কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৪
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-৪
সূরা আত ত্বারিক
সূরা আত-তারিক্ব কুরআনের ৮৬ তম সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ১৭। সূরা আত-তারিক্ব মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। সূরার নামের অর্থ রাত্রিতে আগমনকারী।
নামকরণ
প্রথম আয়াতে الطَّارِق শব্দটিকে এর নাম গণ্য করা হয়েছে।
নাযিল হওয়ার সময়-কাল
বক্তব্য বিষয়ের উপস্থাপনা পদ্ধতির দিক দিয়ে মক্কা মুআ’যযমার প্রাথমিক সূরাগুলোর সাথে এর মিল দেখা যায়। কিন্তু মক্কার কাফেররা যখন কুরআন ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য সব রকমের প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল ঠিক সে সময়ই এ সূরাটি নাযিল হয়।
বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
সর্বপ্রথম আকাশের তারকাগুলোকে এ মর্মে সাক্ষী হিসেবে পেশ করা হয়েছে যে, এ বিশ্ব-জাহানে কোন একটি জিনিসও নেই যা কোন এক সত্তার রক্ষনাবেক্ষণ ছাড়া নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত ও অস্তিত্বশীল থাকতে পারে। তারপর মানুষের দৃষ্টি তার নিজের সত্ত্বার প্রতি আকৃষ্ট করে বলা হয়েছে, দেখো কিভাবে এক বিন্দু শুক্র থেকে অস্তিত্ব দান করে তাকে একটি জ্বলজ্যান্ত গতিশীল মানুষে পরিণত করা হয়েছে। এরপর বলা হয়েছে, যে আল্লাহ এভাবে তাকে অস্তিত্ব দান করেছেন তিনি নিশ্চিতভাবেই তাকে দ্বিতীয়বার পয়দা করার ক্ষমতা রাখেন। দুনিয়ায় মানুষের যেসব গোপন কাজ পর্দার আড়ালে থেকে গিয়েছিল সেগুলোর পর্যালোচনা ও হিসেব-নিকেশই হবে এই দ্বিতীয়বার পয়দা করার উদ্দেশ্য। সে সময় নিজের কাজের পরিণাম ভোগ করার হাত থেকে বাঁচার কোন ক্ষমতাই মানুষের থাকবে না এবং তাকে সাহায্য করার জন্য কেউ এগিয়ে আসতেও পারবে না।
সবশেষে বলা হয়েছে, আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ এবং মাটি থেকে গাছপালা ও ফসল উৎপাদন যেমন কোন খেলা তামাসার ব্যাপার নয় বরং একটি দায়িত্বপূর্ণ কাজ, ঠিক তেমনি কুরআনে যেসব প্রকৃত সত্য ও নিগূঢ় তত্ত্ব বর্ণনা করা হয়েছে সেগুলোও কোন হাসি তামাসার ব্যাপার নয়। বরং সেগুলো একেবারে পাকাপোক্ত ও অপরিবর্তনীয় কথা। কাফেররা এ ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে যে, তাদের চালবাজী ও কৌশল কুরআনের এই দাওয়াতকে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিহত করতে সক্ষম হবে। কিন্তু তারা জানে না, আল্লাহও একটি কৌশল অবলম্বন করছেন এবং তাঁর কৌশলের মোকাবিলায় কাফেরদের যাবতীয় চালবাজী ও কৌশল ব্যর্থ হয়ে যাবে। তারপর একটি বাক্যে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সান্ত্বনা এবং পর্দান্তরালে কাফেরদের ধমক দিয়ে কথা এভাবে শেষ করা হয়েছে: তুমি একটু সবর করো এবং কিছুদিন কাফেরদেরকে ইচ্ছে মতো চলার সুযোগ দাও। কিছুদিন যেতে না যেতেই তারা টের পেয়ে যাবে, তাদের চালবাজী ও প্রতারণা কুরআনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে না। বরং যেখানে তারা কুরআনকে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতিহত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেখানে কুরআন বিজয়ীর আসনে প্রতিষ্ঠিত হবে।
খালেদ বিন আবূ জাবাল আল উদওয়ানী তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করে বলেন: তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে সাক্বীফের পূর্ব দিকে দেখলেন তিনি (সাঃ) ধনুক বা লাঠির ওপর ভর দিয়ে আছেন। তিনি তাদের নিকট সহযোগিতা চাওয়ার জন্য এসেছিলেন, আমি তাঁর মুখ থেকে সূরা ত্বারিক পাঠ করা শ্রবণ করলাম এবং মুখস্থ করে নিলাম। তখন আমি মুশরিক ছিলাম। অতঃপর মুসলিম হওয়ার পর আমি তা পাঠ করলাম। তারপর সাক্বীফ গোত্রের লোকেরা আমাকে ডেকে বলে: রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে কী শুনেছ? আমি তাদের কাছে এ সূরাটি পাঠ করলাম। তখন যেসব কুরাইশ ছিল তারা বলল: আমাদের সাথীর (মুহাম্মাদের) ব্যাপারে আমরা বেশি জানি। যদি আমরা তার কথা সত্য বলে জানতাম তাহলে আমরাই তার আনুগত্য করতাম। (আহমাদ ৩/৩৩৫, মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৭/১৩৬)
পূর্বের ও পরের সূরার সাথে সম্পর্ক
পূর্ববর্তী সূরাতে (আল বুরুজ) মু’মিনদের জন্য ওয়াদা আর কাফেরদের জন্য ধমক সম্পর্কে আলোচিত হয়েছে। আর এই সুরায় তাদেরকে আজাব প্রদানের দলিল স্বরূপ তাদের কৃতকর্মসমূহকে সংরক্ষণ করার কথা আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়া পুনরুত্থানের সম্ভাবনা এবং সংঘটন, এর উপর দলিল স্বরূপ কুরআনের সত্যতার বিবরণ দেওয়া হয়েছে, যা পুর্ববর্তী সূরার শেষ দিকেও ছিল। সূরা বুরুজের শেষে (আয়াত ২২) লাওহে মাহফুয এর কথা বর্নিত আছে যা আকাশে অবস্থিত। এবং সূরা আত ত্বারিক শুরু হয়েছে আকাশের কথা দিয়ে।
এ সূরা, আত ত্বারিকে প্রতিদান ও প্রতিফলের বর্ণনা আছে আর পরবর্তী সূরা আ’লাতে সর্বোচ্চ সফলতাকে প্রকৃত উদ্দেশ্য বলে ঘোষণা করা হয়েছে, সাথে সাথে সফলতা অর্জনের জন্য কিছু কাজের কথাও বলা হয়েছে।
اَلطَّارِقُ -এর মূল হল الطَّرْقُ যার অর্থ الدَّقُّ ‘ধাক্কানো, খটখটানো’। সেখান থেকে হয়েছে اَلْمِطْرَقَةُ ‘হাতুড়ি’। আভিধানিক অর্থে দিনে বা রাতে যেকোন সময়ের আগন্তুককে ‘তারেক’ বলা যায়। কেননা তিনি এলে দরজায় করাঘাত করেন। তবে আরবরা প্রত্যেক রাত্রির আগমুতককে ‘তারেক’ বলে থাকে [কুরতুবী]। আল্লাহ এখানে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন النَّجْمُ الثَّاقِبُ অর্থাৎ ‘উজ্জ্বল তারকা’ বলে। কেননা তা রাতের আকাশে আগমন করে ও উজ্জ্বলভাবে প্রকাশিত হয়।
الثَّاقِبُ এর মূল الثقب ‘ছিদ্র’। এখানে الثاقب বিশেষণ এজন্য ব্যবহার করা হয়েছে كأنه يثقُب الظلامَ بضوئه فينفُذ فيه ‘যেন সে তার আলো দ্বারা অন্ধকার ছিদ্র করে বেরিয়ে যায়’। যেমন আল্লাহ বলেন,وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَآءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيْحَ، ‘আমরা দুনিয়ার আকাশকে সুসজ্জিত করেছি অসংখ্য দীপালীর মাধ্যমে’ (মূলক ৫)।
السَّمَاءُ এসেছে سَمُوٌّ থেকে। অর্থ উঁচু হওয়া। যেমন বলা হয় ‘তার দিকে আমার দৃষ্টি পড়ল’। সেখান থেকে السَّمَاءُ অর্থ ‘আকাশ’। যা উচ্চে অবস্থিত। আকাশের সীমানা ও উচ্চতার কোন সীমা-সরহদ নেই। সীমাহীন নীলাকাশের সৌন্দর্য হল তারকারাজি। যা আমরা চর্মচক্ষুতে দেখতে পাই। এগুলি আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি। নক্ষত্ররাজি কেবল আলো দেয় না, এরা রাতের অন্ধকারে আমাদের পথ দেখায়। আল্লাহ বলেন, ‘তারকারাজির মাধ্যমে লোকেরা পথ খুঁজে পায়’ (নাহল ১৬)। তারকারাজির সংখ্যারও কোন শেষ নেই। এমন বহু নক্ষত্র রয়েছে, যাদের আলো লক্ষ লক্ষ বছর পরেও পৃথিবীতে এসে পৌঁছবে কি-না সন্দেহ। মানুষের তুলনায় এসব সৃষ্টির বিশালতা বুঝানোর জন্যই আল্লাহ এখানে আকাশ ও তারকারাজির শপথ করেছেন।
الطَّارِقُ ও الثَّاقِبُ শব্দ দু’টি একবচন হলেও এখানে إسم جنس বা জাতিবোধক বিশেষ্য হয়েছে। অর্থাৎ রাত্রির উজ্জ্বল তারকারাজি।
এটা শপথের জওয়াব। حَافِظٌ শব্দের অর্থ তত্ত্বাবধায়ক। অর্থাৎ আল্লাহ্ তা’আলা। আকাশ ও নক্ষত্রের শপথ করে বলেছেন, প্রত্যেক মানুষের ওপর তত্ত্বাবধায়ক বা আমলনামা লিপিবদ্ধকারী ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে। সে তার সমস্ত কাজকর্ম ও নড়াচড়া দেখে, জানে। [ফাতহুল কাদীর] এর পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের চিন্তা করা উচিত যে, সে দুনিয়াতে যা কিছু করছে, তা সবই কেয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশের জন্যে আল্লাহর কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তাই কোন সময় আখেরাত ও কেয়ামতের চিন্তা থেকে গাফেল হওয়া অনুচিত। এখানে حَافِظٌ শব্দ একবচনে উল্লেখ করা হলেও তারা যে একাধিক তা অন্য আয়াত থেকে জানা যায়। অন্য আয়াতে আছে (وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحَافِظِينَ ٭ كِرَامًا كَاتِبِينَ) “নিশ্চয় তোমাদের উপর নিয়োজিত রয়েছে তত্ত্বাবধায়করা, সম্মানিত লেখকরা”। [সূরা আল-ইনফিতার; ১০–১১]
তাছাড়া حافظ এর অপর অর্থ আপদ-বিপদ থেকে হেফাযতকারীও হয়ে থাকে। [ইবন কাসীর] আল্লাহ্ তা’আলা প্রত্যেক মানুষের হেফাযতের জন্যে ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। তারা দিন-রাত মানুষের হেফাযতে নিয়োজিত থাকে। তবে আল্লাহ তা’আলা যার জন্যে যে বিপদ অবধারিত করে দিয়েছেন, তারা সে বিপদ থেকে হেফাযত করে না। অন্য এক আয়াতে একথা পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে, (لَهُ مُعَقِّبَاتٌ مِنْ بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ يَحْفَظُونَهُ مِنْ أَمْرِ اللَّهِ) অর্থাৎ মানুষের জন্যে পালাক্রমে আগমনকারী পাহারাদার ফেরেশতা নিযুক্ত রয়েছে। তারা আল্লাহর আদেশে সামনে ও পেছনে থেকে তার হেফাযত করে। [সূরা আর-রাদ: ১১]
অথবা হেফাযতকারী বলতে এখানে আল্লাহকেই বুঝানো হয়েছে। [ফাতহুল কাদীর] তিনি আকাশ ও পৃথিবীর ছোট বড় সকল সৃষ্টির দেখাশুনা, তত্ত্বাবধান ও হেফাযত করছেন। তিনিই সব জিনিসকে অস্তিত্ব দান করেছেন তিনিই সবকিছুকে টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি সব জিনিসকে ধারণ করেছেন বলেই প্রত্যেকটি জিনিস তার নিজের জায়গায় প্রতিষ্ঠিত আছে। তিনি সব জিনিসকে তার যাবতীয় প্ৰায়োজন পূর্ণ করার এবং তাকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত বিপদমুক্ত রাখার দায়িত্ব নিয়েছেন। এ বিষয়টির জন্য আকাশের ও রাতের অন্ধকারে আন্তঃপ্রকাশকারী প্রত্যেকটি গ্রহ ও তারকার কসম খাওয়া হয়েছে।
فَلْيَنْظُرِ এখানে অর্থ ‘দেখা উচিৎ’। এখানে نظر অর্থ চর্মচক্ষু দিয়ে দেখা নয়, বরং জ্ঞানচক্ষু দিয়ে দেখা। অর্থাৎ ‘চিন্তা-গবেষণা করা’।
এখানে আল্লাহ তা’আলা যে মানুষকে পুনরায় সৃষ্টি করতে সক্ষম তার ওপর মানুষেরই নিজের সত্ত্ব থেকে প্রমাণাদি উপস্থাপন করছেন। মানুষ তার নিজের সম্পর্কে একটু চিন্তা করে দেখুক। তাকে কিভাবে কোত্থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তাকে অত্যন্ত দুর্বল বস্তু হতে সৃষ্টি করা হয়েছে। যিনি প্রথমবার তাকে সৃষ্টি করতে পারেন তিনি অবশ্যই দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করতে সক্ষম। যেমন অন্য আয়াতে বলেছেন, “তিনিই প্রথম সৃষ্টি করেন, পরে আবার তিনি তা করবেন, আর এটা তো তার জন্য সহজতর”। [সূরা আর-রূম: ২৭]
دَافِقٍ অর্থ ‘সবেগে নির্গত’। সেখান থেকে مَّاءٍ دَافِقٍ অর্থ ‘মাতৃগর্ভে স্থিত পানি’। অর্থাৎ পিতা ও মাতার মিলিত শুক্রবিন্দু। দু’টি মিলে একটি বিন্দু হওয়ায় مَّاءٍ دَافِقٍ একবচন হয়েছে। অন্য আয়াতে একে نُطْفَةٍ أَمْشَاجٍ বা ‘মিশ্র শুক্রবিন্দু’ বলা হয়েছে (দাহর ৭৬/২)।
আল্লাহ বলেন, তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে সবেগে স্খলিত পানি থেকে যা তার মায়ের গর্ভে স্থিত থাকে। পিতা ও মাতা উভয়ের পানি সেখানে জমা হয়ে একটি পানি বিন্দু অর্থাৎ মিশ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, পিতা ও মাতা উভয়ের মিলিত একটি পানি বিন্দুই হল মানব সৃষ্টির উৎস। যা মায়ের গর্ভে স্থিতি লাভ করে এবং সেখানে পুষ্ট হয়ে সাধারণত ৯ মাস ১০ দিন পরে পূর্ণাঙ্গ মানব শিশুর রূপ ধারণ করে। মাটিতে বীজ বপন করার পর প্রয়োজনীয় তাপ, চাপ ও খাদ্য যোগানোর মাধ্যমে যেমন তা নির্ধারিত সময়ে অংকুর হিসাবে উদ্গত হয় ও পরে বীজ অনুযায়ী বিভিন্ন উদ্ভিদে পরিণত হয়। পিতার শুক্রাণু তেমনি বীজ হিসাবে মায়ের ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়ে সেখানে প্রয়োজনীয় তাপ, চাপ ও খাদ্য যোগানের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ঘটে। অতঃপর পূর্ণাঙ্গ মানব শিশু হিসাবে দুনিয়াতে ভূমিষ্ঠ হয়। সেকারণ সন্তান তার পিতা ও মাতা উভয়ের রং, রূপ ও স্বভাব কমবেশী প্রাপ্ত হয়।
الصُّلْب অর্থ মেরুদন্ড বা পিঠ। التَّرَائِبِ একবচনে التَّرِيْبَةُ অর্থ عظام الصدر ‘নারী ও পুরুষের বুকের উপর দিককার হাড্ডি’। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, এর অর্থ موضع القلادة ‘মেয়েদের কণ্ঠহারের স্থান’।
আয়াতে مِنْ بَيْنِ الصُّلْبِ وَالتَّرَائِبِ বলতে পিতা ও মাতা প্রত্যেকের পিঠ ও বুকের মধ্য হ’তে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। কেননা দেহের সকল প্রধান অঙ্গের অবস্থান মূলত পিঠ ও বুকের মধ্যেই থাকে। দেহের কেন্দ্রবিন্দু হল মস্তিষ্ক। আর তার প্রতিনিধি হিসাবে মেরুদন্ডের হাড্ডির মধ্যে লুক্কায়িত স্নায়ুকান্ড তার শাখা-প্রশাখা ও শিরা-উপশিরার মাধ্যমে মস্তিষ্কের হুকুম সারা দেহে সঞ্চালিত করে।
‘যা নির্গত হয় মেরুদন্ড ও বুকের মধ্যস্থল হতে’- একথার মধ্যে একটি বৈজ্ঞানিক তথ্য নিহিত আছে। তা এই যে, জন্ম পূর্ববর্তী অবস্থায় অর্থাৎ শিশুর দেহ গঠনের স্তরে তার অন্ডকোষ বা ডিম্বাশয় মেরুদন্ড ও বুকের পাঁজরের হাড্ডির মাঝে বিকশিত হওয়া শুরু করে। পরবর্তীতে এগুলো নীচে নেমে গেলেও তাদের রক্ত সঞ্চালন পূর্বের স্থান থেকেই হয়।
উদ্দেশ্য এই যে, যিনি প্রথমবার মানুষকে বীর্য থেকে প্রথম সৃষ্টিতে একজন জীবিত, শ্ৰোতা ও দ্রষ্টা মানব সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাকে পুনরায় ফিরিয়ে দিতে অর্থাৎ মৃত্যুর পর জীবিত করতে আরও ভালরূপে সক্ষম। [ইবন কাসীর] যদি তিনি প্রথমটির ক্ষমতা রেখে থাকেন এবং তারই বদৌলতে মানুষ দুনিয়ায় জীবন ধারণ করছে, তাহলে তিনি দ্বিতীয়টির ক্ষমতা রাখেন না, এ ধারণা পোষণ করার পেছনে এমন কি শক্তিশালী যুক্তি পেশ করা যেতে পারে?
গোপন রহস্য বলতে এখানে প্রত্যেক ব্যক্তির এমনসব কাজ বুঝানো হয়েছে যেগুলো রহস্যাবৃত্ত রয়ে গেছে আবার এমন সব কাজও বুঝানো হয়েছে, যেগুলো বাহ্যিক আকৃতিতে জন সমক্ষে এসে গেছে কিন্তু সেগুলোর পেছনে সক্রিয় নিয়ত, উদ্দেশ্য স্বার্থ ও আশা-আকাঙ্খা এবং সেগুলোর গোপন কার্যকারণ লোক চক্ষুর অন্তরালে থেকে গেছে। কিয়ামতের দিন এসব কিছু উন্মুক্ত হয়ে সামনে এসে যাবে। সেদিন কেবলমাত্র কে কি করেছে এর তদন্ত ও হিসেব-নিকেশ হবে না বরং কি কারণে, কি উদ্দেশ্য, কি নিয়তে ও কোন মানসিকতায় উদ্বুদ্ধ হয়ে এ কাজ করেছিল তারও হিসেব হবে। অনুরূপভাবে এক ব্যক্তি যে কাজটি করেছে দুনিয়ায় তার কি প্রভাব পড়েছে, কোথায় তার প্রভাব পৌঁছেছে এবং কতদিন পর্যন্ত এ প্রভাব অব্যাহত থেকেছে— তাও সারা দুনিয়ার চোখ থেকে গোপন থেকেছে, এমনকি যে ব্যক্তি এ কাজটি করেছে তার চোখ থেকেও। আর একটি রহস্যও শুধুমাত্র কিয়ামতের দিনেই উন্মুক্ত হবে এবং সেদিন এর পুরোপুরি তদন্ত ও হিসেব-নিকেশ হবে। সেটি হচ্ছে, এক ব্যক্তি দুনিয়ায় যে বীজ বপন করে গিয়েছিল তার ফসল কতখানি পর্যন্ত কোন্ কোন্ পদ্ধতিতে সে এবং তার সাথে আর কে কে কাটতে থেকেছে? [তাফহীমুল কুরআন]
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “কেয়ামতের দিন প্রত্যেক গাদ্দারের পিছনে একটি পতাকা লাগানো হবে যাতে থাকবে, এটা অমুকের পুত্ৰ অমুকের গাদ্দারী।” [বুখারী: ৬১৭৮, মুসলিম: ১৭৩৫] সুতরাং সেদিন মানুষের সব গোপন ভেদ খুলে যাবে। প্রত্যেক ভাল-মন্দ বিশ্বাস ও কর্মের আলামত মানুষের মুখমণ্ডলে শোভা পাবে।
মানুষের নিকট এমন শক্তি থাকবে না যে, সে আল্লাহর আযাব থেকে পরিত্রাণ লাভ করতে পারবে। আর না কোন দিক থেকে তার এমন কোন সাহায্যকারী পাওয়া যাবে, যে তাকে আল্লাহর আযাব থেকে বাঁচাতে পারে।
رجع এর আভিধানিক অর্থ হল ফিরে আসা। বৃষ্টিও বারবার এবং ফিরে ফিরে আসে বলে তার জন্য رجع শব্দ প্রয়োগ করা হয়েছে। কোন কোন উলামাগণ বলেন যে, মেঘ (সূর্যের তাপে) সমুদ্রের পানি থেকে সৃষ্টি হয় অতঃপর পুনরায় সেই পানি (সমুদ্র ও) পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই জন্য বৃষ্টিকে رجع বলা হয়েছে। আরবরা পুনর্বার বৃষ্টির আশায় আশাবাদী হয়ে বৃষ্টিকে رجع বলত; যাতে বারবার বর্ষণ হতে থাকে। [ফাতহুল কাদীর]
অর্থাৎ, মাটি ফেটে তা হতে শস্যদানা অঙ্কুরিত হয়। মাটি ফেটে ঝরনাধারা প্রবাহিত হয়। আর এইভাবে একদিন এমন আসবে যেদিন মাটি ফেটে সমস্ত মৃত জীব-জন্তু জীবিত হয়ে ভূগর্ভ থেকে বের হয়ে আসবে। এই জন্যই যমীন, মাটি ও পৃথিবীকে ‘বিদীর্ণশীল’ বলা হয়েছে। (এ ছাড়া সমুদ্রগর্ভেও বড় বড় ফাটল রয়েছে বলে বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে।)
الفَصْلُ অর্থ ‘সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী’। الْهَزْلِ যা ضِدُّ الْجِدِّ ‘সত্যের বিপরীত’ অর্থাৎ বৃথা বাক্য।
আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর কসম করে বলছেন, নিশ্চয়ই কুরআন সত্য ও মিথ্যার ফায়ছালাকারী। আর এটা কোন বৃথাবাক্য নয়। যারা কুরআনকে এড়িয়ে চলতে চায় এবং নিজেদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে চায়, মূলতঃ তারাই কুরআনী সত্যকে প্রকাশ্যে অথবা গোপনে অগ্রাহ্য করে থাকে। কুরআনের বিরুদ্ধে যত কথাই তারা বলুক, সবই বাজে কথা মাত্র। কুরআনে কোন বাহুল্য কথা নেই। কুরআনের প্রতিটি শব্দ, বাক্য ও বর্ণ বিপুল জ্ঞান ও অর্থ সম্ভারে পূর্ণ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রভুর কালাম সত্য ও ন্যায় দ্বারা পূর্ণ’ (আন‘আম ১১৫)।
কুরআন পাঠের সময় চিন্তাশীল পাঠককে সর্বদা মনে রাখতে হবে যে, এর প্রতিটি বাক্য সত্য ও চূড়ান্ত। এর প্রতিটি বর্ণ ও বর্ণনার স্টাইল অনন্য ও অচিন্তনীয় এবং তা চিরন্তন কল্যাণের ইঙ্গিতবাহী। বান্দাকে তার গভীরে ডুব দিয়ে তা বের করে আনতে হবে হাদীছের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী। কেননা কুরআনের ব্যাখ্যা হল হাদীছ এবং কুরআনের কোন বর্ণই অনর্থক বা অহেতুক নয়।
উল্লেখ্য যে, সূরার শুরুতে আকাশের ও উজ্জ্বল নক্ষত্ররাজির শপথ করা হয়েছে। অতঃপর এখানে পুনরায় আকাশ ও পৃথিবীর শপথ করে বলা হচ্ছে যে, ‘কুরআন হল সিদ্ধান্তকারী বাণী’। দুই শপথের মধ্যে সামঞ্জস্য সম্ভবতঃ এই যে, (আল্লাহ সর্বাধিক অবগত) প্রথম শপথে উজ্জ্বল নক্ষত্রের কথা বলা হয়েছে, যা প্রয়োজনে শয়তানের প্রতি নিক্ষেপ করা হয়, যারা ‘অহি’ চুরি করতে চায়। যার মাধ্যমে কুরআনকে হেফাযত করা হয়। দ্বিতীয় শপথে বর্ষণশীল আকাশের কথা বলা হয়েছে, যার দ্বারা মৃত যমীনকে জীবন্ত করা হয়। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, কুরআন হল জীবন সদৃশ। যা মানুষের মৃত হৃদয়কে জীবিত করে। যেমন আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘আর এভাবেই আমরা তোমার নিকট ‘অহি’ করেছি রূহ (কুরআন) আমাদের নির্দেশক্রমে’ (শূরা ৫২)। এখানে কুরআনকে ‘রূহ’ বলা হয়েছে [ইবনে কাসীর]। নিঃসন্দেহে কুরআন মানবজাতির জন্য রূহ সদৃশ।
অর্থাৎ কাফেররা কুরআনের দাওয়াতকে ব্যৰ্থ করার জন্য নানা ধরণের অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। কুরআনের পথ থেকে মানুষদেরকে দূরে রাখতে চাচ্ছে। কুরআনের আহবানের বিপরীতে চলার জন্য ষড়যন্ত্র করছে। [ইবন কাসীর] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে হক দ্বীন নিয়ে এসেছেন তারা তা ব্যৰ্থ করে দিতে ষড়যন্ত্র করছে। [ফাতহুল কাদীর]
الكَيْدُ অর্থ ধোঁকা, প্রতারণা, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র। এই অর্থ বান্দার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, আল্লাহর ক্ষেত্রে নয়। আল্লাহর ক্ষেত্রে অর্থ হবে جزاء كيدهم ‘তাদের চক্রান্তের বদলা’ [কুরতুবী]। অর্থাৎ আল্লাহর কৌশল হল শত্রুদের যথাযথ বদলা দেওয়া।
মক্কায় কাফির-মুশরিকরা রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাথীদের বিরুদ্ধে যে চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র ও অকথ্য নির্যাতন করেছিল, অত্র আয়াতে সেদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেছেন ‘স্মরণ কর সেই সময়ের কথা যখন কাফিররা (মক্কায় দারুন নাদওয়াতে বসে) তোমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল তোমাকে বন্দী করার বা হত্যা করার বা বহিষ্কার করার জন্য। বস্ত্ততঃ তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহ কৌশল করেন। আর আল্লাহ হ’লেন সেরা কৌশলী’ (আনফাল ৩০)।
বস্ত্ততঃ অবিশ্বাসীরা সর্বযুগে রাসূল (সাঃ) ও কুরআনের বিরুদ্ধে মানুষকে নানাবিধ ধোঁকার জালে আবদ্ধ করে থাকে। তারা কুরআনের আলো নিভিয়ে দেবার জন্য এবং কুরআনের প্রচার ও প্রসার বন্ধ করার জন্য নানাবিধ কৌশল করে থাকে। আর আল্লাহ তার যথাযথ কৌশল প্রয়োগ করেন। আর তা হল তাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কুরআনের বিরোধিতা করার সুযোগ দেওয়া এবং যথাসময়ে পাকড়াও করা। যে পাকড়াওয়ের সময়সীমা সম্পর্কে অবিশ্বাসীদের কোন পূর্ব ধারণা থাকবে না।
অর্থাৎ, তাদের জন্য তড়িঘড়ি শাস্তি প্রার্থনা করো না; বরং তাদেরকে কিছুকাল ঢিল, সুযোগ অথবা অবকাশ দাও। এখানে رويدًا শব্দটি قليلًا (কিছু পরিমাণ) অথবা قريبًا (কিছু কাল) এর অর্থে ব্যবহার হয়েছে। এই ঢিল বা অবকাশ দেওয়া কাফেরের পক্ষে এক প্রকার আল্লাহর কৌশল। যেমন তিনি বলেছেন, ‘‘আমি তাদেরকে ক্রমে ক্রমে এমনভাবে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাব যে, তারা জানতেও পারবে না! আর আমি তাদেরকে ঢিল দিব, নিশ্চয় আমার কৌশল অত্যন্ত বলিষ্ঠ।’’ (সূরা আ’রাফ ১৮২-১৮৩ আয়াত)
অন্য আয়াতেও আল্লাহ বলেছেন, “তাদেরকে আমরা অল্পকিছু উপভোগ করতে দেব, তারপর আমরা তাদেরকে কঠিন শাস্তির দিকে যেতে বাধ্য করব।” (সূরা লুকমান: ২৪)
ফুটনোট
✔ اَلطَّارِقُ -অর্থ ‘ধাক্কানো, খটখটানো’।
✔ যিনি প্রথমবার মানুষকে বীর্য থেকে প্রথম সৃষ্টিতে একজন জীবিত, শ্ৰোতা ও দ্রষ্টা মানব সৃষ্টি করেছেন, তিনি তাকে পুনরায় ফিরিয়ে দিতে অর্থাৎ মৃত্যুর পর জীবিত করতে আরও ভালরূপে সক্ষম।
✔ মানুষ যদি নিজের সৃষ্টি উপাদান নিয়ে চিন্তা করে তাহলে আল্লাহ তা‘আলাকে চিনতে পারবে এবং তাদের জন্য আখিরাতের প্রতি ঈমান আনা সহজ হবে।
✔ কিয়ামতের দিন কিছুই গোপন থাকবে না, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সব কিছু উন্মোচন করে দেয়া হবে।
✔ সূরার প্রথমদিকে শপথ করা হয়েছে, শপথ আসমানের এবং রাতে যা আবির্ভূত হয় তার- উজ্জ্বল নক্ষত্র।
✔ মানুষের তুলনায় এসব বিশালতা বুঝানোর জন্যই আল্লাহ এখানে আকাশ ও তারকারাজির শপথ করেছেন।
✔ সূরার শেষ দিকে আবার শপথ করা হয়েছে, শপথ আসমানের যা ধারণ করে বৃষ্টি এবং শপথ যমীনের, যা বিদীর্ণ হয়।
✔ অবিশ্বাসীরা কুরআনের আলো নিভিয়ে দেবার জন্য এবং কুরআনের প্রচার ও প্রসার বন্ধ করার জন্য নানাবিধ কৌশল করে থাকে। আর আল্লাহ তার যথাযথ কৌশল প্রয়োগ করেন। আর তা হল তাদেরকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কুরআনের বিরোধিতা করার সুযোগ দেওয়া এবং যথাসময়ে পাকড়াও করা। যে পাকড়াওয়ের সময়সীমা সম্পর্কে অবিশ্বাসীদের কোন পূর্ব ধারণা থাকবে না।