সূরা নিসা ১৫-২২ আয়াত

কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৪
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-৮

সূরা আন নিসা (১৫-২২)

ইসলামের প্রাথমিক যুগে এরূপ নির্দেশ ছিল যে, ন্যায়বান সাক্ষীদের সত্য সাক্ষ্য দ্বারা কোন স্ত্রীলোকের অশ্লীলতা প্রমাণিত হয়ে গেলে তাকে যেন বাড়ীর বাইরে যেতে দেয়া না হয় বরং জন্মের মত বাড়ীতেই যেন আটক রাখা হয়। অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে তাকে যেন ছেড়ে দেয়া না হয়। এটা বর্ণনা করার পর আল্লাহ পাক বলেন-হ্যা তবে এটা অন্য কথা যে, আল্লাহ তা’আলা তাদের জন্যে কোন পথ নির্দেশ করে দেন। অতঃপর যখন অন্য শাস্তি নির্ধারণ করা হয় তখন পূর্বের ঐ নির্দেশ রহিত হয়ে যায়। হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ব্যভিচারিণী স্ত্রীলোকের জন্যে এ নির্দেশই ছিল। অতঃপর সূরা-ই-নূরের আয়াত অবতীর্ণ হলে বিবাহিতা নারীকে রজম করা অর্থাৎ প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা এবং অবিবাহিতা নারীকে একশ চাবুক মারার নির্দেশ দেয়া হয়। [ইবনে কাসীর]

এখানে এমন পুরুষ ও নারীদের শাস্তি বর্ণিত হয়েছে, যারা নির্লজ্জ কাজ অর্থাৎ ব্যভিচারে লিপ্ত হয়। বলা হয়েছে, যেসব নারী দ্বারা এমন কুকর্ম সংঘটিত হয়, তাদের এ কাজ প্রমাণ করার জন্য চার জন পুরুষ সাক্ষী তলব করতে হবে। অর্থাৎ যেসব বিচারকের কাছে এই মামলা পেশ করা হয়, তারা প্রমাণের জন্য চার জন যোগ্য সাক্ষী তলব করবেন এবং এই সাক্ষীদের পুরুষ শ্রেণী থেকে হওয়াও জরুরী। এ ব্যাপারে নারীদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যভিচারের সাক্ষীদের ব্যাপারে শরীআত দু’রকম কঠোরতা করেছে যেহেতু ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এতে ইজ্জত ও আবরু আহত হয় এবং পারিবারিক মানসম্ভ্রমের প্রশ্ন দেখা দেয়, তাই প্রথমে শর্ত আরোপ করা হয়েছে যে, এমন ক্ষেত্রে শুধু পুরুষই সাক্ষী হতে হবে- নারীদের সাক্ষ্য ধর্তব্য নয়।

দ্বিতীয়তঃ চার জন পুরুষ হওয়া জরুরী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বলাবাহুল্য, এ শর্তটি খুবই কঠোর। দৈবাৎ ও কদাচিৎ তা পাওয়া যেতে পারে। এ শর্ত আরোপের কারণ, যাতে স্ত্রীর স্বামী, তার জননী অথবা অন্য স্ত্রী অথবা ভাই-বোন ব্যক্তিগত জিঘাংসার বশবর্তী হয়ে অহেতুক অপবাদ আরোপ করার সুযোগ না পায় অথবা অন্য অমঙ্গলকামী লোকেরা শক্রতাবশতঃ অপবাদ আরোপ করতে সাহসী না হয়। কেননা, চার জনের কম পুরুষ ব্যভিচারের সাক্ষ্য দিলে তাদের সাক্ষী গ্রহণীয় নয়। এমতাবস্থায় বাদী ও সাক্ষীরা সবাই মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হবে এবং একজন মুসলিমের চরিত্রে কলংক আরোপ করার দায়ে তাদেরকে ‘হদ্দে-কযফ’ বা অপবাদের শাস্তি ভোগ করতে হবে। [তাফসীরে জাকারিয়া]

কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন সমলিঙ্গী ব্যভিচার; যাতে দু’জন পুরুষ আপোসে এ কুকাজ সম্পাদন করে থাকে। আবার কেউ এর অর্থ নিয়েছেন, অবিবাহিত পুরুষ ও মহিলা। আর পূর্বের আয়াতকে তাঁরা বিবাহিত পুরুষ ও মহিলার সাথে নির্দিষ্ট করেছেন। আবার কেউ কেউ এই দ্বিবচন শব্দের অর্থ করেছেন, পুরুষ ও মহিলা। তাতে তারা বিবাহিত হোক বা অবিবাহিত। ইবনে জারীর ত্বাবারী দ্বিতীয় অর্থ অর্থাৎ, অবিবাহিত পুরুষ ও মহিলা অর্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন এবং পূর্বের আয়াতে বর্ণিত শাস্তিকে নবী করীম (সাঃ) কর্তৃক বর্ণিত শাস্তি দ্বারা ও এই আয়াতে বর্ণিত শাস্তিকে সূরা নূরে বর্ণিত একশ’ বেত্রাঘাত শাস্তি দ্বারা রহিত সাব্যস্ত করেছেন। [তাফসীর ত্বাবারী]

এখানে উল্লেখযোগ্য যে, কুরআনুল কারীমে بِجَهَالَةٍ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ থেকে বাহ্যতঃ বোঝা যায়, অজ্ঞাতসারে এবং না জেনে-শুনে গোনাহ করলে তাওবা কবুল হবে এবং জ্ঞাতসারে জেনে-শুনে গোনাহ করলে তাওবা কবুল হবে না। কিন্তু সাহাবায়ে কেরাম এ আয়াতের যে তাফসীর করেছেন তা এই যে, এখানে আয়াতের بِجَهَالَةٍ অর্থ এই নয় যে, সে গোনাহর কাজটি যে গোনাহ, তা জানে না কিংবা গোনাহর ইচ্ছা নেই; বরং অর্থ এই যে, গোনাহর অশুভ পরিণাম ও আখেরাতের আযাবের ব্যাপারে গাফেল বা অসতর্কতাই তার গোনাহর কাজ করার কারণ; যদিও গোনাহটি যে গোনাহ, তা সে জানে এবং তার ইচ্ছাও করে। তাই جهالة শব্দটি এখানে নির্বুদ্ধিতা ও বোকামির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আবুল আলিয়া ও কাতাদাহর বর্ণনা মতে সাহাবায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, বান্দা যে গোনাহ্ করে- অনিচ্ছাকৃত করুক কিংবা ইচ্ছাকৃত, সর্বাবস্থায়ই তা মূর্খতা।

তাফসীরবিদ মুজাহিদ বলেন, যে ব্যক্তি কোন কাজে আল্লাহর নাফরমানী করছে, সে দৃশ্যতঃ বড় আলেম ও বিশেষ জানা-শোনা বিচক্ষণ হলেও সে কাজ করার সময় মূৰ্খই হয়ে যায়। ইকরিমা বলেন, দুনিয়ার যেসব কাজ আল্লাহর আনুগত্যের বাইরে, সেগুলো সবই মূর্খতা। কারণ এই যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানী করে, সে ক্ষণস্থায়ী সুখকে চিরস্থায়ী সুখের উপর অগ্রাধিকার প্রদান করে। যে ব্যক্তি এই ক্ষণস্থায়ী সুখের বিনিময়ে চিরস্থায়ী কঠোর আযাব ক্রয় করে, তাকে বুদ্ধিমান বলা যায় না। তাকে সবাই মূর্খ বলবে, যদিও সে ভালভাবে জানা ও বোঝার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে সে কুকর্ম সম্পাদন করে। মোটকথা, গোনাহর কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে হোক কিংবা ভুলক্রমে, উভয় অবস্থাতেই তা মূর্খতাবশতঃ সম্পন্ন হয়। এ কারণেই সাহাবা, তাবেয়ীন ও সমগ্র উম্মতের এ ব্যাপারে ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোন গোনাহ করে, শর্তসাপেক্ষে তার তাওবাও কবুল হতে পারে। তাছাড়া আয়াতের আরেক অর্থ এও হতে পারে যে, তারা গোনাহ করার সময় এর পরিণাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখে না। অথবা সে অপরাধ করার সময় আল্লাহ যে তাকে দেখছেন সে ব্যাপারে বেখবর হয়ে পড়ে। অথবা সে যখন অপরাধ করে তখন যে তার ঈমানের মধ্যে দূর্বলতা আসবে সে সম্পর্কে গাফেল হয়ে পড়ে। [তাফসীরে সা’দী]

এখানে তাড়াতাড়ি তাওবাহ করা শর্তের অর্থ হলো দুটি- (এক) মৃত্যুর বড় শ্বাস বের না হওয়ার আগ পর্যন্ত করা। [তিরমিযীঃ ৩৫৩৭, ইবন মাজাহঃ ৪২৫৩] (দুই) সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হওয়ার আগ পর্যন্ত করা।

তাওবার অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা। গোনাহ করার পর বান্দার আল্লাহর কাছে তাওবা করার অর্থ হচ্ছে এই যে, যে দাসটি তার প্রভুর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে এখন নিজের কার্যকলাপে অনুতপ্ত। সে প্রভুর আনুগত্য করার ও তাঁর হুকুম মেনে চলার জন্য ফিরে এসেছে। আর আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার দিকে তাওবা করার মানে হচ্ছে এই যে, দাসের ওপর থেকে প্রভুর যে অনুগ্রহ দৃষ্টি সরে গিয়েছিল তা আবার নতুন করে তার প্রতি নিবদ্ধ হয়েছে। মহান আল্লাহ‌ এ আয়াতে বলেন, আমার এখানে ক্ষমতার দরজা একমাত্র সেইসব বান্দার জন্য উন্মুক্ত রয়েছে, যারা ইচ্ছা করে নয় বরং অজ্ঞতার কারণে ভুল করে বসে এবং চোখের ওপর থেকে অজ্ঞতার পর্দা সরে গেলে লজ্জিত হয়ে নিজের ভুলের জন্য ক্ষমাপ্রার্থী হয়। এহেন বান্দা তার ভুল বুঝতে পেরে যখনই প্রভু মহান রব্বুল আলামীনের দিকে ফিরে আসবে তখনই নিজের জন্য তাঁর দরজা উন্মুক্ত দেখতে পাবেঃ —— “আমার এ দরবারে আশাভংগ হয় না কারো শতবার ভেঙেছো তাওবা, তবু তুমি ফিরে এসো।”

কিন্তু যারা আল্লাহকে ভয় না করে সারা জীবন বেপরোয়াভাবে গোনাহ করতে থাকে তারপর ঠিক যখন মৃত্যুর ফেরেশতা সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে, তাদের জন্য কোন তাওবা নেই, তাদের গোনাহের কোন ক্ষমা নেই। এ বিষয়টিকে নবী একটি হাদীসে এভাবে বর্ণনা করেছেনঃ “আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত বান্দার তাওবা কবুল করতে থাকেন যতক্ষণ মৃত্যুর আলামত দেখা না দেয়।” কারণ পরীক্ষার সময় উত্তীর্ণ হবার এবং জীবন গ্রন্থের সব পাতা শেষ হয়ে যাবার পর এখন আর ফিরে আসার সুযোগটাই বা কোথায়? এভাবে কোন ব্যক্তি যখন কুফরীর অবস্থায় দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় এবং পরবর্তী সীমানায় প্রবেশ করে নিজের চোখেই সবকিছু প্রত্যক্ষ করে, দুনিয়ায় সে যা কিছু ভেবে এসেছিল এখন দেখছে আসল ব্যাপার তার সম্পূর্ণ বিপরীত, তখন তার ক্ষমা চাওয়ার কোন সুযোগই তো থাকে না। [তাফহীমুল কুরআন]

 

 

ইসলামপূর্ব যুগে পুরুষ নিজেকে স্ত্রীর জান ও মালের মালিক মনে করতো। স্ত্রী যার বিবাহ-বন্ধনে আবদ্ধ হতো, সে তার প্রাণকে নিজের মালিকানাধীন মনে করতো। স্বামীর মৃত্যুর পর তার ওয়ারিশরা যেমন তার ত্যাজ্য সম্পত্তির ওয়ারিশ ও মালিক হতো, তেমনি তার স্ত্রীরও ওয়ারিশ ও মালিক বলে গণ্য হতো। ইচ্ছা করলে নিজেই তাকে বিয়ে করতো কিংবা অন্যের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণ করে তাকে বিয়ে দিয়ে দিতো। স্বামীর অন্য স্ত্রীর গর্ভজাত পুত্র নিজেও পিতার মৃত্যুর পর তাকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ করতে পারতো। স্ত্রীর প্রাণেরই এই অবস্থা, তখন তার ধন-সম্পদের ব্যাপারটি তো বলাই বাহুল্য। যেসব অর্থ-সম্পদ স্ত্রী উত্তরাধিকারসূত্রে অথবা পিত্ৰালয় থেকে উপঢৌকন হিসেবে লাভ করতো, তারা সেগুলো হজম করে ফেলতো।

যদি কোন নারী তার নিজের অংশের ধন-সম্পদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেই নিত, তবে পুরুষরা তাকে অন্যত্র বিয়ে করতে বাধা দিত; যাতে সে এখানেই মারা যায় এবং ধন-সম্পদ তাদের অধিকারভুক্ত থেকে যায়। কোন কোন সময় স্ত্রীর কোন দোষ না থাকলেও তাকে তার প্রাপ্য প্রদান করতো না। আবার তালাক দিয়েও তাকে মুক্ত করত না। তালাক দিলেও অন্যত্র বিয়ে দিত না। যাতে তার মাহরের টাকা বাইরে না যায়। ইসলাম এসব কিছুর মুলোৎপাটন করে দিয়েছে। এ আয়াত সংক্রান্ত বেশ কিছু বর্ণনায় তা স্পষ্ট। ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ইসলামপূর্বযুগে কোন লোক মারা গেলে তার অভিভাবকরা তার স্ত্রীর অধিকারী হয়ে যেত। সে ইচ্ছে করলে তাকে বিয়ে করত অথবা অন্যের নিকট বিয়ে দিয়ে দিত। তখন এ আয়াতটি নাযিল হয় ৷ [বুখারী ৪৫৭৯] অন্য বর্ণনায় এসেছে, কায়েস ইবন সালত এর পিতা মারা গেলে তার ছেলে তার পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করতে চাইল। জাহেলিয়াতে যা তাদের অভ্যাস ছিল। তখন আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত নাযিল করেন। [নাসায়ী: ১১৫]

ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, এখানে স্পষ্ট খারাপ আচরণ বলতে, স্বামীর অবাধ্যতা ও স্বামীর সাথে শক্রতা বোঝানো হয়েছে। যে মহিলা স্বামীর অবাধ্য সে মহিলা থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য পুরুষটি তাকে দেয়া সম্পদ ফেরৎ নিতে পারবে। [তাবারী]

স্ত্রী যদি সুন্দরী না হয় অথবা তার মধ্যে এমন কোন ত্রুটি থাকে যে জন্য স্বামী তাকে অপছন্দ করে তাহলে এক্ষেত্রে স্বামীর তৎক্ষণাৎ হতাশ হয়ে তাকে পরিত্যাগ করতে উদ্যত হওয়া উচিত নয়। যতদূর সম্ভব তাকে অবশ্যি ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা অবলম্বন করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, স্ত্রী সুন্দরী হয়না ঠিকই কিন্তু তার মধ্যে অন্যান্য এমন কিছু গুণাবলী থাকে, যা দাম্পত্য জীবনে সুন্দর মুখের চাইতে অনেক বেশী গুরুত্ব লাভ করে। যদি সে তার এই গুণাবলী প্রকাশের সুযোগ পায়, তা হলে তার স্বামী রত্মটি যিনি প্রথম দিকে শুধুমাত্র স্ত্রীর অসুন্দর মুখশ্রী দেখে হতাশ হয়ে পড়ছিলেন, এখন দেখা যাবে তার চরিত্র মাধুর্যে তার প্রেমে আত্মহারা হয়ে পড়ছেন। এমনিভাবে অনেক সময় দাম্পত্য জীবেনর শুরুতে স্ত্রীর কোন কোন কথা ও আচরণ স্বামীর কাছে বিরক্তিকর ঠেকে এবং এ জন্য স্ত্রীর ব্যাপারে তার মন ভেঙে পড়ে। কিন্তু সে ধৈর্য্য ধারণ করলে এবং স্ত্রীকে তার সম্ভাব্য সকল যোগ্যতার বাস্তবায়নের সুযোগ দিলে সে নিজেই অনুধাবন করতে পারে যে, তার স্ত্রীর মধ্যে দোষের তুলনায় গুণ অনেক বেশী। কাজেই দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করা মোটেই পছন্দনীয় নয়। তালাক হচ্ছে সর্বশেষ উপায়। একান্ত অপরিহার্য ও অনিবার্য অবস্থায়ই এর ব্যবহার হওয়া উচিত। নবী বলেনঃ তালাক জায়েয হলেও দুনিয়ার সমস্ত জায়েয কাজের মধ্যে এটি আল্লাহর কাছে সবচাইতে অপছন্দনীয়। [তাফহীমুল কুরআন]

আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এই আয়াতের তাফসীরে বলেনঃ এর অর্থ হল স্বামী স্ত্রীকে ভালবাসবে, তারপর তাদের মধ্যে আল্লাহ সন্তান দান করবেন যে সন্তান তাদের মধ্যে প্রভূত কল্যাণ নিয়ে আসবেন বা স্বামীর মনে স্ত্রীর জন্য ভালবাসা তৈরী করে দিবেন। [তাবারী] এছাড়া হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুমিন পুরুষ কোন মুমিন নারীকে ঘৃণা করবে না। যদি তার কোন চরিত্রের কোন একটি দিক তাকে অসন্তুষ্ট করে, তবে অন্য দিক তাকে সন্তুষ্ট করবে। [মুসলিমঃ ১৪৬৯]

তাদের সাথে উত্তম কথা বলবে। কথায়, কাজে, চলাফেরায় যতটুকু সম্ভব সৌন্দর্য রক্ষা করবে। যেমনটি তুমি তাদের কাছ থেকে আশা কর, তেমন ব্যবহারই করো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের মধ্যে উত্তম হলো ঐ ব্যক্তি যে তার পরিবারের কাছে উত্তম। আমি আমার পরিবারের কাছে উত্তম। [তিরমিযীঃ ৩৮৯৫] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চারিত্রিক সৌন্দর্যের মধ্যে এটা ছিল যে, তিনি সদাহাস্য সুন্দর ব্যবহার করতেন। পরিবারের সাথে হাস্যরস, নরম ব্যবহার ইত্যাদি করতেন। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সাথে কখনো কখনো দৌড় প্রতিযোগিতা করতেন। [দেখুন- আবু দাউদঃ ২৫৭৮, ইবন মাজাহঃ ১৯৭৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৬/১২৯]

স্বামী নিজ ইচ্ছায় তালাক দিলে স্ত্রীর কাছ থেকে মোহর ফেরৎ নিতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। قِنْطَارٌ বলা হয় ধন-ভান্ডার এবং প্রচুর সম্পদকে। অর্থাৎ, মোহর যতটা পরিমাণই হোক না কেন তা ফেরৎ নিতে পারবে না। যদি এ রকম কর, তাহলে তা যুলুম এবং প্রকাশ্য পাপ হবে।

দৃঢ় প্রতিশ্রুতি বা পাকাপোক্ত অঙ্গীকার বলে বিয়ে বুঝানো হয়েছে। কারণ বিয়ের সময় মাহর দেয়া এবং স্ত্রীকে সঠিকভাবে পরিচালনা কিংবা সুন্দরভাবে বিদায় করার অঙ্গীকার করার মত চুক্তি সংঘটিত হয়ে থাকে। সুতরাং একে অপরের সাথে মেলামেশা ও চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর এ জাতীয় আচরণ অমানবিক ও অগ্রহণযোগ্য।

উপরোক্ত আয়াতগুলোতে অর্থ ফেরত গ্রহণ যে জুলুম ও গোনাহ্ এ বিষয়টি তিন পর্যায়ে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রথমে বলা হয়েছেঃ  أَتَأْخُذُونَهُ بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُبِينًا অর্থাৎ তোমরা কি স্ত্রীর প্রতি ব্যভিচার ইত্যাদির অপবাদ আরোপ করে প্রদত্ত অর্থ ফেরত গ্রহণের পথ বের করতে চাও ? অর্থাৎ যখন একথা জানা যায় যে, প্রদত্ত অর্থ ফেরত গ্রহণ তখনই জায়েয, যখন স্ত্রী কোন অশোভন কাজ করে। তখন তার কাছ থেকে অর্থ ফেরত গ্রহণ করার মানে প্রকৃতপক্ষে এরূপ ঘোষণা করা যে, সে কোন অশোভন কাণ্ড ও নির্লজ্জতা ইত্যাদি করেছে। মুখে তার প্রতি ব্যভিচারের অপবাদ আরোপ করুক বা না করুক, এমতাবস্থায় এটা অপবাদেরই একটা রূপ। এটা যে প্রকাশ্য গোনাহ তা বলাই বাহুল্য।

দ্বিতীয় পর্যায় বর্ণনা করে বলা হয়েছেঃ وَكَيْفَ تَأْخُذُونَهُ وَقَدْ أَفْضَى بَعْضُكُمْ إِلَى بَعْضٍ – অর্থাৎ এখন তোমরা কেমন করে স্বীয় অর্থ তাদের কাছ থেকে ফেরত গ্রহণ করতে পার, যখন শুধু বিয়েই নয়, অবাধ নির্জনবাস এবং পরস্পরের মাঝে মিলনও হয়ে গেছে ? কেননা, এমতাবস্থায় প্রদত্ত অর্থ মোহরানা হলে স্ত্রী তার পূর্ণ অধিকারিণী ও মালিক হয়ে গেছে। কারণ, যে আপন সত্তাকে স্বামীর হাতে সমর্পণ করে দিয়েছে। এখন তা ফেরত নেওয়ার কোন ন্যায়সঙ্গত অধিকার স্বামীর নেই। আর যদি প্রদত্ত অর্থ উপঢৌকন হয়, তবুও এমতাবস্থায় তা ফেরত দেওয়া সম্ভবপর নয়। কেননা, স্বামী-স্ত্রী পরস্পর একে অপরকে দান করলে তা ফেরত গ্রহণ শরয়ীতমতে সিদ্ধ নয় এবং আইনতও তা কার্যকর হয় না । মোট কথা, বৈবাহিক সম্পর্ক দান—ফেরত গ্রহণের পরিপন্থী।

এ বিষয়টিই তৃতীয় পর্যায়ে বর্ণনা করে বলা হয়েছেঃ وَأَخَذْنَ مِنْكُمْ مِيثَاقًا غَلِيظًا অর্থাৎ নারীরা তোমাদের কাছ থেকে সুদৃঢ় অঙ্গীকার নিয়ে নিয়েছে। এতে বিবাহবন্ধনে অঙ্গীকার বোঝানো হয়েছে, যা আল্লাহর নামে খোতবা সহকারে জনসমক্ষে করা হয়।

মোট কথা এই যে, বৈবাহিক অঙ্গীকার ও পারস্পরিক মিলনের পর প্রদত্ত অর্থ ফেরতদানের জন্য স্ত্রীকে বাধ্য করা প্রকাশ্য জুলুম ও অবিচার। মুসলমানদের এ রূপ আচরণ থেকে বেঁচে থাকা অপরিহার্য। [মাআরিফুল কুরআন] 

জাহেলিয়াত যুগে পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে পুত্ররা বিনাদ্বিধায় বিয়ে করে নিত। [দেখুনঃ বুখারীঃ ৪৫৭৯] এ আয়াতে আল্লাহ তা’আলা এই নির্লজ্জ কাজটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন এবং একে ‘আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ বলে অভিহিত করেছেন। বলাবাহুল্য, যাকে দীর্ঘদিন পর্যন্ত মা বলা হয়, পিতার মৃত্যুর পর তাকে স্ত্রী করে রাখা মানব-চরিত্রের জন্য অপমৃত্যু ছাড়া আর কিছুই হতে পারে না। আলেমগণ বলেন, পিতা কোন নারীকে বিয়ে করার সাথে সাথেই সন্তানদের জন্য সে নারী হারাম হয়ে যাবে। চাই তার সাথে পিতার সহবাস হোক বা না হোক। অনুরূপভাবে যে নারীকে পুত্র বিয়ে করেছে সেও পিতার জন্য হারাম হয়ে যাবে, তার সাথে পুত্রের সহবাস হোক বা না হোক [তাবারী]

আবু বুরদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু মতান্তরে হারেস ইবন আমের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে পাঠিয়েছেন এমন লোকের কাছে যে তার পিতার মৃত্যুর পরে পিতার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে- যেন তাকে হত্যা করা হয় এবং তার যাবতীয় সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। [আবু দাউদঃ ৪৪৫৭, মুসনাদে আহমাদঃ ৪/২৯৭, তিরমিযীঃ ১৩৬২, ইবন মাজাহঃ ২৬০৭]

ফুটনোট

✔ ব্যভিচার একটি জঘন্য অপরাধ, যা যুবকদের বিবাহের প্রতি নিরুৎসাহিত করে, নারীর জীবন ধ্বংস করে, সমাজে পাপ কাজের সয়লাব হয়, আল্লাহ তা‘আলার গযব ডেকে নিয়ে আসে সর্বপোরি বংশনামা নষ্ট হয়।

✔ ব্যভিচারের সাক্ষীদের ব্যাপারে – চার জন পুরুষ হওয়া জরুরী সাব্যস্ত করা হয়েছে।

✔ যারা আল্লাহকে ভয় না করে সারা জীবন বেপরোয়াভাবে গোনাহ করতে থাকে তারপর ঠিক যখন মৃত্যুর ফেরেশতা সামনে এসে দাঁড়ায় তখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকে, তাদের জন্য কোন তাওবা নেই, তাদের গোনাহের কোন ক্ষমা নেই।

✔ তাওবার অর্থ হচ্ছে ফিরে আসা। গোনাহ করার পর বান্দার আল্লাহর কাছে তাওবা করার অর্থ হচ্ছে এই যে, যে দাসটি তার প্রভুর নাফরমান ও অবাধ্য হয়ে প্রভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সে এখন নিজের কার্যকলাপে অনুতপ্ত। সে প্রভুর আনুগত্য করার ও তাঁর হুকুম মেনে চলার জন্য ফিরে এসেছে।

✔ ফিরআউনের মত তাওবাহ করলে তা কবুল হবে না।

✔ জেনেশুনে অপরাধ করলে তার জন্য অবশ্যই পাকড়াও করা হবে।

✔ স্বামী নিজ ইচ্ছায় তালাক দিলে স্ত্রীর কাছ থেকে মোহর ফেরৎ নিতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। অন্যায়ভাবে স্ত্রীদের ওপর সংকীর্ণতা সৃষ্টি করা হারাম।

✔ জাহেলিয়াত যুগে পিতার মৃত্যুর পর তার স্ত্রীকে পুত্ররা বিনাদ্বিধায় বিয়ে করে নিত। আল্লাহ তা’আলা এই নির্লজ্জ কাজটি নিষিদ্ধ করে দিয়েছেন এবং একে ‘আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ, অশ্লীল ও নিকৃষ্ট বলে অভিহিত করেছেন।