কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৬
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্বঃ ১
সূরা আত-তাকভীর
সূরা আত-তাকভীর কুরআনের ৮১ তম সূরা এর আয়াত সংখ্যা ২৯ এবং রুকু সংখ্যা ১। সূরাটি মাক্কী সূরা। সূরার নামের অর্থ – আলোহীন হয়ে পড়া / গুটিয়ে নেওয়া।
নামকরণ
সূরার প্রথম বাক্যের كُوِرَتْ শব্দটি থেকে নামকরণ করা হয়েছে। তাকভীর (تَكْوِيْر) হচ্ছে মূল শব্দ। তা থেকে অতীত কালের কর্তৃবাচ্য অর্থে কুওভিরাত (كُوِرَتْ) শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর মানে হচ্ছে, গুটিয়ে ফেলা হয়েছে। এই নামকরণের অর্থ হচ্ছে, এটি সেই সূরা যার মধ্যে গুটিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে। একেসূরা ইযাশ শামসু কুভভিরাত (যখন সূর্য আলোহীন হয়ে যাবে) নামেও ডাকা হয়।
আলোচ্যবিষয়
১-১৪ নং আয়াতে ক্বিয়ামতের ভয়ংকর অবস্থা বর্ণনা
১৫-২৫ নং আয়াতে বিভিন্ন বস্তুর শপথ এবং কুরআনের সত্যতা ও জিবরাঈল (আ.)-এর মর্যাদা
২৬-২৯ নং আয়াতে মানুষের গন্তব্য এবং আল্লাহর ইচ্ছা
বিষয় বস্তু
এ সূরার বিষয়বস্তু হচ্ছে দু’টিঃ আখেরাত ও রিসালাত।
এখানে ক্বিয়ামত সংঘটন কালের ১২টি অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে। যার মধ্যে ৬টি হবে দুনিয়াতে এবং ৬টি হবে আখেরাতে। দুনিয়ার ছয়টি অবস্থা বর্ণিত হয়েছে প্রথম ছ’টি আয়াতে যা কিয়ামতের প্রথম পর্ব। বলা হয়েছেঃ (১) মানুষ বাজার-ঘাটে মশগুল থাকবে। এমতাবস্থায় হঠাৎ সূর্যের আলো নিভে যাবে। (২) নক্ষত্রসমূহ খসে পড়বে। (৩) পাহাড়সমূহ মাটির উপর ভেঙ্গে পড়বে ও সারা পৃথিবী কম্পিত ও আন্দোলিত হবে। (৪) এ সময় জিন-ইনসান সব ভয়ে ছুটাছুটি করতে থাকবে। (৫) পশু-পক্ষী সব ভীত-চকিত হয়ে একত্রিত হয়ে যাবে। (৬) সমুদ্র সব অগ্নিময় হয়ে একাকার হয়ে যাবে। এরপর একটি বায়ুপ্রবাহ আসবে। যাতে সবাই মারা পড়বে।
পরবর্তী সাতটি ৭ হতে ১৪ আয়াতে কিয়ামতের দ্বিতীয় পর্বের উল্লেখ করে বলা হয়েছেঃ যখন রূহগুলোকে আবার নতুন করে শরীরের সাথে সংযুক্ত করে দেয়া হবে। আমলনামা খুলে দেয়া হবে। অপরাধের ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আকাশের সমস্ত পরদা সরে যাবে এবং জান্নাত- জাহান্নাম ইত্যাদি সব জিনিসই চোখের সামনে সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে। আখেরাতের এই ধরনের একটি পুরোপুরি ছবি আঁকার পর একথা বলে মানুষকে চিন্তা করার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে যে, সে সময় প্রত্যেক ব্যক্তি কি পাথেয় সংগ্রহ করে এনেছে তা সে নিজেই জানতে পারবে।
এরপর রিসালাত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে মক্কাবাসীদেরকে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের সামনে যা কিছু পেশ করছেন সেগুলো কোন পাগলের প্রলাপ নয়। কোন শয়তানের ওয়াসওয়াসা ও বিভ্রান্তিও নয়। বরং সেগুলো আল্লাহর প্রেরিত একজন উন্নত মর্যাদা সম্পন্ন বুযর্গ ও বিশ্বস্ত বাণীবাহকের বিবৃতি, যাঁকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উন্মুক্ত আকাশের দিগন্তে দিনের উজ্জ্বল আলোয় নিজের চোখে দেখেছেন। এই শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে তোমরা কোন দিকে চলে যাচ্ছো?
ফযিলত ও বৈশিষ্ট্য
১. এটি ‘নাসা’ইর’ (সমজাতীয়) সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত, যা নবী (ﷺ) রাতের সালাতে (তাহাজ্জুদে) জোড়া মিলিয়ে পাঠ করতেন।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “…রাসূলুল্লাহ (ﷺ) সমজাতীয় সূরাগুলো এক রাকাতে (জোড়ায় জোড়ায়) পাঠ করতেন। (এর মধ্যে) (সূরা) আদ-দুখান ও {ইযাশ-শামসু কুওভিরাত} (সূরা আত-তাকভীর) এক রাকাতে (পাঠ করতেন)।”
মুহাম্মাদ ইবনু আবান আল বালখী (রহ.) ….. ’আমর ইবনু হুরাইস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী (সা.)-কে ফজরের সালাতে (সূরাহ আত্ তাকভীর ৮১: ১) اِذَا الشَّمۡسُ کُوِّرَتۡ পাঠ করতে শুনেছি।
২. এটি এমন এক সূরা যা নবী (ﷺ)-কে বৃদ্ধ করে দিয়েছিল (তাঁর চুল সাদা করে দিয়েছিল)।
আবু বকর সিদ্দীক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে বললেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আপনি তো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন!” তিনি বললেন: “আমাকে হূদ, ওয়া-ক্বি’আহ, মুরসালাত, ‘আম্মা ইয়াতাসাআলুন এবং {ইযাশ-শামসু কুওভিরাত} (সূরা আত-তাকভীর) বৃদ্ধ করে দিয়েছে।” (তিরমিযী ৩২৯৭)
৩. এর তিলাওয়াতকারী যেন স্বচক্ষে কিয়ামত দিবস প্রত্যক্ষ করলো।
আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসকে স্বচক্ষে দেখার মতো করে দেখতে আনন্দ বোধ করে, সে যেন ‘ইযাশ-শামসু কুওভিরাত’ (সূরা আত-তাকভীর), ‘ইযাস-সামাউন ফাতারাত’ (সূরা আল-ইনফিতার) এবং ‘ইযাস-সামাউন শাক্কাত’ (সূরা আল-ইনশিক্বাক) পাঠ করে।” [তিরমিযী: ৩৩৩৩, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৭, ৩৬, ১০০, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৫১৫]
পূর্ববর্তী ও পরের সূরার সাথে সম্পর্ক
পুর্বব্ররতী সূরা আবাসায় কিয়ামতের দিনের মহাবিপদের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে যে, সে বিপদ সংকুল সময় একান্ত আপনজনও একে অন্যের খবর নিবে না, বরং একে অপরের নিকট হতে পলায়নপর হবে। আর অত্র সূরায় কিয়ামত দিবসের ভয়াবহ দৃশ্যের বিবরণ স্থান পেয়েছে। এ সূরা এবং পরবর্তী সূরা ইনফিত্বারের বিষয়বস্তুর মধ্য মিল রয়েছে। অতএব, উভয় সূরা অবর্তীণ হওয়ার সময়ও প্রায় কাছাকাছি হবে।
আরবী ভাষায় তাকভীর মানে হচ্ছে গুটিয়ে নেয়া। মাথায় পাগড়ী বঁধার জন্য ‘তাকভীরুল ইমামাহ’ বলা হয়ে থাকে। কারণ ইমাম তথা পাগড়ী লম্বা কাপড়ের হয়ে থাকে এবং মাথার চারদিকে তা জড়িয়ে নিতে হয়। এই সাদৃশ্য ও সম্পর্কের কারণে সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি বিছুরিত হয়ে সমগ্র সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে পাগড়ীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন এই সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে। অর্থাৎ তার আলোক বিচ্ছুরণ বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া كُوِّرَتْ এর অপর অর্থ নিক্ষেপ করাও হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, “চাঁদ ও সূর্যকে কিয়ামতের দিন পেচিয়ে রাখা হবে।” [বুখারী: ৩২০০] [ইবন কাসীর]
كُوِّرَتْ শব্দটির মধ্যে বিজ্ঞানের একটি বিরাট উৎস বর্ণিত হয়েছে। যেকালে মানুষ সূর্যকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করত, সেই যুগে কুরআন জানিয়ে দিয়েছে যে, সূর্য একদিন নিঃশেষ হবে। অতএব সে কখনো উপাস্য হতে পারে না। জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সূর্য হল উত্তাপ ও শক্তির উৎস। যা মানুষ ও জীবজগতের কল্যাণে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সূর্য একসময় দীপ্তিহীন হয়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর সেটাই হল ক্বিয়ামতের দিন।
এখানে তার ‘ইনকাদার’ (انكدر) উক্তির দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ‘ইনসাব্বা’ (انصبّ) অর্থাৎ সবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। অন্যান্য মুফাসসিরগণ বলেছেন: ‘ইনকাদারাত’ (انكدرت) অর্থ হলো: পরিবর্তিত হয়ে যাবে (আলোহীন হয়ে যাবে)।
এগুলো আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শন। তাঁর নির্দেশে আলো দিচ্ছে আর তাঁর নির্দেশেই কিয়ামতের পূর্বে আলোহীন হয়ে যাবে। তাই চন্দ্র-সূর্যসহ যেকোন বড় ধরণের নিদর্শনের ইবাদত করা যাবে না, বরং ইবাদত করবে এসব মাখলূকের সৃষ্টিকর্তার জন্য। শুধু তাই নয়, সূর্য-চন্দ্র ও অন্য যেসব বস্তুকে লোকেরা পূজা করত, সবগুলিকে আল্লাহ তা‘আলা ঐদিন জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন। এসব জিনিসকে শাস্তিদানের জন্য নয় বরং যারা তাদের পূজা করত তাদের ধিক্কার দেয়ার জন্য।
ক্বিয়ামতের দিন পাহাড়ের অবস্থা কেমন হবে, সে বিষয়ে কুরআনের বিভিন্নস্থানে বিভিন্নভাবে বলা হয়েছে। যেমন –
(ক) ‘তুমি বল আমার পালনকর্তা পাহাড় সমূহকে উৎপাটিত করে বিক্ষিপ্ত করে দিবেন’। অতঃপর পৃথিবীকে করবেন-‘ মসৃণ সমতলভূমি’ (ত্বোয়াহা ২০/১০৫-১০৬)।
(খ) ‘এবং পাহাড়সমূহ ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাবে। ‘অতঃপর তা হয়ে যাবে উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা’ (ওয়াক্বিআহ ৫৬/৫-৬)।
(গ) ‘পাহাড়সমূহ হবে বালুকাসূতপ’ (মুযযাম্মিল ৭৩/১৪)।
(ঘ) ‘পাহাড়সমূহ চালিত হয়ে মরীচিকা হয়ে যাবে’ (নাবা ৭৮/২০)।
(ঙ) ‘এবং পাহাড়সমূহ হয়ে যাবে ধূনিত তুলার ন্যায়’ (ক্বারেআহ ১০১/৫) ইত্যাদি। এক কথায় বলা যায়, ক্বিয়ামতের পর ভূপৃষ্ঠে পাহাড়ের কোন চিহ্ন থাকবে না। কেননা ঐ সময় পাহাড়ের আর কোন প্রয়োজন থাকবে না।
الْعِشَارُ শব্দটি عشراء এর বহুবচন। অর্থ : এমন গর্ভবতী উটনী যার গর্ভধারণের দশমাস পূর্ণ হয়ে গেছে।
عُطِّلَتْ অর্থাৎ ছেড়ে দেয়া হবে, কোন রাখাল থাকবে না। এখানে দশমাসের গর্ভবতী উটনীকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো : এরূপ গর্ভবতী উটনী আরবদের নিকট খুবই প্রিয়। এত প্রিয় বস্তু হওয়ার পরেও কিয়ামতের আতংক তাদেরকে এ সম্পর্কে গাফেল করে ফেলবে। এত মূল্যবান জিনিস কি হয়ে গেল বা কোথায় চলে গেল কোন খোঁজ খবর থাকবে না। অথবা বলা হয়, এটা উদাহরণ স্বরূপ বলা হয়েছে কেননা কিয়ামত দিবসে কোন গর্ভবতী উটনী থাকবেনা। উদ্দেশ্য হলো : যদি কিয়ামতের দিন কোন মানুষের এরূপ মূল্যবান সম্পদ থাকত তাহলে এরূপ মূল্যবান সম্পদও ছেড়ে দিত, কিয়ামতের ভয়াবহতা দেখে তার প্রতি কোন ভ্রুক্ষেপ করত না ।
ক্বিয়ামতের দিন পশু-পক্ষী এমনকি পিঁপড়াও পুনর্জীবিত হবে। অতঃপর শিংওয়ালাদের কাছ থেকে অত্যাচারিত শিংহীনদের বদলা নেওয়া হবে । এরপর বলা হবে তোমরা সব মাটি হয়ে যাও। ফলে সব মরে মাটি হয়ে যাবে। বাকী থাকবে কেবল জিন ও ইনসান শেষ বিচারের জন্য’। একই মর্মে বর্ণনা করেছেন হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রাঃ)। অত্যাচারী পশুর কাছ থেকে যখন বদলা নেয়া হবে, তখন অত্যাচারী বনু আদমের অবস্থা কেমন হবে সহজেই বুঝা যায় (কুরতুবী)। আল্লাহ বলেন, ‘যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখি দু’ডানায় ভর করে উড়ে বেড়ায়, তারা সবাই তোমাদের মত একেকটি সৃষ্টি মাত্র। আমরা এই কিতাবে (দ্বীন-দুনিয়ার) কোন কিছুই (লিখতে) ছাড়িনি। অতঃপর তারা সবাই তাদের পালনকর্তার নিকটে সমবেত হবে’ (আন’আম ৬/৩৮)।
পশু-পক্ষীর বিচারের বিষয়টি কাফেরদের ভয় দেখানোর উদ্দেশ্যে প্রতীকী বিচার হতে পারে। কেননা জিন ও ইনসান ব্যতীত অন্য কারু জন্য শারঈ বিধান মান্য করার বাধ্যবাধ্যকতা নেই।
এখানে سُجِّرَتۡۙ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মূল হচ্ছে তাসজীর ( سُجِّرَتۡۙ ) এবং তা থেকে অতীতকালে কর্মবাচ্য এ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। সাধারণত চুল্লীতে আগুন জ্বালাবার জন্য ‘তাসজীর’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। কিয়ামতের দিন সমুদ্রে আগুন লেগে যাবে, একথাটা আপাত দৃষ্টে বিস্ময়কর মনে হয়। কিন্তু পানির মূল তত্ত্ব ও উপাদান সম্পর্কে ধারণা থাকলে এর মধ্যে কোন কিছুই বিস্ময়কর মনে হবে না। আল্লাহ তাঁর অসীম ক্ষমতা ও অলৌকিক কার্যক্রমের সাহায্যে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেনের মত এমন দু’টি গ্যাসকে একসাথে মিশ্রিত করে রেখেছেন যাদের একটি আগুন জ্বালায় এবং অন্যটি নিজে জ্বলে। এই দু’টি গ্যাসের সংমিশ্রণে পানির মতো এমন একটি বস্তু সৃষ্টি করেছেন যা আগুন নিভিয়ে দেয়। আল্লাহর অসীম ক্ষমতার একটি ইঙ্গিতই পানির এই মিশ্রণ পরিবর্তন করে দেবার জন্য যথেষ্ট। তখন তারা পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে তাদের মূল প্রকৃতি অনুযায়ী জ্বালাবার ও জ্বলার কাজে ব্যাপৃত হবে।
ক্বিয়ামতের প্রাক্কালে সংঘটিতব্য ৬টি বিষয় বর্ণনা শেষে এবার ক্বিয়ামতের পরে আখেরাতে সংঘটিতব্য ৬টি বিষয় বর্ণিত হচ্ছে।
এর অর্থ হচ্ছে, যখন মানুষকে জোড়া জোড়া করা হবে। অর্থাৎ মানুষের আমল অনুসারে তাদের শ্রেণীবিভাগ করা হবে। যখন হাশরে সমবেত লোকদেরকে বিভিন্ন দলে দলবদ্ধ করে দেয়া হবে। এই দলবদ্ধকরণ ঈমান ও কর্মের দিক দিয়ে করা হবে। কাফের এক জায়গায় ও মুমিন এক জায়গায়। কাফের এবং মুমিনের মধ্যেও কর্ম এবং অভ্যাসের পার্থক্য থাকে। এদিকে দিয়ে কাফেরদেরও বিভিন্ন প্রকার দল হবে আর মুমিনদেরও বিশ্বাস এবং কর্মের ভিত্তিতে দল হবে। যারা ভাল হোক মন্দ হোক একই প্রকার কর্ম করবে তাদেরকে এক জায়গায় জড়ো করা হবে।
উদাহরণত ইহুদীরা ইহুদীদের সাথে, নাসারারা নাসারাদের সাথে, মুনাফিকরা মুনাফিকদের সাথে এক জায়গায় সমবেত হবে। মূলত হাশরে লোকদের তিনটি প্রধান দল হবে- (১) পূর্ববর্তী সৎকর্মী লোকদের (২) আসহাবুল ইয়ামীনের এবং (৩) আসহাবুশ শিমালের দল। প্রথমোক্ত দুই দল মুক্তি পাবে এবং তৃতীয় দলটি হবে কাফের পাপাচারীদের। তারা মুক্তি পাবে না। [তাবারী, কুরতুবী] এ আয়াতের আরেকটি অর্থও হতে পারে। আর তা হল, “যখন আত্মাকে দেহের সাথে পুনঃমিলিত করা হবে। কেয়ামতের সময়ে সকলকে জীবিত করার জন্য প্রথমে দেহকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। অতঃপর আত্মাকে দেহের সাথে সংযোজন করা হবে। [কুরতুবী, ইবন কাসীর] এ আয়াত এবং এর পূর্ববর্তী আয়াত থেকে কিয়ামতের দ্বিতীয় অংশের আলোচনা শুরু হচ্ছে।
الْمَوْؤ۫دَةُ বলা হয় المدفونة حية বা জীবন্ত প্রোথিত সন্তানকে। অর্থাৎ জাহিলী যুগের মানুষেরা কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করত। কারণ কন্যা সন্তান তাদের নিকট অপমানজনক বলে মনে করত। জাহেলী যুগের আরবরা কয়েকভাবে কন্যা সন্তান হত্যা করত।
জাহেলী আরবদের কিছু লোকের মধ্যে এ কুসংস্কার ছিল মূলতঃ তিনটি কারণে। ১. ধর্মীয় বিশ্বাসগত কারণে। ২. অর্থনৈতিক কারণে এবং ৩. সামাজিক কারণে।
প্রথমোক্ত কারণটি ছিল এই যে, তারা বলত, মেয়েরা সব আল্লাহর কন্যা। তাই কন্যা সন্তান দাফন করে তাকে তারা আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দিত। যেমন ভারতের হিন্দুরা সদ্য বিধবা জীবন্ত নারীকে তার মৃত স্বামীর চিতায় জোর করে তুলে দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে স্বর্গে পাঠিয়ে দিত। একে বলা হত ‘সতীদাহ প্রথা’।
দ্বিতীয়টি ছিল দরিদ্রতার কারণে এবং কন্যা সন্তান মানুষ করা ও তাকে বিয়ে দেয়ার বোঝা বহনে অক্ষমতা। বর্তমানে ভারতে দরিদ্রতার কারণে প্রতি বছর হাযার হাযার কন্যা সন্তানের ভ্রুণ হত্যা করা হচ্ছে। তৃতীয় কারণ ছিল, যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় মেয়েদের বন্দী করে নিয়ে যাওয়া ও দাসীবৃত্তি করানোর লজ্জা থেকে বাঁচা। শেষোক্তটি মর্যাদাগত কারণে ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে করত। সাধারণতঃ একাজ মায়েরাই করত। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, প্রসবের প্রাক্কালে তারা ঘরের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে রাখত। মেয়ে হলে সাথে সাথে গর্তে মাটি চাপা দিয়ে মেরে ফেলত। আল্লাহ বলেন, – ‘তারা আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান নির্ধারণ করত। অথচ তিনি (এসব থেকে) পবিত্র। আর তাদের জন্য ওটাই (অর্থাৎ পুত্র সন্তান) যা তারা কামনা করত’। ‘যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হত, তখন তাদের চেহারা মলিন হয়ে যেত। আর সে ক্রোধে ক্লিষ্ট হত’। ‘তাকে শুনানো সুসংবাদের (?) গ্লানিতে সে সম্প্রদায়ের লোকদের থেকে মুখ লুকিয়ে রাখত। সে ভাবত যে, গ্লানি সহ্য করেও মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! এর মাধ্যমে তারা কতই না নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত নিত’ (নাহল ১৬/৫৭-৫৯)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা বোকামি ও অজ্ঞতা বশে নিজ সন্তানদের হত্যা করেছে’ … (আন’আম ৬/১৪০)।
জাহেলী আরবরা বিভিন্নভাবে সন্তান হত্যা করত। যেমন-
১. প্রসবের পূর্বক্ষণে ঘরের মধ্যে গর্ত খনন করে রাখত, কন্যা সন্তান হলে সাথে সাথে গর্তে পুঁতে দিত।
২. মেয়ে একটু বড় হলে বাবা তাকে নিয়ে কোন কুয়ায় নিক্ষেপ করত।
৩. কন্যার বয়স ছয় থেকে সাত বছর হলে পিতা কন্যার মাকে বলত মেয়েকে ভালভাবে সাজিয়ে দিতে। তারপর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে মুরুভুমিতে গর্ত খুড়ে পুঁতে দিত। এসব জীবন্ত প্রোথিত কন্যদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এটা জানা কথা যাদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করা হয়েছে তাদের কোন অপরাধ নেই, মূলত উদ্দেশ্য হলো হত্যাকারীরদেরকে ভর্ৎসনা করা।
সুনানে দারামির প্রথম অধ্যায়ে এ হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার জাহেলী যুগের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ আমার একটি মেয়ে ছিল। সে আমাকে খুব ভালোবাসতো। তার নাম ধরে ডাকলে সে দৌড়ে আমার কাছে আসতো। একদিন আমি তাকে ডাকলাম। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। পথে একটি কূয়া পেলাম। তার হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে কূয়ার মধ্যে ফেলে দিলাম। তার যে শেষ কথাটি আমার কানে ভেসে এসেছিল তা ছিল, হায় আব্বা! হায় আব্বা! একথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন বললেনঃ ওহে, তুমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোকার্ত করে দিয়েছো। তিনি বললেনঃ থাক, তোমরা একে বাধা দিয়ো না। যে বিষয়ে তার কঠিন অনুভূতি জেগেছে সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করতে দাও। তারপর তিনি তাকে বললেনঃ তোমার ঘটনাটি আবার বর্ণনা করো। সেই ব্যক্তি আবার তা শুনালেন। ঘটনাটি আবার শুনে তিনি এত বেশী কাঁদতে থাকলেন যে, চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেলো। এরপর তিনি বললেন, জাহেলী যুগে যা কিছু করা হয়েছে আল্লাহ তা মাফ করে দিয়েছেন। এখন নতুন করে জীবন শুরু করো।
একথা মনে করা ভুল হবে যে, আরববাসীরা এই চরম অমানবিক কাজটি কদর্যতার কোন অনুভূতিই রাখতো না। কোন সমাজ যত বেশী বিকৃতই হোক না কেন তা কখনো এই ধরনের জুলুম ও অমানবিক কাজকে একেবারেই অন্যায় মনে করবে না, এমনটি কখনই হতে পারে না। তাই কুরআন মজীদে এই কাজটির কদর্যতা ও দূষণীয় হওয়া সম্পর্কে কোন লম্বা চওড়া ভাষণ দেয়া হয়নি। বরং কতিপয় লোমহর্ষক শব্দের মাধ্যমে কেবল এতটুকু বলেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে যে, এমন এক সময় আসবে যখন জীবিত পুঁতে ফেলা মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন দোষে তোমাকে হত্যা করা হয়েছিল? আরবের ইতিহাস থেকেও জানা যায়, জাহেলী যুগে অনেক লোকের এই রীতিটির কদর্যতার অনুভূতি ছিল। তাবারানীর বর্ণনা মতে কবি ফারাযদাকের দাদা সা’সা’ ইবনে নাজীয়াহ আলমুজাশেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করে, যে আল্লাহর রসূল! আমি জাহেলী যুগে কিছু ভালো কাজও করেছি। এরমধ্যে একটি হচ্ছে, আমি তিনশ ষাটটি মেয়েকে জীবিত কবর দেয়া থেকে রক্ষা করেছি। তাদের প্রত্যেকের প্রাণ বাঁচাবার বদলে দু’টি করে উট বিনিময় মূল্য হিসেবে দিয়েছি। আমি কি এর প্রতিদান পাবো? জবাবে তিনি বলেনঃ তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে এবং সে পুরস্কার হচ্ছে, আল্লাহ তোমাকে ইসলামের নিয়ামত দান করেছেন।
আসলে এটি ইসলামের একটি বিরাট অবদান। ইসলামের কেবলমাত্র আরবের এই নিষ্ঠুর ও জঘন্য প্রথাটি নির্মূল করেনি বরং এই সঙ্গে মেয়ের জন্ম যে একটি দুর্ঘটনা এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও একে গ্রহণ করে নিতে হয়–এই ধরনের চিন্তাও ধারণারও চিরতরে অবসান ঘটিয়েছে। বিপরীত পক্ষে ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে, মেয়েদের লালন পালন করা, তাদেরকে উত্তম দীক্ষা দেয়া এবং ঘর সংসারে কাজে পারদর্শী করে গড়ে তোলা অনেক বড় নেকীর কাজ। রসূলুল্লাহ ﷺ এ ব্যাপারে মেয়েদের সম্পর্কে মানুষের সাধারণ ধারণা যেভাবে পরিবর্তন করে দেন হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে তা আন্দাজ করা যাবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমি নীচে কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করছিঃ
- “এই মেয়েদের জন্মের মাধ্যমে যে ব্যক্তিকে পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়, তারপর সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার কারণে পরিণত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
- “যে ব্যক্তি দু’টি মেয়ের লালনপালন করে, এভাবে তারা বালেগ হয়ে যায়, সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে ঠিক এভাবে আসবে। একথা তিনি নিজের আঙুলগুলো একসাথে করে দেখান।” (মুসলিম)
- “যে মুসলমানের দু’টি মেয়ে থাকবে, সে যদি তাদেরকে ভালোভাবে রাখে, তাহলে তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।” (ইমাম বুখারীর আদাবুল মুফরাদ)
- “নবী ﷺ সুরাকাহ ইবনে জা’শূমকে বলেন, আমি কি তোমাকে বলবো সবচেয়ে বড় সাদকাহ (অথবা বলেন, বড় সাদকাগুলোর অন্যতম) কি? সুরাকাহ বলেন, অবশ্যই বলুন হে আল্লাহর রসূল! তিনি বলেন, তোমার সেই মেয়েটি যে (তালাক পেয়ে অথবা বিধবা হয়ে) তোমার দিকে ফিরে আসে এবং তুমি ছাড়া তার আর কোন উপার্জনকারী থাকে না।” (ইবনে মাজাহ ও বুখারী ফিল আদাবিল মুফরাদ)
এই শিক্ষার ফলে মেয়েদের ব্যাপারে কেবল আরবদেরই নয় দুনিয়ার অন্যান্য যেসব জাতি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সবার দৃষ্টিভংগীই বদলে গেছে।
হাসান বাছরী বলেন, বর্ণিত আয়াতে জীবন্ত প্রোথিত কন্যা শিশুকে হত্যার কারণ জিজ্ঞেস করার অর্থ হল হত্যাকারীকে ধমকানো। কেননা শিশুটিকে বিনা দোষে হত্যা করা হয়েছে। বস্ত্ততঃ এটাই হলো হত্যাকারীকে ধমকানোর সর্বোত্তম পন্থা। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন ঐ মেয়েটি তার বাপকে ধরে বলবে- ‘কি অপরাধে আপনি আমাকে হত্যা করেছিলেন’ ? সেদিন পিতা কোন জবাব দিতে পারবে না। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, মেয়ে তার মাকে ধরে এনে বলবে, ‘হে আমার রব! এই আমার মা। ইনি আমাকে হত্যা করেছিলেন’ (কুরতুবী)। ইবনু কাছীর বলেন, ‘মযলূম কন্যা সন্তানকেই যখন এভাবে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন যালেম পিতা-মাতাকে কেমন অবস্থা করা হবে? (ইবনু কাছীর)। এযুগে যেসব নিষ্ঠুর মায়েরা তাদের সন্তানদের জীবন্ত ফেলে দিচ্ছে, তারা সাবধান হবে কি?
نُشِرَتْ অর্থ ‘বন্ধ করার পর যা খোলা হয়’। যে সকল ফেরেশতা মানুষের ভাল-মন্দ কার্যসমূহ লিপিবদ্ধ করার দায়িত্বে নিযুক্ত থাকেন, মানুষের মৃত্যুর সাথে সাথে উক্ত আমলনামা তারা বন্ধ করে দেন। ক্বিয়ামতের দিন সেটাই তার সম্মুখে খুলে দেওয়া হবে। তখন সেই আমলনামা দেখে মানুষ বলে উঠবে- ‘হায় আফসোস! এ কেমন আমলনামা যে ছোট-বড় কোন কিছুই লিখতে বাদ রাখেনি’ (কাহফ ১৮/৪৯)।
এ বিষয়ে সূরা হাক্কাহ ১৮ হতে ২৯ আয়াত পর্যন্ত ক্বিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফিরের আনন্দ ও বিষাদময় বর্ণনা সমূহ উল্লেখিত হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক মানুষের কর্মকে তার গ্রীবালগ্ন করে রেখেছি এবং ক্বিয়ামতের দিন তাকে বের করে দেখাব একটি কিতাব, যা সে খোলা অবস্থায় পাবে’। ‘(অতঃপর বলা হবে) পাঠ কর তুমি তোমার আমলনামা। আজ তোমার হিসাবের জন্য তুমিই যথেষ্ট’ (বনি ইস্রাঈল ১৭/১৩-১৪)।
كُشِطَتْ অর্থ ‘উৎপাটন করা হয়েছে, বিদূরিত করা হয়েছে। যেমন যবহকৃত পশুর চামড়া খুলে নেয়া হয়’। ক্বিয়ামতের দিন আকাশকে তার স্থান থেকে সরিয়ে নেয়া হবে, যেমন কোন কিছুর উপর থেকে আবরণ সরিয়ে নেয়া হয়। আকাশকে অতঃপর ভাজ করা হবে। যেভাবে কাগজ ভাজ করা হয়। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাজ করা অবস্থায় থাকবে’ (যুমার ৩৯/৬৭)। তিনি বলেন, ‘যেদিন আমরা আকাশকে ভাজ করে নেব, যেমন ভাজ করা হয় লিখিত কাগজপত্র। যেভাবে আমরা প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম, সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব। আমাদের ওয়াদা সুনিশ্চিত। আমরা তা পূর্ণ করবই’ (আম্বিয়া ২১/১০৪)। আল্লাহ বলেন, – ‘যেদিন আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং তা রক্তরঞ্জিত চামড়ার রূপ ধারণ করবে’ (রহমান ৫৫/৩৭)। এসময় কেবল আল্লাহর আরশ বাকী থাকবে। যেমন তিনি বলেন, ‘সেদিন তাদের উপরে তোমার পালনকর্তার আরশ বহন করবে আটজন ফেরেশতা’ (হাক্কাহ ৬৯/১৭)। তিনি পৃথিবীকেও কব্জায় নিবেন আর বলবেন, ‘আমিই বাদশাহ। পৃথিবীর রাজা-বাদশাহরা কোথায়’?
জান্নাত ও জাহান্নাম উভয়টি সৃষ্ট অবস্থায় আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) মি’রাজ রজনীতে তা স্বচক্ষে দেখেছেন। জাহান্নাম তো সর্বদাই উত্তপ্ত। তাহ’লে ক্বিয়ামতের দিন উত্তপ্ত করা হবে অর্থ কি? আল্লাহ বলেন, ‘(সেদিন) এর ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর’ (তাহরীম ৬৬/৬)। অর্থাৎ কাফের ও জ্বলন্ত পাথর দিয়ে জাহান্নামকে ঐদিন আরও উত্তপ্ত করা হবে। এক্ষণে বর্ণিত আয়াতে سُعِّرَتْ অর্থ হবে ‘উত্তপ্ত করা হবে এবং তার উত্তাপ অধিক বৃদ্ধি করা হবে’।
أُزْلِفَتْ অর্থ ‘জান্নাতকে জান্নাতবাসীর নিকটবর্তী করা হবে’। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, ‘জান্নাতকে মুক্তাক্বীদের নিকটবর্তী করা হবে’ (শো’আরা ২৬/৯০)। হাসান বাছরী বলেন, এর অর্থ হল মুত্তাক্বীদেরকে জান্নাতের নিকটে নেয়া হবে। এটা নয় যে, জান্নাত তার স্থান থেকে সরে আসবে’ (কুরতুবী)।
৭ আয়াত হতে ১৩ আয়াত পর্যন্ত ক্বিয়ামতের দিন সংঘটিতব্য আখেরাতের ৬টি বিষয় বর্ণিত হল। এভাবে ১ হতে ১৩ আয়াত পর্যন্ত ক্বিয়ামতের আগের ও পরের ৬+৬ মোট ১২টি বিষয় শর্তাকারে বর্ণিত হল। অতঃপর এগুলির জওয়াবে আল্লাহ বলেন,
পূর্ববর্তী শর্তগুলির জওয়াব হল অত্র আয়াতটি। ক্বিয়ামতের আগে-পিছে ১২টি বিষয় উপস্থাপনের উদ্দেশ্য হল বান্দাকে এটা বিশ্বাস করানো যে, তাকে অবশ্যই আল্লাহর নিকটে তার জীবনের সকল কাজের হিসাব দিতে হবে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন প্রত্যেকে চোখের সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে যেসব ভাল কাজ সে করেছিল এবং যা কিছু মন্দ কাজ সে করেছিল। সেদিন সে কামনা করবে, যদি এইসব কর্মের ও তার মধ্যকার ব্যবধান অনেক দূরের হতো’ (আলে ইমরান ৩/৩০)। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে, ‘মানুষকে সেদিন অবহিত করা হবে যা সে আগে ও পিছে প্রেরণ করেছে’ (ক্বিয়ামাহ ৭৫/১৩)।
এ পর্যন্ত প্রথম বিষয়বস্ত্ত ক্বিয়ামতের বর্ণনা শেষ হল। এক্ষণে দ্বিতীয় বিষয়বস্ত্ত কুরআনের বর্ণনা শুরু হল।–
أُقْسِمُ অর্থ أُقْسِمُ ‘আমি শপথ করছি’। এখানে لاَ অব্যয়টি অতিরিক্ত। যা আনা হয়েছে বাক্যে তাকীদ সৃষ্টির জন্য।
بِالْخُنَّسِ الْجَوَارِ الْكُنَّسِ দ্বারা তাফসীরকারদের মতে, পাঁচটি বিচরণশীল গ্রহ উদ্দেশ্য: শনি, বৃহস্পতি, বুধ, মঙ্গল এবং শুক্র। আল্লাহই সর্বাধিক অবগত। এই মতটি আলী (রা.) থেকে বর্ণিত। অন্য সব নক্ষত্রের মধ্যে এগুলোকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার দুটি কারণ থাকতে পারে: প্রথমত, এগুলো সূর্যের মুখোমুখি হয়, যা বকর ইবনু আব্দুল্লাহ আল-মুযানী বলেছেন। দ্বিতীয়ত, এগুলো ছায়াপথ (Milky Way) অতিক্রম করে, যা ইবনু আব্বাস (রা.) বলেছেন। হাসান ও কাতাদা (রহ.) বলেন, এগুলো হলো সেইসব নক্ষত্র যা দিনের বেলায় অদৃশ্য (খানাস) হয়ে যায় এবং অস্ত যাওয়ার সময় লুকিয়ে (কানাস) পড়ে। আলী (রা.) থেকেও বর্ণিত, তিনি বলেন: এগুলো হলো সেই নক্ষত্র যা দিনে অদৃশ্য থাকে এবং রাতে প্রকাশিত হয়, আর অস্ত যাওয়ার সময় লুকিয়ে যায়, অর্থাৎ দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। ‘আস-সিহাহ’ গ্রন্থে বলা হয়েছে: ‘আল-খুন্নাস’ দ্বারা সকল নক্ষত্রকেই বোঝানো হয়, কারণ সেগুলো অস্ত যাওয়ার সময় বা দিনের বেলায় অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার এও বলা হয় যে, এর দ্বারা স্থির নক্ষত্রের পরিবর্তে শুধু বিচরণশীল গ্রহগুলোকেই বোঝানো হয়েছে। আল-ফাররা’ বলেন: ﴿فَلَا أُقْسِمُ بِالْخُنَّسِ الْجَوَارِ الْكُنَّسِ﴾ দ্বারা পাঁচটি গ্রহ—শনি, বৃহস্পতি, মঙ্গল, শুক্র এবং বুধ—উদ্দেশ্য। কারণ এগুলো নিজ কক্ষপথে পশ্চাদপসরণ করে (খানাস) এবং লুকিয়ে যায় (কানাস), যেমন হরিণ তার গুহায় (কিনাস) আশ্রয় নেয়। ‘খানাস’ শব্দটি পিছিয়ে যাওয়া অর্থে ব্যবহৃত হয়।
عَسْعَسَ শব্দটির দুটি অর্থ হতে পারে। একটি উপরে আছে, তা হচ্ছে বিদায় নেয়া, শেষ হওয়া। অপর অর্থ হল আগমন করা, প্রবেশ করা। তখন আয়াতটির অর্থ হয়, শপথ রাতের, যখন তা আগমন করে।
রাত্রির অন্ধকার ভেদ করে সূর্যের আলো বেরিয়ে আসে- এই মর্মটি ফুটিয়ে তোলার জন্যেই এখানে طَلَعَ না বলে تَنَفَّسَ বলা হয়েছে। যাতে বান্দার জন্য ইঙ্গিত রয়েছে পৃথিবীর ঘূর্ণায়মান হওয়ার প্রতি এবং এর আহ্নিক গতির প্রতি, যা ২৪ ঘণ্টায় একবার নিজ অক্ষকেন্দ্রে আবর্তন করে থাকে এবং যার ফলে দিবস ও রাত্রির আগমন ও নির্গমন ঘটে। মাত্র একটি (تَنَفَّسَ ) শব্দে বিজ্ঞানের একটি বিরাট উৎসের সন্ধান দেওয়া হয়েছে এই আয়াতে। অথচ নিরক্ষর নবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) কখনোই কোন বৈজ্ঞানিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। কুরআন যে স্রেফ আল্লাহর কালাম- এতে যে নবী বা ফেরেশতার বক্তব্যের কোন মিশ্রণ নেই, এ সকল বৈজ্ঞানিক আয়াত তার অন্যতম প্রকৃষ্ট প্রমাণ।
এর মাধ্যমে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন যে, আল্লাহ ব্যতীত আর কে আছে যে রাত্রিকে সরিয়ে দিবসকে বের করে আনতে পারে? এটা কেবল আল্লাহরই একক ক্ষমতা। যেমন তিনি বলেন, ‘তুমি বলে দাও, তোমরা ভেবে দেখেছ কি? যদি আল্লাহ রাত্রিকে তোমাদের উপর ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের এমন কোন উপাস্য আছে, যে তোমাদের নিকট সূর্যকিরণ এনে দেবে? তবুও কি তোমরা কথা শুনবে না’? ‘তুমি বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি? যদি আল্লাহ দিবসকে তোমাদের উপর ক্বিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ী করে দেন, তবে আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের এমন কোন উপাস্য আছে, যে তোমাদের নিকট রাত্রি এনে দিবে, যাতে তোমরা বিশ্রাম নিতে পারবে? তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না’? (ক্বাছাছ ২৮/৭১-৭২)।
এখানে সম্মানিত বাণীবাহক (رَسُولٍ كَرِيمٍ) বলতে অহী আনার কাজে লিপ্ত ফেরেশতা জিবরীল আলাইহিস সালামকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তী আয়াতে এ-কথাটি আরো সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। নবী-রাসূলগণের মতো ফেরেশতাগণের বেলায়ও রাসূল শব্দ ব্যবহৃত হয়। উল্লেখিত সবগুলো বিশেষণ জিবরীল আলাইহিস সালাম এর জন্যে বিনা দ্বিধায় প্রযোজ্য। তিনি যে শক্তিশালী, তা অন্যত্রও বলা হয়েছে, (عَلَّمَهُ شَدِيدُ الْقُوَىٰ) “তাঁকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী” [সূরা আন-নাজম: ৫]। তিনি যে আরাশ ও আকাশবাসী ফেরেশতাগণের মান্যবর তা মিরাজের হাদীস দ্বারা প্ৰমাণিত আছে; তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে আকাশে পৌছলে তাঁর আদেশে ফেরেশতারা আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়। তিনি যে أمين তথা বিশ্বাসভাজন তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না; আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই তার আমানত বা বিশ্বস্ততার ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে অহীর আমানত দিয়েছেন। [ইবন কাসীর, কুরতুবী]
আর কুরআনকে “বাণীবাহকের বাণী” বলার অর্থ এই নয় যে, এটি ঐ সং ফেরেশতার নিজের কথা। বরং “বাণীবাহকের বাণী” শব্দ দুটিই একথা প্ৰকাশ করছে যে, এটি সেই সত্তার বাণী যিনি তাকে বাণীবাহক করে পাঠিয়েছেন। সূরা ‘আল হাক্কার ৪০ আয়াতে এভাবে কুরআনকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বাণী বলা হয়েছে। সেখানেও এর অর্থ এই নয় যে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের রচনা। বরং একে “রাসূলে করীমের” বাণী বলে একথা সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি পেশ করছেন, মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ হিসেবে নয়। উভয় স্থানে বাণীকে ফেরেশতা ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে সম্পর্কিত করার কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহর বাণী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বাণীবহনকারী ফেরেশতার মুখ থেকে এবং লোকদের সামনে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল। [বাদায়িউত তাফসীর]
অত্র আয়াত দু’টিতে জিব্রীলের চারটি গুণ বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথম গুণ তিনি হলেন ذِيْ قُوَّةٍ ‘শক্তিশালী’। অন্যত্র বর্ণিত হয়েছে- ‘তাকে শিক্ষা দান করেন এক শক্তিশালী ফেরেশতা’। ‘যিনি সহজাত শক্তিসম্পন্ন। যিনি নিজ আকৃতিতে প্রকাশ পেলেন’। ‘যখন তিনি ছিলেন ঊর্ধ্ব দিগন্তে’ (নাজম ৫৩/৫-৭)। বস্ত্ততঃ জিব্রীলের সহজাত শক্তির আধিক্য বর্ণনার জন্য অত্র আয়াতে ذُو مِرَّةٍ বিশেষণটি ব্যবহৃত হয়েছে। যাতে করে এই ধারণার অবকাশ না থাকে যে, অহী নিয়ে আগমনকারী ফেরেশতার কাজে কোন শয়তান প্রভাব খাটাতে পারে। কেননা জিব্রীল (আঃ) এতই শক্তিশালী যে শয়তান তার কাছেও ঘেঁষতে পারে না। তাছাড়া তিনি আল্লাহর যেকোন হুকুম পালনে সক্ষম। বস্ত্ততঃ জিব্রীলের শক্তিমত্তার বহু প্রমাণ দুনিয়াতেই রয়েছে। যেমন লূত (আঃ)-এর কওমকে ভূমি ও নগরীসহ চোখের পলকে উৎপাটিত করে ফের উপুড় করে ফেলে ধ্বংস করে দেওয়া। এছাড়াও রয়েছে আদ, সামূদ, শুআয়েব প্রমুখ নবীদের শক্তিশালী জাতিগুলিকে নিমিষে নিশ্চিহ্ন করার ইতিহাস। এর দ্বারা বুঝানো হয়েছে যে, জিব্রীলকে প্রকৃতিগতভাবেই আল্লাহ মহাশক্তিশালী করে সৃষ্টি করেছেন।
দ্বিতীয় গুণ হল مَكِيْنٍ বা মর্যাদাবান। অর্থ ‘আল্লাহর নিকটে রয়েছে তাঁর বিশেষ স্থান ও উচ্চ মর্যাদা’।
তৃতীয় গুণ হল مُطَاعٍ ثَمَّ ‘সেখানে মান্যবর’ অর্থাৎ ‘উচ্চতম স্থানের ফেরেশতাগণ তার কথার অনুবর্তী’। তিনি সাধারণ ফেরেশতা নন; বরং ফেরেশতাগণের সর্দার। আর সেজন্যই তাঁকে আল্লাহ ও রাসূলের মাঝে অহী প্রেরণের মহান দূতিয়ালীর জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
চতুর্থ গুণ হল أَمِيْنٍ অর্থ ‘আল্লাহ প্রদত্ত অহি ও রিসালাত পৌঁছানোর ব্যাপারে তিনি বিশ্বস্ত ও আমানতদার’। এটাই হল তাঁর জন্য সবচেয়ে বড় বিশেষণ যে, স্বয়ং আল্লাহ তাঁকে ‘আমীন’ বা আমানতদার বলে ঘোষণা করেছেন। তাই এটা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতে হবে যে, কুরআন ও হাদীছের যেটুকু অহী আল্লাহ তাঁর নবীর কাছে প্রেরণ করেন, জিব্রীল (আঃ) সেটুকু হুবহু যথাযথভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। একটি শব্দ বা বর্ণ সেখান থেকে খেয়ানত হয়নি।
এখানে ‘তোমাদের সাথী’ বলে মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে বুঝানো হয়েছে। জিব্রীলকে দেখা ও তার মাধ্যমে অহী নাযিলের বিষয়কে মুশরিক নেতারা বিশ্বাস করত না। তাই তারা রাসূল (সাঃ)-কে ‘পাগল’ বলত। আবার কখনো ‘ভূতে ধরা রোগী’ (رَجُلاً مَّسْحُوْرًا) বলত (ইসরা ১৭/৪৭)। এখানে সেকথারই জওয়াব দেওয়া হয়েছে। ১৯ নং আয়াতের ন্যায় এ আয়াতটিও جواب القسم বা পূর্ববর্তী শপথসমূহের জওয়াব হিসাবে এসেছে। অর্থাৎ আমি শপথ করে বলছি যে, মুহাম্মাদ পাগল নন। কিংবা তিনি জিনে ধরা রোগীর মত কোন কথা বলেন না বা জ্ঞান লোপ পাওয়া ব্যক্তির মত প্রলাপ বকেন না। আল্লাহ বলেন, ‘বরং তিনি এসেছেন সত্য সহকারে এবং তিনি বিগত রাসূলগণের সত্যায়ন করেন’ (ছাফফাত ৩৭/৩৭)।
অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিব্রীলকে তার নিজস্ব রূপে দেখেছেন। অতএব উক্ত ফেরেশতা তাঁর নিকটে অপরিচিত নন। তিনিই তার নিকটে অহী নিয়ে আগমন করে থাকেন।
উল্লেখ্য যে, জিব্রীলকে তার স্বরূপে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) দু’বার দেখেছেন। প্রথমবার মি’রাজের পূর্বে ও দ্বিতীয়বার মি’রাজের সময় সিদরাতুল মুনতাহায়। প্রথম দেখেন মক্কার বাত্বহা (بطحاء) উপত্যকায় ৬০০ ডানা বিশিষ্ট বিশাল অবয়বে। যাতে আসমান যমীনের মধ্যবর্তী দিগন্ত বেষ্টিত হয়ে পড়ে। আয়েশা (রাঃ) বলেন, সাধারণতঃ জিব্রীল রাসূল (সাঃ)-এর নিকট আসতেন একজন পুরুষ মানুষের বেশ ধারণ করে। কিন্তু এবার তিনি আসেন নিজস্ব রূপে। যাতে দিগন্তরেখা বন্ধ হয়ে যায়’। ‘ইবনু মাসঊদ (রাঃ)-এর বর্ণনায় এসেছে, এসময় তাঁর ৬০০ ডানা ছিল’। যা বর্তমান সূরায় এবং সূরা নজম ৫ হতে ১০ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। দ্বিতীয়বার দেখেন মে’রাজ রজনীতে, যা বর্ণিত হয়েছে সূরা নজম ১৩ হতে ১৬ আয়াতে। আর এটা স্পষ্ট (আল্লাহ সর্বাধিক অবগত) যে, বর্তমান সূরাটি মে’রাজের রাত্রির আগে নাযিল হয়েছে। কেননা এখানে মাত্র একটি দর্শনের কথা বলা হয়েছে, যেটি প্রথম দর্শন। আর দ্বিতীয়বার দর্শনটি বলা হয়েছে সূরা নজম ১৩ আয়াতে’ (ইবনু কাছীর)। বস্ত্ততঃ জিব্রীলকে স্বরূপে দেখানোর উদ্দেশ্য হল রাসূল (সাঃ)-এর বিশ্বাসকে আরও মযবুত করা এবং এটা নিশ্চিত করা যে, তাঁর আনীত ইসলামী শরী‘আত স্পষ্ট ও দিব্যজ্ঞানের উপর ভিত্তিশীল। কোনরূপ ধারণা ও কল্পনার উপরে নয় ।
অর্থাৎ, আল্লাহ তাঁর প্রতি যা ওহী করেছেন, সে বিষয়ে তিনি অভিযুক্ত নন যে তিনি তাতে কিছু বৃদ্ধি করেন, হ্রাস করেন অথবা তার কোনো অংশ গোপন করেন। বরং তিনি (ﷺ) আসমান ও যমিনের অধিবাসীদের নিকট বিশ্বস্ত, যিনি তাঁর রবের বার্তা সুস্পষ্টভাবে পৌঁছে দিয়েছেন। তিনি এর কোনো অংশই ধনী বা দরিদ্র, নেতা বা অনুসারী, পুরুষ বা নারী, শহরবাসী বা গ্রামবাসী—কারো থেকেই গোপন করেননি।
অর্থাৎ কোন শয়তান এসে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কানে এসব কথা বলে যায়, তোমাদের এ ধারণা ভুল। শয়তান কেন মানুষকে শিরক, মূর্তিপূজা, কুফরী ও আল্লাহদ্রোহিতা থেকে সরিয়ে আল্লাহপরস্তি ও তাওহীদের শিক্ষা দেবে? কেন সে মানুষের মনে লাগামহীন উটের মতো স্বাধীন জীবন যাপন করার পরিবর্তে আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন ও তাঁর সামনে জবাবদিহি করার অনুভূতি জাগাবে? জাহেলী রীতিনীতি, জুলুম, দুর্নীতি ও দুস্কৃতির পথে চলতে বাধা দিয়ে কেন সে মানুষকে পবিত্র ও নিষ্কলুষ জীবন যাপন এবং ন্যায়, ইনসাফ, তাকওয়া ও উন্নত নৈতিক চারিত্রিক গুণাবলী অর্জন করতে উদ্ধুদ্ধ করবে? এই ধরনের কাজ করা শয়তানের পক্ষে কোনক্রমেই সম্ভব নয়।
অর্থাৎ, এ ধরনের চিন্তা তোমাদের মাথায় কীভাবে আসে? তোমাদের বুদ্ধি-বিবেচনা কোথায় হারিয়ে গেল? তোমরা কীভাবে সত্যকে—যা সত্যের সর্বোচ্চ শিখরে অবস্থিত—মিথ্যার সমপর্যায়ে গণ্য করলে, যা কি না সবচেয়ে নিকৃষ্ট [এবং ঘৃণ্য] ও সর্বনিম্ন পর্যায়ের বাতিল? এটা তো বাস্তবতা বা সত্যকে সম্পূর্ণরূপে উল্টে দেওয়ার নামান্তর।
কুরআন হল বিশ্ববাসীদের জন্য উপদেশ এবং অফুরন্ত কল্যাণের উৎস। যা থেকে মানুষ যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব নেবে এবং মানসিক শান্তি ও দুনিয়া-আখেরাতের কল্যাণ লাভ করবে। অন্য আয়াতে কুরআনের বিশেষণে আল্লাহ বলেছেন, ‘এ কুরআন মানুষের জন্য বিস্তৃত ব্যাখ্যা, সুপথ প্রদর্শক এবং আল্লাহভীরুদের জন্য উপদেশবাণী’ (আলে ইমরান ৩/১৩৮)। অন্যত্র তিনি বলেন, ‘মানুষের জন্য হেদায়াত এবং হেদায়াতের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যাবলী এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী’ (বাক্বারাহ ২/১৮৫)। কুরআনের এ সত্য শাশ্বত ও চিরন্তন। যা যুগের পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তনশীল নয়। বরং কুরআন হল যুগ ও সমাজের পরিবর্তনকারী।
অর্থাৎ কুরআন হল উপদেশগ্রন্থ ঐ ব্যক্তির জন্য, যে ব্যক্তি শিরক বিমুক্ত নির্ভেজাল তাওহীদ বিশ্বাস ও ছহীহ সুন্নাহর উপরে দৃঢ় থাকতে চায়। কেননা প্রকৃত সত্যের সন্ধানী যারা, কুরআন হল তাদের চূড়ান্ত পথ নির্দেশক। এ পথেই রয়েছে মুক্তি। আর অন্য পথে রয়েছে কেবলই ধ্বংস আর বিপত্তি। ইবনু কাছীর বলেন,- ‘যে ব্যক্তি সুপথ পেতে চায়, তার জন্য অপরিহার্য হল এই কুরআন। কেননা এটিই হল তার জন্য নাজাত ও হেদায়াতের পথ। এর বাইরে কোন সুপথ নেই’।
এখানে استقامت তথা দৃঢ় থাকার কথা বলা হয়েছে। কেননা যুক্তিবাদী দোদেল বান্দার কোন স্থান আল্লাহর কাছে নেই। আল্লাহ তার রাসূলকে এ বিষয়ে বিশেষভাবে নির্দেশ দিয়ে বলেন- ‘তোমাকে যেভাবে নির্দেশ করা হয়েছে, সেভাবে দৃঢ় থাক এবং যারা তোমার সঙ্গে তওবা করেছে তারাও। (কোন অবস্থায়) সীমালংঘন করবে না। নিশ্চয়ই তিনি সবকিছু দেখেন যা তোমরা করো’ (হূদ ১১/১১২)। এ আয়াতে শুধু নবীকেই নয়, সকল ঈমানদার ও মুত্তাকী মুসলমানকে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেননা দুনিয়ার যত অশান্তির মূলে হল বাতিলের সঙ্গে আপোষকামী দুর্বলচেতা লোকেরা। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি কখনই তাদের দলভুক্ত হবে না।
শয়তানের জাঁকজমক ও বাতিলে ভরা এ দুনিয়ায় আল্লাহর পথে দৃঢ় থাকা খুবই কঠিন বিষয়। যারা সত্যের উপরে দৃঢ় থাকে, তাদের ইহকালীন ও পরকালীন পুরস্কার সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা বলে আমাদের পালনকর্তা আল্লাহ। অতঃপর তার উপর অবিচল থাকে। তাদের উপরে ফেরেশতাগণ নাযিল হয় এবং বলে, তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তা করো না, তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর’। ‘ইহকালে ও পরকালে আমরা তোমাদের বন্ধু। যেখানে তোমাদের জন্য আছে, যা তোমাদের মন চাইবে এবং সেখানে তোমাদের জন্য প্রস্ত্তত রয়েছে যা তোমরা দাবী করবে’। ‘এটা হবে ক্ষমাশীল ও দয়াময়ের পক্ষ হতে বিশেষ আপ্যায়ন’ (হামীম সাজদাহ ৪১/৩০-৩২)।
অর্থাৎ তোমরা সরল পথে চলতে চাইলে এবং আল্লাহর দ্বীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাইলেই থাকতে পারবে না। যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা না করবেন। সুতরাং তাঁর কাছেই তাওফীক কামনা করো। তবে এটা সত্য যে, কেউ যদি আল্লাহর পথে চলতে ইচ্ছে করে তবে আল্লাহ্ও তাকে সেদিকে চলতে সহযোগিতা করেন। মূলত আল্লাহর ইচ্ছা হওয়ার পরই বান্দার সে পথে চলার তাওফীক হয়। বান্দার ইচ্ছা আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারেই হয়। তবে যদি ভাল কাজ হয় তাতে আল্লাহর সস্তুষ্টি থাকে, এটাকে বলা হয় ‘আল্লাহর শরীয়তগত ইচ্ছা’। পক্ষান্তরে খারাপ কাজ হলে আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হলেও তাতে তাঁর সন্তুষ্টি থাকে না। এটাকে বলা হয় ‘আল্লাহর প্রাকৃতিক ইচ্ছা’। এ দু’ধরনের ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য না করার কারণে অতীতে ও বর্তমানে অনেক দল ও ফেরকার উদ্ভব ঘটেছে।
الْمَوْؤ۫دَةُ বলা হয় المدفونة حية বা জীবন্ত প্রোথিত সন্তানকে। অর্থাৎ জাহিলী যুগের মানুষেরা কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করত। কারণ কন্যা সন্তান তাদের নিকট অপমানজনক বলে মনে করত। জাহেলী যুগের আরবরা কয়েকভাবে কন্যা সন্তান হত্যা করত।
জাহেলী আরবদের কিছু লোকের মধ্যে এ কুসংস্কার ছিল মূলতঃ তিনটি কারণে। ১. ধর্মীয় বিশ্বাসগত কারণে। ২. অর্থনৈতিক কারণে এবং ৩. সামাজিক কারণে।
প্রথমোক্ত কারণটি ছিল এই যে, তারা বলত, মেয়েরা সব আল্লাহর কন্যা। তাই কন্যা সন্তান দাফন করে তাকে তারা আল্লাহর সাথে মিলিয়ে দিত। যেমন ভারতের হিন্দুরা সদ্য বিধবা জীবন্ত নারীকে তার মৃত স্বামীর চিতায় জোর করে তুলে দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করে স্বর্গে পাঠিয়ে দিত। একে বলা হত ‘সতীদাহ প্রথা’।
দ্বিতীয়টি ছিল দরিদ্রতার কারণে এবং কন্যা সন্তান মানুষ করা ও তাকে বিয়ে দেয়ার বোঝা বহনে অক্ষমতা। বর্তমানে ভারতে দরিদ্রতার কারণে প্রতি বছর হাযার হাযার কন্যা সন্তানের ভ্রুণ হত্যা করা হচ্ছে। তৃতীয় কারণ ছিল, যুদ্ধ-বিগ্রহের সময় মেয়েদের বন্দী করে নিয়ে যাওয়া ও দাসীবৃত্তি করানোর লজ্জা থেকে বাঁচা। শেষোক্তটি মর্যাদাগত কারণে ও লোকলজ্জার ভয়ে অনেকে করত। সাধারণতঃ একাজ মায়েরাই করত। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, প্রসবের প্রাক্কালে তারা ঘরের মধ্যে গর্ত খুঁড়ে রাখত। মেয়ে হলে সাথে সাথে গর্তে মাটি চাপা দিয়ে মেরে ফেলত। আল্লাহ বলেন, – ‘তারা আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান নির্ধারণ করত। অথচ তিনি (এসব থেকে) পবিত্র। আর তাদের জন্য ওটাই (অর্থাৎ পুত্র সন্তান) যা তারা কামনা করত’। ‘যখন তাদের কাউকে কন্যা সন্তানের সুসংবাদ দেওয়া হত, তখন তাদের চেহারা মলিন হয়ে যেত। আর সে ক্রোধে ক্লিষ্ট হত’। ‘তাকে শুনানো সুসংবাদের (?) গ্লানিতে সে সম্প্রদায়ের লোকদের থেকে মুখ লুকিয়ে রাখত। সে ভাবত যে, গ্লানি সহ্য করেও মেয়েটিকে বাঁচিয়ে রাখবে, না মাটিতে পুঁতে ফেলবে। সাবধান! এর মাধ্যমে তারা কতই না নিকৃষ্ট সিদ্ধান্ত নিত’ (নাহল ১৬/৫৭-৫৯)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘নিশ্চয়ই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যারা বোকামি ও অজ্ঞতা বশে নিজ সন্তানদের হত্যা করেছে’ … (আন’আম ৬/১৪০)।
জাহেলী আরবরা বিভিন্নভাবে সন্তান হত্যা করত। যেমন-
১. প্রসবের পূর্বক্ষণে ঘরের মধ্যে গর্ত খনন করে রাখত, কন্যা সন্তান হলে সাথে সাথে গর্তে পুঁতে দিত।
২. মেয়ে একটু বড় হলে বাবা তাকে নিয়ে কোন কুয়ায় নিক্ষেপ করত।
৩. কন্যার বয়স ছয় থেকে সাত বছর হলে পিতা কন্যার মাকে বলত মেয়েকে ভালভাবে সাজিয়ে দিতে। তারপর আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়ানোর কথা বলে মুরুভুমিতে গর্ত খুড়ে পুঁতে দিত। এসব জীবন্ত প্রোথিত কন্যদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে কি কারণে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছে। এটা জানা কথা যাদেরকে জীবন্ত প্রোথিত করা হয়েছে তাদের কোন অপরাধ নেই, মূলত উদ্দেশ্য হলো হত্যাকারীরদেরকে ভর্ৎসনা করা।
সুনানে দারামির প্রথম অধ্যায়ে এ হাদীসটি উদ্ধৃত হয়েছে। এক ব্যক্তি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে তার জাহেলী যুগের একটি ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেনঃ আমার একটি মেয়ে ছিল। সে আমাকে খুব ভালোবাসতো। তার নাম ধরে ডাকলে সে দৌড়ে আমার কাছে আসতো। একদিন আমি তাকে ডাকলাম। তাকে সঙ্গে করে নিয়ে হাঁটতে লাগলাম। পথে একটি কূয়া পেলাম। তার হাত ধরে ধাক্কা দিয়ে কূয়ার মধ্যে ফেলে দিলাম। তার যে শেষ কথাটি আমার কানে ভেসে এসেছিল তা ছিল, হায় আব্বা! হায় আব্বা! একথা শুনে রসূলুল্লাহ ﷺ কেঁদে ফেললেন। তাঁর চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরতে লাগলো। উপস্থিত লোকদের মধ্য থেকে একজন বললেনঃ ওহে, তুমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে শোকার্ত করে দিয়েছো। তিনি বললেনঃ থাক, তোমরা একে বাধা দিয়ো না। যে বিষয়ে তার কঠিন অনুভূতি জেগেছে সে বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করতে দাও। তারপর তিনি তাকে বললেনঃ তোমার ঘটনাটি আবার বর্ণনা করো। সেই ব্যক্তি আবার তা শুনালেন। ঘটনাটি আবার শুনে তিনি এত বেশী কাঁদতে থাকলেন যে, চোখের পানিতে তাঁর দাড়ি ভিজে গেলো। এরপর তিনি বললেন, জাহেলী যুগে যা কিছু করা হয়েছে আল্লাহ তা মাফ করে দিয়েছেন। এখন নতুন করে জীবন শুরু করো।
একথা মনে করা ভুল হবে যে, আরববাসীরা এই চরম অমানবিক কাজটি কদর্যতার কোন অনুভূতিই রাখতো না। কোন সমাজ যত বেশী বিকৃতই হোক না কেন তা কখনো এই ধরনের জুলুম ও অমানবিক কাজকে একেবারেই অন্যায় মনে করবে না, এমনটি কখনই হতে পারে না। তাই কুরআন মজীদে এই কাজটির কদর্যতা ও দূষণীয় হওয়া সম্পর্কে কোন লম্বা চওড়া ভাষণ দেয়া হয়নি। বরং কতিপয় লোমহর্ষক শব্দের মাধ্যমে কেবল এতটুকু বলেই ছেড়ে দেয়া হয়েছে যে, এমন এক সময় আসবে যখন জীবিত পুঁতে ফেলা মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হবে, কোন দোষে তোমাকে হত্যা করা হয়েছিল? আরবের ইতিহাস থেকেও জানা যায়, জাহেলী যুগে অনেক লোকের এই রীতিটির কদর্যতার অনুভূতি ছিল। তাবারানীর বর্ণনা মতে কবি ফারাযদাকের দাদা সা’সা’ ইবনে নাজীয়াহ আলমুজাশেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করে, যে আল্লাহর রসূল! আমি জাহেলী যুগে কিছু ভালো কাজও করেছি। এরমধ্যে একটি হচ্ছে, আমি তিনশ ষাটটি মেয়েকে জীবিত কবর দেয়া থেকে রক্ষা করেছি। তাদের প্রত্যেকের প্রাণ বাঁচাবার বদলে দু’টি করে উট বিনিময় মূল্য হিসেবে দিয়েছি। আমি কি এর প্রতিদান পাবো? জবাবে তিনি বলেনঃ তোমার জন্য পুরস্কার রয়েছে এবং সে পুরস্কার হচ্ছে, আল্লাহ তোমাকে ইসলামের নিয়ামত দান করেছেন।
আসলে এটি ইসলামের একটি বিরাট অবদান। ইসলামের কেবলমাত্র আরবের এই নিষ্ঠুর ও জঘন্য প্রথাটি নির্মূল করেনি বরং এই সঙ্গে মেয়ের জন্ম যে একটি দুর্ঘটনা এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও একে গ্রহণ করে নিতে হয়–এই ধরনের চিন্তাও ধারণারও চিরতরে অবসান ঘটিয়েছে। বিপরীত পক্ষে ইসলাম শিক্ষা দিয়েছে, মেয়েদের লালন পালন করা, তাদেরকে উত্তম দীক্ষা দেয়া এবং ঘর সংসারে কাজে পারদর্শী করে গড়ে তোলা অনেক বড় নেকীর কাজ। রসূলুল্লাহ ﷺ এ ব্যাপারে মেয়েদের সম্পর্কে মানুষের সাধারণ ধারণা যেভাবে পরিবর্তন করে দেন হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে তা আন্দাজ করা যাবে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ আমি নীচে কয়েকটি হাদীস উদ্ধৃত করছিঃ
- “এই মেয়েদের জন্মের মাধ্যমে যে ব্যক্তিকে পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়, তারপর সে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করে তারা তার জন্য জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার কারণে পরিণত হবে।” (বুখারী ও মুসলিম)
- “যে ব্যক্তি দু’টি মেয়ের লালনপালন করে, এভাবে তারা বালেগ হয়ে যায়, সে কিয়ামতের দিন আমার সাথে ঠিক এভাবে আসবে। একথা তিনি নিজের আঙুলগুলো একসাথে করে দেখান।” (মুসলিম)
- “যে মুসলমানের দু’টি মেয়ে থাকবে, সে যদি তাদেরকে ভালোভাবে রাখে, তাহলে তারা তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।” (ইমাম বুখারীর আদাবুল মুফরাদ)
- “নবী ﷺ সুরাকাহ ইবনে জা’শূমকে বলেন, আমি কি তোমাকে বলবো সবচেয়ে বড় সাদকাহ (অথবা বলেন, বড় সাদকাগুলোর অন্যতম) কি? সুরাকাহ বলেন, অবশ্যই বলুন হে আল্লাহর রসূল! তিনি বলেন, তোমার সেই মেয়েটি যে (তালাক পেয়ে অথবা বিধবা হয়ে) তোমার দিকে ফিরে আসে এবং তুমি ছাড়া তার আর কোন উপার্জনকারী থাকে না।” (ইবনে মাজাহ ও বুখারী ফিল আদাবিল মুফরাদ)
এই শিক্ষার ফলে মেয়েদের ব্যাপারে কেবল আরবদেরই নয় দুনিয়ার অন্যান্য যেসব জাতি ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে তাদের সবার দৃষ্টিভংগীই বদলে গেছে।
হাসান বাছরী বলেন, বর্ণিত আয়াতে জীবন্ত প্রোথিত কন্যা শিশুকে হত্যার কারণ জিজ্ঞেস করার অর্থ হল হত্যাকারীকে ধমকানো। কেননা শিশুটিকে বিনা দোষে হত্যা করা হয়েছে। বস্ত্ততঃ এটাই হলো হত্যাকারীকে ধমকানোর সর্বোত্তম পন্থা। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ক্বিয়ামতের দিন ঐ মেয়েটি তার বাপকে ধরে বলবে- ‘কি অপরাধে আপনি আমাকে হত্যা করেছিলেন’ ? সেদিন পিতা কোন জবাব দিতে পারবে না। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, মেয়ে তার মাকে ধরে এনে বলবে, ‘হে আমার রব! এই আমার মা। ইনি আমাকে হত্যা করেছিলেন’ (কুরতুবী)। ইবনু কাছীর বলেন, ‘মযলূম কন্যা সন্তানকেই যখন এভাবে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন যালেম পিতা-মাতাকে কেমন অবস্থা করা হবে? (ইবনু কাছীর)। এযুগে যেসব নিষ্ঠুর মায়েরা তাদের সন্তানদের জীবন্ত ফেলে দিচ্ছে, তারা সাবধান হবে কি?
ফুটনোট
প্রথম পর্ব: মহাপ্রলয়ের বারোটি দৃশ্য: মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ভাঙ্গন
সূরার সূচনা হয় এক অভাবনীয় ও শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনার মাধ্যমে। আল্লাহ কিয়ামতের ঠিক পূর্বমুহূর্তে মহাবিশ্বের চূড়ান্ত ভাঙ্গন ও সংকোচনের বারোটি ধারাবাহিক দৃশ্য তুলে ধরেন। প্রতিটি দৃশ্যই মানব ইতিহাসের সকল ধারণাকে চূর্ণ করে দেয়।
প্রথম ছয়টি দৃশ্য (মহাজাগতিক বিপর্যয়):
১. যখন সূর্যকে গুটিয়ে নিষ্প্রভ করে দেওয়া হবে,
২. এবং যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে,
৩. যখন পর্বতমালাকে চলমান করা হবে,
৪. যখন দশ মাসের গর্ভবতী উটনীগুলোকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দেওয়া হবে, (যা ছিল আরবদের কাছে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ)
৫. যখন বন্য পশুদেরকে একত্রিত করা হবে,
৬. এবং যখন সমুদ্রগুলোকে অগ্নিউত্তাল করে তোলা হবে।
পরবর্তী ছয়টি দৃশ্য (মানবসমাজের চূড়ান্ত বিচার):
৭. যখন আত্মাসমূহকে (তাদের দেহের সাথে) পুনরায় সংযুক্ত করা হবে,
৮. যখন জীবন্ত পুঁতে ফেলা কন্যাসন্তানকে জিজ্ঞেস করা হবে, “কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?”,
৯. যখন আমলনামাগুলোকে উন্মোচিত করা হবে,
১০. যখন আকাশের আবরণ সরিয়ে দেওয়া হবে,
১১. এবং যখন জাহান্নামকে প্রচণ্ডভাবে প্রজ্বলিত করা হবে,
১২. আর জান্নাতকে নিকটবর্তী করা হবে।
এই বারোটি ভয়াবহ ও বিস্ময়কর দৃশ্যের পর আল্লাহ একটি চূড়ান্ত ও সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন:”তখন প্রত্যেক ব্যক্তি জানতে পারবে, সে কী নিয়ে উপস্থিত হয়েছে।”
দ্বিতীয় পর্ব: চারটি মহিমান্বিত শপথ এবং এক সম্মানিত রাসূলের বাণী
মহাপ্রলয়ের এই ভয়াবহ বর্ণনার পর, আল্লাহ এবার চারটি অত্যন্ত সুন্দর ও মহিমান্বিত বিষয়ের শপথ করে এই কুরআনের উৎস ও তার বাহকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেন।
চারটি শপথ:
- “সুতরাং, আমি শপথ করছি পশ্চাতে গমনকারী নক্ষত্ররাজির,”
- “যারা চলমান হয় এবং অদৃশ্য হয়ে যায়।”
- “শপথ রাত্রির, যখন তার অবসান ঘটে,”
- “এবং শপথ প্রভাতের, যখন তা শ্বাস গ্রহণ করে (আলোকোজ্জ্বল হয়)।”
এই কাব্যিক ও মহিমান্বিত শপথের পর আল্লাহ বলেন:
কুরআনের উৎস ও বাহকের পরিচয়:
“নিশ্চয়ই এ (কুরআন) এক সম্মানিত রাসূলের (জিবরাইলের) আনীত বাণী।”
তাঁর বৈশিষ্ট্য:
- “যিনি শক্তিশালী, আরশের অধিপতির (আল্লাহর) নিকট মর্যাদাসম্পন্ন।”
- “যিনি সেখানে (ঊর্ধ্বলোকে) সকলের মান্যবর, বিশ্বস্ত।”
রাসূল (ﷺ)-এর সত্যতা:
এরপর আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদ (ﷺ)-এর ব্যাপারে বলেন:
- “আর তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ ﷺ) কোনো উন্মাদ নন।”
- “তিনি তো তাকে (জিবরাইলকে) সুস্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন।”
- “এবং তিনি অদৃশ্য জগতের সংবাদ প্রকাশে কোনো কৃপণতা করেন না।”
চূড়ান্ত ঘোষণা:
“আর এ (কুরআন) কোনো অভিশপ্ত শয়তানের কথা নয়।”
তৃতীয় পর্ব: চূড়ান্ত প্রশ্ন এবং ঐশী ইচ্ছার সার্বভৌমত্ব
এই শক্তিশালী ঘোষণা ও সাক্ষ্যের পর, আল্লাহ এবার সমগ্র মানবজাতির বিবেককে নাড়া দেওয়ার জন্য একটি চূড়ান্ত ও সরাসরি প্রশ্ন রাখেন:
“তাহলে তোমরা কোথায় যাচ্ছ?”
এই সংক্ষিপ্ত প্রশ্নটি মানুষকে তার জীবনের উদ্দেশ্য ও গন্তব্য নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।
এরপর আল্লাহ এই কুরআনের প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরেন:
“এ তো বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ ছাড়া আর কিছুই নয়।”
কার জন্য এই উপদেশ?: “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তির জন্য, যে সরল পথে চলতে চায়।”
অবশেষে, সূরাটি শেষ হয় মানব ইচ্ছা ও ঐশী ইচ্ছার মধ্যকার সম্পর্ককে চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট করে দেওয়ার মাধ্যমে:
“আর তোমরা ইচ্ছা করতে পারো না, যতক্ষণ না জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহ ইচ্ছা করেন।”
এই একটি আয়াতই মানুষের সীমিত স্বাধীনতা এবং আল্লাহর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের মধ্যে এক নিখুঁত ভারসাম্য স্থাপন করে।