কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৩
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-২২
সূরা বাকারাহ ২৮২-২৮৩ আয়াত
অত্র আয়াতকে “আয়াতুদ দাইন”বা ঋণের আয়াত বলা হয়। কুরআনুল কারীমের এটা সবচেয়ে বড় আয়াত। যেহেতু পূর্বের আয়াতে সুদকে কঠোরভাবে হারাম করে দান-সদাকাহ করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে সেহেতু সমাজে বসবাসকারীদের মাঝে ঋণ গ্রহণ করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিবেই। কারণ সুদ হারাম, সব মানুষ দান-সদাকাহ করার ক্ষমতা রাখে না। তাছাড়া সবাই দান-সদাকাহ নিতে পছন্দও করে না। সুতরাং প্রয়োজন সাড়ার অন্যতম উপায় ঋণ আদান-প্রাদান করা। ঋণ দেয়াও বড় ফযীলতের কাজ বলে হাদীসে উল্লেখ রয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: কিয়ামতের দিন একজন লোককে আল্লাহ তা‘আলার সামনে আনা হবে। তাকে আল্লাহ তা‘আলা জিজ্ঞাসা করবেন: বল, তুমি আমার জন্য কী পুণ্য করেছ? সে বলবে: হে আল্লাহ! আমি এমন একটি অণু পরিমাণও পুণ্যের কাজ করতে পারিনি যার প্রতিদান আমি আপনার নিকট চাইতে পারি। আল্লাহ তা’আলা তাকে পুনরায় এটাই জিজ্ঞাসা করবেন এবং সে একই উত্তর দেবে। আল্লাহ তা’আলা আবার জিজ্ঞাসা করবেন তখন সে বলবে: হে আল্লাহ! একটি সামান্য কথা মনে পড়েছে। আপনি দয়া করে আমাকে কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। আমি ব্যবসায়ী ছিলাম। লোক আমার নিকট হতে কর্জ নিয়ে যেতো। আমি যখন দেখতাম যে, এ লোকটি দরিদ্র এবং পরিশোধ করতে পারছে না তখন তাকে কিছু সময় অবকাশ দিতাম। ধনীদের ওপরও পীড়াপীড়ি করতাম না। অত্যন্ত দরিদ্র ব্যক্তিদের ক্ষমা করে দিতাম। তখন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তাহলে আমি তোমার পথ সহজ করবো না কেন? আমি তো সর্বাপেক্ষা বেশি সহজকারী। যাও আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। তুমি জান্নাতে চলে যাও। (সহীহ বুখারী হা: ২০৭৭)
আলোচ্য আয়াতে কারিমাটি আল্লাহ তা‘য়ালা নাযিল করেছিলেন প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। ওই সময়ে আরবদের কাছে আজকের মতো সহজলভ্য কাগজ ছিল না। তখন মানুষ লিখত পাতা, চামড়া বা হাড়ের উপরে। পড়ালেখা জানত হাতেগোনা কয়েকজন। সেই অবস্থায়ও আল্লাহ তা‘য়ালা ঋণের ব্যাপারে লিখতে বলেছেন। এখান থেকেই বোঝা যায় লিখিত চুক্তি করা কতটা জরুরি। ঋণ নিয়ে মানুষের মধ্যে হাজারো সমস্যা হয় এজন্যই আল্লাহ তা‘য়ালা স্বাক্ষীসহ লিখিত চুক্তি করার ব্যাপারে জোর দিয়েছেন। কিন্তু মুসলিম সমাজ নামাজ, রোজা, যাকাতকে ফরজ জেনে যেভাবে গুরুত্বের সাথে নিয়েছে, স্বাক্ষীসহ লিখিত চুক্তির ব্যাপারটা ফরজ হওয়ার পরেও তেমন গুরুত্ব দেন না।
আলোচ্য আয়াতে কারিমাটি হচ্ছে লেনদেন বা ঋণের উপর একটি আইন সঙ্কলন। এ আয়াতে কারিমায় লেনদেন সম্পর্কিত আইনের জরুরি মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে যাকে চুক্তিনামাও বলা যেতে পারে। এরপর স্বাক্ষ্য-বিধির বিশেষ ধারা উল্লেখিত হয়েছে। এ আয়াতে কারিমায় লেনদেন সম্পর্কিত মৌলিক বিধিমালা জারি করা হয়েছে।
প্রথম বিধি- লিপিবদ্ধ করা
লেনদেনে সময় চুক্তি লিপিবদ্ধ করার নির্দেশনা বা লেনদেন সংক্রান্ত প্রথম মূলনীতি বা আইনের বিধান বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আয়াতের প্রথমে বলেন, ‘হে ঈমানগণ, যখন তোমরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখ।’
আজকাল লেখালেখির যুগ, লেখাই মুখের কথার স্থলাভিষিক্ত হয়ে গেছে। কিন্তু অতীতে দুনিয়ার সব কাজ-কারবার ও ব্যবসা-বাণিজ্য মুখে মুখেই চলত। লেখালেখি এবং দলীল-দস্তাবেজের প্রথা প্রচলন ছিল না। সর্বপ্রথম কুরআনুল কারিম এদিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এ আয়াতে বলা হয়েছে, হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরস্পর ঋণ দেওয়া-নেওয়া কর, তখন তা লিখে নাও।
এখানে প্রথম নির্দেশ এই যে, ধার-কর্জের লেনদেনে দলীল-দস্তাবেজ লিপিবদ্ধ করা উচিত, যাতে ভুল-ভ্রান্তি অথবা কোনো পক্ষ থেকে অস্বীকৃতির কোনো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তখন কাজে লাগে।
সাধারণত বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে ঋণের লেন-দেনের ব্যাপারে দলীল বা প্রমাণপত্র লেখাকে এবং সাক্ষী রাখাকে দূষণীয় ও আস্থাহীনতার প্রকাশ মনে করা হয়ে থাকে। কিন্তু আল্লাহর বাণী হচ্ছে এই যে, ঋণ ও ব্যবসায় সংক্রান্ত লেন-দেনের চুক্তি সাক্ষ্য প্রমাণাদিসহ লিখিত আকারে সম্পাদিত হওয়া উচিত। এর ফলে লোকদের মধ্যে লেনদেন পরিষ্কার থাকবে। হাদীসে বলা হয়েছে তিন ধরনের লোক আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে কিন্তু তাদের ফরিয়াদ শোনা হয় না। এক, যার স্ত্রী অসচ্চরিত্র কিন্তু সে তাকে তালাক দেয় না। দুই, এতিমের বালেগ হবার আগে যে ব্যক্তি তার সম্পদ তার হাতে সোপর্দ করে দেয়। তিন, যে ব্যক্তি কাউকে নিজের অর্থ ঋণ দেয় এবং তাতে কাউকে সাক্ষী রাখে না।
দ্বিতীয় বিধি- লেনদেনে সময় নির্দিষ্ট করা
দ্বিতীয় নির্দেশ হলো ধার-কর্জের ব্যাপারে মেয়াদ বা সময় অবশ্যই নির্দিষ্ট করতে হবে। অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ধার-কর্জের লেনদেন বৈধ নয়। এতে কলহ-বিবাদের দ্বার উন্মুক্ত হয়।
এ কারণেই ফিকাহবীদগণ বলেছেন, মেয়াদও এমন নির্দিষ্ট করতে হবে, যাতে কোনোরূপ অস্পষ্টতা না থাকে। মাস এবং দিন তারিখসহ নির্দিষ্ট করতে হবে। কোনোরূপ অস্পষ্ট মেয়াদ, যেমন ‘ধান কাটার সময়’ এরূপ নির্ধাতির করা যাবে না। কেননা, আবহাওয়ার পরিবর্তনে ধান কাটার সময় আগে-পিছে হয়ে যেতে পারে।
তৃতীয় বিধি- দলিল বা চুক্তি লেখকের মাধ্যমে লিখে নেয়া
এটা জরুরী যে, তোমাদের মধ্যে কোন লেখক ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখবে। এতে একদিকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, লেখক কোন এক পক্ষের লোক হতে পারবে না; বরং নিরপেক্ষ হতে হবে – যাতে কারো মনে সন্দেহ-সংশয় না থাকে। অপরদিকে লেখককে ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। অন্যের ক্ষণস্থায়ী উপকার করে নিজের চিরস্থায়ী ক্ষতি করা তার পক্ষে উচিত হবে না। এরপর লেখককে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা তাকে এ লেখার বিদ্যা দান করেছেন। এর কৃতজ্ঞতা এই যে, সে লিখতে অস্বীকার করবে না।
চতুর্থ বিধি- লেখক ঋণ গ্রাহীতার কথা মতো লিখবেন
এরপর দলীল কোন্ পক্ষ থেকে লিখতে হবে সে সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “যে ব্যক্তির উপর হক্ক রয়েছে (ঋণগ্রহীতা) সে যেন লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।” চুক্তিনামার শর্ত, ঋণ গ্রহন কারীই বলবে। অর্থাৎ যার দায়িত্বে দেনা, সে লেখাবে। উদাহরণতঃ এক ব্যক্তি সওদা কিনে মূল্য বাকী রাখল। এখানে যার দায়িত্বে দেনা হচ্ছে, সে দলীলের বিষয়বস্তু লেখাবে। কেননা, এটা হবে তার পক্ষ থেকে স্বীকৃতি বা অঙ্গীকারপত্র।
আর ঋণগ্রহীতা যেন লেখার বিষয় বলে দেয় এবং সে যেন স্বীয় প্রতিপালক আল্লাহকে ভয় করে এবং লেখার মধ্যে বিন্দুমাত্র কমবেশি না করে। এখানে ঋণগ্রহীতাকে বুঝানো হয়েছে, সে যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং টাকার যেন সঠিক পরিমাণ লেখায়, কম করে যেন না লেখায়। অথাৎ, চুক্তি লেখার সময় সব শর্ত বলবে ঋণ গ্রহীতা, ঋণ দাতা নয়।
পঞ্চম বিধি- ঋণ গ্রহীতা অপারগ হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করা
ঋণ গ্রহীতা অপারগ হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করতে হবে। ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বা শর্ত বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে দলিল বা চুক্তি লেখা সংক্রান্ত নিয়ম বর্ণনা করে মহান আল্লাহ তা‘য়ালা আয়াতে কারিমার পরের অংশে বলেন: ‘কিন্তু ঋণ গ্রহীতা যদি নির্বোধ বা দুর্বল হয়, অথবা সে লেখার বিষয়বস্তু না বলে দিতে পারে, তাহলে তার অভিভাবক যেন ইনসাফের সাথে লেখার বিষয়বস্তু বলে দেয়।’
লেনদেনের ব্যাপারে দেনাদার ব্যক্তি কখনো নির্বোধ বা অক্ষম, বৃদ্ধ, অপ্রাপ্তবয়স্ক বালক, মুক অথবা অন্য ভাষাভাষী হতে পারে। এ কারণে দলিলের বিষয়বস্তু বলে দেয়া তার পক্ষে সম্ভব নাও হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলে তার পক্ষ থেকে তার কোনো অভিভাবক চুক্তি লেখাবে। যেমন পাগল ও নাবালেগের সব কাজ-কারবার অভিভাবক দ্বারাই সম্পন্ন হয়। মুক ও অন্য ভাষাভাষীর অভিভাবকও এ কাজ সম্পন্ন করতে পারে। যদি তারা কাউকে উকিল নিযুক্ত করে, তাতেও চলবে। এখানে কুরআনুল কারীমের ‘ওলী’ শব্দটি উভয় অর্থই বোঝায়।
এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, অনন্তর ঋণগ্রহীতা যদি নির্বোধ হয় কিংবা দুর্বল হয় অথবা নিজে লেখার বিষয়বস্তু বা শর্ত বলে দিতে অক্ষম হয়, তাহলে তার অভিভাবক যেন ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লেখায়।
ষষ্ঠ বিধি- লেনদেনের সময় বিশ্বস্ত স্বাক্ষী রাখা
এ পর্যন্ত লেনদেনে দলীল লেখা ও লেখানোর জরুরী মূলনীতি ব্যক্ত হয়েছে। অতঃপর বলা হয়েছে যে, দলীলের লেখাকেই যথেষ্ট মনে করবে না; বরং এতে সাক্ষীও রাখবে—যাতে কোন সময় পারস্পরিক কলহ দেখা দিলে আদালতে সাক্ষীদের সাক্ষ্য দ্বারা ফয়সালা হতে পারে। এ কারণেই ফিকবিদগণ বলেছেন যে, লেখা শরীয়তসম্মত প্রমাণ নয়, তাই লেখার সমর্থনে শরীয়তসম্মত সাক্ষ্য বিদ্যমান না থাকলে শুধু লেখার উপর ভিত্তি করে ফয়সালা করা যায় না। আজকালকার সাধারণ আদালতসমূহেও এ রীতিই প্রচলিত রয়েছে। লেখার মৌখিক সত্যায়ন ও তৎসমর্থনে সাক্ষ্য ব্যতীত কোন ফয়সালা করা হয় না।
আয়াতে এরপর সাক্ষ্য-বিধির কতিপয় জরুরী নীতি বর্ণনা করা হয়েছে। উদাহরণতঃ (১) সাক্ষী দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা হওয়া জরুরী। একা একজন পুরুষ অথবা শুধু দু’জন মহিলা সাধারণ লেন-দেনের সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। অনুরূপভাবে (২) সাক্ষী মুসলিম হতে হবে। (مِنْ رِجَالِكُمْ) শব্দে এদিকেই নির্দেশ করা হয়েছে। (৩) সাক্ষী নির্ভরযোগ্য আদিল’ (বিশ্বস্ত) হতে হবে, যার কথার উপর আস্থা রাখা যায়। ফাসেক ও ফাজের (অর্থাৎ পাপাচারী) হলে চলবে না। (مِمَّنْ تَرْضَوْنَ مِنَ الشُّهَدَاءِ) বাক্যে এ নির্দেশ রয়েছে।
সপ্তম বিধি- লেনদেনে স্বাক্ষ্যদানের ব্যাপারে সাক্ষীর বিরক্ত না হওয়া
শরীয়তসম্মত ওযর ব্যতীত সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করা গোনাহ্ঃ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, যখন কোন ব্যাপারে কাউকে সাক্ষী করার জন্য ডাকা হয়, তখন সে যেন আসতে অস্বীকার না করে। কেননা, সাক্ষ্যই হচ্ছে সত্য প্রতিষ্ঠিত করার এবং বিবাদ মেটানোর উপায় ও পন্থা। কাজেই একে জরুরী জাতীয় কাজ মনে করে কষ্ট স্বীকার করবে। এরপর আবার লেনদেনের দলীল লিপিবদ্ধ করার উপর জোর দিয়ে বলা হয়েছেঃ লেনদেন ছোট হোক কিংবা বড় হোক —সবই লিপিবদ্ধ করা দরকার। এ ব্যাপারে বিরক্তিবোধ করা উচিত নয়। কেননা, লেনদেন লিপিবদ্ধ করা সত্য প্রতিষ্ঠিত রাখতে, নির্ভুল সাক্ষ্য দিতে এবং সন্দেহ থেকে বেঁচে থাকতে চমৎকাররূপে সহায়তা করে।
অষ্টম বিধি- ইচ্ছা হলে নগদ লেনদেনে না লিখে রাখা
‘তবে তোমরা পরস্পর যে ব্যবসায় নগদ লেনদেন কর, তা না লিখলে তোমাদের কোনো দোষ নেই।’
এ আয়াতে কারীমায় বলা হয়েছে, ব্যবসায় যে নগদ আদান-প্রদান কর, তা না লিখলে কোনো দোষ নেই। তোমরা যখন পরস্পর বেচাকেনা কর, তখন স্বাক্ষী রাখ। এর অর্থ হচ্ছে, যদিও নিত্যদিনের কেনাবেচার ক্ষেত্রে লেনদেনের বিষয়টি লিখিত থাকা ভালো, যেমন আজকাল ক্যাশ মেমো লেখার পদ্ধিত প্রচলিত আছে, তবুও এমনটি করা অপরিহার্য নয়। অনুরূপভাবে প্রতিবেশী ব্যসায়ীরা পরস্পরের মধ্যে রাত দিন যেসব লেনদেন করতে থাকে, সেগুলোও লিখিত আকারে না থাকলে কোনো ক্ষতি নেই।
নবম বিধি- ঋণ চুক্তির লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত না করা
‘আর তোমরা স্বাক্ষী রাখ, যখন তোমরা বেচাকেনা করবে এবং কোনো লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে না। আর যদি তোমরা কর, তাহলে নিশ্চয় তা হবে তোমাদের সাথে অনাচার। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আল্লাহ তোমাদেরকে শিক্ষা দেবেন। আর আল্লাহ সব বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’
আয়াতের শুরুতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে যে, তারা যেন লিখতে ও স্বাক্ষী দিতে অস্বীকার না করে। এমতাবস্থায় তাদেরকে হয়ত মানুষ বিরক্ত করে তুলতে পারত। তাই আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছে, কোনো লেখক বা স্বাক্ষীকে যেন ক্ষতিগ্রস্ত করা না হয়। নিজের উপকারের জন্য যেন তাদের বিব্রত না করা হয়।
এরপর বলা হয়েছে, তোমরা যদি লেখক বা স্বাক্ষীকে বিব্রত কর, তবে এতে তোমাদের গোনাহ হবে। এজন্য লেখক কিংবা স্বাক্ষীকে বিব্রত বা ক্ষতিগ্রস্ত করা হারাম। এ কারণেই ফকীহগণের মতে, লেখক লেখার পারিশ্রমিক দাবি করে কিংবা স্বাক্ষী যাতায়াত খরচ চায়, তবে এটা তাদের নায্য অধিকার। তা না দেয়াও তাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিব্রত করার শামিল। ইসলাম বিচার ব্যবস্থায় স্বাক্ষীকে স্বাক্ষ্যদানে বাধ্য করেছে এবং স্বাক্ষ্য গোপন করাকে কঠোর অপরাধ সাব্যস্ত করেছে।
আয়াতের শেষ ভাগে বলা হয়েছেঃ আল্লাহ্কে ভয় কর। আল্লাহ তা’আলা তোমাদেরকে নির্ভুল নীতি শিক্ষা দেন। এটা তাঁর অনুগ্রহ। আল্লাহ্ তা’আলা সর্ববিষয়ে পরিজ্ঞাত। এ আয়াতে অনেক বিধি-বিধান বর্ণিত হয়েছে। কোন কোন ফিকহবিদ এ আয়াত থেকে বিশটি গুরুত্বপূর্ণ মাস’আলা বের করেছেন। কোরআন পাকের সাধারণ রীতি এই যে, আইন বর্ণনা করার আগে ও পরে আল্লাহ্-ভীতি ও প্রতিদান দিবসের ভীতি স্মরণ করিয়ে মানুষের মনকে নির্দেশ পালনে উদ্বুদ্ধ করে। এই রীতি অনুযায়ী আলোচ্য আয়াত আল্লাহ্-ভীতি দ্বারা শেষ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, আল্লাহর দৃষ্টিতে কোন কিছু গোপন নয়। তোমরা যদি কোন অবৈধ বাহানার মাধ্যমেও বিরুদ্ধাচরণ কর, তবুও আল্লাহ্কে ধোঁকা দিতে পারবে না।
যদি সফরে ঋণ লেনদেনের প্রয়োজন পড়ে এবং সেখানে লেখার লোক অথবা কাগজ-কলম ইত্যাদি না থাকে, তাহলে তার বিকল্প ব্যবস্থা হল, ঋণগ্রহীতা কোন জিনিস ঋণদাতার কাছে বন্ধক রাখবে। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বন্ধক রাখা শরীয়ত সম্মত একটি বৈধ জিনিস। নবী করীম (সাঃ)ও তাঁর লোহার বর্মটি একজন ইয়াহুদীর কাছে বন্ধক রেখেছিলেন। (বুখারী ২২০০নং,মুসলিম) এই বন্ধক রাখা জিনিসটি যদি এমন হয় যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায়, তাহলে তার উপকারিতার অধিকারী হবে মালিক; ঋণদাতা নয়। অবশ্য বন্ধকে রাখা জিনিসে যদি ঋণদাতার কোন কিছু ব্যয় হয়, তবে সে তার খরচ নিতে পারবে। খরচ নিয়ে নেওয়ার পর অবশিষ্ট লাভ মালিককে দেওয়া জরুরী হবে।
অর্থাৎ, তোমাদের একে অপরের প্রতি যদি বিশ্বাস থাকে, তাহলে কিছু বন্ধক রাখা ছাড়াই ঋণের আদান-প্রদান করতে পার। (এখানে ‘আমানত’ অর্থ ঋণ।) আল্লাহকে ভয় করে তা (আমানত) সঠিকভাবে আদায় কর।
সাক্ষ্য গোপন করা কাবীরা গুনাহ। এই জন্যই এর কঠোর শাস্তির কথা কুরআনের এই আয়াতে এবং বহু হাদীসেও বর্ণিত হয়েছে। অনুরূপ সত্য সাক্ষ্য দেওয়ার ফযীলতও অনেক। এক হাদীসে নবী করীম (সাঃ) বলেছেন, ‘‘আমি কি তোমাদেরকে উত্তম সাক্ষীদাতার কথা বলে দিবো না? সে হল এমন লোক, যার কাছে সাক্ষী তলব করার পূর্বেই সে নিজেই সাক্ষী নিয়ে উপস্থিত হয়ে যায়।’’ (মুসলিম ১৭১৯নং) অপর এক বর্ণনায় নিকৃষ্টতম সাক্ষীদাতার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ‘‘আমি কি তোমাদেরকে নিকৃষ্টতম সাক্ষীদাতাদের কথা বলে দিবো না? তারা এমন লোক, যাদের নিকট সাক্ষী চাওয়ার পূর্বেই তারা সাক্ষী দেয়।’’ (মুসলিম ২৫৩৫নং) অর্থাৎ, এরা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে মহাপাপ সম্পাদন করে। আলোচ্য আয়াতে বিশেষ করে অন্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, গোপন করা অন্তরের কাজ। তাছাড়া অন্তর হল অন্য সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের নেতা। এটা গোশতের এমন এক টুকরা যে, যদি এটা ঠিক থাকে, তাহলে সারা দেহ ঠিক থাকবে। আর যদি এর মধ্যে খারাবী আসে, তাহলে সমস্ত দেহ খারাবীর শিকার হয়ে পড়বে।
শোন! শরীরে এমন একটি গোশতের টুকরা আছে যে, যদি তা ঠিক থাকে, তাহলে সারা দেহ ঠিক থাকবে। আর যদি তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সারা দেহ নষ্ট হয়ে যাবে। শোন! তা হল, অন্তর।’’ (বুখারী ৫২নং)
ফুটনোট
- সূরা বাকারাহ-এর ২৮২ নং আয়াত কুরআনের সবচেয়ে বড় আয়াত। অত্র আয়াতকে “আয়াতুদ দাইন” বা ঋণের আয়াত বলা হয়।
- আগের আয়াতগুলোতে সুদের বিষয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এর বিপরীতে ইসলাম সমাধান হিসাবে দান-সাদকা এবং কর্দে হাসান বিষয় নিয়ে এসেছে।
- লেনদেন সম্পর্কিত মৌলিক বিধিমালা হলো-
- প্রথম বিধি- লিপিবদ্ধ করা
- দ্বিতীয় বিধি- লেনদেনে সময় নির্দিষ্ট করা
- তৃতীয় বিধি- দলিল বা চুক্তি লেখকের মাধ্যমে লিখে নেয়া
- চতুর্থ বিধি- লেখক ঋণ গ্রাহীতার কথা মতো লিখবেন
- পঞ্চম বিধি- ঋণ গ্রহীতা অপারগ হলে অভিভাবকের মাধ্যমে শর্ত নির্ধারণ করা
- ষষ্ঠ বিধি- লেনদেনের সময় বিশ্বস্ত স্বাক্ষী রাখা
- সপ্তম বিধি- লেনদেনে স্বাক্ষ্যদানের ব্যাপারে সাক্ষীর বিরক্ত না হওয়া
- অষ্টম বিধি- ইচ্ছা হলে নগদ লেনদেনে না লিখে রাখা
- নবম বিধি- ঋণ চুক্তির লেখক ও স্বাক্ষীকে ক্ষতিগ্রস্ত না করা
- সাক্ষীর বিধান – সংখ্যাঃ সাক্ষী দু’জন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দু’জন মহিলা হওয়া জরুরী। একা একজন পুরুষ অথবা শুধু দু’জন মহিলা সাধারণ লেন-দেনের সাক্ষ্যের জন্য যথেষ্ট নয়। গুণাবলীঃ (১) সাক্ষী মুসলিম হতে হবে। (২) সাক্ষী নির্ভরযোগ্য আদিল’ (বিশ্বস্ত) হতে হবে,
- সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে একজন পুরুষের পরিবর্তে দুইজন দুইজন স্ত্রীলোক কেন? এর উত্তরে বলা হয়েছে- যাতে স্ত্রীলোকদের মধ্যে একজন ভুলে গেলে তাদের একজন অপরজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
- লেখককে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তা’আলা তাকে এ লেখার বিদ্যা দান করেছেন। এর কৃতজ্ঞতা এই যে, সে লিখতে অস্বীকার করবে না।
- সফরে ঋণ লেনদেনের প্রয়োজন পড়ে এবং সেখানে লেখার লোক অথবা কাগজ-কলম ইত্যাদি না থাকে, তাহলে তার বিকল্প ব্যবস্থা হল, ঋণগ্রহীতা কোন জিনিস ঋণদাতার কাছে বন্ধক রাখবে।
- সাক্ষ্য গোপন করা কাবীরা গুনাহ।