তাদের সত্যনিষ্ঠার জন্যে, আর তিনি ইচ্ছা করলে মুনাফিকদের শাস্তি দিতে পারেন অথবা তাদের প্রতি ফিরতেও পারেন। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ পরিত্রাণকারী, অফুরন্ত ফলদাতা”। (৩৩: ২৪)

“মুনাফিক পুরুষদের ও মুনাফিক নারীদের ও অবিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ্ ওয়াদা করেছেন জাহান্নামের আগুন, তাতে তারা অবস্থান করবে। তাই তাদের জন্য পর্যাপ্ত, আর আল্লাহ্ তাদের ধিক্কার দিয়েছেন, আর তাদের জন্য রয়েছে নির্ধারিত শাস্তি”। (৯: ৬৮)

 

২. তাদের জন্য কোন সন্মান নেইঃ “তারা বলে — ”আমরা যদি মদীনায় ফিরে যাই তাহলে প্রবলরা দুর্বলদের সেখান থেকে অবশ্যই বের করে দেবে।’’ কিন্ত ক্ষমতা তো আল্লাহরই আর তাঁর রসূলের আর মুমিনদের, কিন্ত মুনাফিকরা জানে না”। (৬৩: ৮)

 

৩. তাদের প্রতি আল্লাহর গজবঃ “আর যেন তিনি শাস্তি দিতে পারেন মুনাফিক পুরুষদের ও মুনাফিক নারীদের এবং মুশরিক পুরুষদের ও মুশরিক নারীদের — যারা আল্লাহ্ সন্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণা ধারণ করে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে দুস্কর্ম ঘুরে আসবে, আর আল্লাহ্ তাদের উপরে রাগ করেছেন এবং তাদের ধিক্কার দিয়েছেন, আর তাদের জন্য তিনি জাহান্নাম তৈরি করেছেন। আর কত নিকৃষ্ট গন্তব্যস্থল? (৪৮: ৬)

৪. আল্লাহ্‌ তাদের ক্ষমা করবেন নাঃ তুমি তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর অথবা না কর, উভয়ই তাদের জন্য সমান। আল্লাহ তাদেরকে কখনও ক্ষমা করবেননা। আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎ পথে পরিচালিত করেননা। (সূরা মুনাফিকুন ৬)

১.মুনাফিকদের অনুগত করা, অনুস্মরণ করা যাবেনাঃ অর্থঃ”আর তুমি অবিশ্বাসীদের ও মুনাফিকদের আজ্ঞাপালন করো না, আর ওদের বিরক্তিকর ব্যবহার উপেক্ষা করো এবং আল্লাহর উপরে তুমি নির্ভর করো। আর আল্লাহই কর্ণধাররূপে যথেষ্ট”। (৩৩: ৪)।

 হে নবী! আল্লাহ্কে ভয়-ভক্তি করো আর অবিশ্বাসীদের ও মুনাফিকদের আজ্ঞাপালন করো না। নিঃসন্দেহ আল্লাহ্ সর্বজ্ঞাতা, পরমজ্ঞানী”। (৩৩: ১)

 

২. তাদেরকে বন্ধু হিসেবে গ্রহন করা যাবেনাঃ তারা চায় যে তোমরা যেন অবিশ্বাস পোষণ করো যেমন তারা অবিশ্বাস করে, যাতে তোমরা সবাই এক রকমের হতে পারো। কাজেই তাদের মধ্যে থেকে কাউকে বন্ধু হিসেবে নিও না যে পর্যন্ত না তারা আল্লাহর পথে গৃহত্যাগ করে। কিন্তু তারা যদি ফিরে যায় তবে তাদের ধরো আর তাদের বধ করো যেখানেই তাদের পাও, আর তাদের থেকে কাউকেও বন্ধুরূপে নিও না এবং সাহায্যকারীরূপেও নয়”, — (৪: ৮৮)

 

৩. তাদেরকে উপেক্ষা করে চলাঃ আপনি কাফের ও মুনাফিকদের আনুগত্য করবেন না এবং তাদের উৎপীড়ন উপেক্ষা করুন ও আল্লাহর উপর ভরসা করুন। আল্লাহ কার্যনিবার্হীরূপে যথেষ্ট। (সূরা আহযাব ৪৮)

 

৪.  তাদের বিরুদ্ধে সাহসী হওয়াঃ মুনাফেকরা এ ব্যাপারে ভয় করে যে, মুসলমানদের উপর না এমন কোন সূরা নাযিল হয়, যাতে তাদের অন্তরের গোপন বিষয় অবহিত করা হবে। সুতরাং আপনি বলে দিন, ঠাট্টা-বিদ্রপ করতে থাক; আল্লাহ তা অবশ্যই প্রকাশ করবেন যার ব্যাপারে তোমরা ভয় করছ। (সূরা তাওবাহ ৬৪)

 

৫. তাদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়াঃ হে নবী, কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করুন এবং মুনাফেকদের সাথে তাদের সাথে কঠোরতা অবলম্বন করুন। তাদের ঠিকানা হল দোযখ এবং তাহল নিকৃষ্ট ঠিকানা। (সূরা তাওবাহ ৭৩)

মুনাফিকদের আরো অসংখ্য বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক দোষ-ত্রুটি কুরআনে বর্ণিত আছে। আল্লাহ আমাদের এসব থেকে হেফাজত করুক।

 ফুটনোট 

সূরা মুনফিকুন-এ মুনাফিকদের যেসব বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো-

  • তারা মিথ্যাবাদী
  • শপথকে ঢাল বানায় অর্থাৎ মিথ্যা শপথ করে
  • তারা আল্লাহর পথ হতে মানুষকে নিবৃত্ত করে
  • তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে
  • তারা বোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছে
  • তারা মানুষকে বিভ্রান্ত করে
  • অহংকারী
  • তারা আল্লাহ্‌র পথে ব্যয় করে না
  • তারা হেদায়তের আলো পাবে না, ক্ষমা পাবে না
  • তারা নিজেকে সম্মানী মনে করে
  • তারা আল্লাহ্‌কে স্মরণের ব্যাপারে উদাসীন

মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে মুমিনদের কিছু বিষয়ে আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামীন সতর্ক করে দিয়েছেন এ সূরায়-

  • ঐশ্বর্য ও সন্তান-সন্ততি যেন আল্লাহর স্মরণে উদাসীন না করে
  • আল্লাহ্‌ যে রিযক দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করা
  • মৃত্যু আসার পূর্বে; সাদাকাহ করা এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া
  • নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ তখন কেহকেও অবকাশ দিবেননা।

 

একটি সুযোগের আবদার !!!

মানুষ নিফাকী কাজে ব্যস্ত এবং আল্লাহ এই সর্তকবার্তার বিষয়ে উদাসীন। কিন্তু একটা সময় আসবে মানুষ বুঝতে পারবে তার মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে আসছে। তখন সে চাইবে-“ হে আমার রাব্ব! আমাকে আরও কিছু কালের জন্য অবকাশ দিলে আমি সাদাকাহ করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” কিন্তু সেই সুযোগ দেওয়া হবে না।

এখানে আলোচিত মুনফিকদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে অনেকগুলো হয়তো বা আমাদের মাঝে রয়েছে। তাই আসুন, মালাকুল মওউত আসার আগেই নিজেকে পূর্ণাঙ্গ মুমিন হিসাবে গড়ে তুলি, সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যাই।