কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৬
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্বঃ ৪
সূরা আন-নাবা
কুরআনের ৭৮তম সূরা আন-নাবা। সূরার আয়াত সংখ্যা ৪০ এবং রুকু সংখ্যা ২। সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং সূরার নামের অর্থ মহাসংবাদ / কিয়ামত।
নামকরণ
সূরার দ্বিতীয় আয়াতের عَنِ النَبَاِ الْعَظِيمِ বাক্যাংশের ‘আন নাবা’ শব্দটিকে এর নাম হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। আর এটি কেবল নামই নয়, এই সূরার সমগ্র বিষয়বস্তুর শিরোনামও এটিই। কারণ নাবা মানে হচ্ছে কিয়ামত ও আখেরাতের খবর। আর এই সূরায় এরই ওপর সমস্ত আলোচনা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে।
বিষয়বস্তু
১. মহা সংবাদ (কিয়ামত) সম্পর্কে মানুষের জিজ্ঞাসা এবং আল্লাহর সৃষ্টিতে নিদর্শন (আয়াত ১-১৬)
তারা কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে? সেই মহাসংবাদ (কিয়ামত) সম্পর্কে যাতে তারা মতভেদ করে, তারা শীঘ্রই জানতে পারবে, আল্লাহ কি পৃথিবীকে বিছানা, পাহাড়কে পেরেক, মানুষকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেননি? নিদ্রাকে বিশ্রাম, রাতকে আবরণ, দিনকে জীবিকা অর্জনের সময় বানাননি? সপ্তাকাশ নির্মাণ, প্রোজ্জ্বল সূর্য স্থাপন, মেঘ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ এবং তার মাধ্যমে শস্য, উদ্ভিদ ও ঘন বাগান সৃষ্টি।
২. বিচার দিবসের (ইয়াওমুল ফাসল) বর্ণনা এবং জাহান্নামের শাস্তি (আয়াত ১৭-৩০)
বিচার দিবস নির্ধারিত রয়েছে, সেদিন শিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া হবে এবং মানুষ দলে দলে উপস্থিত হবে, আকাশ খুলে দেওয়া হবে ও তাতে অনেক দরজা হবে, পাহাড়সমূহ চালিত হয়ে মরীচিকার মতো হবে, জাহান্নাম ওঁৎ পেতে থাকবে, সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য তা হবে প্রত্যাবর্তনস্থল, সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে থাকবে, কোনো শীতলতা বা পানীয় পাবে না, ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ব্যতীত, এটি তাদের কৃতকর্মের উপযুক্ত প্রতিদান, তারা হিসাব-নিকাশের আশা করত না এবং আল্লাহর আয়াতসমূহকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করত।
৩. মুত্তাকীদের জন্য জান্নাতের প্রতিদান আয়াত (৩১-৩৬)
মুত্তাকীদের জন্য রয়েছে সাফল্য (জান্নাত), বাগান ও আঙ্গুর, সমবয়স্কা পূর্ণযৌবনা তরুণী এবং পরিপূর্ণ পানপাত্র, সেখানে তারা কোনো অনর্থক বা মিথ্যা কথা শুনবে না, এটি তাদের রবের পক্ষ থেকে যথোপযুক্ত প্রতিদান।
৪. উপসংহার, আল্লাহর মহিমা এবং কাফিরদের আফসোস (আয়াত ৩৭-৪০)
তিনি আকাশ, পৃথিবী ও এর মধ্যবর্তী সবকিছুর রব, পরম দয়াময়, তাঁর সাথে কথা বলার সাধ্য কারো থাকবে না, যেদিন রূহ (জিবরাঈল) ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে, সেদিন আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কেউ কথা বলতে পারবে না এবং যে কথা বলবে সে সঠিক কথাই বলবে, সেই দিন সত্য, যার ইচ্ছা সে তার রবের দিকে প্রত্যাবর্তন করুক, আল্লাহর নিকটবর্তী আযাব সম্পর্কে সতর্ক করা হচ্ছে, সেদিন মানুষ তার কৃতকর্ম দেখতে পাবে এবং কাফির বলবে, ‘হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!’
ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য
১. এটি ‘মুফাসসাল’ (সংক্ষিপ্ত) শ্রেণীর সূরাগুলোর অন্যতম, যা দ্বারা নবী (ﷺ)-কে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
ওয়াছিলা ইবনুল আসক্বা’ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (ﷺ) বলেছেন: “…এবং মুফাসসাল দ্বারা আমাকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে।” (আলেমদের মতে, সূরা আন-নাবা ‘মুফাসসাল’ শ্রেণীর সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত।)
২. এটি ‘নাসা’ইর’ (সমজাতীয়) সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত, যা নবী (ﷺ) রাতের সালাতে (তাহাজ্জুদে) জোড়া মিলিয়ে পাঠ করতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “…রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সমজাতীয় সূরাগুলো এক রাকাতে (জোড়ায় জোড়ায়) পাঠ করতেন। (এর মধ্যে) {‘আম্মা ইয়াতাসাআলুন} (সূরা আন-নাবা) ও {ওয়াল-মুরসালাত} (সূরা আল-মুরসালাত) এক রাকাতে (পাঠ করতেন)।” এটি ইমাম মুসলিম ও আবু দাউদ বর্ণনা করেছেন।
৩. এটি এমন এক সূরা যা নবী (ﷺ)-কে বৃদ্ধ করে দিয়েছিল (তাঁর চুল সাদা করে দিয়েছিল)।
আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন!” তিনি বললেন: “আমাকে হূদ, ওয়া-ক্বি’আহ, মুরসালাত, ‘আম্মা ইয়াতাসাআলুন (সূরা আন-নাবা) এবং ইযাশ শামসু কুওভিরাত (এই সূরাগুলো) বৃদ্ধ করে দিয়েছে।”
عَمَّ يَتَسَاءَلُوْنَ ‘তারা পরস্পরে কি বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে’? এখানে عَمَّ প্রশ্নবোধক অব্যয়। যা আসলে ছিল عَنْ مَا। অর্থ, ‘কি বিষয়ে’? নূন ও মীম সংযুক্ত করে এবং মীম-এর আলিফ ফেলে দিয়ে عَمَّ করা হয়েছে সহজে উচ্চারণ করার জন্য।
يَتَسَاءَلُوْنَ ক্রিয়ার শব্দমূল হল سَوَالٌ অর্থ ‘প্রশ্ন’ বা জিজ্ঞাসা। সেখান থেকে تَسَاءُلٌ মাছদারের অর্থ ‘পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করা’। আয়াতে বর্ণিত ক্রিয়াপদের কর্তা হল ‘কুরায়েশ নেতাগণ’। অত্র আয়াতে আল্লাহ অবিশ্বাসী নেতাদের পারস্পরিক বিতর্ক সুন্দর বাণীচিত্রের মাধ্যমে আমাদের নিকট তুলে ধরেছেন এটা বুঝানোর জন্য যে, সকল যুগের সকল অবিশ্বাসীর চিন্তাধারা একই রূপ।
দুনিয়াতে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হল জন্মগ্রহণ করা ও বেঁচে থাকা। পক্ষান্তরে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হল মৃত্যুবরণ করা ও বিলীন হওয়া। এ দুনিয়াতে কেউ মরতে চায় না। বিলীন হতে চায় না। অথচ দেখা যাচ্ছে যে, যে মানুষের জন্য লক্ষ-কোটি বছর ধরে আসমান-যমীন ও এর মধ্যকার সবকিছুর সৃষ্টি, সেই মানুষের গড় আয়ু একশ বছরেরও কম। সেরা সৃষ্টি মানুষ কি এতই অন্তঃসারশূন্য যে, পৃথিবীতে সে মাত্র কিছুদিনের জন্য আবির্ভূত হয়েই নিঃশেষে হারিয়ে যাবে? অথচ এখানে তার কামনা-বাসনার সবকিছু সে পায় না। বরং বলা চলে যে, অনেক কিছুই সে পায় না। তাই এ অস্থায়ী ও অসম্পূর্ণ জগৎ থেকে তাকে চিরস্থায়ী ও পরিপূর্ণ আরেকটি জগতে হিজরত করতে হয়, যেখানে সে তার চাহিদামত সবকিছুই পাবে পরিপূর্ণভাবে। অতএব ইহজাগতিক মৃত্যুর পরেই তার জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হল পরজগতের জন্য পুনরুত্থান ও পুনর্জন্মলাভ করা। অত্র আয়াতে আল্লাহ মানুষকে সেই সুসংবাদটিই শুনিয়েছেন। আর তা হল মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান যা ক্বিয়ামতের দিন ঘটবে। কিছু মানুষ পুনর্জন্মবাদে বিশ্বাস করে। কিন্তু তা এই দুনিয়াতেই। যার কোন ভিত্তি নেই বা যৌক্তিকতা নেই। মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান দিবসের এই ঘটনাকেই আল্লাহ النَّبَاِ العْظِيْمِ বা ‘মহাসংবাদ’ বলে অভিহিত করেছেন। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে লোক সকল! তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় কর। নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের প্রকম্পন একটি ভয়ংকর বিষয়’ (হজ্জ ২২/১)।
অর্থাৎ, যে ‘মহা সংবাদ’ নিয়ে তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে সেই বিষয়েই ঐ জিজ্ঞাসাবাদ। কারো কারো মতে এই ‘মহা সংবাদ’-এর উদ্দেশ্য হল, পবিত্র কুরআন। কেননা, কাফেররা এ ব্যাপারে বিভিন্ন মন্তব্য করত। কেউ তাকে যাদু, কেউ জ্যোতিষীর কথা, কেউ কবিদের কাব্য, কেউ বা আবার পূর্বযুগের উপাখ্যান বলে অভিহিত করত। অনেকের মতে এর উদ্দেশ্য হল, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া এবং পুনর্বার জীবিত হওয়ার সংবাদ। কেননা, এ ব্যাপারেও তাদের মাঝে কিছু মতভেদ ছিল। কেউ তো একেবারেই তা অস্বীকার করত। আবার কেউ তাতে সন্দেহ পোষণ করত। কোন কোন আলেম বলেন, জিজ্ঞাসাকারী মু’মিন-কাফের উভয়ই ছিল। মু’মিনদের জিজ্ঞাসা তাদের ঈমান এবং অন্তর্দৃষ্টি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ছিল। আর কাফেরদের জিজ্ঞাসা ছিল ঠাট্টা-ব্যঙ্গ ও উপহাসস্বরূপ।
অর্থাৎ পুনরুত্থান সম্পর্কে তারা যে অবিশ্বাস পোষণ করছে এবং ক্বিয়ামতকে অস্বীকার করছে, তা কখনোই সত্য নয়। বরং তাদের এ দাবী অসার মাত্র। যে ক্বিয়ামত সম্পর্কে তারা মতভেদ করছে, নিশ্চিতভাবে তা আসবেই। তাকে প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কারু নেই। সত্বর তারা জানতে পারবে। সত্বর তারা তাদের মিথ্যাচারের পরিণতি ভোগ করবে।
এখানে কখনোই না, অতঃপর কখনোই না, পরপর দু’বার বলার অর্থ হল ধমকের পর ধমক দেওয়া। সাধারণ মূর্খরা সহজে কথা শোনে। কিন্তু জ্ঞানী মূর্খরা সহজে হার মানতে চায় না। তাই তাদের জন্য এই ব্যবস্থা।
অন্য আয়াতে فِرَاشاً (বিছানা) শব্দ এসেছে (বাক্বারাহ ২/২২)। এখানে ‘বিছানা’ বলতে এমন আশ্রয়স্থলকে বুঝানো হয়েছে, যা সৃষ্টিজগতের জন্য অনুকূল, মযবুত এবং নিরাপদ বিচরণ ক্ষেত্র। অন্যত্র পৃথিবীর বিশেষণ হিসাবে ذَلُوْلاً (অনুগত) বলা হয়েছে (মুল্ক ৬৭/১৫)। আল্লাহর হুকুমে ভূ-পৃষ্ঠে রয়েছে বিছানার ন্যায় ধীরস্থির ও বান্দার জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। এজন্য আল্লাহপাক এর মধ্যে দান করেছেন মধ্যাকর্ষণ শক্তি। যার কারণে পৃথিবী সূর্য থেকে ঝুলে থাকে এবং তার পৃষ্ঠে বিচরণকারী সৃষ্টিকুলকে সর্বদা নিজের দিকে আকৃষ্ট করে ধরে রাখে। সেই সাথে রয়েছে বায়ুর চাপ। যে কারণে কিছু উপরে ছুঁড়ে মারলে তা আবার পৃথিবীর বুকে ফিরে আসে। ঠিক বিছানা বা দোলনা যেভাবে শিশুকে আকর্ষণ করে এবং সেখানেই সে আরাম বোধ করে ও ঘুমিয়ে যায়। পৃথিবীর এই আকর্ষণী ক্ষমতা যদি আল্লাহ না দিতেন, তাহ’লে ভূপৃষ্ঠে প্রাণীকুল যেকোন সময় পৃথিবী থেকে ছিটকে পড়ে মহাশূন্যে হারিয়ে যেত। অন্য আয়াতে এসেছে مَهْدًا (ত্বোয়াহা ২০/৫৩; যুখরুখ ৪৩/১০) যার অর্থ দোলনা, যা বাচ্চাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। দোলনা ও বিছানা একই মর্ম বহন করে। আল্লাহ বলেন, ‘আমরা পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছি। অতএব আমরা কতই না সুন্দর বিস্তৃতকারী? (যারিয়াত ৫১/৪৮)।
এটি ক্বিয়ামতের দ্বিতীয় প্রমাণ। এখানে পাহাড়কে ‘পেরেক’ বলা হয়েছে এজন্য যে, পাহাড় ভূগর্ভ থেকে উঠে আসে এবং পৃথিবীকে শক্তভাবে চেপে রাখে। যাতে হেলতে না পারে। যেমনভাবে ঘরের চালে পেরেকসমূহ বাঁশ বা কাঠের কাঠামোকে পরস্পরে মযবুতভাবে বেঁধে রাখে, যাতে তা বিচ্ছিন্ন বা এলোমেলো না হয়ে যায়। পৃথিবীর বুকে পাহাড় মানবদেহে হাঁড়ের ন্যায়। যা ব্যতীত মানুষ দাঁড়াতে বা চলতে পারে না। অনুরূপভাবে পাহাড় পৃথিবীকে শক্তভাবে ধরে না রাখলে সে মহাশূন্যে উল্টে-পাল্টে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। এতদ্ব্যতীত পাহাড় আমাদের জন্য তার বুকে পানি ও মাথায় বরফ সঞ্চয় করে রাখে। যা ঝর্ণা ও নদী আকারে প্রবাহিত হয়। পাহাড় পানিভরা মেঘকে আটকে দিয়ে তার পাদদেশের অঞ্চলগুলিতে বৃষ্টি বর্ষণে সাহায্য করে। পাহাড়ের দেহ ঘিরে থাকে অসংখ্য ভেষজ, ফলজ ও বনজ বৃক্ষরাজি, যা বান্দার মঙ্গলের জন্য আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। এছাড়াও পাহাড় মানুষের নানাবিধ কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছে। তবে তার সবচেয়ে বড় অবদান হল এই যে, সে পেরেক স্বরূপ পৃথিবীকে মযবুতভাবে ধরে রাখে, যাতে পৃথিবী নড়াচড়া করতে না পারে। যেটা খুবই সম্ভব ছিল। কেননা ভূ-পৃষ্ঠের কোন অংশে মানব বসতি বেশী, কোন অংশে কম। কোন অংশে পানির ভাগ বেশী, কোন অংশে কম। ফলে ওযনের তারতম্য হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু ওযনের এই তারতম্যে পৃথিবীর ভারসাম্যে কোনরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না পাহাড়ের কারণে। যা আল্লাহ প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে স্থাপন করেছেন। অন্য আয়াতে رَوَاسِىَ শব্দ এসেছে (রা‘দ ১৩/৩, মুরসালাত ৭৭/২৭ প্রভৃতি), যার অর্থ পাহাড়, যা পৃথিবীর দৃঢ়তা রক্ষাকারী (ثوابت)।
অর্থাৎ পুরুষ ও নারীরূপে। যাতে পরস্পরের মিলনে মানুষের বংশধারা অব্যাহত থাকে। এই জোড়া পরস্পরে বিপরীতধর্মী এবং পরস্পরের প্রতি তীব্র আকর্ষণশীল। জোড়া কেবল মানুষের মধ্যে নয়; বরং প্রাণী ও জড় জগতের সর্বত্র বিরাজমান। এবিষয়টি আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন বিস্তৃতভাবে। যেমন তিনি বলেন, মহাপবিত্র তিনি, যিনি জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন সবকিছুকে, যমীন থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদরাজিকে এবং মানুষকে ও তাদের অজানা সব বস্ত্তকে’ (ইয়াসীন ৩৬/৩৬)। আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক বস্ত্ত জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পার’ (যারিয়াত ৫১/৪৯)।
মানুষসহ সকল প্রাণীর জন্য নিদ্রা হল আল্লাহর একটি বিশেষ অনুগ্রহ। নিন্দ্রা না থাকলে মানুষ কোন কাজেই উদ্যম ও আগ্রহ খুঁজে পেত না। অন্য আয়াতে নিদ্রাকে আল্লাহর অস্তিত্বের অন্যতম নিদর্শন (آية) হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে অন্যতম হল রাত্রি ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তোমাদের তাঁর কৃপা অন্বেষণ। নিশ্চয়ই এর মধ্যে শ্রবণকারী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী নিহিত রয়েছে’ (রূম ৩০/২৩)। নিদ্রার সবচেয়ে বড় সুফল হিসাবে বলা হয়েছে, سُبَاتًا বা ক্লান্তি দূরকারী। এই ক্লান্তি দৈহিক ও মানসিক উভয়টিই হতে পারে। ব্যথাতুর ব্যক্তি ঘুমিয়ে গেলে ব্যথা ভুলে যায়। শোকাতুর ব্যক্তি নিদ্রা গেলে শোক ভুলে যায়। ঘুম থেকে উঠলে তার দেহ-মন তরতাযা হয়ে ওঠে। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, কমপক্ষে ছয় মিনিট গভীর ঘুম হলে ক্লান্তি দূর হয়ে নবজীবন লাভ হয়। ঘুম তাই আল্লাহ প্রদত্ত এক অমূল্য মহৌষধ। যা দেহ ও মনে স্বস্তি ও শান্তি দানকারী (রূম ৩০/২৩)।
‘লেবাস’ অর্থ পোষাক যা লজ্জা নিবারণ করে। এখানে রাত্রিকে পোষাক বলা হয়েছে এজন্য যে, রাত্রি তার অন্ধকার দ্বারা দিবসের আলোর সামনে পর্দা টাঙিয়ে দেয়, যাতে মানুষসহ জীবজগত নিরিবিলি পরিবেশে সুস্থিরভাবে নিদ্রা যেতে পারে। আবার শেষরাতে উঠে শান্ত-সমাহিত চিত্তে আল্লাহর ইবাদতে রত হতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য রাত্রিকে করেছেন আবরণ, নিদ্রাকে করেছেন ক্লান্তি দূরকারী এবং দিবসকে করেছেন উত্থান সময়’ (ফুরক্বান ২৫/৪৭)।
এখানে مَعَاشًا অর্থ وقت معاش ‘জীবিকা অন্বেষণকাল’। রাতের নিদ্রাশেষে দিনের আলোয় মানুষ ও পশুপক্ষী স্ব স্ব রূযীর তালাশে বেরিয়ে যাবে। এটাই হল আল্লাহ প্রদত্ত ব্যবস্থাপনা। ভূপৃষ্ঠে, ভূগর্ভে, পানিরাশিতে ও সৌরলোকের সর্বত্র আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহরাজি ছড়িয়ে রেখেছেন। একমাত্র জ্ঞানবান সৃষ্টি মানুষকে এসব তালাশ করে এনে তা ভোগ করার জন্য এবং বেশী বেশী আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও তাঁর শুকরিয়া আদায়ের জন্য তিনি জোরালো ভাষায় তাকীদ দিয়েছেন (জুম‘আ ৬২/১০, বাক্বারাহ ২/১৭২)। আল্লাহ আসমান-যমীন ও এতদুভয়ের মধ্যস্থিত প্রকাশ্য ও গোপন নে‘মত সম্ভারকে মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন (লোকমান ৩১/২০)। মানুষকে অবশ্যই সেসব নে‘মত সন্ধানের জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
سبْعًا شِدَادًا অর্থ ‘সুদৃঢ় সপ্ত আকাশ’। পৃথিবী সৃষ্টির পর আল্লাহ সাত আসমান সৃষ্টি করেন। যেমন তিনি বলেন, ‘তিনিই সেই সত্তা, যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন ভূমন্ডলের সবকিছু। অতঃপর মনোসংযোগ করেছেন নভোমন্ডলের দিকে। অতঃপর তাকে বিন্যস্ত করেছেন সপ্ত আকাশে। বস্ত্ততঃ তিনি সকল বিষয়ে সুবিজ্ঞ’ (বাক্বারাহ ২/২৯)। আল্লাহ বলেন,‘অতঃপর তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ করেন। যা ছিল ধূম্র বিশেষ। অতঃপর তিনি ওটাকে ও পৃথিবীকে বললেন, তোমরা উভয়ে এসো ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়। তারা বলল, আমরা এলাম অনুগত হয়ে’। ‘অতঃপর তিনি তাকে দুই দিনে সপ্তাকাশে পরিণত করলেন এবং প্রত্যেক আকাশে তার বিধান প্রত্যাদেশ করলেন। আর আমরা দুনিয়ার আকাশকে সুশোভিত করলাম প্রদীপমালা দিয়ে এবং তাকে করলাম সুরক্ষিত। এটি পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ আল্লাহর ব্যবস্থাপনা’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/১১-১২)।
আলোচ্য আয়াতে সপ্ত আকাশকে شِدَادٌ বা ‘কঠিন’ বলার মধ্যে বিজ্ঞানীদের জন্য ইঙ্গিত রয়েছে যে, এসব আসমানের গঠন প্রকৃতি এমন, যা ভেদ করা কঠিন ও দুরূহ। অন্য আয়াতে আসমানকে বা ‘সুরক্ষিত ছাদ’ বলা হয়েছে (আম্বিয়া ২১/৩২)। বায়ুমন্ডল আমাদের জন্য সেই সুরক্ষিত ছাদ হিসাবে কাজ করছে। এতদ্ব্যতীত নক্ষত্ররাজি রাতের অন্ধকারে আলো দিয়ে ও দিক নির্দেশনা দিয়ে এবং বহু অজানা সেবা দিয়ে প্রতিনিয়ত জীবজগতকে লালন করে যাচ্ছে। যা আল্লাহর ‘রব’ বা পালনকর্তা হওয়ার বড় প্রমাণ।
এখানে ‘প্রদীপ’ অর্থ সূর্য। وَهَّاجًا অর্থ ‘জ্বলন্ত’। মাত্র একটি শব্দে সূর্যের এই পরিচয় দানের মধ্যে বিজ্ঞানীদের জন্য রয়েছে অফুরন্ত চিন্তার খোরাক। পৃথিবী থেকে অন্যূন ৩ লক্ষ ৩০ হাজার গুণ ভারী সূর্য নিঃসন্দেহে একটি বিশাল জ্বলন্ত গ্যাসপিন্ড। যার উপরিভাগের তাপমাত্রা প্রায় ৫৬০০ ডিগ্রী সেলসিয়াস। যার ২০০ কোটি ভাগের একভাগ পৃথিবীর উপর পড়ে। তাতেই আমরা সূর্য কিরণে জ্বালা অনুভব করি।
সূর্যের অবদানেই পৃথিবীতে জীবনের উন্মেষ, অবস্থিতি ও তৎপরতা সম্ভবপর হচ্ছে। সূর্যের এই অতুলনীয় খেদমতের জন্য কিছু মানুষ সূর্যকে দেবতা বলে পূজা করে। অথচ তারা সূর্যের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা আল্লাহকে ভুলে যায়। তাই আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর নিদর্শন সমূহের মধ্যে অন্যতম হ’ল রাত্রি, দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্য বা চন্দ্রকে সিজদা করো না। বরং তোমরা আল্লাহকে সিজদা করো, যিনি এগুলিকে সৃষ্টি করেছেন, যদি নাকি তোমরা কেবল তাঁরই ইবাদত করে থাক’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৭)।
সূর্যের আলো এবং চন্দ্রের আলোর মধ্যকার পার্থক্য অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে যথাক্রমে ضِيَاءٌ ও نُوْرٌ বলে (ইউনুস ১০/৫)। যার অর্থ কিরণ ও জ্যোতি। এর মধ্যেই বিজ্ঞানের একটি বড় উৎস লুকিয়ে আছে যে, চন্দ্রের নিজস্ব কোন আলো নেই। সে সূর্যের আলোয় আলোকিত। দু’টির প্রতিক্রিয়াও ভিন্ন। সূর্যের কিরণে দেহে জবালা ধরায় ও শক্তি বাড়ায়। চন্দ্রের জ্যোতিতে জ্বালা নেই, আছে পেলব পরশ। ফলে দু’টির ফলাফল ও কল্যাণকারিতাও ভিন্ন। বস্ত্ততঃ ‘আসমান ও যমীন দাঁড়িয়ে আছে আল্লাহর হুকুমে। অতঃপর যখন তিনি ডাক দিবেন, তখন সবকিছুর অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে যাবে এবং আমরা স্ব স্ব কবর থেকে বেরিয়ে আল্লাহর নিকটে সমবেত হব’ (রূম ৩০/২৫)।
‘সূর্যের’ বর্ণনার পরেই ‘বৃষ্টি’র বর্ণনা এসেছে। যা ইঙ্গিত বহন করে যে, সূর্যকিরণ হল মেঘ সৃষ্টি ও বৃষ্টিপাতের প্রধানতম কারণ। সাগরের লবণাক্ত পানি সূর্যতাপে বাষ্প হয়ে উপরে উঠে যায়। অতঃপর তা পরিচ্ছন্ন হয়ে মেঘ ও বৃষ্টিতে পরিণত হয়। অতঃপর বায়ু প্রবাহ তাকে বহন করে আল্লাহর হুকুম মত প্রয়োজনীয় স্থানে বর্ষণ করে (ফুরক্বান ২৫/৪৮)। বৃষ্টি একসাথে পড়লে মাটি ধুয়ে চলে যেত ও ব্যাপক ভূমিক্ষয় হত। তাই তাকে সরু ও সূক্ষ্ম ধারায় বর্ষণ করা হয়। যাতে ভূমিক্ষয় না হয় বা কচি চারা ও অংকুরসমূহ ভেঙ্গে নষ্ট না হয়। বৃষ্টির সঙ্গে পাঠানো হয় বিদ্যুৎ (রূম ৩০/২৪)। যার মধ্যে থাকে নাইট্রোজেন। এক হিসাবে জানা যায় যে, বছরে পৃথিবীতে যে বিদ্যুৎ চমকায় বা বজ্রপাত হয়, তাতে প্রায় এক কোটি টন নাইট্রোজেন বা ইউরিয়া সার বৃষ্টির মাধ্যমে মাটির সাথে মিশে যায়। যা ভূমির উর্বরা শক্তি বৃদ্ধি করে। এইভাবে প্রাকৃতিক নিয়মেই আল্লাহ বান্দার রূযীর জন্য ভূমিকে উর্বর ও সমৃদ্ধ করে রাখেন। আল্লাহ বলেন, ‘তাঁর অন্যতম নিদর্শন এই যে, তুমি ভূমিকে দেখতে পাও শুষ্ক। অতঃপর যখন আমরা তাতে বৃষ্টি বর্ষণ করি, তখন সেটি আন্দোলিত হয় ও স্ফীত হয়। বস্ত্ততঃ যিনি একে জীবিত করেন, তিনিই মৃতকে জীবন দান করবেন। নিশ্চয়ই তিনি সকল বিষয়ের উপর ক্ষমতাশালী’ (হা-মীম সাজদাহ ৪১/৩৯)।
বৃষ্টি বর্ষণের প্রধান উদ্দেশ্য হিসাবে আল্লাহ বলেন, তার দ্বারা আমি বান্দার জন্য শস্য, উদ্ভিদ ও উদ্যানসমূহ সৃষ্টি করি। এখানে মানুষ ও গবাদিপশুর খাদ্য হিসাবে প্রধান তিনটি জাতের উৎপন্ন দ্রব্যের নাম করা হয়েছে। যার প্রত্যেকটি স্ব স্ব জাতের প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন حَبًّا বা শস্যদানা বলতে চাউল, গম, যব ইত্যাদি বুঝানো হয়েছে। نَبَاتَا বা উদ্ভিদ বলতে নানাবিধ সবজি, ঘাস ইত্যাদিকে বুঝানো হয়েছে যা কাঁচা অবস্থায় খেতে হয়। অতঃপর جَنَّاتٍ বা উদ্যান বলতে খেজুর, আঙ্গুর, কলা, আম ইত্যাদি বাগিচাকে বুঝানো হয়েছে। বলা বাহুল্য, এটা আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি কৌশল যে, একই বৃষ্টি দিয়ে তিনি বিভিন্ন জাতের ও বিভিন্ন স্বাদের ফল ও ফসল উৎপন্ন করেন। যার মধ্যে জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন সমূহ রয়েছে (রা‘দ ১৩/৪)।
উপরে বর্ণিত ৬ হতে ১৬ পর্যন্ত ১১টি আয়াত আল্লাহ যমীন ও আসমান এবং তন্মধ্যকার সৃষ্টিকুল বিষয়ে বর্ণনা করেছেন পুনরুত্থান বা ক্বিয়ামতের প্রমাণ হিসাবে। তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, মানুষ ছাড়াও এইসব বিশাল সৃষ্টিকে যিনি অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন (বাক্বারাহ ২/১১৭; দাহর ৭৬/১) এবং কোনরূপ নমুনা বা পূর্বদৃষ্টান্ত ছাড়াই প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন (আম্বিয়া ২১/১০৪), তাঁর পক্ষে এটা খুবই সহজ এগুলিকে ধ্বংস করে দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করা (রূম ৩০/২৭)। অতএব মানুষের মত একটা সামান্য প্রাণীর মৃত্যুর পর পুনরুত্থান ঘটানো তাঁর জন্য খুবই সহজ কাজ। যদিও অবিশ্বাসীরা এতে বিস্ময় প্রকাশ করে (ক্বাফ ৫০/২-৩)।
يَوْمَ الْفَصْلِ অর্থ ‘ফায়ছালার দিন’। আর তা হল ক্বিয়ামতের দিন। কেননা ঐদিন আল্লাহ বান্দার ভাল-মন্দ কাজ-কর্মের বিচার-ফায়ছালা করবেন। كَانَ مِيْقَاتًا অর্থ গণিত সময়সীমা যা নির্ধারিত, যেখান থেকে কোনরূপ কমবেশী হবে না। আল্লাহ বলেন, ‘আর আমরা ক্বিয়ামতের দিনটাকে কিছুকালের জন্য স্থগিত রেখেছি মাত্র’ (হূদ ১১/১০৪)। এখানে সরাসরি يَوْمَ القِيامَةِ বা ‘ক্বিয়ামতের দিন’ না বলে يَوْمَ الْفَصْلِ বা ‘বিচারের দিন’ বলার মাধ্যমে ক্বিয়ামতের মূল উদ্দেশ্যকেই সামনে আনা হয়েছে এবং বান্দাকে পরকালীন জওয়াবদিহিতার বিষয়ে হুঁশিয়ার করা হয়েছে। যাতে সে দুনিয়াতে প্রস্ত্ততি গ্রহণ করে।
অন্য আয়াতে দু’বার ফুঁক দেয়ার কথা এসেছে (ইয়াসীন, ৩৬/৪৯,৫১; যুমার ৩৯/৬৮)। প্রথম ফুঁকের আওয়াজে সবার মৃত্যু হবে এবং দ্বিতীয় ফুঁকের আওয়াজে সবাই জীবিত হবে ও কবর থেকে বেরিয়ে হাশরের ময়দানে আল্লাহর নিকটে জমা হবে। আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, উভয় ফুঁকের মধ্যবর্তী সময়কাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, চল্লিশ। কিন্তু এই চল্লিশ দিন, মাস, না বছর তা বলতে তিনি অস্বীকার করেন। অতঃপর রাসূল (ছাঃ) বলেন যে, আল্লাহ ঐ সময় এমন বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, যার স্পর্শে মরা-সড়া নিশ্চিহ্ন মানুষ সব বেঁচে উঠবে স্ব স্ব মেরুদন্ডের নিম্নদেশের অস্থিখন্ড (عَجْبُ الذَّنْبِ) অবলম্বন করে। কেননা মানুষের অস্থিসমূহের ঐ অংশটুকু বিনষ্ট হবে না’।[বুখারী হা/৪৯৩৫, মুসলিম হা/২৯৫৫, মিশকাত হা/৫৫২১] যদি কেউ বলেন, আগুনে পুড়িয়ে ভস্ম করার পর তার দেহের কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, সে অবস্থায় কিসের অবলম্বনে সেদিন মানুষের দেহ গঠিত হবে? জওয়াব এই যে, এটি স্বাভাবিক কবরের লাশ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এক্ষণে পুড়িয়ে ভস্ম করার অস্বাভাবিক অবস্থার সময়কার জবাব এই যে, মানবদেহের সবকিছু নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও তার মূল অণুবীজ, কখনো নিশ্চিহ্ন হয় না। তাকে অবলম্বন করে দেহ গঠিত হতে পারে। যেমন দুনিয়াতে মায়ের গর্ভে পিতার শুক্রাণুকে ঘিরে দেহ গঠিত হয়ে থাকে। আর আল্লাহর জন্য তো কোন অবলম্বনের প্রয়োজন হয় না।
আসমান অত্যন্ত সুরক্ষিত। যা ভেদ করে যে কেউ উপরে উঠতে পারে না। প্রত্যেক আসমানে রয়েছে দরজাসমূহ এবং রয়েছে দাররক্ষী ফেরেশতাগণ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-কে নিয়ে মে‘রাজে গমনের সময় জিব্রীল (আঃ) সপ্ত আকাশের প্রত্যেক দরজায় প্রবেশের পূর্বে দাররক্ষী ফেরেশতার অনুমতি নিয়েছিলেন। [বুখারী হা/৩৪৯, মুসলিম হা/১৬৩, মিশকাত হা/৫৮৬৪] ক্বিয়ামতের দিন যখন আসমান বিদীর্ণ হবে, তখন দরজাসমূহ দিয়ে ফেরেশতাদের দুনিয়াতে নামিয়ে দেয়া হবে (ফুরক্বান ২৫/২৫)। এই বিদীর্ণ হওয়ার অর্থ দরজা সমূহ খুলে দেওয়া। দ্বিতীয় ফুঁকদানের পর আসমান ও যমীন পুনরায় বহাল হয়ে যাবে এবং নতুন আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি হবে ও সকল মানুষ মহাপরাক্রান্ত আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে’ (ইবরাহীম ১৪/৪৮)। নতুন সেই পৃথিবী সমতল হবে। তাতে কোনরূপ বক্রতা বা উঁচু-নীচু থাকবে না (ত্বোয়াহা ২০/১০৬-১০৭)।
বিশাল ও সুদৃঢ় পর্বতমালা ঐদিন মরীচিকার ন্যায় অস্তিত্বহীন বস্ত্ততে পরিণত হবে, যা ধূনিত তুলার ন্যায় হয়ে যাবে (ক্বারে’আহ ১০১/৫) এবং সমূলে উৎপাটিত হয়ে মেঘখন্ড সমূহের ন্যায় বিক্ষিপ্ত হয়ে চালিত হবে (ত্বোয়াহা ২০/২০৫; নমল ২৭/৮৮)।
উপরের চারটি আয়াতে ক্বিয়ামত সংঘটনকালের ভয়ংকর অবস্থা বর্ণিত হয়েছে। অতঃপর বিচার শেষে জাহান্নাম ও জাহান্নামীদের অবস্থা প্রসঙ্গে আল্লাহ নিম্নোক্ত আয়াত সমূহে বলেন,
مِرْصَادٌ অর্থ ঘাঁটি, যেখানে বসে কারু অপেক্ষা করা হয়। জাহান্নাম হবে ঘাঁটি কাফির-মুশরিক ও সীমালংঘনকারী ফাসিক-মুনাফিকদের জন্য। আল্লাহ বলেন, ‘আর তোমাদের প্রত্যেকেই ওটা (অর্থাৎ পুলছিরাত) অতিক্রম করবে। এটা তোমার প্রতিপালকের অমোঘ সিদ্ধান্ত’ (মারিয়াম ১৯/৭১)। হাসান বছরী ও ক্বাতাদাহ বলেন, ‘জাহান্নামের উপরে সেতু রয়েছে। সেটা অতিক্রম না করে কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এখানে যে ব্যক্তি পার হওয়ার অনুমতিসহ আসবে, সে ব্যক্তি অতিক্রম করবে। আর যে ব্যক্তি সেটা নিয়ে আসতে পারবে না, সে আটকে যাবে’ (কুরতুবী)। বস্ত্ততঃ জাহান্নামের উপরের এই পুলকেই বলা হয় الصِّرَاطُ বা ‘পুলছেরাত’। যা অতীব সূক্ষ্ম ও অতীব ধারালো। জাহান্নামী ব্যক্তি তা পার হতে গিয়ে আটকে যাবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। পক্ষান্তরে জান্নাতীগণ স্বচ্ছন্দে চোখের পলকে পার হয়ে যাবে এবং তারা কোনরূপ অগ্নিতাপ অনুভব করবে না।
অর্থাৎ তারা সেখানে অবস্থানকারী হবে সুদীর্ঘ বছর। আয়াতে ব্যবহৃত أحقاب শব্দটি حقب এর বহুবচন। এর অর্থ নির্ধারণ নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও স্বাভাবিকভাবে বলা যায় যে, এর দ্বারা ‘সুদীর্ঘ সময়’ উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে। সুতরাং أحقاب দ্বারা তখন কোন সুনির্দিষ্ট সময় বোঝা উচিত হবে না। তাই উপরে এর অনুবাদ করা হয়েছে, “যুগ যুগ ধরে’। এর মানে হচ্ছে, একের পর এক আগমনকারী দীর্ঘ সময় তারা সেখানে অবস্থান করবে। এমন একটি ধারাবাহিক যুগ যে, একটি যুগ শেষ হবার পর আর একটি যুগ শুরু হয়ে যায়। একের পর এক আসতেই থাকবে এবং এমন কোন যুগ হবে না যার পর আর কোন যুগ আসবে না। [দেখুন: ইবন কাসীর] কুরআনের ৩৪ জায়গায় জাহান্নামবাসীদের জন্য ‘খুলুদ’ (চিরন্তন) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। তিন জায়গায় কেবল খুলুদ বলেই শেষ করা হয়নি বরং তার সাথে “আবাদান” (চিরকাল) শব্দও বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এক জায়গায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, “তারা চাইবে জাহান্নাম থেকে বের হয়ে যেতে। কিন্তু তারা কখনো সেখান থেকে বের হতে পারবে না এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী আযাব।” [সূরা আল-মায়েদাহ: ৩৭]
অর্থাৎ জাহান্নামে তারা শীতলকারী কোন বায়ু বা দেহ পুষ্টকারী কোন পানীয় পাবে না। اَلْبَرْدُ অর্থ ‘ঠান্ডা বাতাস ও শান্তি, তন্দ্রা ও নিদ্রা’। সব অর্থই পরস্পরের পরিপূরক। এ কারণেই বলা হয় ‘শীত ঘুম নষ্ট করেছে’।
মূলে গাস্সাক শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর অর্থ হয়ঃ পুঁজ, রক্ত, পুঁজ মেশানো রক্ত এবং চোখ ও গায়ের চামড়া থেকে বিভিন্ন ধরনের কঠোর দৈহিক নির্যাতনের ফলে যেসব রস বের হয়, যা প্রচণ্ড দুৰ্গন্ধযুক্ত। [ইবন কাসীর]
অর্থাৎ জাহান্নামে তাদেরকে যে শাস্তি দেয়া হবে, তা ন্যায় ও ইনসাফের দৃষ্টিতে তাদের বাতিল বিশ্বাস ও কুকর্মের অনুরূপ হবে। এতে কোন বাড়াবাড়ি হবে না। [মুয়াস্সার, সা’দী]
এ কথা প্রথমোক্ত বাক্যের কারণ দর্শিয়ে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সে উল্লিখিত আযাবের উপযুক্ত। কেননা, সে মৃত্যুর পর পুনর্জীবনের প্রতি বিশ্বাসীই ছিল না, যাতে তারা হিসাব-নিকাশের আশঙ্কা করত।
এ হচ্ছে তাদের জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব ভোগ করার কারণ। তারা আল্লাহর সামনে হাজির হয়ে নিজেদের আসনের হিসেব পেশ করার সময়ের কোন আশা করত না। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ যেসব আয়াত পাঠিয়েছিলেন সেগুলো মেনে নিতে তারা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করত এবং সেগুলোকে মিথ্য বলে প্রত্যাখ্যান করত। [ফাতহুল কাদীর]
অর্থাৎ, লাওহে মাহ্ফুযে। অথবা সেই রেকর্ড (কর্ম-বিবরণী) উদ্দেশ্য, যা (কিরামান কাতিবীন) ফিরিশতাগণ লিখে থাকেন। কিন্তু প্রথম অর্থটি অধিকতর সঠিক। যেমন দ্বিতীয় স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,‘‘আমি প্রত্যেক জিনিস স্পষ্ট গ্রন্থে সংরক্ষিত রেখেছি।’(সূরা ইয়াসীন ১২ আয়াত)
আযাব বৃদ্ধি করার অর্থ হল যে, এখন থেকে এই আযাব চিরস্থায়ী। যখনই তাদের চামড়া গলে যাবে, তখনই ওর স্থলে নুতন চামড়া সৃষ্টি করা হবে। (সূরা নিসা ৫৬ আয়াত) যখনই আগুন নিভে যাবে, তখনই পুনরায় তা প্রজ্বলিত করা হবে। (সূরা বানী ইস্রাঈল ৯৭ আয়াত)
২১-৩০ পর্যন্ত ১০টি আয়াতে জাহান্নামীদের শাস্তি বর্ণনা শেষে ৩১ থেকে ৪০ পর্যন্ত সূরার শেষ ১০টি আয়াতে জান্নাতীদের পুরস্কার বর্ণনা করা হয়েছে। কুরআনের অলৌকিক বর্ণনা রীতির অন্যতম হল তার مَثَانِىْ রীতি অর্থাৎ পরপর বিপরীতমুখী বর্ণনা। ফলে যেখানেই ঈমানের বর্ণনা, তার পরেই আসে কুফরের বর্ণনা। যেখানেই জাহান্নামের শাস্তির বর্ণনা, তার পরেই আসে জান্নাতের পুরস্কারের বর্ণনা। এখানে সেই রীতিই অনুসৃত হয়েছে, যা কুরআনের শুরু থেকেই রয়েছে। বান্দা দুনিয়াতে যেসব বস্ত্তকে দেখে এবং যেগুলিকে সর্বাধিক আনন্দদায়ক মনে করে, সেগুলিকেই নমুনাস্বরূপ এখানে বর্ণনা করা হয়েছে। যাতে তারা সেদিকে আকৃষ্ট হয়। নইলে দুনিয়ার সর্বাধিক আকর্ষণীয় বস্ত্তও জান্নাতের কোন বস্ত্তর সাথে তুলনীয় নয়।
দুনিয়াতে শাস্তি ও পুরস্কার দু’ধরনের হয়ে থাকে। মনোগত ও বস্ত্তগত। আখেরাতেও অনুরূপ হবে। আলোচ্য সূরার শেষাংশে ৩১ হতে ৩৬ পর্যন্ত ৬টি আয়াতে পরকালে নেককার বান্দাদের জন্য বস্ত্তগত পুরস্কারের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন,
আল্লাহভীরু সৎকর্মশীল বান্দাগণ চোখের পলকে পুলছেরাত পার হতে সক্ষম হবেন। আর এটা হবে দুনিয়াতে তাদের আল্লাহর অবাধ্যতা হতে বিরত থাকার এবং তাঁর দেওয়া বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার অনন্য পুরস্কার। مَفَازٌ অর্থ – ‘সফলতা, মুক্তি ও দোযখবাসীদের শাস্তি সমূহ হতে মুক্ত স্থান’। এজন্য পানিশূন্য ময়দানকে مَفَازَةٌ বলা হয় (কুরতুবী)।
اَلتَّقْوَى অর্থ ‘অপসন্দনীয় বস্ত্ত থেকে বিরত থাকা’। পারিভাষিক অর্থে ‘আল্লাহভীরু ব্যক্তি’। মুমিনের চাইতে মুত্তাক্বী এক দর্জা উপরে, যিনি নিজের সৎকর্ম সমূহের মাধ্যমে ও খালেছ দো‘আর মাধ্যমে আল্লাহর শাস্তি থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখেন (কুরতুবী)। মুত্তাক্বী ব্যক্তি লাগামবদ্ধ প্রাণীর ন্যায় নিয়ন্ত্রিত জীবন যাপন করেন। তিনি যা খুশী বলতে বা করতে পারেন না। তিনি সর্বদা অন্যায় ও অপসন্দনীয় কর্ম হতে বিরত থাকেন। কথিত আছে যে, একবার ওমর (রাঃ) উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-কে তাক্বওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আপনি কি কখনো কাঁটা বিছানো পথে চলেছেন? তিনি বলেন, হ্যাঁ, চলেছি। উবাই (রাঃ) বললেন, কিভাবে চলেছেন? ওমর (রাঃ) বললেন, খুব সাবধানে কষ্টের সাথে চলেছি। উবাই (রাঃ) বললেন, فذلك التقوى ‘ওটাই হল তাক্বওয়া’ (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)।
অর্থাৎ তাদের সফলতার প্রতিদান স্বরূপ রয়েছে খেজুর-আঙ্গুর ইত্যাদি ফল-ফলাদির বাগিচাসমূহ। এখানে আঙ্গুরসমূহ অর্থ আঙ্গুর বাগিচাসমূহ।
রাসূল (সাঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন পুরুষ ও নারী সকলের বয়স ৩০ বা ৩৩ বছরের হবে। হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) গৃহে প্রবেশ করলেন। তখন এক বৃদ্ধা আমার নিকটে বসা ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ইনি কে? আমি বললাম, উনি সম্পর্কে আমার খালা হন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, ‘কোন বৃদ্ধা জান্নাতে প্রবেশ করবে না’। একথা শুনে বৃদ্ধা কাঁদতে লাগল। আয়েশা (রাঃ) এই খবর গিয়ে জানালে রাসূল (সাঃ) তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন যে, ঐ সময় সকল নর-নারী যৌবনপ্রাপ্ত হবে। এর মধ্যে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)-এর বাক্যরসের প্রমাণ পাওয়া যায়। অতঃপর রাসূল (সাঃ) আয়াত পাঠ করলেন, ‘আমরা জান্নাতী রমণীদের সৃষ্টি করেছি বিশেষরূপে’। ‘আমরা তাদেরকে তৈরী করেছি কুমারী হিসাবে’। [ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/৩৬-৩৭]
دهاقًاএর অর্থঃ পরিপূর্ণ কিংবা একের পর এক নিরবচ্ছিন্ন অথবা তা স্বচ্ছ ও নির্মল হবে। كأس এমন পানপাত্রকে বলা হয়, যা পূর্ণরূপে ভর্তি থাকে।
অর্থাৎ জান্নাতী শরাব পান করার ফলে তাদের জ্ঞান ও বিচারবুদ্ধিতে কোন তারতম্য হবে না এবং তারা কোনরূপ বাজে ও অনর্থক কথা বলবে না। যেরূপ দুনিয়াতে শরাব পানের ফলে হয়ে থাকে। তারা সেখানে পরস্পরে মিথ্যারোপ করবে না। অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘সেখানে কোন বেফায়দা কথা নেই বা (মিথ্যাচারের) পাপ নেই’ (তূর ৫২/২৩)। বরং জান্নাত হল ‘দারুস সালাম’ বা ‘শান্তির নীড়’। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে শান্তির গৃহ। আর তিনিই তাদের অভিভাবক তাদের সৎকর্মের কারণে’ (আন‘আম ৬/১২৭)। সেখানে সকল কথা ও কাজ হবে ত্রুটিমুক্ত। তিনি বলেন,‘সেখানে কেউ কোন অনর্থক ও পাপের কথা শুনবে না’। ‘কেবলই শুনবে সালাম আর সালাম (শান্তি আর শান্তি)’। (ওয়াক্বি‘আহ ৫৬/২৫-২৬)।
লক্ষণীয় যে, এসব নেয়ামত বর্ণনা করে বলা হয়েছে, জান্নাতের এসব নেয়ামত মুমিনদের প্রতিদান এবং আপনার রবের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত দান। এখানে জান্নাতের নেয়ামতসমূহকে প্রথমে কর্মের প্রতিদান ও পরে আল্লাহর দান বলা হয়েছে। প্রতিদান শব্দের পরে আবার যথেষ্ট পুরস্কার দেবার কথা বলার অর্থ এ দাঁড়ায় যে, তারা নিজেদের সৎকাজের বিনিময়ে যে প্রতিদান লাভের অধিকারী হবে কেবলমাত্র ততটুকুই তাদেরকে দেয়া হবে না বরং তার ওপর অতিরিক্ত পুরস্কার এবং অনেক বেশী পুরস্কার দেয়া হবে। বিপরীত পক্ষে জাহান্নামবাসীদের জন্য কেবলমাত্র এতটুকুই বলা হয়েছে যে, তাদেরকে তাদের কাজের পূর্ণ প্রতিফল দেয়া হবে। অর্থাৎ তাদের যে পরিমাণ অপরাধ তার চেয়ে বেশী শাস্তি দেয়া হবে না এবং কমও দেয়া হবে না। [দেখুন, তাতিস্মাতু আদওয়াউল বায়ান] কুরআন মজীদের বিভিন্ন স্থানে একথা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। যেমন সূরা ইউসুস ২৬–২৭ আয়াত, সূরা আন নামল ৮৯–৯০ আয়াত, সূরা আল কাসাস ৮৪ আয়াত, সূরা সাবা ৩৩ আয়াত এবং সূরা আল মু’মিন ৪০ আয়াত।
অত্র আয়াতে অবিশ্বাসীদের জন্য মানসিক আযাবের খবর দেওয়া হয়েছে। মুমিনগণ আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর সাথে কথা বলতে পারবেন (হূদ ১১/১০৫) কিংবা কারু জন্য সুফারিশ করতে পারবেন (বাক্বারাহ ২/২৫৫; ত্বোয়াহা ২০/১০৯)। কিন্তু কাফির-মুশরিক ও মুনাফিকদের এই সুযোগ দেওয়া হবে না। এমনকি তাদের চোখ অন্ধ করে দেওয়া হবে (ইসরা ১৭/৭২; ত্বোয়াহা ২০/১২৪) এবং তারা আল্লাহকে সামনা-সামনি দেখার মহা সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘কখনোই না। তারা সেদিন তাদের প্রতিপালক হতে পর্দার অন্তরালে থাকবে’ (মুত্বাফফিফীন ৮৩/১৫)। আল্লাহ্কে দেখার মত সৌভাগ্য হতে বঞ্চিত হওয়া ও তাঁকে সামনে পেয়েও কথা বলার ও নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে ক্ষমা প্রার্থনার সুযোগ থেকে মাহরূম হওয়া এবং তার জন্য কারু কোন সুফারিশ করার এখতিয়ার না থাকার চাইতে মর্মান্তিক কোন মানসিক শাস্তি আর হতে পারে কি? আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন!
অধিকাংশ তাফসীরকারগণের মতে ‘রূহ’ বলে এখানে জিবরীল আলাইহিস সালামকে বোঝানো হয়েছে। [মুয়াস্সার, সা’দী] ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত আছে যে, রূহ দ্বারা আল্লাহ তা’আলার এক বড় আকৃতির ফেরেশতাকে বোঝানো হয়েছে। কাতাদাহ বলেন, এখানে রূহ বলে আদম সন্তানদেরকে বোঝানো হয়েছে। শেষোক্ত দু’টি তাফসীর অনুযায়ী দুটি সারি হবে- একটি রূহের ও অপরটি ফেরেশতাগণের। [আত-তাফসীর আস-সাহীহ]
এখানে কথা বলা মানে শাফা’আত করা বলা হয়েছে। শাফা’আত করতে হলে যে ব্যক্তিকে যে গুনাহগারের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে শাফা’আত করার অনুমতি দেয়া হবে একমাত্র সে-ই তার জন্য শাফা’আত করতে পারবে। আর শাফা’আতকারীকে সঠিক ও যথার্থ সত্য কথা বলতে হবে। অন্যায় সুপারিশ করতে পারবে না। [দেখুন: কুরতুবী]
আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ভয় কর সেইদিনকে, যেদিন তোমরা ফিরে যাবে আল্লাহর কাছে। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তি তার আমল অনুযায়ী যথাযথ বদলা পাবে এবং তাদের উপর কোনরূপ যুলুম করা হবে না’ (বাক্বারাহ ২/২৮১)।
‘জান্নাতে’ ঠিকানা নির্ধারণের কথা না বলে ‘তার পালনকর্তার প্রতি ঠিকানা নির্ধারণ করুক’ বলার মধ্যে এ বিষয়ে ইঙ্গিত রয়েছে যে, আল্লাহর সন্তুষ্টিই হল প্রধান কাম্য। জান্নাত হল তার ফলাফল মাত্র। অতএব বান্দাকে সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিলের উদ্দেশ্যে কাজ করতে হবে। কেননা শুধুমাত্র আমলের মাধ্যমে কেউ জান্নাত পাবে না আল্লাহর রহমত ব্যতীত।
অর্থাৎ, কিয়ামতের দিবসের আযাব সম্পর্কে যা অতি নিকটেই। কেননা, তার আগমন সুনিশ্চিত সত্য। আর প্রতিটি জিনিস যা আসবে তা অতি নিকটেই। যেহেতু যে কোন প্রকারে তা আসবেই আসবে।
ভাল ও মন্দ যে আমলই সে পার্থিব জীবনে করেছে তা আল্লাহর নিকট পৌঁছে গেছে। কিয়ামতের দিন তা তার সামনে এসে যাবে এবং সে তা স্বচক্ষে দেখতে পাবে। ‘‘তারা তাদের কৃতকর্ম সম্মুখে উপস্থিত পাবে।” (সূরা কাহ্ফ ৪৯ আয়াত) ‘‘সেদিন মানুষকে অবহিত করা হবে যে, সে কী অগ্রে পাঠিয়েছে ও কী পশ্চাতে রেখে গেছে।” (সূরা ক্বিয়ামাহ ১৩ আয়াত)
যখন সে নিজের ভয়ঙ্কর আযাব দেখে নেবে, তখন সে এই আকাঙ্ক্ষা করবে। কোন কোন আলেম বলেন, আল্লাহ তাআলা পশুদের মাঝেও ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারের সাথে ফায়সালা করবেন। এমনকি যদি কোন শিংবিশিষ্ট পশু কোন শিংবিহীন পশুর প্রতি অত্যাচার করে থাকে তাহলে তারও বদলা দেওয়া হবে। তারপর আল্লাহ পশুদেরকে বলবেন, তোমরা মাটিতে পরিণত হও। তখন তারা মাটি হয়ে যাবে। আর সেই সময় কাফেররাও বাসনা করবে যে, তারাও যদি পশু হতো এবং তাদের মত আজ মাটি হয়ে যেতে পারত! (তাফসীর ইবনে কাসীর)
ফুটনোট
প্রথম পর্ব: এক মহাসংবাদ এবং মানুষের গভীর মতবিরোধ
সূরার সূচনা হয় এক অত্যন্ত শক্তিশালী ও কৌতুহলোদ্দীপক প্রশ্ন দিয়ে, যা এক উত্তপ্ত বিতর্কের প্রতি ইঙ্গিত করে। আল্লাহ বলছেন: এক জ্বলন্ত প্রশ্ন: “তারা পরস্পর কোন বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে?”
প্রশ্নের উত্তর:
- “সেই মহাসংবাদ (আন-নাবা’ আল-আযীম) সম্পর্কে,”
- “যে বিষয়ে তারা চরম মতবিরোধে লিপ্ত।”
এই মহাসংবাদ হলো পুনরুত্থান ও পরকাল, যা নিয়ে মক্কার কাফিররা সন্দেহ, উপহাস এবং বিতর্কে লিপ্ত ছিল। তাদের এই মতবিরোধের জবাবে আল্লাহ কোনো দীর্ঘ বিতর্কে না গিয়ে এক চূড়ান্ত ও কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন: “কখনোই নয়! তারা শীঘ্রই জানতে পারবে। অতঃপর আবারও বলি, কখনোই নয়! তারা শীঘ্রই জানতে পারবে।” এই পুনরাবৃত্তিটি তাদের জন্য অপেক্ষা করা ভয়াবহ বাস্তবতার গভীরতাকে তুলে ধরে।
দ্বিতীয় পর্ব: প্রকৃতির মাঝে আল্লাহর ক্ষমতার অকাট্য প্রমাণ
অবিশ্বাসীদের পুনরুত্থান বিষয়ক সন্দেহের জবাবে, আল্লাহ এবার তাদের দৃষ্টিকে তাদের চারপাশের বিশাল ও সুবিন্যস্ত সৃষ্টিজগতের দিকে ফিরিয়ে আনেন। এই নিদর্শনগুলোই পুনরুত্থানের সম্ভাবনার সবচেয়ে বড় ও অকাট্য প্রমাণ। আল্লাহ ধাপে ধাপে তাঁর কিছু মহান সৃষ্টির কথা তুলে ধরেন:
পৃথিবী ও পর্বতমালার কাঠামো:
- “আমি কি পৃথিবীকে এক বিস্তীর্ণ শয্যারূপে বানাইনি?”
- “এবং পর্বতমালাকে পেরেকস্বরূপ?”
- মানব জীবন ও তার চক্র:
- “আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়।”
- “এবং তোমাদের নিদ্রাকে করেছি বিশ্রামের জন্য।”
- “আর রাতকে করেছি আবরণস্বরূপ।”
- “এবং দিনকে করেছি জীবিকা অর্জনের সময়।”
আকাশ ও তার শক্তি:
- “আর আমি তোমাদের ঊর্ধ্বে নির্মাণ করেছি সুদৃঢ় সাত আকাশ।”
- “এবং আমি স্থাপন করেছি এক উজ্জ্বল প্রদীপ (সূর্য)।”
বৃষ্টি ও প্রাণের প্রাচুর্য:
- “এবং আমিই মেঘমালা থেকে প্রচুর পানি বর্ষণ করি,”
- “যাতে তা দিয়ে আমি শস্য ও উদ্ভিদ উৎপন্ন করতে পারি,”
- “এবং ঘন সন্নিবেশিত উদ্যানসমূহ।”
এই নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল সৃষ্টিব্যবস্থার বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহ যেন প্রশ্ন রাখছেন: যিনি প্রথমবার এই সবকিছু এত নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করতে পারেন, তাঁর জন্য কি মৃতকে পুনরায় জীবনদান করা অসম্ভব?
তৃতীয় পর্ব: সেই ফয়সালার দিন এবং মহাপ্রলয়ের চিত্র
প্রকৃতির এই বিশাল নিদর্শনের পর, সূরাটি এবার সেই মহাসংবাদের মূল বিষয়—”ইয়াওমুল ফাসল” বা ফয়সালার দিন—এর এক জীবন্ত ও ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে।
এক নির্ধারিত সময়:
“নিশ্চয়ই ফয়সালার দিনটি এক নির্ধারিত সময়।”
মহাপ্রলয়ের দৃশ্য:
- “যেদিন শিঙায় ফুঁক দেওয়া হবে, তখন তোমরা দলে দলে উপস্থিত হবে।”
- “এবং আকাশকে খুলে দেওয়া হবে, ফলে তা বহু দ্বারবিশিষ্ট হয়ে যাবে।”
- “আর পর্বতমালাকে চলমান করা হবে, ফলে তা মরীচিকার মতো হয়ে যাবে।”
চতুর্থ পর্ব: দুই দলের চূড়ান্ত ও বিপরীতধর্মী পরিণতি
মহাপ্রলয়ের এই ভয়াবহ দৃশ্যের পর শুরু হবে চূড়ান্ত প্রতিদান ও শাস্তির পালা। আল্লাহ দুটি দলের চূড়ান্ত ও ভিন্ন পরিণতি সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন:
সীমালঙ্ঘনকারীদের ঠিকানা (জাহান্নাম):
- “নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওঁৎ পেতে থাকবে, সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য এক প্রত্যাবর্তনস্থলরূপে।”
- “তারা সেখানে যুগ যুগ ধরে অবস্থান করবে।”
- “তারা সেখানে কোনো শীতলতা বা কোনো পানীয়ের স্বাদ পাবে না,”
- “ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ছাড়া।”
- “এটাই যথাযোগ্য প্রতিদান।”
এর কারণ হিসেবে বলা হবে, তারা হিসাব-নিকাশের কোনো আশাই করত না এবং তারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছিল।
আল্লাহভীরুদের সফলতা (জান্নাত):
এই অন্ধকার চিত্রের বিপরীতে আল্লাহ এবার সেই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিদের এক উজ্জ্বল ও মনোরম চিত্র তুলে ধরেন, যারা আল্লাহভীরু (মুত্তাকি)।
- “নিশ্চয়ই আল্লাহভীরুদের জন্য রয়েছে মহাসাফল্য।”
- “উদ্যানসমূহ ও আঙ্গুরসমূহ,”
- “এবং সমবয়স্কা, পূর্ণযৌবনা তরুণীগণ,”
- “আর পরিপূর্ণ পানপাত্র।”
- “তারা সেখানে কোনো অনর্থক বা মিথ্যা কথা শুনবে না।”
পঞ্চম পর্ব: চূড়ান্ত সার্বভৌমত্ব এবং সেই দিনের নীরবতা
সূরার শেষাংশে আল্লাহ তাঁর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব এবং কিয়ামতের দিনের ভয়াবহ নীরবতার এক চিত্র তুলে ধরেন।
আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব:
“(এই পুরস্কার) তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে এক প্রতিদান, এক যথাযোগ্য পুরস্কার। তিনি আকাশ ও পৃথিবীর এবং এর মধ্যবর্তী সবকিছুর প্রতিপালক, পরম করুণাময়।”
সেই দিনের ভয়াবহ নীরবতা:
“তাঁর সামনে কথা বলার সাহস কারো থাকবে না।”
“যেদিন রূহ (জিবরাইল) এবং ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হবে, সেদিন পরম করুণাময় যাকে অনুমতি দেবেন, সে ছাড়া আর কেউই কথা বলতে পারবে না এবং সে সঠিক কথাই বলবে।”
সূরাটি শেষ হয় এক চূড়ান্ত ও শক্তিশালী সতর্কবার্তার মাধ্যমে:
“নিশ্চয়ই সেই দিনটি সত্য। সুতরাং, যার ইচ্ছা, সে তার প্রতিপালকের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করুক।”
“আমি তো তোমাদেরকে এক আসন্ন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করলাম। সেদিন মানুষ তার দুই হাত যা অগ্রিম প্রেরণ করেছে, তা দেখতে পাবে এবং কাফির ব্যক্তি বলবে, ‘হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!'”