কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৪
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-১২
সূরা আনকাবুত ২৩-৩০ আয়াত
পৃথিবীতে আল্লাহর রহমত ও করুণা সকল সৃষ্টির জন্য ব্যাপক। যার দ্বারা মু’মিন-কাফের, মুখলিস-মুনাফিক, (একনিষ্ঠ-নিষ্ঠাহীন), ভাল-মন্দ সকল শ্রেণীর মানুষই উপকৃত হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ সকলকেই জীবন উপকরণ ও ধন-সম্পদ দিয়ে থাকেন। এটি আল্লাহর দয়ার সেই পরিব্যাপ্তি, যার সম্পর্কে তিনি বলেন,{وَرَحْمَتِي وَسِعَتْ كُلَّ شَيْءٍ} অর্থাৎ, আমার দয়া প্রত্যেক বস্তুতে পরিব্যাপ্ত। কিন্তু পরকাল যেহেতু প্রতিদান ও প্রতিফল পাওয়ার জন্য; মানুষ দুনিয়াতে যে ফসল বপন করবে, সেই ফসল সে আখেরাতে কর্তন করবে। পৃথিবীতে যে যেমন কাজ করবে সেই অনুপাতে তাকে ফল দেওয়া হবে। সেদিন আল্লাহ পক্ষপাতহীন ফায়সালা দান করবেন। পৃথিবীর ন্যায় পরকালেও যদি মু’মিন-কাফের ও ভাল-মন্দের সাথে একই প্রকার ব্যবহার করা হয়, সবাই যদি আল্লাহর দয়ার যোগ্য হয়, তাহলে প্রথমতঃ আল্লাহর ন্যায় বিচারের উপর প্রশ্ন উঠবে এবং দ্বিতীয়তঃ কিয়ামতের উদ্দেশ্য অর্থহীন হয়ে পড়বে। মহান আল্লাহ কিয়ামত এই জন্যই অনুষ্ঠিত করবেন যে, যারা সৎকর্মশীল তাদেরকে সুখময় স্থান জান্নাত দান করবেন। আর যারা অসৎকর্মশীল তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক স্থান জাহান্নাম দান করবেন। সেই জন্য কিয়ামত দিবসে আল্লাহর রহমত একমাত্র মু’মিনদের জন্যই হবে। এখানেও উক্ত কথাই বর্ণনা করা হয়েছে যে, যারা পরকাল ও পুনর্জীবন অস্বীকার করবে, তাদের ভাগ্যে আমার রহমত জুটবে না। উক্ত কথাটি সূরা আ’রাফে এই ভাষায় বর্ণনা করা হয়েছে,{فَسَأَكْتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَالَّذِينَ هُم بِآيَاتِنَا يُؤْمِنُونَ} অর্থাৎ, সুতরাং আমি তা (দয়া পরকালে) তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা পরহেযগার হয়, যাকাত দেয় ও আমার নিদর্শনসমূহে বিশ্বাস করে। (সূরা আ’রাফ ১৫৬ আয়াত)
এখান থেকে বর্ণনা আবার ইবরাহীমের কাহিনীর দিকে মোড় নিচ্ছে।
হযরত ইবরাহীমের ন্যায়সঙ্গত যুক্তির কোন জবাব তাদের কাছে ছিল না। তাদের যদি কোন জবাব থেকে থাকে তাহলে তা এই ছিল যে, হক কথা বলছে যে কণ্ঠটি সেটি স্তব্ধ করে দাও এবং যে ব্যক্তি আমাদের ভুল আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরছে এবং তা থেকে আমাদের বিরত থাকতে বলছে তাকে জীবন্ত রেখো না। “হত্যা করো ও জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারো” শব্দাবলী থেকে একথা প্রকাশিত হচ্ছে যে, সমগ্র জনতা হযরত ইবরাহীমকে মেরে ফেলার ব্যাপারে একমত ছিল তবে মেরে ফেলার পদ্ধতির ব্যাপারে ছিল বিভিন্ন মত। কিছু লোকের মত ছিল, তাকে হত্যা করা হোক। আবার কিছু লোকের মত ছিল, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হোক, এর ফলে ভবিষ্যতে যারা এ ভূখণ্ডে হক কথা বলার পাগলামী করতে চাইবে এটা তাদের জন্য একটা শিক্ষা হয়ে থাকবে।
তারা শেষ পর্যন্ত হযরত ইবরাহীমকে পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত করেছিল। তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এখানে শুধুমাত্র এতটুকু কথা বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ তাকে আগুনের হাত থেকে রক্ষা করেন। কিন্তু সূরা আল আম্বিয়ায় পরিষ্কার করে বলা হয়েছেঃ আল্লাহর নির্দেশে আগুন হযরত ইবরাহীমের জন্য ঠাণ্ডা ও নিরাপদ বস্তু হয়ে যায়,قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ “আমি বললাম, হে আগুন! ঠাণ্ডা হয়ে যাও এবং শান্তি ও নিরাপত্তা হয়ে যাও ইবরাহীমের প্রতি।” (৬৯ আয়াত) একথা বলা নিষ্প্রয়োজন, তাকে যদি আগুনের মধ্যে নিক্ষেপই না করা হয়ে থাকতো তাহলে আগুনকে ঠাণ্ডা হয়ে যাও এবং তার প্রতি শান্তি ও নিরাপত্তা হয়ে যাও এ হুকুম দেবার কোন অর্থই হয় না। এ থেকে এ কথা পরিষ্কার প্রমাণিত হয় যে, সমস্ত বস্তুর ধর্ম বা প্রকৃতি মহান আল্লাহর হুকুমের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি যখনই চান যে কোন বস্তুর ধর্ম ও বিশেষত্ব পরিবর্তন করতে পারেন। সাধারণভাবে আগুনের ধর্ম হচ্ছে জ্বালানো এবং দগ্ধীভূত হবার মতো প্রত্যেকটি জিনিসকে পুড়িয়ে ফেলা। কিন্তু আগুনের এ ধর্ম তার নিজের প্রতিষ্ঠিত নয় বরং আল্লাহ প্রতিষ্ঠিত। তার এ ধর্ম আল্লাহকে এমনভাবে বেঁধে ফেলেনি যে, তিনি এর বিরুদ্ধে কোন হুকুম দিতে পারেন না। তিনি নিজে আগুনের মালিক। যে কোন সময় তিনি তাকে জ্বালাবার কাজ পরিত্যাগ করার হুকুম দিতে পারেন। যে কোন সময় নিজের এক ইঙ্গিতে তিনি অগ্নিকুণ্ডকে ফুল বাগানে পরিণত করতে পারেন। এ অস্বাভাবিক নিয়মের ব্যত্যয় তার রাজ্যে প্রতিদিন হয় না। কোন বড় রকমের তাৎপর্যবহ শিক্ষা ও প্রয়োজনের খাতিরেই হয়ে থাকে। কিন্তু নিয়মমাফিক যেসব জিনিস প্রতিদিন দেখতে আমরা অভ্যস্ত সেগুলোকে কোনক্রমেই এর স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে খাড়া করা যেতে পারে না যে, সেগুলোর মধ্যে তার শক্তি আবদ্ধ হয়ে গেছে এবং নিয়ম বিরোধী কোন ঘটনা আল্লাহর হুকুমেও সংঘটিত হতে পারে না।
তাছাড়া এতে আরও নিদর্শন রয়েছে আল্লাহর ক্ষমতা, তাঁর রাসূলদের সম্মান রক্ষা, তার ওয়াদার বাস্তবায়ণ, তাঁর শক্ৰদের হেয়করণ। তাছাড়া আরও প্রমাণ রয়েছে যে, সমস্ত সৃষ্ট সে বড় কিংবা ছোট যাই হোক না কেন আল্লাহ্ তা’আলার কুদরতের অধীন। তাছাড়া এ ব্যাপারেও নির্দশন রয়েছে যে, তিনি আগুনের ভয়াবহ শাস্তি মেনে নিতে প্ৰস্তুত হয়ে যান এবং সত্য ও ন্যায়ের পথ পরিহার করতে প্রস্তুত হননি। নিদর্শন এ ব্যাপারেও রয়েছে যে, মহান আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহিস সালামকেও পরীক্ষার পুল পার না করিয়ে ছাড়েননি। আবার এ ব্যাপারেও যে, ইবরাহীমকে আল্লাহ যে পরীক্ষার সম্মুখীন করেন তাতে তিনি সাফল্যের সাথে উত্তীর্ণ হন, তবে এই আল্লাহর সাহায্য তার জন্য এমন অলৌকিক পদ্ধতিতে আসে যে, জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড তাঁর জন্য ঠাণ্ডা করে দেয়া হয়।
বক্তব্যের ধারাবাহিকতা থেকে বুঝা যায়, আগুনের মধ্য থেকে নিরাপদে বের হয়ে আসার পর ইবরাহীম আলাইহিস সালাম লোকদেরকে একথা বলেন।
তোমরা আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের পরিবর্তে মূর্তিপূজার ভিত্তিতে নিজেদের সামাজিক জীবন গড়ে তুলেছে। এ ব্যবস্থা দুনিয়ার জীবনের সীমানা পর্যন্ত তোমাদের জাতীয় সত্ত্বকে একত্র করে রাখতে পারে। কারণ এখানে সত্য-মিথ্যা নির্বিশেষে যে কোন আকীদার ভিত্তিতেই যে কোন ঐক্য ও সমাজ গড়ে উঠুক না কেন তা পারস্পরিক বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা, ভ্রাতৃত্ব ও অন্যান্য সকল ধর্মীয়, সামাজিক, তামাদ্দুনিক, অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হতে পারে। সেটাই কেবল তোমাদেরকে এ শির্কের উপর একত্রিত করে রেখেছে। [আত-তাহরীর ওয়াত তানওয়ীর]
মিথ্যা আকীদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত তোমাদের এ সম্পর্ক আখেরাতে প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারে না। সেখানে পারস্পরিক গ্ৰীতি-ভালোবাসা, সহযোগিতা, আত্মীয়তা এবং আকীদা-বিশ্বাস ও কামনা-বাসনার কেবলমাত্র এমন ধরনের সম্পর্ক বজায় থাকতে পারে যা দুনিয়ায় এক আল্লাহর বন্দেগী এবং সৎকর্মশীলতা ও আল্লাহভীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। কুফার ও শির্ক এবং ভুল পথ ও কুপথের সাথে জড়িত যাবতীয় সম্পর্ক সেখানে ছিন্ন হয়ে যাবে। সকল ভালোবাসা শক্রতায় পরিণত হবে। সমস্ত শ্রদ্ধা-ভক্তি ঘৃণায় রূপান্তরিত হবে। একে অন্যের ওপর লা’নত বর্ষণ করবে [ইবন কাসীর] এবং প্রত্যেকে নিজের গোমরাহীর দায়-দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে বলবে, এই যালেম আমাকে ধ্বংস করেছে, কাজেই একে দ্বিগুণ শাস্তি দেয়া হোক। একথা কুরআনের বিভিন্ন স্থানে বলা হয়েছে। এক স্থানে বলা হয়েছেঃ “বন্ধুরা সেদিন পরস্পরের শক্র হয়ে যাবে, মুত্তাকীরা ছাড়া।” [সূরা যুখরুফ: ৬৭]
অন্যত্র বলা হয়েছে, “প্রত্যেকটি দল যখন জাহান্নামে প্রবেশ করবে তখন তার কাছের দলের প্রতি লানত বর্ষণ করতে করতে প্রবেশ করবে, এমনকি শেষ পর্যন্ত যখন সবাই সেখানে একত্ৰ হয়ে যাবে তখন প্রত্যেক পরবর্তী দল পূর্ববর্তী দলের বিরুদ্ধে বলবে: হে আমাদের রব! এ লোকেরাই আমাদের পথভ্রষ্ট করেছে, কাজেই এদেরকে দ্বিগুণ আগুনের শাস্তি দিন।” [সূরা আল-আ’রাফ: ৩৮] অন্যত্র বলা হয়েছে, “আর তারা বলবো, হে আমাদের রব! আমরা নিজেদের সরদারদের ও বড়দের আনুগত্য করেছি এবং তারা আমাদের বিপথগামী করেছে। হে আমাদের রব! আপনি তাদেরকে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের ওপর বড় রকমের লানত বর্ষণ করুন।” [সূরা আল-আহযাব: ৬৭–৬৮]
লূত (আঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর ভাইপো (ভাতিজা) ছিলেন। তিনি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেন এবং পরবর্তীতে তাঁকেও ‘সাদূম’ এলাকায় নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয়।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম বললেন, আমি আমার পালনকর্তার উদ্দেশ্যে দেশ-ত্যাগ করছি। উদ্দেশ্য এই যে, এমন কোন জায়গায় যাব, যেখানে পালনকর্তার ইবাদাতে কোন বাধা নেই। ইবরাহীম নখায়ী ও কাতাদাহ বলেন, (إِنِّي مُهَاجِرٌ) ইবরাহীমের উক্তি। কেননা, এর পরবর্তী বাক্য (وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ) নিশ্চিতরূপে তারই অবস্থা। কোন কোন তফসীরকার (إِنِّي مُهَاجِرٌ) কে লুত আলাইহিস সালাম-এর উক্তি প্রতিপন্ন করেছেন। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] কিন্তু পূর্বাপর বর্ণনাদৃষ্ট প্রথম তফসীরই উপযুক্ত। লুত আলাইহিস সালামও এই হিজরতে শরীক ছিলেন, কিন্তু ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর অধীন হওয়ার কারণে যেমন সারার কথা উল্লেখ করা হয়নি, তেমনি লুত আলাইহিস সালাম-এর হিজরতের কথাও স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
ইসহাক (আঃ) এর ঔরসে ইয়াকূব (আঃ)-এর জন্ম হয়। (ইয়াকূব (আঃ)-এর অপর নাম ছিল ইস্রাঈল।) যাঁর ঔরসে বানী ইস্রাঈল বংশের সূত্রপাত হয় এবং তাদের মধ্যেই সমস্ত নবী আগমন করেন ও আসমানী কিতাব অবতীর্ণ হয়। শেষ পর্যায়ে নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর দ্বিতীয় পুত্র ইসমাঈল (আঃ)-এর বংশে জন্মলাভ করে নবী হন এবং তাঁর উপর কুরআন অবতীর্ণ হয়।
আল্লাহ্ তা’আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর আত্মত্যাগ ও অন্যান্য সৎকর্মের প্রতিদান দুনিয়াতেও দান করেছেন। তাঁকে মানুষের প্রিয় ও নেতা করেছেন। যারাই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের দাওয়াতকে হেয় প্রতিপন্ন করতে চেয়েছিল তারা সবাই দুনিয়ার বুক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং এমনভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে যে, আজ দুনিয়ার কোথাও তাদের কোন নাম নিশানাও নেই। কিন্তু যে ব্যক্তিকে আল্লাহর কালেমা বুলন্দ করার অপরাধে তারা জ্বলিয়ে পুড়িয়ে ছাই করে দিতে চেয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত যাকে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় স্বদেশভূমি ত্যাগ করতে হয়েছিল তাকে আল্লাহ এমন সফলতা দান করেন যে, দুনিয়াতে তাকে উত্তম স্বচ্ছন্দ রিযিক, প্রশস্ত আবাস, উত্তম নেককার স্ত্রী, সুপ্ৰশংসা প্ৰদান করা হয়েছে।
তাছাড়া চার হাজার বছর থেকে দুনিয়ার বুকে তার নাম সমুজ্জ্বল রয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে। দুনিয়ার সকল মুসলিম, নাসারা ও ইয়াহুদী রাব্বুল আলমীনের সেই খলীল তথা বন্ধুকে একযোগে নিজেদের নেতা বলে স্বীকার করে। একমাত্র সেই ব্যক্তি এবং তার সন্তানদের থেকেই তারা হিদায়াতের আলোকবর্তিকা লাভ করতে পেরেছে। আখেরাতে তিনি যে মহাপুরস্কার লাভ করবেন তাতো তার জন্য নির্ধারিত হয়েই আছে কিন্তু এ দুনিয়ায়ও তিনি যে মর্যাদা লাভ করেছেন তা দুনিয়ার বৈষয়িক স্বাৰ্থ উদ্ধার প্রচেষ্টায় জীবনপাতকারীদের একজনও আজ পর্যন্ত লাভ করতে পারেনি। এ থেকে জানা গেল যে, কর্মের আসল প্রতিদান তো আখেরাতে পাওয়া যাবে, কিন্তু তার কিছু অংশ দুনিয়াতেও নগদ দেয়া হয়। অনেক নির্ভরযোগ্য হাদীসে অনেক সৎকর্মের পার্থিব উপকারিতা ও অসৎকর্মের পার্থিব অনিষ্ট বর্ণিত হয়েছে।
এখানে অশ্লীল কর্ম বলতে সমকামিতা (পুরুষে-পুরুষে যৌন-মিলন)-কে বুঝানো হয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে লূত (আঃ)-এর জাতিই এ কাজ সর্বপ্রথম শুরু করেছিল; যেমন কুরআন তা স্পষ্ট করেছে।
এখানে লুত আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি গুরুতর পাপের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, পুংমৈথুন, যা এর পূর্বে আদম সন্তানদের আর কেউ করে নি। সাথে সাথে তারা আল্লাহর সাথে কুফরি করত এবং রাসূলদের প্রতি মিথ্যারোপ করত। দ্বিতীয়ত, রাহাজানি, অর্থাৎ পথে মানুষদেরকে আক্রমন করে তাদের হত্যা করত এবং সবকিছু নিয়ে নিত। আর তৃতীয়ত, তারা মজলিসে সবার সামনে এমন অপকর্ম করত, যা সম্পূর্ণ অশোভনীয় ছিল। তাদের একজন অন্যজনকে তা থেকে বাধা দিত না। কুরআন তৃতীয় পাপকাজটি নির্দিষ্ট করেনি। এ থেকে জানা যায় যে, যে কোন গুনাহ প্রকাশ্যে করাও একটি স্বতন্ত্র গোনাহ।
কোন কোন তফসীরকারক এ স্থলে সেসব গোনাহ একটি একটি করে উল্লেখ করেছেন, যেগুলো এই নির্লজেরা তাদের প্রকাশ্যে মজলিসে করত। উদাহরণত: পথিকদের গায়ে পাথর ছুড়ে মারা এবং তাদের প্রতি বিদ্রুপাত্মক ধ্বনি দেয়া। কেউ কেউ বলেন, তাদের প্ৰসিদ্ধ অশ্লীল কাজটি তারা গোপনে নয়, প্রকাশ্যেই মজলিসের সবার সামনে করত। কারও কারও মতে, তারা প্রকাশ্যে বড় শব্দ করে গুহ্যদেশ দিয়ে বাতাস বের করত। কারও কারও মতে, ছাগল ও মোরগ লড়াই চালিয়ে যেত। এই সবই তারা করত। আর তারা আরও কঠিন প্রকৃতির খারাপ কাজ করত। [ইবন কাসীর; ফাতহুল কাদীর] আয়াতে উল্লেখিত প্রথম গোনাহাটিই সর্বাধিক মারাত্মক। তাদের পূর্বে পৃথিবীতে কেউ এই অপকর্ম করত না। বনের পশুরাও এ থেকে বেঁচে থাকে। এটা যে এক গুরুতর অপরাধ, এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই।
কুফরী, হঠকারিতা এবং ঔদ্ধত্যপনা তাদের এতো বেড়ে গিয়েছিল যে, নবী (আঃ)-এর উপদেশের জবাবে তাঁকে তারা বলতোঃ “ছেড়ে দাও তোমার উপদেশবাণী। যদি তুমি সত্যবাদী হও তবে আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন কর।” শেষে অসহ্য হয়ে হযরত লুত (আঃ) আল্লাহর সামনে হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রার্থনা করেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! বিপর্যয় সৃষ্টিকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করুন।”
ফুটনোট
✔ মুমিন ব্যক্তিরা সংখ্যায় কম হলেও অত্যাচারী ও জালিম শাসকের সামনে মাথানত করে না। ইব্রাহিম (আঃ) একা হওয়া সত্ত্বেও পথভ্রষ্ট ও কাফেরদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং এ কারণে মহান আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন।
✔ পৃথিবীতে আল্লাহর দেয়া অন্যতম পুরস্কার হচ্ছে নেক সন্তান ও বংশধর। যা মহান আল্লাহ তার নেক বান্দাদেরকে দান করেন।
✔ একজন মানুষের পক্ষে দুনিয়া ও আখেরাত- দুই জীবনেই আল্লাহ্র পক্ষ থেকে পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। তবে ইসলামে আখেরাতের জীবনকে বাদ দিয়ে দুনিয়াপুজারি হতে যেমন নিষেধ করা হয়েছে তেমনি আখেরাতকে পেতে গিয়ে দুনিয়ার জীবনকে ধ্বংস করতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
✔ লূত (আঃ) ইবরাহীম (আঃ)-এর ভাইপো (ভাতিজা) ছিলেন। তিনি ইবরাহীম (আঃ)-এর প্রতি ঈমান আনেন এবং পরবর্তীতে তাঁকে ‘সাদূম’ এলাকায় নবী হিসাবে প্রেরণ করা হয়।
✔ আল্লাহর প্রেরিত নবী-রাসূলগণ কোনো নির্দিষ্ট দেশ ও জাতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নন। যখনই প্রয়োজন তখনই তারা হিজরত করে মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য কোনো জনপদে চলে যান।
✔ লুত আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকটি গুরুতর পাপের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, পুংমৈথুন, যা এর পূর্বে আদম সন্তানদের আর কেউ করে নি। দ্বিতীয়ত, রাহাজানি, অর্থাৎ পথে মানুষদেরকে আক্রমন করে তাদের হত্যা করত এবং সবকিছু নিয়ে নিত। আর তৃতীয়ত, তারা মজলিসে সবার সামনে এমন অপকর্ম করত, যা সম্পূর্ণ অশোভনীয় ছিল। তাদের একজন অন্যজনকে তা থেকে বাধা দিত না।
✔ কোন গুনাহ প্রকাশ্যে করাও একটি স্বতন্ত্র গোনাহ।
✔ সব ধর্মে সমকামিতাকে জঘন্য পাপাচার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামি আইনে সমকামিতাকে সমাজে ফেতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সমতুল্য বলে মনে করা হয়। সমাজে এ ধরনের পাপাচার ছড়িয়ে পড়তে গেলে কঠোরভাবে তার মোকাবিলা করার পাশাপাশি পাপিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর বিজয় অর্জনের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
✔ লুত (আঃ) দোয়া করেছিলেন- رَبِّ انْصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ – হে আমার প্রতিপালক! দুষ্কার্যকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করো।