কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২২
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্বঃ ৬
সূরা আদিয়াত
কুরআনের ১০০ তম সূরা, এর আয়াতের সংখ্যা ১১টি, এর রূকুর সংখ্যা ১টি এবং ৩০ পারা। আ’দিয়াত সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। আল-আদিয়াত এর বাংলা অর্থ হল অভিযানকারী।
নামকরণ
প্রথম শব্দ আল আদিয়াতকে এর নামকরণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
নাযিলের সময় – কাল
এই সূরাটির মক্কী বা মাদানী হওয়ার ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) , জাবের (রা) , হাসান বসরী , ইকরামা ও আতা বলেন , এটি মক্কী সূরা। হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা) ও কাতাদাহ একে মাদানী সূরা বলেন । অন্যদিকে হযরত ইবনে আব্বাস (রা) থেকে দুই ধরনের মত উদ্ধৃত হয়েছে। তাঁর একটি মত হচ্ছে এটি মক্কী সূরা এবং অন্য একটি বক্তব্যে তিনি একে মাদানী সূরা বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সূরার বক্তব্য ও বর্ণনাভঙ্গী পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিচ্ছে যে , এটি কেবল মক্কী সূরাই নয় বরং মক্কী যুগের প্রথম দিকে নাযিল হয়।
বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
মানুষ আখেরাতকে অস্বীকার করে অথবা তো থেকে গাফেল হয়ে কেমন নৈতিক অধপাতে যার একথা লোকদের বুঝানোই এই সূরাটির উদ্দেশ্য। এই সঙ্গে আখেরাতে কেবল মানুষের বাইরের কাজকর্মই নয়, তাদের মনের গোপন কথাগুলোও যাচাই – বাছাই করা হবে , এ সম্পর্কেও এই সূরায় তাদেরকে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে।
এ উদ্দেশ্যে আরবে সাধারণভাবে যে বিশৃংখলা ছড়িয়ে ছিল এবং যার ফলে সমগ্র দেশবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল তাকে যুক্তি ও প্রমাণ হিসেবে পেশ করা হয়েছে। সারা দেশের চতুর্দিকে নারকীয় হত্যাকাণ্ড চলছিল। লুন্ঠন , রাহাজানী , এক গোত্রের ওপর অন্য গোত্রের আকস্মিক আক্রমণের মাধ্যমে সবকিছু লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া সাধারণ ব্যাপারে পরিণত হয়েছিল। রাতে কোন ব্যক্তিও নিশ্চিন্তে চলাফেরা করতে পারতো না । কারণ সবসময় আশংকা থাকতো , এই বুঝি কোন দুশমন অতি প্রত্যুষে তাদের জনপদ আক্রমণ করে বসলো। দেশের এই অবস্থার কথা আরবের সবাই জানতো। তারা এসব ক্ষতি ও অনিষ্ট সম্পর্কে পুরোপুরি সজাগ ছিল। যার সবকিছু লুন্ঠিত হতো , সে এ অবস্থার জন্য মাতম করতো এবং যে লুন্ঠন করতো সে আনন্দে উৎফুল্ল হতো। কিন্তু এই লন্ঠনকারী আবার যখন লুন্ঠিত হতো , তখন সেও অনুভব করতো , এ কেমন খারাপ অবস্থার মধ্যে কেমন দুর্বিসহ জীবন আমরা যাপন করে চলেছি।
এ পরিস্থিতির ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে , মৃত্যুর পর পুনুজ্জীবন এবং সেখানে আল্লাহর সামনে জবাদিহি করার ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে মানুষ তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ হয়ে পড়েছে। সে আল্লাহর দেয়া ক্ষমতাগুলোকে জুলুম নিপীড়নের কাজে ব্যবহার করছে। সে ধন সম্পদের প্রেমে অন্ধ হয়ে তা অর্জন করার জন্য যে কোন অন্যায় , অসৎ ও গর্হিত পন্থা অবলম্বন করতে কুন্ঠিত হয় না। তা অবস্থা নিজেই সাক্ষ দিচ্ছে সে নিজের রবের দেয়া শক্তিগুলোর অপব্যবহার করে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতাহীনতার প্রকাশ করছে। যদি সে সেই সময়ের কথা জানতো যখন কবর থেকে জীবিত হয়ে আবার উঠতে হবে এবং যেসব ইচ্ছা , উদ্দেশ্য ও স্বার্থপ্রবণাতায় উদ্ধৃদ্ধ হয়ে সে দুনিয়ায় নানান ধরনের কাজ করেছিল সেগুলোকে তার মনের গভীর তলদেশ থেকে বের করে এনে সামনে রেখে দেয়া হবে , তাহলে সে এই দৃষ্টিভংগী ও কর্মনীতি কখনই অবলম্বন করতে পারতো না দুনিয়ায় কে কি করে এসেছে এবং কার সাথে কোন ধরনের ব্যবহার করা উচিত মানুষের রব সে সময় সেকথা খুব ভালোভাবেই জানবেন।
আগের ও পরের সূরার সাথে সম্পর্ক
৯৯ তম সূরা আল যিলযালের শেষ ২ আয়াতে মানুষের কর্মের খুটিনাটি বিষয় প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে, এই সূরা আল আদিয়াতের শেষ ২ আয়াতে মানুষের চিন্তা/পরিকল্পনার খুটিনাটি বিষয় প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ২ টা সূরা মিলিয়ে মানুষের বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীন সবই প্রকাশ পাবে তা বলা হয়েছে।
সূরা ঝিলঝাল এ আখিরাতে মানুষের অবস্থার কথা এসেছে এবং এই সূরায় দুনিয়ায় মানুষের অবস্থার কথা এসেছে। আখিরাতের অবস্থা জানার পরও মানুষ তার মালিকের ব্যাপারে বড়ই অকৃতজ্ঞ!!! (আয়াত ৬)
৯৯-১০২ এই ৪ টি সূরায় আখিরাত ও দুনিয়ার কথা পরপর এসেছে। ৯৯ তম সূরা আল যিলযালে আখিরাতের কথা ১০০ তম সূরা আল আদিয়াতে দুনিয়া বিষয়ক। তেমনি ১০১ তম সূরা আল ক্বরিয়াহ তে আবার আখিরাতের কথা১০২ তম সূরা আত তাকাসুর আবার দুনিয়া বিষয়ক। এভাবে আখিরাত, দুনিয়া, আবার আখিরাত, আবার দুনিয়া এর বিষয় নিয়ে এসে মানুষকে বারবার সাবধান করেছেন এবং দুনিয়ার সাথে যে আখিরাত অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত তা বোঝাতে চেয়েছেন।
দৌড়ায় শব্দের মাধ্যমে যে এখানে ঘোড়া বুঝানো হয়েছে আয়াতে শব্দগুলো থেকে একথা মোটেই স্পষ্ট নয়৷ বরং এখানে শুধু বলা হয়েছে الۡعٰدِیٰتِ অর্থাৎ ” কসম তাদের যারা দৌড়ায় ৷ ” এ কারণে কারা দৌড়ায় এর ব্যাপারে মুফাসসিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মতের সৃষ্টি হয়েছে৷ সাহাবী ও তাবেঈগণের একটি দল বলেছেন , ঘোড়া এবং অন্য একটি দল বলেছেন উট৷ কিন্তু যেহেতু দৌড়াবার সময় বিশেষ আওয়াজ , যাকে ضَبۡحًا ( হ্রেষারব) বলা হয় , একমাত্র ঘোড়ার মুখ দিয়েই দ্রুত শ্বাস- প্রশ্বাস চলার কারণে বের হয় এবং পরের আয়াতগুলোতে অগ্নি ষ্ফুলিংগ ঝরাবার , খুব সকালে কোন জনপদে অতর্কিত আক্রমণ চালাবার এবং সেখানে ধূলা উড়াবার কথা বলা হয়েছে , আর এগুলো একমাত্র ঘোড়ার সাথেই খাপ খায় , তাই অধিকাংশ গবেষক একে ঘোড়ার সাথে সংশ্লিষ্ট করেছেন৷ ইবনে জারীর বলেন , ” এ ব্যাপারে যে দু’টি বক্তব্য পাওয়া যায় তার মধ্যে ঘোড়া দৌড়ায় এই বক্তব্যটি অগ্রাধিকার লাভের যোগ্য৷ কারণ উট হ্রেষারব করে না , ঘোড়া হ্রেষারব করে৷ আর আল্লাহ বলেছেন , যারা হ্রেষারব করে দৌড়ায় তাদের কসম৷ ” ইমাম রাজী বলেন , ” এই আয়াতগুলোর বিভিন্ন শব্দ চিৎকার করে চলছে , এখানে ঘোড়ার কথা বলা হয়েছে৷ কারণ ঘোড়া ছাড়া আর কেউ হ্রেষারব করে না৷ আর আগুনের ষ্ফুলিংগ ঝরাবার কাজটিও পাথরের ওপর ঘোড়ার খুরের আঘাতেই সম্পন্ন হয়৷ এ ছাড়া অন্য কোন ভাবেই তা হতে পারে না৷ অন্য দিকে খুব সকালে আক্রমণ চালাবার কাজটিও অন্য কোন প্রাণীর তুলনায় ঘোড়ার সাহায্যে সম্পন্ন করাই সহজতর হয়৷
موريات শব্দটি إيراء থেকে উদ্ভূত। অর্থ অগ্নি নিৰ্গত করা। যেমন চকমকি পাথর ঘষে ঘষে অথবা দিয়াশলাই ঘষা দিয়ে অগ্নি নির্গত করা হয়। قدح এর অর্থ আঘাত করা, ঘর্ষন করা; যার কারণে আগুন তৈরী হয়। লৌহনাল পরিহিত অবস্থায় ঘোড়া যখন প্রস্তরময় মাটিতে ক্ষুরাঘাত করে দৌড় দেয় তখন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ নির্গত হয়।
مغيرات শব্দটি أغارة থেকে উদ্ভূত। অর্থ হামলা করা, হানা দেয়া। صبحاً বা ‘ভোর বেলায়’ বলে আরবদের অভ্যাস হিসেবে প্রভাতকালের উল্লেখ করা হয়েছে। কোন কোন মুফাসসির বলেন, আরববাসীদের নিয়ম ছিল, কোন জনপদে অতর্কিত আক্রমণ করতে হলে তারা রাতের আঁধারে বের হয়ে পড়তো। এর ফলে শত্রুপক্ষ পূর্বাহ্নে সতর্ক হতে পারতো না। এভাবে একেবারে খুব সকালে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। প্রভাতে আলো যেটুকু ছড়িয়ে পড়তো তাতে তারা সবকিছু দেখতে পেতো। আবার দিনের আলো খুব বেশী উজ্জ্বল না হবার কারণে প্রতিপক্ষ দূর থেকে তাদের আগমন দেখতে পেতো না। ফলে তারা মোকাবেলার জন্য প্ৰস্তুতিও গ্ৰহণ করতে পারতো না।
أثرن শব্দটি إثارة থেকে উৎপন্ন। অর্থ ধূলি উড়ানো। نقع ধূলিকে বলা হয়। আর به শব্দের অর্থ, সে সময়ে বা শক্ৰদের সে স্থানে। অর্থাৎ অশ্বসমূহ যুদ্ধক্ষেত্রে এত দ্রুত ধাবমান হয় যে, তাদের ক্ষুর থেকে ধূলি উড়ে চতুর্দিক আচ্ছন্ন করে ফেলে।
فَوَسَطنَ শব্দের অর্থ হল মধ্যস্থলে ঢুকে পড়া। جَمعًا শব্দের অর্থ হল শত্রুসেনা। অর্থাৎ, সে সময় বা সেই অবস্থায় যখন আকাশ ধূলো-বালিতে ছেয়ে যায়, তখন এই অশ্বদল শত্রুসেনার মাঝে ঢুকে পড়ে আর ভীষণভাবে যুদ্ধ লড়ে
রাতের বেলা হ্রেষারব করে আগুনের ফুলকি ঝরাতে ঝরাতে যেসব ঘোড়া দৌড়ায় , তারপর খুব সকালে ধূলি উড়িয়ে কোন জনপদে চড়াও হয় এবং প্রতিরোধকারীদের ভীড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে ,সেসব ঘোড়ার কসম খাওয়া হয়েছে যে কথাটি বলার জন্য এটিই সেই কথা৷ অধিকাংশ তফসীরকার এই ঘোড়া বলতে যে ঘোড়া বুঝিয়েছেন তা দেখে অবাক হতে হয়৷ জিহাদকারী গাযীদের ঘোড়াকে তারা এই ঘোড়া বলে চিহ্নিত করেছেন এবং যে ভীড়ের এই ঘোড়া মধ্যে এই ঘোড়া প্রবেশ করে তাকে তারা কাফেরদের সমাবেশ মনে করেছেন৷ অতছ “মানুষ তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ “এ কথাটির ওপরই কসম খাওয়া হয়েছে ৷একথা সুস্পষ্ট ,আল্লাহর পথে জিহাদকারী গাযীদের ঘোড়ার দৌড়াদৌড়ি এবং কাফেরদের কোন দলের ওপর তাদের ঝাঁপিয়ে পড়ায় একথা বুঝায় না যে মানুষ তার রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ ৷ আর মানুষ নিজেই তার এই অকৃতজ্ঞতার সাক্ষী এবং সে ধন দৌলতের মোহে বিপুলভাবে আক্রান্ত এই পরবর্তী বাক্যগুলোও এমন সব লোকদের সাথে খাপ খায় না যারা আল্লাহর পথে জিহাদ করতে বের হয়৷ তাই নিশ্চিতভাবে একতা মেনে নিতে হবে যে , এই সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াতে যে কসম খাওয়া হয়েছে তা সে সময়ের আরবে সাধারণভাবে যে লুঠতরাজ , হত্যাকাণ্ড ও রক্তপাত চলছিল সেদিকেই ইংগিত করছে৷ জাহেলী যুগে রাতগুলো হতো বড়ই ভয়াবহ৷ প্রত্যেক গোত্র ও জনপদের লোকেরা আশংকা করতো , না জানি রাতের আঁধারে তাদের ওপর কোন দুশমন চড়াও হবার জন্য ছুটে আসছে৷ আর দিনের আলো প্রকাশিত হবার সাথ সাথে তারা নিশ্চিন্ত হতো৷ কারণ রাতটা নির্ঝনঝাটে ও ভালোয় ভালোয় কেটে গেছে৷ সেখানে গোত্রে গোত্রে কেবলমাত্র প্রতিশোধমূলক লড়াই হতো না৷ বরং এক গোত্র আর এক গোত্রের ওপর আক্রমণ চালাতো তার ধন – দৌলত লুটে নেবার , তার উট , ভেড়া ইত্যাদি পশু কেড়ে নেবার এবং তার মেয়েদের ও শিশুদের গোলাম বানাবার জন্য৷ এসব লুটতরাজ ও জুলুম নিপীড়ন করা হতো সাধারণত ঘোড়ায় চড়ে৷ মানুষ যে তার রবের প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ এই বক্তব্যের সপক্ষে এ বিষয়গুলোকে আল্লাহ প্রমাণ হিসেবে পেশ করেছেন ৷ অর্থাৎ যে শক্তিকে তারা ব্যয় করছে লুটতরাজ , হানাহানি , খুন – খারাবি ও যুদ্ধ – বিগ্রহের জন্য সে শক্তি তো আল্লাহ তাদেরকে মূলত এ কাজে ব্যয় করার জন্য দেননি৷ কাজেই আল্লাহর দেয়া এ উপকরণ ও শক্তিগুলোকে আল্লাহর সবচেয়ে বেশী অপ্রিয় , যে দুনিয়ায় বিপর্যয় সৃষ্টি করা তার পিছনে ব্যয় করা তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় অকৃতজ্ঞতা ছাড়া আর কিছুই নয়৷
তার বিবেক এর সাক্ষী ৷ আবার অনেক কাফের নিজ মুখেই প্রকাশ্যে এই অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে৷ কারণ তাদের মতে আদতে আল্লাহর কোন অস্তিত্বই নেই৷ সে ক্ষেত্রে নিজেদের প্রতি তাঁর কোন অনুগ্রহের স্বীকৃতি দেয়া এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে অপরিহার্য করার কোন প্রশ্নই ওঠে না৷
কুরআনের মূল শব্দগুলো হচ্ছে : ( خَیۡر ) এর শাব্দিক তরজমা হচ্ছে , ” সেই ভালোয় প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষন করে ৷ ” কিন্তু আরবী ভাষায় ‘ খাইর ” শব্দটি কেবলমাত্র ভালো ও নেকীর প্রতিশব্দ হিসেবেই ব্যবহৃত হয় না বরং ধন – দৌলত অর্থেও এর ব্যবহার প্রচলিত৷ সূরা আল বাকারার ১৮০ আয়াতে ” খাইর ” শব্দটি ধন সম্পদ অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে৷ বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ও পরিবেশ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে কোথায় এ শব্দটি নেকী অর্থে এবং কোথায় ধন – সম্পদ অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে তা অনুধাবন করা যায়৷ এই আয়াতটির পূর্বাপর আলোচনা থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হচ্ছে যে , এখানে ” খাইর ” বলতে ধন সম্পদ বুঝানো হয়েছে , নেকী বুঝানো হয়নি৷ কারণ যে ব্যক্তি নিজের রবের প্রতি অকৃতজ্ঞ এবং নিজের কার্যকলাপের মাধ্যমে নিজের অকৃতজ্ঞতার সপক্ষে সাক্ষ পেশ করছে তার ব্যাপারে কখনো একথা বলা যেতে পারে না যে , সে নেকী ও সৎবৃত্তির প্রতি গভীর ভালোবাসা পোষণ করে৷
মরা মানুষ যেখানে যে অবস্থায় আছে সেখান থেকে তাকে বের করে এনে জীবিত মানুষের আকারে দাঁড় করানো হবে৷
অর্থাৎ বুকের মধ্যে যেমন ইচ্ছ ও নিয়ত , স্বার্থ ও উদ্দেশ্য , চিন্তা , ভাবধারা এবং বাহ্যিক কাজের পেছনে যেসব গোপন অভিপ্রায় লুকিয়ে আছে সেসব খুলে সামনে রেখে দেয়া হবে৷ সেগুলো যাচাই করে ভালো ও খারাপগুলোকে আলাদা আলাদা করে দেয়া হবে৷ অন্য কথায় শুধুমাত্র বাইরের চেহারা দেখে মানুষ বাস্তবে যা কিছু করেছে সে সম্পর্কে শেষ সিদ্ধান্ত শুনিয়ে দেয়া হবে না৷ বরং মনের মধ্যে লুকানো রহস্যগুলোকে বাইরে বের করে এনে দেখা হবে যে , মানুষ যেসব কাজ করেছে তার পেছনে কি উদ্দেশ্য ও স্বার্থ – প্রেরণা লুকিয়েছিল ৷ এ বিষয়টি চিন্তা করলে মানুষ একথা স্বীকার না করে পারে না যে , আসল ও পূর্ণাংগ ইনসাফ একমাত্র আল্লাহর আদালতে ছাড়া আর কোথাও কায়েম হতে পারে না৷ নিছক বাইরের কাজকর্ম দেখে কোন ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া যায় না বরং কি উদ্দেশ্যে সে এ কাজ করেছে তাও দেখতে হবে৷ দুনিয়ার ধর্মহীন আইন ব্যবস্থাগুলোও নীতিগতভাবে একথা জরুরী মনে করে৷ তবে নিয়ত ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে অনুসন্ধান চালিয়ে তার সঠিক চেহারা সনাক্ত করার মতো উপকরণ দুনিয়র কোন আদালতেরও নেই৷ একমাত্র আল্লাহই এ কাজ করতে পারেন একমাত্র তিনিই মানুষের প্রত্যেকটি কাজের বাইরের চেহারার পেছনে যে গোপন প্রেরণা ও উদ্দীপনা সক্রিয় থাকে তা যাচাই করে সে কোন ধরনের পুরস্কার বা শাস্তির অধিকারী হতে পারে তা নির্ধারণ করতে পরেন৷ তাছাড়া আয়াতের শব্দাবলী থেকে একথা সুস্পষ্ট যে মনের ভেতরে, ইচ্ছা , সংকল্প ও নিয়ত সম্পর্কে আল্লাহ পূর্বাহ্নেই যে জ্ঞান রাখেন নিছক তার ভিত্তিতে এ ফায়সালা হবে না৷ বরং কিয়ামতের দিন এ রহস্যগুলো উন্মুক্ত করে সবার সামনে রেখে দেয়া হবে এবং প্রকাশ্য আদালতে যাচাই ও পর্যালোচনা করে এর কতটুকু ভালো ও কতটুকু খারাপ ছিল তা দেখিয়ে দেয়া হবে৷ এজন্য এখানে ( وَ حُصِّلَ مَا فِی الصُّدُوۡرِ) বলা হয়েছে৷ কোন জিনিসকে বের করে বাইরে নিয়ে আসাকে ‘ হুসসিলা ‘ বা ‘ তাহসীল ‘ বলে ৷ যেমন , বাইরের ছাল বা খোসা ছড়িয়ে ভেতরের মগজ বের করা৷ এভাবে বিভিন্ন ধরনের জিনিসকে ছেটে পরস্পর থেকে আলাদা করার জন্যও এ শব্দটি ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷ কাজেই মনের মধ্যে লুকানো রহস্যসমূহের ‘ তাহসীল ‘ বা বের করে আনার মধ্যে এ দু’টি অর্থ শামিল হবে৷ সেগুলোকে খুলে বাইরে বের করে দেয়াও হবে আবার সেগুলো ছেটে ভালো ও মন্দ আলাদা করে দেয়াও হবে৷ এ বক্তব্যটিই সুরা আত তারিকে এভাবে বলা হয়েছে : ” যেদিন গোপন রহস্য যাচাই বাছাই করা হবে৷ ” ( ৯ আয়াত )
যে প্রভু তাকে কবর থেকে বের করবেন এবং তার অন্তরের রহস্য উদঘাটন করে দেবেন তাঁর ব্যাপারে প্রত্যেক ব্যক্তি জানতে পারে যে, তিনি কত খবর রাখেন? আর তাঁর নিকটে কোন কিছু গোপন থাকতে পারে না। সুতরাং তিনি প্রত্যেককে তার নিজ আমলানুযায়ী ভাল অথবা মন্দ প্রতিফল দেবেন। এটা যেন ঐ সমস্ত ব্যক্তিদের জন্য সতর্কবাণী, যারা আল্লাহর নিয়ামত দ্বারা উপকৃত তো হয়, কিন্তু তাঁর কৃতজ্ঞতা না করে অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে। অনুরূপ মাল-ধনের আসক্তিতে বন্দী হয়ে তার সেই হকসমূহ আদায় করে না, যা আল্লাহ অন্যের প্রাপ্য হিসাবে নির্ধারণ করে রেখেছেন।
ফুটনোট
▶ এই সূরার আয়াতগুলোকে তিনভাবে ভাগ করা যায়-
- প্রথম অংশ (১-৫) আয়াতে- আল্লাহ্ বেপারোয়া কিছু মানুষের কর্মকান্ডের কথা তুলে ধরেছেন যাদের উদাহরণ তীব্র গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে আক্রমন করার মত।
- দ্বিতীয় অংশ (৬-৮) আয়াতে- আল্লাহ্ মানুষের কিছু মানবিক দূর্বলতার কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম অংশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে, মানুষ আসলে বেপরোয়া এবং ঘোড়ার মত সে মনিবের বাধ্যগত নয় বরং অবাধ্য
- তৃতীয় অংশ (৯-১১) আয়াতে- আল্লাহ্ আখিরাতে কথা বলেছেন যেদিন মানুষের ঐ বেপরোয়া ভাব প্রকাশ পাবে যা সে লুকিয়ে রাখতো সেদিন মানুষকে জবাবদিহী করতে হবে তার কর্মকান্ডের জন্য।
▶ তিনটি মানবিক দূর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে-
১) মানুষ তার পালনকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞ
২) মানুষ জানার পরও কৃতজ্ঞতার ও জবাবদিহিতার বিষয়ে উদাসহীন
৩) মানুষ ধন-সম্পদের ভালবাসায় মত্ত
▶ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিভিন্ন উপায় আছে। যেমন—
১. কলব বা অন্তরের মাধ্যমে অর্থাৎ নিয়ামতদাতার নিয়ামত পেয়ে অন্তরে শুকরিয়া আদায় করা। এর পদ্ধতি হলো, আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর অবাধ্যতার মানসিকতা না থাকা এবং তাকওয়া অবলম্বন করা।
২. ভাষার মাধ্যমে। অর্থাৎ মুখে নিয়ামতের শোকরিয়া প্রকাশ করা, গণনা করা ইত্যাদি। নিজের জবান দিয়ে রাতের পর রাত আল্লাহর প্রশংসা করেছেন।
৩. অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মাধ্যমে শুকরিয়া হলো সালাত আদায় করা ও বেশি বেশি নেক আমল করা।
▶ ধন-সম্পদের ভালবাসায় মত্ত হওয়া অথবা সম্পদের ফিতনা থেকে বাঁচার দুটি উপায় : দুনিয়ার হাকিকত ও বাস্তবতা উপলব্ধি করা এবং আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহে ব্যস্ত থাকা। (সূরা কাহাফ আয়াত : ৪৫-৪৬)
▶ আখিরাতের বিষয়ে এখানে দুটি বিষয় উল্লেখ আছে- মানুষকে কবর থকে উত্থলন করা হবে, মানুষের বুকের মধ্যে যা লুকানো ছিল সব প্রকাশিত হবে।
▶দুনিয়ার জীবনে আমরা বেপোয়ারা ঘোড়ার মত ছূটে চলছি আমাদের রবের অকৃজ্ঞ হয়ে ধন-সম্পদের পিছনে। আমাদের তো দাঁড়াতে হবে সেই রবের সামনে যেদিন আমাদের মনে মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভালো/খারাপ বিষয়গুলোও প্রকাশ পাবে। আমরা কি প্রস্তুত সেদিনের জাবাবদিহীর জন্য?