কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৪
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-৫
সূরা বুরুজ
নামকরণ:
প্রথম আয়াতে اَلْبُرُوْجَ শব্দটিকে এর নাম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নাযিল হওয়ার সময়-কাল :
এর বিষয়বস্তু থেকেই একথা সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, এ সূরাটি মক্কা মুয়ায্যমায় এমন এক সময় নাযিল হয় যখন মুশরিকদের জুলুম-নিপীড়ন তুংগে উঠেছিল এবং তারা কঠিনতম শাস্তি দিয়ে মুসলমানদের ইসলাম থেকে বিচ্যূত করার চেষ্টা করছিল।
বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য :
এর মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে, ঈমানদারদের ওপর কাফেররা যে জুলুম করছিল সে সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করা এবং ঈমানদারদেরকে এই মর্মে সান্ত্বনা দেয়া যে, যদি তারা এসব জুলুম-নিপীড়নের মোকাবিলায় অবিচল থাকে তাহলে তারা এর জন্য সর্বোত্তম পুরস্কার পাবে এবং আল্লাহ নিজেই জালেমদের থেকে বদলা নেবেন।
এ প্রসংগে সর্বপ্রথম আসহাবুল উখদূদের (গর্ত ওয়ালাদের) কাহিনী শুনানো হয়েছে। তারা ঈমানদারদেরকে আগুনে ভরা গর্তে ফেলে দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছিল। এ কাহিনীর মাধ্যমে মু’মিন ও কাফেরদেরকে কয়েকটি কথা বুঝানো হয়েছে।
এক, গর্তওয়ালারা যেমন আল্লাহর অভিশাপ ও তাঁর শাস্তির অধিকারী হয়েছে তেমনি মক্কার মুশরিক সরদাররাও তার অধিকারী হচ্ছিল।
দুই, ঈমানদাররা যেমন তখন ঈমান ত্যাগ করার পরিবর্তে আগুনে ভরা গর্তে নিক্ষিপ্ত হয়ে জীবন দেয়াকে বেছে নিয়েছিল, ঠিক তেমনিভাবে এখনও ঈমানদারদের ঈমানের পথ থেকে সামান্যতমও বিচ্যূত না হয়ে সব রকমের কঠিনতম শাস্তি ভোগ করা উচিত।
তিন, যে আল্লাহকে মেনে নেবার কারণে কাফেররা বিরোধী হয়ে গেছে এবং ঈমানদাররা তাদের মেনে নেবার ওপর অবিচল রয়েছে, তিনি সবার ওপর ক্ষমতাশালী ও বিজয়ী, তিনি পৃথিবী ও আকাশের কর্তৃত্বের অধিকারী, নিজের সত্তায় তিনি নিজেই প্রশংসার অধিকারী এবং তিনি উভয় দলের অবস্থা দেখছেন। কাজেই নিশ্চিতভাবেই কাফেররা তাদের কুফরীর কারণে কেবল জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে না বরং এই সংগে নিজেদের জুলুম-নিপীড়নের শাস্তিও তারা ভোগ করবে আগুনে দগ্ধীভূত হয়ে। অনুরূপভাবে যারা ঈমান এনে সৎকাজ করেছে তারা নিশ্চিতভাবে জান্নাতে যাবে এবং এটিই বৃহত্তম সাফল্য।
তারপর কাফেরদেরকে এ মর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ অত্যন্ত শক্ত ও কঠোরভাবে পাকড়াও করে থাকেন। যদি তোমরা নিজেদের বিরাট দলীয় শক্তির ওপর ভরসা করে থাকো তাহলে তোমাদের চাইতে বড় দলীয় শক্তির অধিকারী ছিল ফেরাউন ও সামূদরা। তাদের সেনাবাহিনীর পরিণাম থেকে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো। আল্লাহর অসীম শক্তি তোমাদেরকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে। এই ঘেরাও কেটে বের হবার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আর যে কুরআনকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্য তোমরা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছো, তার প্রত্যেকটি শব্দ অপরিবর্তনীয়। এই কুরআনের প্রতিটি শব্দ লওহে মাহফুযের গায়ে এমনভাবে খোদিত আছে যে হাজার চেষ্টা করেও কেউ তা বদলাতে পারবে না।
আগের ও পরের সূরার সাথে সম্পর্ক
আগের (৮৪ তম) সূরা আল ইনশিকক এ আকাশের কথা এসেছে। তারই ধারাবাহিকতায় এই সূরাও আকাশের কথা দিয়ে শুরু হয়েছে।
এই সূরার শেষে (আয়াত ২২) লাওহে মাহফুয এর কথা বর্নিত আছে যা আকাশে অবস্থিত। পরের ৮৬ তম সূরা আত তরিক শুরু হয়েছে আকাশের কথা দিয়ে। ৮৫ তম সূরা আল বুরুজের শেষের দিকে (আয়াত ২০) বলা হয়েছে যে, আল্লাহ সবসময়েই তাদের ঘেরাও করে রাখেন, যার আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় পরের সূরা আত তরিক এর ৪র্থ আয়াতে (এমন একটি সত্ত্বাও নেই যার উপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত নেই)
ফযীলত
জাবির ইবনু সামুরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যোহর ও আসরের সালাতে ওয়াস-সামায়ি যাতি’ল বুরূজ, ওয়াস-সামায়ি ওয়াত-তারিক এবং এই ধরনের সূরা তিলাওয়াত করতেন। – [সিফাতুস সালাত ৯৪, সহিহ আবু দাউদ ৭৬৭, তিরমিজী হাদিস নম্বরঃ ৩০৭]
بُرُوجٌ শব্দটি بُرْجٌ এর বহুবচন। অর্থ বড় প্রাসাদ ও দুর্গ। অন্য আয়াতে আছে, (وَلَوْ كُنتُمْ فِي بُرُوجٍ مُّشَيَّدَةٍ) এখানে এই অর্থই বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী] অধিকাংশ তাফসীরবিদের মতে আলোচ্য আয়াতে بُرُوجٌ এর অর্থ বড় বড় গ্রহ-নক্ষত্র। কয়েকজন তাফসীরবিদ এ স্থলে অর্থ নিয়েছেন প্রাসাদ। অর্থাৎ সেসব গৃহ, যা আকাশে প্রহরী ও তত্ত্বাবধায়ক ফেরেশতাদের জন্যে নির্ধারিত। আবার কারও কারও মতে, এ অর্থ সুন্দর সৃষ্টি। অর্থাৎ সুন্দর সৃষ্টি আসমানের শপথ। তবে ইমাম ইবন জারীর আত-তাবারীর মত হচ্ছে, এখানে সূর্য ও চন্দ্রের অবস্থানস্থলসমূহ। আর তার সংখ্যা বারটি। সূর্য তার প্রতিটিতে একমাস চলে। আর চন্দ্র এর প্রতিটিতে দুইদিন ও একদিনের তিনভাগের এক অংশ সময় চলে। এতে করে চাঁদের আটাশটি অবস্থান হয়। তারপর সে দুদিন গোপন থাকে। এই বারটির প্রত্যেকটি একেকটি بُرْجٌ। চন্দ্র ও সূর্য আকাশের গতিতে গতিশীল হয়ে এসব بُرْجٌ এর মধ্যে অবতরণ করে। [ইবন কাসীর] তাই আয়াতের অর্থ হবে, সেই আসমানের শপথ, যাতে রয়েছে চাঁদ ও সূর্যের অবতরণস্থানসমূহ, অনুরূপ তাতে রয়েছে সমস্ত গ্রহ-নক্ষত্রের অবতরণস্থলসমূহ, যেগুলো নিয়ম মেনে সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে চলছে। এ সুন্দর চলন ও সুন্দর নিয়মই আল্লাহর অপার শক্তি, রহমত, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রমাণ বহন করছে। [সা’দী]
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ) বা প্রতিশ্রুত দিনের অর্থ কেয়ামতের দিন। আর مَشْهُود এর অর্থ আরাফার দিন এবং شاهد এর অর্থ শুক্রবার দিন। জুম’আর দিনের চেয়ে উত্তম কোন দিনে কোন সূর্য উদিত হয়নি এবং ডুবেওনি। সেদিন এমন একটি সময় আছে, কোন মুমিন বান্দা যখনই কোন কল্যাণের দো’আ করে তখনই তার দো’আ কবুল করা হয়। অথবা যদি কোন অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় তখনই তাকে আল্লাহ তা থেকে আশ্রয় দেয়।” [তিরমিযী: ৩৩৩৯]
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা চারটি বস্তুর শপথ করার পর মূল কথা বর্ণনা করেছেন। (এক) বুরুজবিশিষ্ট আকাশের; (দুই) কেয়ামত দিবসের; (তিন) আরাফার দিনের এবং (চার) শুক্রবারের। এসব শপথের সম্পর্ক এই যে, এগুলো আল্লাহ্ তা’আলার পরিপূর্ণ শক্তি, কেয়ামতের হিসাব-নিকাশ এবং শাস্তি ও প্রতিদানের দলীল। শুক্রবার ও আরাফার দিন মুসলিমদের জন্যে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহের পবিত্ৰ দিন।
এখানে قُتِلَ অর্থ – অভিশপ্ত হয়েছে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস (রাঃ) বলেন, ‘কুরআনে যেখানেই قُتِلَ এসেছে, সেখানেই তার অর্থ হবে لُعِنَ অর্থাৎ অভিশপ্ত হয়েছে। قُتِلَ -এর পূর্বে একটি ‘লাম তাকীদ’ (لَ) উহ্য রয়েছে। অর্থাৎ لَقُتِلَ ‘অবশ্যই ধ্বংস হয়েছে গর্তওয়ালারা’।
الأُخْدُوْدُ অর্থ ‘ভুগর্ভের দীর্ঘ বড় গর্ত’। এর উৎপত্তি خَدٌّ থেকে। যার অর্থ ‘মুখগহবর’। এখানে অগ্নিগহবর বুঝানো হয়েছে।
যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এখানে ‘আসহাবুল উখদূদ’ বা গর্তওয়ালা বলা হয়েছে।
النَّار শব্দটি الأخدُود থেকে বদলে ইশতিমাল। ذات الوقود শব্দটি النار শব্দের সিফাত (বিশেষণ)। অর্থাৎ, গর্ত কি ধরনের ছিল? ইন্ধনপূর্ণ অগ্নি। যা ঈমানদারদেরকে নিক্ষেপ করার জন্য প্রজ্বলিত করা হয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হতে এ বিষয়ে যে দীর্ঘ হাদীস বর্ণনা করেছেন সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ :
প্রাক-ইসলামী যুগের জনৈক বাদশাহর একজন জাদুকর ছিল। জাদুকর বৃদ্ধ হয়ে গেলে তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য একজন বালককে তার নিকটে জাদুবিদ্যা শেখার জন্য নিযুক্ত করা হয়। যাতায়াতের পথে একটি গীর্জায় একজন ঈসায়ী ধর্মযাজক ছিলেন। বালকটি দৈনিক তার কাছে বসত। ঈসায়ী ধর্মযাজকের বক্তব্য শুনে সে ঈসায়ী হয়ে যায়। কিন্তু তা গোপন রাখে। একদিন দেখা গেল যে, বড় একটি হিংস্র জন্তু (সিংহ) রাস্তা আটকে দিয়েছে। লোকেরা ভয়ে আগাতে পারছে না। বালকটি মনে মনে বলল, আজ আমি দেখব, পাদ্রীর দাওয়াত সত্য, না জাদুকরের দাওয়াত সত্য। সে একটি পাথরের টুকরা হাতে নিয়ে বলল, – ‘হে আল্লাহ! যদি পাদ্রীর দাওয়াত তোমার নিকটে জাদুকরের দাওয়াতের চাইতে অধিক পসন্দনীয় হয়, তাহলে এই জন্তুটাকে তুমি মেরে ফেল, যাতে লোকেরা যাতায়াত করতে পারে’ বলেই সে পাথরটি নিক্ষেপ করল এবং জন্তুটি সাথে সাথে মারা পড়ল। এখবর পাদ্রীর কানে পৌঁছে গেল। তিনি বালকটিকে ডেকে বললেন, ‘হে বৎস! তুমি আমার চাইতে উত্তম। তুমি অবশ্যই সত্বর পরীক্ষায় পতিত হবে। যদি হও, তবে আমার কথা বলো না’। বালকটির কারামত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তার মাধ্যমে অন্ধ ব্যক্তি চোখ ফিরে পেত। কুষ্ঠরোগী সুস্থ হত এবং অন্যান্য বহু রোগ ভাল হয়ে যেত। ঘটনাক্রমে বাদশাহর এক মন্ত্রী ঐ সময় অন্ধ হয়ে যান। তিনি বহুমূল্য উপঢৌকনাদি নিয়ে বালকটির নিকটে আগমন করেন। বালকটি তাকে বলে – ‘আমি কাউকে রোগমুক্ত করি না। এটা কেবল আল্লাহ করেন। এক্ষণে যদি আপনি আল্লাহর উপরে বিশ্বাস স্থাপন করেন, তাহলে আমি আল্লাহর নিকটে দো‘আ করব। অতঃপর তিনিই আপনাকে সুস্থ করবেন’। মন্ত্রী ঈমান আনলেন। বালক দো‘আ করল। অতঃপর তিনি চোখের দৃষ্টি ফিরে পেলেন। পরে রাজদরবারে গেলে বাদশাহর প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে, আমার পালনকর্তা আমাকে সুস্থ করেছেন। বাদশাহ বলেন, তাহলে আমি কে? মন্ত্রী বললেন, لا، بل ربى وربك الله- ‘না। বরং আমার ও আপনার পালনকর্তা হলেন আল্লাহ। তখন বাদশাহর হুকুমে নির্যাতন শুরু হয়। এক পর্যায়ে তিনি উক্ত বালকের নাম বলে দেন। তখন বালককে ধরে এনে একই প্রশ্নের একই জবাব পেয়ে তার উপরেও চালানো হয় কঠোর নির্যাতন। ফলে এক পর্যায়ে সে পাদ্রীর কথা বলে দেয়। তখন বৃদ্ধ পাদ্রীকে ধরে আনলে তিনিও একই জওয়াব দেন। বাদশাহ তাদেরকে ধর্ম ত্যাগ করতে বললে তারা অস্বীকার করেন। তখন পাদ্রী ও মন্ত্রীকে জীবন্ত করাতে চিরে তাদের মাথাসহ দেহকে দু’ভাগ করে ফেলা হয়। এরপর বালকটিকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ফেলে দিয়ে মেরে ফেলার হুকুম দেয়া হয়। কিন্তু তাতে বাদশাহর লোকেরাই মারা পড়ে। অতঃপর তাকে নদীর মধ্যে নিয়ে নৌকা থেকে ফেলে দিয়ে পানিতে ডুবিয়ে মারার হুকুম দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও বালক বেঁচে যায় ও বাদশাহর লোকেরা ডুবে মরে। দু’বারেই বালকটি আল্লাহর নিকটে দো‘আ করেছিল, اَللَّهُمَّ اكْفِنِيهِمْ بِمَا شِئْتَ ‘হে আল্লাহ! এদের হাত থেকে আমাকে রক্ষা কর যেভাবে তুমি চাও’। পরে বালকটি বাদশাহকে বলে, আপনি আমাকে কখনোই মারতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপনি আমার কথা শুনবেন। বাদশাহ বললেন, কি সে কথা? বালকটি বলল, আপনি সমস্ত লোককে একটি ময়দানে জমা করুন। অতঃপর একটা তীর নিয়ে আমার দিকে নিক্ষেপ করার সময় বলুন, بِاسْمِ اللهِ رَبِّ الْغُلاَمِ ‘বালকটির পালনকর্তা আল্লাহর নামে’। বাদশাহ তাই করলেন এবং বালকটি মারা পড়ল। তখন উপস্থিত হাযার হাযার মানুষ সমস্বরে বলে উঠল, آمَنَّا بِرَبِّ هَذَا الْغُلاَمِ ‘আমরা বালকটির প্রভুর উপরে ঈমান আনলাম’। তখন বাদশাহ বড় বড় ও দীর্ঘ গর্ত খুঁড়ে বিশাল অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে সবাইকে হত্যা করেন। নিক্ষেপের আগে প্রত্যেককে তাওহীদ বর্জনের বিনিময়ে মুক্তির কথা বলা হয়। কিন্তু কেউ তা মানেনি। শেষ দিকে একজন মহিলা তার শিশু সন্তান কোলে নিয়ে ইতস্ততঃ করছিলেন। হঠাৎ কোলের অবোধ শিশুটি বলে ওঠে, ‘ধৈর্য ধরো মা! কেননা তুমি সত্যের উপরে আছো’। তখন বাদশাহর লোকেরা মা ও শিশুপুত্রকে একসাথে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে’। তিরমিযীর বর্ণনা অনুযায়ী ঐদিন ৭০ হাযার মানুষকে পুড়িয়ে মারা হয় (সনদ জাইয়িদ)। তবে একথাটি রাবী ছোহায়েব রূমীর হতে পারে। কেননা তাঁর নিকট নাছারাদের ইলম ছিল [ইবনে কাসীর]।
[ইমাম আহমাদ ২৩৯৭৬, মুসলিম ৩০০৫, তিরমিযী ৩৩৪০]
শিক্ষণীয় বিষয় :উপরে বর্ণিত কাহিনীর প্রতি ইঙ্গিত করে আল্লাহপাক অত্র আয়াতগুলি নাযিল করেন ও মক্কার নির্যাতিত মুসলমানদের সান্ত্বনা দেন। এই হৃদয়বিদারক ঘটনা বর্ণনা করে রাসূল (সাঃ) স্বীয় সাহাবা ও উম্মতকে সাবধান করেছেন যেন তারা দুনিয়াবী লাভের চিন্তায় শাসন-নির্যাতনের মুখে ঈমান থেকে বিচ্যুত না হয় এবং আখেরাতকে হাতছাড়া না করে।
উক্ত ঘটনায় দেখা গেছে যে, ঐ বৃদ্ধ পাদ্রী ও মন্ত্রীকে মাথায় করাত দিয়ে জীবন্ত চিরে দু’ভাগ করে ফেলা হয়েছে। তথাপি তারা ঈমান ত্যাগ করেননি। ছোট্ট বালকটির ঈমান ও ধৈর্য আরও বেশী বিস্ময়কর। সে বাদশাহকে নিজের মৃত্যুর পদ্ধতি বলে দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে যে, মৃত্যুবরণের চেয়ে সত্যকে রক্ষা করা তার নিকটে অনেক বেশী মূল্যবান। বস্ত্ততঃ বালকটির এই সত্যনিষ্ঠা ও হাসিমুখে মৃত্যুবরণের দৃশ্য হাযার হাযার মানুষের হৃদয়কে উদ্বেলিত করে এবং তারা সবাই সাথে সাথে মুসলমান হয়ে যায়। পরবর্তীতে তারাও হাসিমুখে ঈমানের বিনিময়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে। একেই বলে ‘জীবনের চেয়ে দীপ্ত মৃত্যু তখনি জানি, শহীদী রক্তে হেসে ওঠে যবে যিন্দেগানি’।
বালকটিকে হত্যার পরপরই তার অনুসারী হাজার হাজার নারী-পুরুষকে শিরক বর্জন করে তাওহীদ বরণ করার অপরাধে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিল। রাসূল (সাঃ)-এর যুগে খুবায়েব, আসেম, ইয়াসির পরিবার কি এর অন্যতম উদাহরণ নয়? যুগে যুগে ক্বিয়ামত পর্যন্ত এরূপ অত্যাচার-নির্যাতন মুমিন নর-নারীর উপর হতে থাকবে। এরপরেও ইসলাম যিন্দা থাকবে।
অর্থাৎ উক্ত মজলুম মানুষগুলির একমাত্র অপরাধ ছিল আল্লাহর উপর ঈমান আনা। আর একারণেই তাদের উপরে প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছিল। যদি তারা যুগ যুগ ধরে চলে আসা বাপ-দাদার ধর্মের উপরে টিকে থাকত এবং আল্লাহর উপরে ঈমান না আনতো, তাহলে তাদের উপরে এই জুলুম নেমে আসত না।
এখানে আল্লাহ স্বীয় ছিফাত হিসাবে ‘আযীয’ (মহাপরাক্রান্ত) ও ‘হামীদ’ (মহাপ্রশংসিত) এনেছেন। অতঃপর বলেছেন, যার হাতে রয়েছে আসমান ও যমীনের মালিকানা এবং তিনি সবকিছু দেখছেন। একথাগুলির মধ্যে জালেমদের প্রতি প্রচ্ছন্ন হুমকি রয়েছে। বরং প্রকাশ্যেই বলে দেয়া হয়েছে যে, অত্যাচারী যত বড় শক্তিশালী হৌক না কেন, তার অত্যাচার প্রতিরোধে তিনি ‘আযীয’ বা মহাপরাক্রান্ত। আর মজলুমের পক্ষে যালেমদের বদলা নেয়ার জন্য তিনি ‘হামীদ’ বা চির প্রশংসিত। আসমান ও যমীনের বাইরে পালাবার কোন ক্ষমতা যালেমদের নেই। আর এসবের উপরেই রয়েছে আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্য ও নিরংকুশ মালিকানা। তাই যে কোনভাবেই হউক আল্লাহ যালেমদের প্রতিশোধ নেবেনই।
وَاللهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ شَهِيْدٌ ‘বস্ত্ততঃ আল্লাহ সবকিছু প্রত্যক্ষ করছেন’। তিনি তার সৃষ্টজীবের কর্মসমূহ জানেন। তাঁর নিকট কোন কিছুই গোপন থাকেনা’। এর দ্বারা জালেম ও মজলুম উভয়কে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। জালেম যেন জুলুম না করে এবং মজলুম যেন ধৈর্য হারিয়ে কুফরী না করে। বরং জালেমদের জানা উচিত যে, তাদের এই জুলুম হল উম্মতের জাগৃতির সোপান। মজলুমকে তাই আল্লাহর উপর ঈমান রেখে সকল প্রকার বৈধ পথে জালেমকে রুখে দাঁড়াবার সার্বিক প্রস্ত্ততি নিতে হবে (আনফাল ৬০)।
فَتَنُوا শব্দের এক অর্থ হচ্ছে, أحرقوا বা জ্বালিয়েছিল। অপর অর্থ পরীক্ষা করা। বিপদে ফেলা। [ফাতহুল কাদীর]
কাফেরদের জাহান্নামের আযাব ও দহন যন্ত্রণার খবর দেয়ার সাথে সাথে কুরআন বলছে যে, এই আযাব তাদের ওপর পতিত হবে, যারা এই দুষ্কর্মের কারণে অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেনি। এতে তাদেরকে তাওবার দাওয়াত দেয়া হয়েছে। হাসান বসরী বলেনঃ বাস্তবিকই আল্লাহর অনুগ্রহ ও কৃপার কোন তুলনা নেই। তারা তো আল্লাহর নেক বান্দাদেরকে জীবিত দগ্ধ করে তামাশা দেখছে, আল্লাহ তা’আলা এরপরও তাদেরকে তওবা ও মাগফিরাতের দাওয়াত দিচ্ছেন। [ইবনুল কাইয়্যেম, বাদায়ে’উস তাফসীর; ইবন কাসীর]
এখানে অত্যাচারী কাফেরদের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে, যারা মুমিনদেরকে কেবল ঈমানের কারণে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করেছিল। শাস্তি প্রসঙ্গে দুটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে— (এক) তাদের জন্যে আখেরাতে জাহান্নামের আযাব রয়েছে, (দুই) তাদের জন্যে দহন যন্ত্রণা রয়েছে। এখানে দ্বিতীয়টি প্রথমটিরই বর্ণনা ও তাকীদ হতে পারে। অর্থাৎ জাহান্নামে গিয়ে তারা চিরকাল দহন যন্ত্রণা ভোগ করবে। এটাও সম্ভবপর যে, দ্বিতীয় বাক্যে দুনিয়ার শাস্তি বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত আলেম রবী ইবনে আনাস বলেন, মুমিনদেরকে অগ্নিতে নিক্ষেপ করার পর অগ্নি স্পর্শ করার পূর্বেই আল্লাহ তা’আলা তাদের রূহ কবজ করে নেন। এভাবে তিনি তাদেরকে দহন যন্ত্রণা থেকে রক্ষা করেন। ফলে তাদের মৃতদেহই কেবল অগ্নিতে দগ্ধ হয়। অতঃপর এই অগ্নি আরও বেশি প্রজুলিত হয়ে তার লেলিহান শিখা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে যারা মুসলিমদের অগ্নি দগ্ধ হওয়ার তামাশা দেখছিল, তারাও এই আগুনে পুড়ে ভষ্ম হয়ে যায়। [ফাতহুল কাদীর]
যারা বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা কুসংস্কার ছেড়ে খালেস তাওহীদে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, সেইসব ঈমানদার নর-নারীকে যেসব যালেমরা অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করে হত্যা করেছে, একইভাবে মক্কার মুশরিক নেতারা এবং পরবর্তীকালে যেসব যালেমরা শক্তির জোরে ঈমানদারগণের উপরে জুলুম করে চলেছে, ঐসব ঈমানদার ও সৎকর্মশীল মানুষের জন্য আল্লাহ প্রস্ত্তত করে রেখেছেন শান্তিময় জান্নাত, যার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হয় নদী ও ঝর্ণাসমূহ এবং এটাই হল সবচেয়ে বড় সফলতা। যালেমদের দৃষ্টিতে ঈমানদাররা পরাজিত ও ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর দৃষ্টিতে ঈমানদারগণ জয়ী ও সফল হয়েছে।
আল্লাহপাক অত্র আয়াতে ঈমানদার ও সৎকর্মশীল নর-নারীদের জন্য আগাম সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। জান্নাত যেন অপেক্ষায় আছে ঈমানদার নর-নারীদের পাবার জন্য। ক্বিয়ামতের দিন যখন তারা সেখানে প্রবেশ করবে, তখন দাররক্ষীসহ চারিদিক থেকে ফেরেশতাগণের অভিবাদনের আওয়ায আসবে সালাম আর সালাম। ‘আপনাদের উপর সালাম। আসুন! শান্তির সাথে চিরকালের জন্য এখানে প্রবেশ করুন’।[ যুমার ৭৩; ফুরক্বান ৭৫; ইউনুস ৯-১০] নিঃসন্দেহে এটিই হল বড় সফলতা। দুনিয়ায় যার কোন তুলনা নেই।
এটি পূর্ববর্তী শপথের জওয়াব হিসাবে এসেছে অর্থাৎ وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْبُرُوْجِ ‘নক্ষত্রশোভিত আকাশের শপথ’ বলার পরে মধ্যবর্তী বাক্যগুলি শপথের তাকীদ হিসাবে এসেছে। হাকীম তিরমিযীও একথা বলেছেন। অর্থাৎ যারা রাসূল (সাঃ)-কে অবিশ্বাস করে বা তাঁর আনীত শরী‘আতের অবাধ্যতা করে এবং ঈমানদার নর-নারীদের উপর যুলুম করে, তাদের বিরুদ্ধে শপথ করে আল্লাহ বলছেন যে, অবশ্যই তোমার প্রভুর পাকড়াও অত্যন্ত কঠিন। যখন তিনি ধরবেন, তখন সেখান থেকে নিষ্কৃতির কোন পথ আর থাকবে না। অতএব সাবধান হও হে মানুষ! তওবা করে যুলুম ও অবাধ্যতা ’তে নিবৃত্ত হও! আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের অনুগত হও!!
আল্লাহ বলেন, ‘যারা আমাদের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে, আমরা তাদের অজান্তে ধীরে ধীরে তাদের পাকড়াও করি’। ‘আমি তাদেরকে অবকাশ দেই। নিশ্চয়ই আমার কৌশল অত্যন্ত মযবুত’ (আ‘রাফ ১৮২-৮৩; ক্বলম ৪৪-৪৫)। তিনি বলেন,‘আর এভাবেই তোমার প্রতিপালক অত্যাচারী জনপদকে পাকড়াও করেন। নিঃসন্দেহে তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত মর্মন্তুদ ও কঠোর’ (হূদ ১০২)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ যালেমকে অবকাশ দেন। অবশেষে যখন তিনি তাকে ধরেন, তখন আর সুযোগ দেন না। অতঃপর তিনি হূদ ১০২ আয়াতটি পাঠ করেন’। [বুখারী ৪৬৮৬; মুসলিম ২৫৮৩]
অর্থাৎ যাবতীয় সৃষ্টির সূচনা তিনিই করেছেন এবং সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবার পরে তিনিই আবার পুনরুত্থান ঘটাবেন। মানুষ মরে মাটি হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁর হুকুমে ক্বিয়ামতের দিন সবাই পুনর্জীবিত হবে। আর যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেন, তাঁর পক্ষে পুনরায় সৃষ্টি করা খুবই সহজ। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেন। অতঃপর তার পুনরাবৃত্তি করবেন। আর এটি তাঁর জন্য অতীব সহজ। নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে সর্বোচ্চ স্থান তাঁরই। তিনি মহাপরাক্রান্ত ও প্রজ্ঞাময়’ (রূম ২৭)।
الْوَدُود শব্দটির কয়েকটি অর্থ বর্ণিত আছে। কারও কারও মতে, ‘ওয়াদূদ’ বলা হয় তাকে যার কোন সন্তান নেই। অর্থাৎ যার এমন কেউ নেই। যার প্রতি মন টানতে থাকবে। তবে অধিকাংশ মুফাস্সিরের মতে এর অর্থ, প্রিয় বা প্রিয়পাত্র। যার ভালবাসায় কোন খাদ নেই। যারা তাঁকে ভালবাসেন তিনিও তাদেরকে ভালবাসেন। অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তিনি তাদেরকে ভালবাসেন আর তারাও তাঁকে ভালবাসে”। [সূরা আল-মায়েদাহ: ৫৪] তিনি এমন সত্তা যাঁকে তার ভালবাসার পাত্ররা এমন ভালবাসে যে ভালবাসার কোন উদাহরণ দেয়া সম্ভব হয় না। যার কোন তুলনা নেই। তাঁর খালেস বান্দাদের অন্তরে তাঁর যে ভালবাসা রয়েছে সেটার তুলনা কোন ভালবাসা দিয়ে দেয়া যাবে না। আর এজন্যই ভালবাসা হচ্ছে আল্লাহর দাসত্বের মূল কথা। যে ভালবাসার কারণে যাবতীয় ভালবাসার পাত্রের উপর সেটা স্থান করে নেয়। অন্য ভালবাসা যদি আল্লাহর ভালবাসার অনুগামী না হয় তবে সেটা বান্দার জন্য বিপদ ও শাস্তির কারণ হয়। [তাফসীরে জাকারিয়া]
অর্থাৎ, তিনি সমস্ত সৃষ্টি হতে সুমহান এবং সুউচ্চ। ‘আরশ’ যা সব থেকে উচ্চে অবস্থিত, যার উপরে আল্লাহ আছেন। যেমন সাহাবাগণ, তাবেয়ীনগণ এবং মুহাদ্দিসগণদের এ বিশ্বাস। المَجِيدُ শব্দের অর্থ হল মর্যাদাবান ও গৌরবময়। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
“আরশের মালিক” বলে মানুষের মধ্যে এ অনুভূতি জাগানো হয়েছে যে তিনি যেহেতু আরশের মালিক। আর আরশ সবকিছুর উপরে। তাই তিনিও সবকিছুর উপরে। সবকিছু মহান আল্লাহর আরশের সামনে অতি নগন্য। বরং সমস্ত আসমান, যমীন ও কুরসী সবগুলোকেই আরশ শামিল করে। [সা’দী] কাজেই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে কেউ তার হাত থেকে নিস্তার পেতে পারে না। “শ্রেষ্ঠ সম্মানিত” বলে এ ধরনের বিপুল মর্যাদাসম্পন্ন সত্তার প্রতি অশোভন আচরণ করার হীন মনোবৃত্তির বিরুদ্ধে মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে। তাছাড়া এটি আরশের গুণও হতে পারে। [ইবনে কাসীর]
অর্থাৎ, তিনি যা চান তা বাস্তবে করে থাকেন। তাঁর আদেশ ও চাহিদাকে রুখার সাধ্য কারো নেই। আর না কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার ক্ষমতা রাখে। আবু বাকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর মৃত্যু রোগের সময় তাঁকে কেউ জিজ্ঞাসা করল যে, আপনাকে কি কোন ডাক্তার দেখেছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। সে বলল, তিনি কি বলেছেন? আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, তিনি বলেছেন, إني فعَّال لما أريد অর্থাৎ, আমি যা চাই, তাই করি। আমার ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করার মত কেউ নেই।
অত্র আয়াতে স্বীয় রাসূলকে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহ বলেন, ফেরাঊন ও তার বিশাল সেনাদলকে এবং দুর্ধর্ষ সামুদ জাতিকে আমি চোখের পলকে ধ্বংস করেছি এবং তাদের নাম-নিশানা মুছে দিয়েছি তাদের সীমাতিরিক্ত বাড়াবাড়ির কারণে। অতএব হে রাসূল! তুমি ভয় পাবে না। তোমার প্রতিপক্ষ মক্কার কাফেররা তাদের তুলনায় কিছুই নয়। তাদের বাড়াবাড়ির পরিণামও বিগত জাতিগুলোর মতই হবে। ওরা তোমার কোনই ক্ষতি করতে পারবে না। যেমন পারেনি সামুদ জাতির নবী সালেহ এবং ফেরাঊনের কাছে প্রেরিত নবী মূসা ও হারুনের। এখানে সামুদ ও ফেরাঊনকে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করার কারণ হল সামুদ ছিল আরবদের একটি জাতি। যাদের ধ্বংসলীলার ঘটনা আরবদের নিকটে প্রসিদ্ধ ছিল। অন্যদিকে ফেরাঊনের ঘটনা ছিল মিসরের এবং তা কিতাবধারী ইহুদী-নাছারাদের নিকটে খুবই পরিচিত ছিল।
মক্কার কাফেররা সামূদ, ফেরাঊন প্রমুখ বিগত কাফেরদের মন্দ পরিণতি জানা সত্ত্বেও শেষনবী মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর উপরে মিথ্যারোপে লিপ্ত রয়েছে। তাই এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। বরং এদের মিথ্যারোপ পূর্বেকার সকল মিথ্যারোপের চাইতে বেশী। অথচ তারা বিলক্ষণ জানে যে, তারা চারিদিক থেকে আল্লাহর ঘেরাওয়ের মধ্যে রয়েছে। তাঁর পাকড়াও থেকে বাঁচার ক্ষমতা যেমন ফেরাঊন ও সামূদ জাতির হয়নি, তেমনি মক্কার কাফেরদের এমনকি কোন যুগের কাফির-মুনাফিকদের হবে না। একথা বলার মাধ্যমে আল্লাহ সকল যুগের ঈমানদার নর-নারীর উপরে ও ইসলামের প্রচার ও প্রসারে নিবেদিতপ্রাণ নেতৃবৃন্দের উপরে নির্যাতনকারী কাফের ও ফাসেকদের হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন।
مِنْ وَرَآئِهِمْ অর্থ ‘তাদের পিছন থেকে’। যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, وَرَاءَ ظَهْرِهِ ‘তার পিঠের পিছন থেকে’ (ইনশিক্বাক্ব ১০)। অর্থাৎ ‘আল্লাহ তাদের সকল কর্ম গণনা করে রাখছেন এবং তিনি সবগুলির যথাযথ বদলা দিবেন’।অথবা এর দ্বারা এটা বুঝানো হয়েছে যে, যালেমরা পিছন দিক দিয়েও পালাবার পথ পাবে না। সেদিকেও আল্লাহ তাদের ঘিরে রেখেছেন।
একথার মধ্যে অবিশ্বাসীদের প্রতি ধমক ও তাচ্ছিল্য রয়েছে। কারণ তারা আল্লাহর কালামকে দূরে নিক্ষেপ করে নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসারী হয়েছে। অথচ তারা যে কুরআনকে মিথ্যা সাব্যস্ত করছে, তা অতীব পবিত্র ও উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন। এটি কোন সৃষ্ট বস্ত্ত নয়; বরং সরাসরি আল্লাহর কালাম। এটি সর্বোচ্চ স্থানে সুরক্ষিত ফলকে লিপিবদ্ধ। যাতে কোন বাতিলের প্রবেশাধিকার নেই (হামীম সাজদাহ ৪২) বা কোনরূপ পরিবর্তন ও কমবেশী করার সুযোগ নেই (আন‘আম ১১৫; ইউনুস ১৫; কাহফ ২৭)। অতএব কুরআনের উপর কাফেরদের অবিশ্বাস ও মিথ্যারোপে কিছুই যায় আসে না। তারা এর কোনই ক্ষতি করতে পারবে না।
এর মধ্যে মুমিনদের প্রতি উপদেশ রয়েছে, তারা যেন অভ্রান্ত সত্যের উৎস পবিত্র কুরআনকে আঁকড়ে থাকে এবং সার্বিক জীবনে তার অনুসারী হয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হয়।
ফুটনোট
✔ (وَالْيَوْمِ الْمَوْعُودِ) বা প্রতিশ্রুত দিনের অর্থ কেয়ামতের দিন।
✔ এই সূরায় শাহেদ ও মাশহুদের শপথ করা হয়েছে। আর مَشْهُود এর অর্থ আরাফার দিন এবং شاهد এর অর্থ শুক্রবার দিন।
✔ যারা বড় বড় গর্তের মধ্যে আগুন জ্বালিয়ে ঈমানদারদেরকে তার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল এবং তাদের জ্বলে পুড়ে মরার বীভৎস দৃশ্য নিজেদের চোখে দেখেছিল তাদেরকে এই সূরায় ‘আসহাবুল উখদূদ’ বা গর্তওয়ালা বলা হয়েছে।
✔ গর্তওয়ালারা মুমিনদের সাথে শত্রুতা কোন অধিকার বঞ্চিত হয়ে বা অত্যাচারিত হয়ে করে নাই; বরং মুমিনরা আল্লাহর উপর ঈমান এনেছিলো এ কারনেই ছিলো তাদের সব শত্রুতা।
✔ যারা মু’মিন পুরুষ ও নারীদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন চালায় ও তওবা করেনা, তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব এবং এক্ষেত্রে যেহেতু তারা দুনিয়াতে মু’মিন পুরুষ ও নারীদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেছিলো তাই আখিরাতে তাদের শাস্তিও হবে অনুরুপ তবে অধিকতর তীব্র জ্বালা-পোড়ার শাস্তি।
✔ সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের কাছে হক কথা বলা।
✔ এই সূরায় দুই ধরনের মানুষের দুই ধরনের পরিনতির কথা রয়েছে- এক, জাহান্নামের আযাব এবং জ্বলে পুড়ে যাওয়ার শাস্তি অর্থাৎ বিফলতা। দুই, জান্নাতের অসীম নিয়ামত এবং সবচাইতে বড় সফলতা।
✔ নির্দোষ মানুষদের কষ্ট দেয়ার শাস্তি কত ভয়াবহ হতে পারে তা বোঝানোর জন্য আল্লাহ তার ‘রব’ নামটি ব্যবহার করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ তাদের পালনকর্তা, মালিক, পরিপূর্ন কর্তৃত্বশীল, বৃদ্ধি নিশ্চিতকারী, অস্তিত্ব রক্ষাকারী, পুরষ্কার প্রদানকারী হওয়ায় তাদের কষ্ট দেওয়ার প্রতিশোধ আল্লাহ কঠিনভাবে গ্রহন করবেন।
✔ আকাশ সমান বড় অপরাধ করেও যদি আল্লাহ তা‘আলার কাছে তাওবা করা হয় তবুও আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমা করে দেবেন। হাসান বাসরী (রহঃ) বলেন : দেখ, আল্লাহ তা‘আলার দয়া ও উদারতার প্রতি, তারা আল্লাহ তা‘আলার কত ওলী ও আনুগত্যশীল বান্দাদেরকে হত্যা করেছে তারপরেও আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে তাওবার দিকে আহ্বান করছেন। (তাফসীর সা‘দী)
✔ কাফিরদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলার পাকড়াও বড় কঠিন।
✔ ইতিহাসের সবচাইতে শক্তিশালী, ইসলাম ও খোদাবিরোধী সৈন্যদলের (ফেরাউন ও সামুদের) পরিনতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ এটা বোঝাতে যান যে, আল্লাহর শক্তি ও তার বাহিনীর বিপরীতে ঐসব সেনাদলের কি করুন পরিনতিই না হয়েছিলো! সেই তুলনায় তোমরা (যারা ইসলামের বিরোধিতা করছো) তো অতি নগন্য, তাই তোমাদের পরিনতির কথা ভেবে নাও এবং বিরত হও।