কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৩
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-১৬
সূরা যুমার ২২-৩১
২১ নং আয়াতে মানুষের পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত বৃষ্টি দ্বারা উৎপন্ন শস্যক্ষেত্রের সাথে তুলনার করার পরে এ আয়াত এসেছে। এ সমস্ত বাস্তব ব্যাপার দ্বারা শিক্ষা গ্রহণ এবং ইসলামকে অকাট্য ও নির্ভুল সত্য বলে মেনে নেয়ার যোগ্যতা ও সুযোগ আল্লাহ যাকে দিয়েছেন৷ কোন ব্যাপারে মানুষের বক্ষা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়া মূলত এমন একটি মানসিক অবস্থার নাম, যখন তার মনে উক্ত বিষয় সম্পর্কে কোন দুচিন্তা বা দ্বিধা – দ্বন্দ্ব কিংবা সংশয় থাকে না এবং কোন বিপদের আভাস বা কোন ক্ষতির আশংকাও তাকে ঐ বিষয় গ্রহণ করতে বাধা দিকে পরে না৷ বরং সে পূর্ণ মানসিক তৃপ্তির সাথে এ সিদ্ধান্ত করে যে, এ জিনিসটি ন্যায় ও সত্য৷ তাই যাই ঘটুক না কেন আমাকে এর ওপরই চলতে হবে৷ এ ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোন ব্যক্তি যখন ইসলামের পথ অবলম্বন করে তখন আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ থেকে যে নির্দেশই আসে তা সে অনিচ্ছায় নয় খুশী ও আগ্রহের সাথে মেনে নেয় ৷ কিতাব ও সুন্নাহ থেকে যে আকাইদ ও ধ্যান ধারণা এবং যে নীতিমালা ও নিয়ম কানুন তার সামনে আসে তা সে এমনভাবে গ্রহণ করে যেন সেটাই হৃদয়ের প্রতিধ্বনি ৷ কোন অবৈধ সুবিধা পরিত্যাগ করতে তার কোন অনুশোচনা হয় না৷ সে মনে করে ঐগুলো তার জন্য কল্যাণকর কিছু ছিল না৷ বরং তা ছিল একটি ক্ষতি যা থেকে আল্লাহর অনুগ্রহ রক্ষা পেয়েছে৷ অনুরূপ ন্যায় ও সত্যের ওপর কায়েম থাকার কারণে তার যদি কোন ক্ষতি হয় তাহলে সে সেই জন্য আফসোস করে না, ঠাণ্ডা মাথায় বরদাশত করে এবং আল্লাহর পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার পরিবর্তে তার কাছে ঐ ক্ষতি হালকা মনে হয়৷ বিপদাপদ আসলে তার এ একই অবস্থা হয়৷ সে মনে করে, আমার দ্বিতীয় কোন পথই নেই — এ বিপদ থোকে বাঁচার জন্য, যে পথ দিয়ে আমি বের হয়ে যেতে পারি৷ আল্লাহর সরল সোজা পথ একটিই৷ আমাকে সর্বাবস্থায় ঐ পথেই চলতে হবে৷ বিপদ আসলে আসুক৷
জ্ঞানের আলো হিসেবে সে আল্লাহর কিতাব ও রসূলের সুন্নাত লাভ করেছেন যার উজ্জ্বল আলোতে সে জীবনে চলার অসংখ্য ছোট ছোট পথের মধ্যে কোনটি ন্যায় ও সত্যের সোজা রাস্তা তা প্রতি পদক্ষেপে স্পষ্ট দেখতে পায়৷
” শরহে সদর ” (উন্মুক্ত বক্ষ বা খোলা মন ) এর বিপরীতে মানুষরে মনের দু’টি অবস্থা হতে পারে৷ একটি হচ্ছে ‘ দ্বীকে সদর ‘ (বক্ষ সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া, মন সংকীর্ণ হয়ে যাওয়া ) এর অবস্থা৷ এ অবস্থার মনের মধ্যে ন্যায় ও সত্য প্রবেশের কিছু না কিছু অবকাশ থাকে৷ দ্বিতীয়টি ‘ কাসাওয়াতে ক্বালব’ (মন কঠিন হয়ে যাওয়া ) এর অবস্থা৷ এ অবস্থায় মনের মধ্যে ন্যায় ও সত্য প্রবেশের কোন সুযোগই থাকে না৷ দ্বিতীয় অবস্থাটি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলছেন : যে ব্যক্তি এ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে তার জন্য সর্বাত্মক ধ্বংস ন্যায় ও সত্যকে কোনভাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়ে যার তাহলেও তার জন্য রক্ষা পাওয়ার কিছু না কিছু সম্ভাবনা থাকে৷ আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি হতে এ দ্বিতীয় বিষয়টি আপনা থেকেই প্রকাশ পায়৷ কিন্তু আল্লাহ তা’আলা তা সুস্পষ্ট করে বলেননি৷ কারণ, যারা রসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরোধিতায় জেদ ও হঠকারিতা করতে একপায়ে দাঁড়িয়ে ছিল এবং এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বসেছিলো যে, কোনমতেই তাঁর কোন কথা মানবে না, আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল তাদেরকে সাবধান করা৷ তাদেরকে এ মর্মে সাবধান করা হয়েছে যে, তোমরা তোমাদের এ জিদ ও হঠকারিতাকে অত্যন্ত গর্বের বিষয় বলে মনে করে থাকো৷ কিন্তু আল্লাহর যিকির এবং তাঁর পক্ষ থেকে আসা উপদেশ বাণী শুনে বিনম্র হওয়ার পরিবর্তে কেউ যদি আরো বেশী কঠোর হয়ে যায় তাহরে একজন মানুষের জন্য এর চেয়ে বড় অযোগ্যতা ও দুর্ভাগ্য আর কিছুই নেই৷
أَحْسَنُ الْحَدِيْثِ (উত্তম বাণী)এর অর্থ হল কুরআন কারীম। متشابها এর অর্থ, কুরআনের শ্রুতিমধুর ও সুখপাঠ্য বাণী, তার সাহিত্য-শৈলী, শব্দালঙ্কার, অর্থ-সত্যতা ইত্যাদি গুণাবলীতে পারস্পরিক সাদৃশ্যপূর্ণ। অথবা কুরআন পূর্ব আসমানী গ্রন্থসমূহের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। অর্থাৎ, কুরআন অন্য সকল আসমানী কিতাবের অনুরূপ। مَثَانِيَ অর্থাৎ, এই কুরআনে বর্ণিত ইতিহাস ও কাহিনী, আদেশ-উপদেশ ও বিধি-বিধানগুলিকে বারবার ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।
যারা তাদের রবকে ভয় করে কারণ, তারাই ঐ সকল আযাব ও শাস্তির ধমক, সতর্কবাণী বুঝতে পারে, যা অবাধ্যদের জন্য তাতে বর্ণনা করা হয়েছে।
তাদের দেহ-মন আল্লাহর স্মরণের প্রতি নরম হয়ে যায় অর্থাৎ, যখন আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও অনুগ্রহ লাভের আশা তাদের মনে জাগে তখন তাদের অন্তর নরম হয়ে যায় এবং আল্লাহর স্মরণে মগ্ন হয়ে পড়ে। ক্বাতাদা (রঃ) বলেন ‘‘এতে আল্লাহর আওলিয়াগণের গুণাবলী বর্ণনা করা হয়েছে; আল্লাহর ভয়ে তাঁদের অন্তর কম্পিত হয়, তাঁদের চক্ষু অশ্রুসিক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহর যিকর দ্বারা তাঁরা মনে শান্তি পান। যিকর করতে গিয়ে তাঁরা নেশাগ্রস্ত মাতালদের মত এবং সংজ্ঞাহীন বেহুঁশের মত হয়ে যান না। (যেমন তাঁরা নেচেও উঠেন না।) কারণ এসব হল বিদআতীদের আচরণ এবং তাতে শয়তানের হাত থাকে। (ইবনে কাসীর) যেমন বর্তমানেও বিদআতীদের কাওয়ালী-গান বা যিকরের আসর অনুরূপ শয়তানী কার্যকলাপে পরিপূর্ণ; যাতে বিভিন্ন অবস্থার তারা উন্মত্ততা, মূর্ছা, অচৈতন্য, মোহিত, আত্মহারা, বিভোর, ধ্যানমগ্ন, বেহুঁশী, মস্তী ইত্যাদি নাম দিয়ে থাকে। ইমাম ইবনে কাসীর (রহঃ) বলেন, এই বিষয়ে মু’মিনগণ কাফেরদের থেকে কয়েক দিক দিয়ে স্বতন্ত্র। প্রথম এই যে, মু’মিনগণের শ্রাব্য বস্তু হল কুরআন কারীম, আর কাফেরদের শ্রাব্য বস্তু হল নির্লজ্জ গায়িকাদের গান-বাজনা। (যেমন বিদআতীদের শ্রাব্য বস্তু হল শিরকী অতিরঞ্জনমূলক না’ত, গজল ও কাওয়ালী গান।) দ্বিতীয় এই যে, মু’মিনগণ কুরআন শ্রবণ করে আদব ও ভীতি, আশা ও মহব্বত এবং অনুধাবন ও উপলব্ধির সাথে ক্রন্দন করেন এবং সিজদায় লুটিয়ে পড়েন। পক্ষান্তরে কাফেররা হৈ-হাল্লা করে এবং খেলাধূলায় ব্যস্ত থাকে। তৃতীয় এই যে, মু’মিনগণ কুরআন শ্রবণের সময় আদব ও বিনয় প্রকাশ করেন; যেমন সাহাবায়ে কিরামগণের বরকতময় অভ্যাস ছিল। যার ফলে তাঁদের দেহ শিউরে উঠত এবং তাঁদের অন্তর আল্লাহর প্রতি আসক্ত হয়ে যেত।
(উপরে أَفَمَنْ شَرَحَ اللَّهُ صَدْرَهُ আয়াতে বলা হয়েছিল যে,কোরআন শুনে কেউ প্রভাবান্বিত হয় এবং কেউ হয় না। পরের আয়াতে বলা হয়েছে যে, যারা প্রভাবান্বিত হয় না, তাদের মধ্যে যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রভাব রয়েছে। নতুবা কোরআন সবার জন্যই সমান প্রভাবশালী। এতে কোন ত্রুটি নেই।) আমি মানুষের (হিদায়েতের) জন্য এ কোরআনে সর্বপ্রকার (জরুরী) বিষয়বস্তু বর্ণনা করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। (এর অবস্থা এই যে,) এটা আরবী ভাষার কোরআন, এতে সামান্যও বক্তৃতা নেই যাতে তারা (এসব সত্য ও পরিষ্কার বিষয়বস্তু শুনে) ভয় করে। (হিদায়েতনামা হওয়ার জন্য অত্যাবশ্যকীয় গুণাবলী কোরআনে সন্নিবেশিত রয়েছে। এর বিষয়বস্তু সত্য ও সুস্পষ্ট। এর ভাষাও আরবী, যা আরবের লোকেরা প্রত্যক্ষভাবে বুঝতে সক্ষম। এরপর তাদের মাধ্যমে অন্যদের পক্ষেও বোঝা সহজ। মোটকথা, এই হিদায়েত গ্রন্থে কোন ত্রুটি নেই। কারও মধ্যে কবুল করার যোগ্যতা না থাকলে তার কি প্রতিকার।)
মানুষ মুখমণ্ডলের ওপর কোন আঘাত তখনই করে যখন সে পুরোপুরি অক্ষম ও নিরূপায় হয়ে পড়ে৷ অন্যথায় যতক্ষণ পর্যন্ত তার মধ্যে প্রতিরোধের সামান্যতম শক্তিও থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত সে শরীরের প্রত্যেকটি অংশে আঘাত সহ্য করতে থাকে কিন্তু মুখের ওপর আঘাত লাগতে দেয় না৷ তাই এখানে ঐ ব্যক্তির চরম অসহায়ত্বের চিত্র অংকন করা হয়েছে এই বলে যে, সে নিজের মুখের ওপর চরম আঘাত সহ্য করবে৷
যেমন অন্য আয়াতে এসেছে, “যে ব্যক্তি ঝুঁকে মুখে ভর দিয়ে চলে, সে-ই কি ঠিক পথে চলে, না কি সে ব্যক্তি যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে?” [সূরা আল-মুলক: ২২] আরও এসেছে, “যেদিন তাদেরকে উপুড় করে টেনে নিয়ে যাওয়া হবে জাহান্নামের দিকে; সেদিন বলা হবে, জাহান্নামের যন্ত্রণা আস্বাদন কর।” [সূরা আল-কামার: ৪৮] আরও এসেছে, “যে অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হবে সে কি শ্রেষ্ঠ, না যে কিয়ামতের দিন নিরাপদে উপস্থিত হবে সে? তোমরা যা ইচ্ছে আমল কর।” [সূরা ফুস্সিলাত: ৪০]
সৎকর্মশীল ব্যক্তিদের আসল উপার্জন হচ্ছে এই যে, সে তার কাজের ফলশ্রুতিতে আল্লাহর কাছে পুরস্কারের যোগ্য হয়ে যায়৷ আর গোমরাহী ও বিপথগামীতা অবলম্বনকারী ব্যক্তিদের প্রকৃত উপার্জন হচ্ছে সে শাস্তি যা সে আখেরাতে লাভ করবে৷
আল্লাহ তাআলা বলেনঃ তাদের পূর্ববর্তী লোকেরাও মিথ্যা আরোপ করেছিল এবং রাসূলদেরকে মিথ্যাবাদী বলেছিল, ফলে শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করলো তাদের অজ্ঞাতসারে। ফলে আল্লাহর শাস্তি তাদেরকে পার্থিব জীবনেও লাঞ্ছিত ও অপমানিত করলো, আর পরকালের কঠিন শাস্তি তো তাদের জন্যে বাকী আছেই। সুতরাং হে মক্কার কাফিরের দল! তোমাদের এখন উচিত আল্লাহকে ভয় করা এবং আল্লাহর রাসূল (সঃ)-এর সাথে দুর্ব্যবহার করা হতে বিরত থাকা। নতুবা তোমাদের অবাধ্যতা ও হঠকারিতার কারণে হয়তো তোমাদের উপরও আল্লাহর কঠিন শাস্তি নেমে আসবে। তোমাদের জ্ঞান থাকলে তোমাদের পূর্ববর্তীদের অবস্থা তোমাদের শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণের জন্যে যথেষ্ট।
এর দ্বারা মক্কার কাফেরদেরকে এই বলে সতর্ক করা হচ্ছে যে, পূর্ববর্তী জাতিরা পয়গম্বরদেরকে মিথ্যাজ্ঞান করার ফলে তাদের এই অবস্থা হয়েছিল, আর তোমরা নবীকুল শিরোমণি ও মানবকুল শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে মিথ্যাজ্ঞান করছ। তোমাদেরকেও এই মিথ্যার ভয়াবহ পরিণতিকে ভয় করা দরকার।
আল কুরআনের উপমা-দৃষ্টান্ত পেশ করার বিষয়টি খুবই স্পষ্ট। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য পেশ করি; আর জ্ঞানী লোকেরা ছাড়া কেউ তা বুঝে না। [সূরা আনকাবুত-৪৩]
তিনি আরও বলেছেন, মানুষের জন্য আমি এ উদাহরণগুলি পেশ করি; হয়ত তারা চিন্তাভাবনা করবে । [সূরা হাশর, আয়াত ২১]
উপমা বা দৃষ্টান্তকে আরবীতে মেছাল বলে। এর বহুবচন হলো আমছাল । আল কুরআনের উল্লিখিত উপমা-উদাহরণ-দৃষ্টান্ত ভিন্ন প্রকৃতি ও আমেজবহ। অতএব আল কুরআনের উদ্ধৃত মেছালের সংজ্ঞায় বলা যায় যে, অর্থ ও ভাবকে সংক্ষিপ্ত ও নান্দনিক কায়দায় এমনভাবে প্রকাশ করা, যা হৃদয়ে রেখাপাত করে, হোক তা উপমা অথবা প্রচলিত কথা (প্রবাদ)। পবিত্র কোরআনের প্রায় ৪০ জায়গায় এ ধরনের উপমা ব্যবহৃত হয়েছে। আল কুরআনের উপমা-উদাহরণ তিন প্রকার- ১-সরাসরি ব্যক্ত উপমা। (আমসালুল মুসাররিহা) ২-সুপ্ত উপমা। (আমসালুল কামিনাহ), ৩-প্রবাদতুল্য উপমা। (কওলুল মুহাককি)
উপমা-উদাহরণ চিন্তাগত বিষয়কে সহজবোধ্য ও স্পর্শযোগ্য করে উপস্থাপন করে। ফলে মানববুদ্ধি তা সহজে গ্রহণ করে নেয়। যেমন আল্লাহ তাআলা লোকদেখিয়ে দানকারীর উপমা পেশ করে বলেন, অতএব তার উপমা এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর রয়েছে মাটি। অতঃপর তাতে প্রবল বৃষ্টি পড়ল, ফলে তাকে একেবারে পরিষ্কার করে ফেলল। তারা যা অর্জন করেছে তার মাধ্যমে তারা কোন কিছু করার ক্ষমতা রাখে না । [সূরা বাকারা, আয়াত ২৬৪]
উপমা উদাহরণ বাস্তবতাকে উন্মোচিত করে দেয়। যা দৃষ্টির অন্তরালে তাকে বর্তমানে এনে হাজির করে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী, যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয় । [সূরা বাকারা, আয়াত ২৭৫]
উপমা-উদাহরণ চমৎকার অর্থকে সংক্ষিপ্ত আকারে পেশ করে, যেমন সুপ্ত-উপমা ও প্রবাদতুল্য উপমা। উপমা-উদাহরণ যে বিষয়কে কেন্দ্র করে পেশ করা হয়, সে বিষয়ের ব্যাপারে মানুষকে আগ্রহী করে তোলে। বিশেষ করে উদাহরণ-দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশকৃত বিষয়টি পূর্ব থেকেই মানুষের আগ্রহের জগতে সজীব থাকে। যেমন আল্লাহর পথে যারা দান করে তাদের দান বহু কল্যাণ বয়ে আনে এ বিষয়টির দৃষ্টান্ত তুলে ধরে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ, প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ । [সূরা বাকারা, আয়াত ২৬১]
পৃথিবীতে অনেক ভাষা আছে। সব ভাষাই আল্লাহর দান। তাহলে কোরআন কেন আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে? এর জবাবে আল্লাহ বলেন, ‘আমি যদি এই কোরআনকে অনারবি ভাষায় অবতীর্ণ করতাম, তবে তারা বলত, এর আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হলো না কেন? এটি কেমন কথা যে কোরআন অনারবি ও রাসুল [মুহাম্মদ (সা.)] আরবীয়। বলো, যারা ইমান আনে, তাদের জন্য এটি হেদায়েত ও (আত্মার) ব্যাধির প্রতিকার, আর যারা ইমান আনে না, তাদের কানে বধিরতা আছে। তাদের জন্য এটি অন্ধত্বের কারণ। এরা এমন যে যেন তাদের বহু দূর-দূরান্ত থেকে ডাকা হচ্ছে।’ (সুরা : হা-মিম সিজ্দা, আয়াত : ৪৪)
প্রশ্ন হলো, মহানবী (সা.) বিশ্বনবী। কিন্তু কোরআন শুধু আরবি ভাষায় অবতীর্ণ হলে অন্য ভাষার লোকেরা কিভাবে কোরআন থেকে উপকৃত হবে? এর জবাব হলো, মক্কা পৃথিবীর কেন্দ্রে অবস্থিত। আর সেখানকার ভাষা আরবি। তাই কেন্দ্রস্থলের ভাষা আরবিতে কোরআন অবতীর্ণ করা হয়েছে, যাতে আরবি ভাষাভাষিরা সবার আগে তা বুঝতে পারে। আর অন্য ভাষাভাষিরা তাদের মাধ্যমে কোরআন বুঝতে পারে। এ বিষয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি বরকতময় কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি। এটি আগের আসমানি কিতাবগুলোর সমর্থক, যাতে তুমি এর মাধ্যমে জনপদগুলোর কেন্দ্র (মক্কা) ও তার আশপাশের লোকদের সতর্ক করতে পারো। যারা পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তারা এর প্রতিও বিশ্বাস রাখে এবং তারা তাদের নামাজের পরিপূর্ণ রক্ষণাবেক্ষণ করে।’ (সুরা : আন’আম, আয়াত : ৯২)
এ কিতাব অন্য কোন ভাষায় নাযিল হয়নি যে, তা বুঝার জন্য মক্কা ও আরবের লোকদের কোন অনুবাদক বা ব্যাখ্যাকারের দরকার হয়৷ এ কিতাব তাদের নিজের ভাষায় নাযিল হয়েছে৷ যা তারা নিজেরাই সরাসরি বুঝতে সক্ষম৷
অর্থাৎ তার মধ্যে কোন বক্রতা বা জাটিলতাপূর্ণ কোন কথা নেই যে, তা বুঝা সাধারণ মানুষের জন্য কঠিন হবে৷ বরং এর মধ্যে পরিস্কারভাবে সহজ – সরল কথা বলা হয়েছে৷ প্রত্যেক ব্যক্তি এখান থেকে জেনে নিতে পারে এ গ্রন্থ কোন জিনিসকে ভ্রান্ত বলে এবং কেন বলে ? কোন জিনিসকে সঠিক বলে এবং কিসের ভিত্তিতে ? কি স্বীকার করাতে চায় এবং কোন জিসিস অস্বীকার করাতে চায়৷ কোন কোন কাজের নির্দেশ দেয় এবং কোন কোন কাজে বাধা দেয়৷
এ উপমাতে আল্লাহ তা’আলা শিরক ও তাওহীদের পার্থক্য এবং মানব জীবনের ওপর এ দু’টির প্রভাব এমন পরিস্কারভাবে বর্ণনা করেছেন যে, এতো বড় বিষয়কে এর চেয়ে সংক্ষিপ্ত কথায় এবং এতটা কার্যকর পন্থায় বুঝিয়ে দেয়া সম্ভব নয়৷ একথা সবাই স্বীকার করবে যে, যে ব্যক্তি অনেক মালিক বা মনিবের অধীন এবং তারা প্রত্যেকেই তাকে নিজের দিকে টানে৷ তারা এমন বদমেজাজী যে, প্রত্যেক তার সেবা গ্রহণ করতে চায় কিন্তু অন্য মালিকের নির্দেশ পালনের সুযোগ তাকে দেয় না, তাছাড়া তাদের পরস্পর বিরোধী নির্দেশ শুনতে গিয়ে যার নির্দেশই সে পালন করতে অপরাগ হয় সে তাকে শুধু ধমক ও বকাঝকা দিয়েই ক্ষান্ত হয় না, বরং শাস্তি দিতেও বদ্ধপরিকর হয়, এমন ব্যক্তির জীবন অনিবার্যরূপেই অত্যন্ত সংকীর্ণতার মধ্যে পতিত হবে৷ পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি একই মনিবের চাকর সে ব্যক্তি অতীব আরাম ও শান্তিতে জীবন যাপন করবে৷ তাকে অন্য কারো খেদমত এবং সন্তোষ বিধান করতে হয় না৷ এটা এমন সহজ করল কথা যা বুঝার জন্য বড় বেশী চিন্তা – ভাবনা করার প্রয়োজন হয় না৷ এ উপমা পেশ করার পর কারো জন্য একথা বুঝাও কঠিন নয় যে এক আল্লাহর দাসত্বে মানুষের জন্য যে শান্তি ও নিরাপত্তা আছে বহু সংখ্যক ইলাহর দাসত্ব করে কখনো তা লাভ করা যেতে পারে না৷
এখানে একথাও ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার যে, পাথরের মূর্তির সাথে বহু সংখ্যক বক্র স্বভাবের এবং পরস্পর কলহপ্রিয় মনিবদের উপমা খাটে না৷ এ উপমা সেসব জীবন্ত মনিবদের ক্ষেত্রেই খাটে যারা কার্যতই পরস্পর বিরোধী নির্দেশ দান করে এবং বাস্তবেও তাকে নিজের দিকে টানতে থাকে৷ পাথরের মূর্তি কাকে কবে আদেশ দেয় এবং কাকে কখন নিজের খেদমতের জন্য ডাকে ? এ তো জীবন্ত মনিবদের কাজ৷ মানুষের নিজের প্রবৃত্তির মধ্যে, বংশের মধ্যে, জ্ঞাতি – গোষ্ঠির মধ্যে, জাতি ও দেশের সমাজের মধ্যে, ধর্মীয় নেতাদের মধ্যে, শাসক ও আইন প্রণেতাদের মধ্যে, কায়কারবার ও জীবিকার গণ্ডির মধ্যে এবং পৃথিবীর সভ্যতার ওপর প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিসমূহের মধ্যে সর্বত্র বিদ্যমান৷ তাদের পরস্পর বিরোধী আকাংখা ও বিভিন্ন দাবী মানুষকে সবসময় নিজের দিকে টানতে থাকে৷ সে তাদের যার আকাংখা ও দাবী পূরণ করতে ব্যর্থ হয় সে তাকে নিজের কর্মের গণ্ডির মধ্যে শাস্তি না দিয়ে ছাড়ে না৷ তবে প্রত্যেকরে শাস্তিতর উপরকরণ ভিন্ন ভিন্ন্৷ কেউ মনে আঘাত দেয়, কেউ অসন্তুষ্ট হয়, কেউ উপহাস করে, কেউ সম্পর্ক ছিন্ন করে৷ কেউ নির্বোধ বলে আখ্যায়িত করে, কেউ ধর্মের ওপর আক্রমণ করে এবং কেউ আইনের আশ্রয় নিয়ে শাস্তি দেয়৷ মানুষের জন্য এ সংকীর্ণতা থেকে বাঁচার একটিই মাত্র উপায় আছে৷ আর তা হচ্ছে তাওহীদের পথ গ্রহণ করে শুধু এক আল্লাহর বান্দা হয়ে যাওয়া এবং গলদেশ থেকে অন্যদের দাসত্বের শৃঙ্খল ছিঁড়ে দূরে নিক্ষেপ করা
তাওহীদের পথ অবলম্বন করারও দু’টি পন্থা আছে এবং এর ফলাফলও ভিন্ন ভিন্ন৷
একটি পন্থা এই যে, কেউ ব্যক্তিগত পর্যায়ে এক আল্লাহর বান্দা হয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেবে কিন্তু আশে – পাশের পরিবেশ তার সহযোগী হবে না৷ এ ক্ষেত্রে তার জন্য বাইরের দ্বন্দ্ব – সংঘাত ও সংকীর্ণতা আগের চেয়েও বেড়ে যেতে পারে৷ তবে সে যতি সরল মনে এ পথ অবলম্বন করে থাকে তাহলে মনের দিক দিয়ে শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করবে৷ সে প্রবৃত্তির এমন প্রতিটি আকাংখা প্রত্যাখ্যান করবে যা আল্লাহর নির্দেশের পরিপন্থী বা যা পূরণ করার পাশাপাশি আল্লাহভীরুতার দাবী পূরণ করা যেতে পারে না৷ সে পরিবার, গোত্র, গোষ্ঠী, জাতি, সরকার, ধর্মীয় নেতৃত্ব এবং আর্থিক কর্তৃত্বেরও এমন কোন দাবী গ্রহণ করবে না যা আল্লাহর আইনের সাথে সাংঘর্ষিক৷ এর ফলে সে সীমাহীন দুঃখ – দুর্দশার সম্মুখীন হতে পারে তথা অনিবার্যরূপেই হবে কিন্তু তার মন এ ব্যাপারে পুরোপুরি পরিতৃপ্ত থাকবে যে, আমি যে আল্লাহর বান্দা তার দাসত্বের দাবী আমি সম্পূর্ণরূপে পূরণ করছি৷ আর আমি যাদের বান্দা নই আমার কাছে তাদের এমন কোন অধিকার নেই, যে কারনে আমি আমার রবের নির্দেশের বিরুদ্ধে তাদের দাসত্ব করবো৷ দুনিয়ার কোন শক্তিই তার থেকে মনের এ প্রশান্তি এবং আত্মার এ শান্তি ও তৃপ্তি ছিনিয়ে নিতে পারে না৷ এমনকি তাকে যদি ফাঁসি কাষ্ঠেও চড়তে হয় তাহলে সে প্রশান্ত মনে ফাঁসির কাষ্ঠেও ঝুলে যাবে৷ সে একথা ভেবে সামান্য অনুশোচনাও করবে না যে, আমি কেন মিথ্যা প্রভুদের সামনে মাথা নত করে আমার জীবন রক্ষা করলাম না৷
আরেকটি পন্থা এই যে, গোটা সমাজ তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাক এবং সেখানে নৈতিক চরিত্র, সভ্যতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, আইন, কানুন, রীতিনীতি ও দেশাচার, রাজনতি, অর্থনীতি মোট কথা জীবনের প্রতিটি বিভাগের জন্য আকীদা – বিশ্বাস হিসেবে সেসব মূলনীতি মেনে নেয়া হোক এবং কার্যত চালু করা হোক যা মহান আল্লাহ তাঁর কিতাব ও রসূলের মাধ্যমে দিয়েছেন৷ আল্লাহর দীন যেটিকে গোনাহ বলবে আইন সেটিকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করবে, সরকারের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা সেগুলোকে উৎখাত করার চেষ্টা করবে, শিক্ষা – দীক্ষা সেটি থেকে বাঁচার জন্য মন মানসিকতা তৈরী করবে৷ মিম্বার ও মিহরাব থেকে এর বিরুদ্ধেই আওয়াজ উঠবে সমাজ এটিকে দোষণীয় মনে করবে এবং জীবিকা অর্জনের প্রতিটি কাজ- কারবারে তা নিষিদ্ধ হবে৷ অনুরূপভাবে আল্লাহর দীন যে জিনিসকে কল্যাণ ও সুকৃতি হিসেবে আখ্যায়িত করবে আইন তাকেই সমর্থন করবে৷ ব্যবস্থাপনার শক্তি তার লালন পালন করবে৷ গোটা শিক্ষা ব্যবস্থা মন মগজে সেটিকে বদ্ধমূল করতে এবং চরিত্র ও কর্মে প্রতিফলিত করার চেষ্টা করবে৷ মিম্বর ও মিহরাব তারই শিক্ষা দেবে, সমাজও তারই প্রশংসা করবে৷ তার ওপরেই প্রচলিত রীতিনীতি কার্যত প্রতিষ্ঠিত করবে এবং কায়-কারবার ও জীবন জীবিকার প্রক্রিয়াও সে অনুসারেই চলবে৷ এভাবেই মানুষ পূর্ণ আভ্যন্তীণ ও বাহ্যিক শান্তি লাভ করে এবং বস্তুগত ও আধ্যাত্মক উন্নতির সমস্ত দরজা তার জন্য খুলে যায়৷ কারণ, আল্লাহ ও গায়রুল্লাহর দাসত্বের দাবীর যে দ্বন্দ্ব – সংঘাত তা তখন প্রায় শেষ হয়ে যায়৷
ইসলাম যদিও প্রত্যেক ব্যক্তিকে এই বলে আহবান জায়ায় যে, দ্বিতীয় অবস্থাটা সৃষ্টি হোক বা না হোক সর্বাবস্থায় সে তাওহীদকেই তার আদর্শ হিসেবে মেনে চলবে এবং সব রকম বিপদ – আপদ ও দুঃখ – কষ্টের মোকাবিলা করে আল্লাহর দাসত্ব করে৷ কিন্তু এ কথা অস্বীকার করা যায় না যে, ইসলামের চূড়ান্ত লক্ষ এ দ্বিতীয় অবস্থা সৃষ্টি করা৷ সমস্ত নবী ও রসূল আলাইহিমুস সালামের প্রচেষ্টা ও দাবীও এই যে, একটি মুসলিম উম্মাহর উত্থান ঘটুক যারা কুফর ও কাফেরদের আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে জামায়ত বদ্ধভাবে আল্লাহর দীন অনুসরণ করবে৷ কুরআন ও সুন্নাত সম্পর্কে অজ্ঞ এবং বিবেক – বুদ্ধিহীন না হয়ে কেউই একথা বলতে পারে না যে, নবী রসূল আলাইহিমুস সালামের চেষ্টা সাধানার লক্ষ ছিল শুধু ব্যক্তিগত ঈমান ও আনুগত্য৷ সামাজিক জীবনে ‘ দীন হক ‘ বা ন্যায় ও সত্যের আদর্শ কয়েম করার উদ্দেশ্য আদৌ তাঁদের ছিল না৷
এখানে ” আলহামদুলিল্লাহ ” এর অর্থ বুঝার জন্য মনের মধ্যে এ চিত্রটি অংকন করুন যে,শ্রোতাদের সামনে উপরোক্ত প্রশ্ন পেশ করার পর বক্তা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন যাতে তাওহীদের বিরোধীতাকারীদের কাছে তার কোন জবাব থাকলে যেন দিতে পারে৷ কিন্তু তাদের কাছ থেকে যখন কোন জবাব আসলো না এবং কোন দিক থেকে এ জবাবও আসলো না যে, দু’টি সমান, তখন বক্তা বললেন ‘ আলহামদুলিল্লাহ ‘ অর্থাৎ আল্লাহর শুকরিয়া যে তোমরা নিজেরাও মনে মনে এ দু’টি অবস্থার পার্থক্য অনুভব করে থাকো৷ একজন মনিবের দাসত্বের চেয়ে অনেক মনিবের দাসত্ব উত্তম বা দু’টি সমান পর্যায়ের একথা বলার ধৃষ্ঠতা তোমাদের কারোই নেই৷
তাদের অধিকাংশই জানে না অর্থাৎ একজন মনিবের দাসত্ব ও বহু সংখ্যক মনিবের দাসত্বের মধ্যকার পার্থক্য তো বেশ বুঝতে পার কিন্তু এক প্রভুর দাসত্ব ও বহু সংখ্যক প্রভুর দাসত্বের মধ্যকার পার্থক্য যখন বুঝানোর চেষ্টা করা হয় তখন অজ্ঞ সেজে বসো৷
এ বাক্যাংশ ও পূর্ববর্তী বাক্যাংশের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম শূন্যতা আছে যা স্থান কাল ও পূর্বাপর বিষয়ে চিন্তা করে যে কোন বুদ্ধিমান ব্যক্তি নিজেই পূর্ণ করতে পারেন৷ এখানে এ বিষয়টি প্রচ্ছন্ন আছে যে, তোমরা এভাবে একটি পরিস্কার সহজ – সরল কথা সহজ – সরল উপায়ে এসব লোককে বুঝাচ্ছো আর এরা হঠকারিতা করে তোমাদের কথা শুধু প্রত্যাখ্যানই করছে না বরং এ সুস্পষ্ট সত্যকে পরাভূত করার জন্য তোমাদের চরম শত্রু হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ ঠিক আছে ! চিরদিন তোমরাও থাকবে না, এরাও থাকবে না৷ একদিন উভয়কেই মরতে হবে৷ তখন সবাই যার যার পরিণাম জানতে পারবে৷
এ আয়াত নাযিল হলে যুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! দুনিয়াতে আমরা যে ঝগড়া করছি সেটা কি আবার আখেরাতেও হবে? রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হ্যাঁ, তখন যুবাইর বললেন, বিষয়টি তাহলে ভয়াবহ। [তিরমিযীঃ ৩২৩৬] ইবন উমর বলেন, আমরা এ আয়াত নাযিল হয়েছে জানতাম কিন্তু কেন নাযিল হলো বুঝতে পারিনি। আমরা বলতাম, কার সাথে আমরা ঝগড়া করব? আমাদের মধ্যে এবং আহলে কিতাবদের মধ্যে তো কোন ঝগড়া নেই। অবশেষে যখন মুসলিমদের মাঝে ফেতনা শুরু হলো তখনই বুঝতে পারলাম যে, এটাই আমাদের রবের পক্ষ থেকে যে ঝগড়ার ওয়াদা করা হয়েছিল তা। [আত-তাফসীরুস সহীহ]
হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বলেন, এখানে انکم শব্দের মধ্যে মুমিন, কাফির, মুসলমান, জালিম ও মযলুম সবাই অন্তর্ভুক্ত। তারা সবাই নিজ নিজ মোকাদ্দমা আল্লাহ্ তা’আলার আদালতে দায়ের করবে এবং আল্লাহ্ জালিমকে মানুষের হক দিতে বাধ্য করবেন। বুখারীতে বর্ণিত হযরত আবু হুরায়রার রেওয়ায়েতে রসুলুল্লাহ্ (সা)-র ধরন বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, কারও যিম্মায় কারও কোন হক থাকলে তার উচিত দুনিয়াতেই তা আদায় করা অথবা ক্ষমা নিয়ে মুক্ত হয়ে যাওয়া। কেননা, পরকালে দীনার-দেরহাম থাকবে না যে, তা নিয়ে হক আদায় করা যাবে। সেখানে জালিম ব্যক্তির কিছু সৎকর্ম থাকলে তা জুলুমের পরিমাণে তার কাছ থেকে নিয়ে মযলুম ব্যক্তিকে দিয়ে দেওয়া হবে। তার কাছে কোন সৎকর্ম না থাকলে মযলুমের গোনাহ্, তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হবে।সহীহ মুসলিমে আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লাহ্ (সা) এক দিন সাহাবায়ে কিরামকে প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে? তাঁরা আরয করলেন, ইয়া রসূলুল্লাহ্, আমরা তো তাকেই নিঃস্ব মনে করি, যার কাছে নগদ অর্থ-কড়ি এবং প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নেই। তিনি বললেনঃ আমার উম্মতের মধ্যে সত্যিকার নিঃস্ব সে ব্যক্তি, যে কিয়ামতের দিন অনেক নামায, রোযা ও হজ্জ-যাকাত ইত্যাদি নিয়ে উপস্থিত হবে, কিন্তু দুনিয়াতে সে কাউকে গালি দিয়েছিল, কারও বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করেছিল, কারও অর্থ-কড়ি অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করেছিল, কাউকে হত্যা করেছিল এবং কাউকে প্রহার করে দুঃখ দিয়েছিল—এসব মযলুম সবাই আল্লাহর সামনে তাদের যুলুমের প্রতিকার দাবি করবে। ফলে তার সৎকর্মসমূহ তাদের মধ্যে বন্টন করে দেওয়া হবে। যদি তার সহকর্ম নিঃশেষ হয়ে যায় এবং মযলুমের হক অবশিষ্ট থাকে তবে মযলুমের গুনাহ তার ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতএব এ ব্যক্তি সবকিছু থাকা সত্ত্বেও কিয়ামতে নিঃস্ব হয়ে যাবে। সেই প্রকৃত নিঃস্ব।
ফুটনোট
- “শরহে সদর” (উন্মুক্ত বক্ষ বা খোলা মন ) কাসাওয়াতে ক্বালব’ (মন কঠিন হয়ে যাওয়া ) এই দুই ধরনের কলব/হৃদয় কখনো সমান হতে পারে না।
- শরহে সদর হলো আল্লাহ ইসলামের জন্য যার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন ফলে সে তার রাবের দেয়া নূরের উপর রয়েছে। অপরদিকে কাসাওয়াতে ক্বালব’ হলো- কঠোর হৃদয় ব্যক্তি, যারা আল্লাহর স্মরণ বিমুখ! তারা স্পষ্ট বিভ্ৰান্তিতে আছে।
- أَحْسَنُ الْحَدِيْثِ(উত্তম বাণী)এর অর্থ হল কুরআন
- ২৩ নং আয়াতে কুরআনের কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো হলো-
- এটা উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য
- এটা বারবার পড়া হয়। (কুরআন পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী পঠিত গ্রন্থ)
- এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হিদায়াত
- কোরআন শুনে কেউ প্রভাবান্বিত হয় এবং কেউ হয় না। যারা প্রভাবান্বিত হয় না, তাদের মধ্যে যোগ্যতা ও প্রতিভার প্রভাব রয়েছে। নতুবা কোরআন সবার জন্যই সমান প্রভাবশালী।
- কুরআন অধ্যয়নের/শুনার ফলে যারা তাদের রবকে ভয় করে, যাদের শরীর শিউরে ওঠে, যাদের দেহ, মন বিনম্র হয়ে আল্লাহর স্মরণে ঝুঁকে পড়ে বুঝতে হবে আল্লাহ্ তাদের উন্মুক্ত বক্ষ বা খোলা মন রেখেছেন এবং তারা হিদায়াতের উপর রয়েছে।
- কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল করা হয়েছে এবং যা বক্রতামুক্ত
- কুরআনে উপমা/দৃষ্টান্তের মাধ্যমে মানুষকে বিভিন্ন বিষয় বুঝানো হয়েছে যাতে মানুষ কুরআনের উপদেশ সহজে গ্রহণ করে।
- তাওহীদ ও শিরকের বিষয় বুঝতে ২৯ নং একটি উদাহরণ দেওয়া হয়েছে- এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত; এ দু’জনের অবস্থা কি সমান?
- প্রত্যেক সৃষ্টিই মরণশীল
- কিয়ামতের দিন সবাই নিজ নিজ মোকাদ্দমা আল্লাহ্ তা`আলার আদালতে দায়ের করবে এবং আল্লাহ্ জালিমকে মানুষের হক দিতে বাধ্য করবেন।