কুরাআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৩
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-১২
সূরা মূলক ১৫-৩০
ভুপৃষ্ঠ নিজে থেকেই তোমাদের অনুগত হয়ে যায়নি৷ আর যে খাবার তোমরা লাভ করছো তাও আপনা থেকেই এখানে সৃষ্টি হয়নি৷ বরং আল্লাহ তাঁর হিকমত ও কুদরত দ্বারা এ পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন যে, এখানে তোমাদের জীবন ধারণ সম্ভব হচ্ছে এবং বিশাল গ্রহটি এমন শান্তিময় হয়ে উঠেছে যে, তোমরা নিশ্চিন্তে এখানে চলাফেরা করছো৷ তোমাদের জন্য এটি এমন একটি নিয়ামতের ভাণ্ডরে হয়ে উঠেছে যে, তোমাদের জীবন যাপনের জন্য এখানে অসংখ্য উপকরণ বর্তমান আছে৷ যদি তোমরা গাফিল না হয়ে থাকো এবং কিছু বিবেক -বুদ্ধি কাজে লাগিয়ে দেখো তাহলে জানতে পারবে, ভূ পৃষ্ঠকে তোমাদের জীবন ধারণের উপযোগী বানাতে এবং সেখানে রিযিকের অফুরন্ত ভাণ্ডার সৃষ্টি করতে পরিমাণ বুদ্ধি ও কৌশল কাজে লাগানো হয়েছে৷
এ পৃথিবীর বুকে বিচরণ করো এবং আল্লাহর দেয়া রিযিক খাও৷ কিন্তু একথা ভুলে যেও না যে, একদিন তোমাদের আল্লাহর সামনে হাজির হতে হবে৷
এর দ্বারা একথা বুঝায় না যে, আল্লাহ আসমানে থাকেন৷ বরং একথাটি এভাবে বলার কারণ হলো, মানুষ যখনই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতে চায় তখনই সে আসমানের দিকে তাকায়, দোয়া করার সময় আসমানের দিকে হাত উঠায়, কোন বিপদের সময় সব রকম সাহায্য-সহযোগিতা ও অবলম্বন থেকে নিরাশ হয়ে গেলে আসমানের দিকে মুখ তুলে আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে ৷ আকস্মিকভাবে কোন বিপদ আপতিত হলে বলে ,এটি ওপর থেকে নাযিল হয়েছে৷ অস্বাভাবিকভাবে পাওয়া কোন জিনিস সম্পর্কে বলে এটি উর্ধ জগত থেকে এসেছে ৷ আল্লাহর প্রেরিত কিতাবসমূহকে আসমানী কিতাব বলা হয়৷ আবু দাউদে হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি একটি কাল দাসীকে সাথে করে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললোঃ একজন ঈমানদার দাসকে মুক্ত করা আমার ওয়াজিব হয়ে গিয়েছে৷ আমি কি এই দাসটিকে মুক্ত করতে পারি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দাসীটিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আল্লাহ কোথায়? সে আংগুল দিয়ে আসমানের দিকে ইশারা করে দেখালো৷ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার জিজ্ঞেস করলেনঃ আমি কে? সে প্রথমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দিকে এবং আসমানের দিকে ইশারা করলো৷ এভাবে তার উদ্দেশ্য বুঝা যাচ্ছিল যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ একে মুক্ত করে দাও, এ ঈমানদার৷ (মুয়াত্তা, মুসলিম, ও নাসায়ী হাদীসগ্রন্থেও অনুরূপ ঘটনা বর্ণিত হয়েছে)
হযরত উমর (রা) হযরত খাওলা বিনতে সা”লাবা সম্পর্কে একবার বলেন যে, তিনি এমন এক মহিলা যার আবেদন সাত আসমানের ওপর থেকে কবুল করা হয়েছে৷ এসব কথা থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মানুষ যখন আল্লাহ সম্পর্কে চিন্তা করে তখন স্বভাবই তার মন নিচে মাটির দিকে যায় না৷ বরং ওপরে আসমানের দিকে যায়৷ এদিকে লক্ষ রেখেই এখানে আল্লাহ তা”আলা সম্পর্কে -(যিনি আসমানে আছেন) কথাটি বলা হয়েছে৷ তাই এ ক্ষেত্রে এরূপ সন্দেহ পোষণ করার কোন অবকাশ নেই যে, কুরআন আল্লাহ তা”আলাকে আসমানে অবস্থানকারী বলে ঘোষনা করছে৷ কি করে এ ধারণা সৃষ্টি হতে পারে? এ সূরা মুলকেরই শুরুতেই বলা হয়েছে -(তিনি স্তরে স্তরে সাজিয়ে সাতটি আসমান সৃষ্টি করেছেন৷ সূরা আল বাকারায় বলা হয়েছে – (তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাও না কেন সেটিই আল্লাহর দিক৷
এভাবে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে যে, এ পৃথিবীতে তোমাদের টিকে থাকা এবং নিরাপত্তা লাভ করা সমসময় মহান আল্লাহর দয়া ও করুণার ওপর নির্ভর করে৷ তোমরা আপন শক্তির জোরে এ পৃথিবীতে সুখের জীবন যাপন করছো না৷ তোমাদের জীবনের এক একটি মুহূর্ত , যা এখানে অতিবাহিত হচ্ছে, তার সবই আল্লাহর হিফাযত ও তত্ত্বাবধানের ফল৷ অন্যথায় তাঁর ইংগিতে যে কোন সময় এ পৃথিবীতে ভূমিকম্প সংঘটিত হতে পারে এবং এ পৃথিবী তোমাদের জন্য মায়ের স্নেহময় কোল না হয়ে কবরে পরিণত হতো৷ অথবা যে কোন সময় এমন ঝড় ঝাঞ্চ্বা আসতে পারে যা তোমাদের জনপদকে ধ্বংস করে ফেলবে৷
সাবধানবাণী মানে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে মক্কার কাফেরদেরকে সাবধান করা৷ তাদেরকে সাবধান করে দেয়া হচ্ছিল, যদি তোমরা কুফরী ও শিরক থেকে বিরত না হও এবং তাওহীদের যে আহবান তোমাদের জানানো হচ্ছে তাতে সাড়া না দাও তাহলে আল্লাহর আযাব তোমাদের পাকড়াও করবে৷
অর্থাৎ শূন্যে উড়ন্ত প্রতিটি পাখি করুণাময় আল্লাহর হিফাযতে থেকে উড়ে থাকে৷ তিনি প্রতিটি পাখিকে এমন দৈহিক কাঠামো দান করেছেন যার সাহায্য তারা উড়ে বেড়াবার যোগ্যতা লাভ করছে৷ তিনিই প্রতিটি পাখিকে উড়তে শিখিয়েছেন৷ তিনিই বাতাসকে এমন সব নিয়ম-কানুনের অধীন করে দিয়েছেন যে কারণে বাতাসের চেয়ে ভারী দেহের অধিকারী বস্তুসমূহের পক্ষেও বাতাসে ভর দিয়ে উড়া সম্ভব ৷ আর উড়তে সক্ষম প্রতিটি বস্তুকে তিনি শূণ্যে ধরে রাখেন৷ তা না হলে আল্লাহ তাঁর হিফাযত উঠিয়ে নেয়া মাত্রই তা মাটিতে পড়ে যেতো৷
অর্থাৎ গুটিকয়েক পাখির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়৷ বরং এ পৃথিবীতে যা আছে তা সবই আল্লাহর হিফাযত করার কারণে টিকে আছে৷ প্রতিটি জিনিসের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যেসব উপকরণ প্রয়োজন তা তিনিই যোগান দিচ্ছেন৷ তাঁর প্রতিটি সৃষ্টির কাছে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও সামগ্রী ঠিকমত পৌছানোর ব্যবস্থা তিনিই করেন৷
প্রশ্নবাচক এই উক্তি এখানে ধমকের জন্য এসেছে। جُنْدٌ এর অর্থ হল সৈন্যদল, গোষ্ঠী। অর্থাৎ, কোন সৈন্যদল বা গোষ্ঠী এমন নেই, যে তোমাদেরকে আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে পারবে।
অর্থাৎ, আল্লাহ যদি বৃষ্টি বর্ষণ না করেন অথবা যমীনকেই যদি ফসলাদি উৎপন্ন করতে নিষেধ করে দেন কিংবা যদি পাকা ফসলকে নষ্ট করে দেন; যেমন কখনো কখনো তিনি এইরূপ করে থাকেন, যার কারণে তোমাদের জীবিকার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়, যদি মহান আল্লাহ এইরূপ করে দেন তাহলে বল, আর এমন কে আছে, যে আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত তোমাদের জন্য রুযীর ব্যবস্থা করে দেবে?
তাদের উপর ওয়ায-নসীহতের এই কথাগুলোর কোন প্রভাব পড়ে না, বরং তারা সত্যের বিরুদ্ধাচরণ করেই যাচ্ছে এবং তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে ভ্রষ্টতার দিকে আগে বাড়তেই আছে। না তারা উপদেশ গ্রহণ করে, আর না তারা চিন্তা-ভাবনা করে।
মুখে ভর দিয়ে যে চলে সে ডানে-বামে, আগে-পিছে কিছুই দেখে না এবং সে হোঁচট খাওয়া থেকেও রক্ষা পায় না। এমন মানুষ কি নিজ গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে পারে? অবশ্যই না। অনুরূপ দুনিয়ায় আল্লাহর নাফরমানীতে ডুবে থাকা ব্যক্তি পরকালে সাফল্য লাভ করা হতে বঞ্চিত থাকবে।
সিরাতুল মুস্তাকিম- যে পথে কোন বক্রতা নেই ও ভ্রষ্টতার আশঙ্কা নেই এবং সে সামনে ও ডানে-বামে দেখতেও পায়। নিশ্চিত যে, এমন ব্যক্তি তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ, আল্লাহর আনুগত্যের সরল পথ অবলম্বনকারী আখেরাতে বড়ই সৌভাগ্যবান হবে। কেউ কেউ বলেন যে, এটা মুমিন ও কাফের উভয়ের সেই অবস্থার বিবরণ, যা কিয়ামতে তাদের হবে। কাফেরদেরকে মুখের উপর ভর করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। আর মুমিনরা সোজা হয়ে নিজের পায়ে হেঁটে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যেমন, কাফেরদের ব্যাপারে অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, আমি তাদেরকে কিয়ামতের দিন মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় সমবেত করব ’’ (সূরা বানী ইস্রাঈল ৯৭ আয়াত)
হাদীসে এসেছে যে, সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, কাফেররা মুখে ভর দিয়ে কিরূপে চলবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ যে আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে পায়ে ভর দিয়ে চালনা করেছেন, তিনি কি মুখমণ্ডল ও মস্তকের ওপর ভর দিয়ে চালাতে সক্ষম নন? [বুখারী: ৪৭৬০, মুসলিম: ২৮০৬]
আল্লাহ তোমাদের মানুষ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন, জন্তু-জানোয়ার করে পাঠাননি৷ তোমাদের কাজ তো এ ছিল না যে, দুনিয়ায় যে গোমরাহী বিস্তারলাভ করে আছে তোমরা চোখ বন্ধ করে তাই মেনে চলবে, ভেবেও দেখবে না, যে পথে তোমরা চলছো তা সঠিক কিনা৷ কেউ যদি তোমাদের সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য বুঝাতে চেষ্টা করে, তার কথা তোমরা কানেই তুলবে না এবং তোমাদের মন-মস্তিষ্কে আগে জেঁকে বসা অসত্য ও অন্যায়কে আঁকড়ে থাকবে এ উদ্দেশ্যে তোমাদেরকে এ কান দেয়া হয়নি৷ এ চোখ তো এ জন্য দেয়া হয়নি যে, তোমরা অন্ধের মতো অন্যের অনুসরণ করবে৷ যমীন থেকে আসমান পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা নিদর্শনসমূহ আল্লাহর রাসূলের পেশকৃত তাওহীদের সাক্ষ দিচ্ছে কি না এ বিশ্ব – জাহানের ব্যবস্থাপনা খোদাহীন বা বহুখোদার পরিচালনাধীন হওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে কিনা নিজের দৃষ্টিশক্তিকে কাজে লাগিয়ে তোমরা তা দেখবে না এজন্য এ চোখ তোমাদেরকে দেয়া হয়নি৷ এ মন-মস্তিস্কেও তোমাদের এ জন্য দেয়া হয়নি যে, তোমরা চিন্তা-ভাবনা ও বিচার -বিবেচনার কাজ অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়ে দুনিয়াতে এমন সব নিয়ম-কানুন অনুসরণ করে চলবে যা অন্য কেউ চালু করেছে৷ তোমরা বিবেক -বুদ্ধি খাটিয়ে এতোটুকুও ভেবে দেখবে না যে, তা সঠিক না ভ্রান্ত৷ জ্ঞানও বিবেক -বুদ্ধি এবং শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির এ নিয়ামত আল্লাহ তোমাদের দিয়েছিলেন ন্যায় ও সত্যকে চিনার জন্য৷ কিন্তু তোমরা অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছো৷ এসব উপকরণের মাধ্যমে তোমরা সব কাজই করছো৷ কিন্তু যে জন্য তা তোমাদের দেয়া হয়েছিলো সে একটি কাজই মাত্র করছো না৷
অর্থাৎ মৃত্যুলাভের পরে পুনরায় তোমাদেরকে জীবিত করে পৃথিবীর সব জায়গা থেকে পরিবেষ্টিত করে আনা হবে এবং আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে৷
এভাবে প্রশ্ন করে তারা কিয়ামতের সময় ও তার দিন তারিখ জানতে চাইতো না৷ তারা এ উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করতো না যে, তাদেরকে কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সন, মাস, দিন ও সময় বলে দিলে তারা তা স্বীকার করে নেবে৷ বরং তারা মনে করতো কিয়ামত সংঘটিত হওয়া অসম্ভব ও অযৌক্তিক৷ আর তা মিথ্যা সাব্যস্ত করার একটা বাহানা হিসেবে ব্যবহার করার উদ্দেশ্যেই এ প্রশ্ন তারা করতো৷ তাদের মূল বক্তব্য হলো, তুমি আমাদেরকে কিয়ামতের যে অদ্ভুত কাহিনী শুনাচ্ছো , তা কখন আত্মপ্রকাশ করবে? কোন সময়ের জন্য তা সংরক্ষিত রাখা হয়েছে? আমাদের চোখের সামনে এনে তা দেখিয়ে দিচ্ছো না কেন? দেখিয়ে দিলেই তো আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে যেতো৷ এ বিষয়ে একটি কথা ভালভাবে উপলব্ধি করা দরকার যে, কেউ কিয়ামতের সত্যতা স্বীকার করলে বিবেক -বুদ্ধি ও যুক্তি -প্রমাণ দ্বারাই করতে পারে৷ কুরআনের বিভিন্ন জায়গায় এ ধরনের যুক্তি-প্রমাণ সবিস্তারে পেশ করা হয়েছে৷ এখন থেকে যায় কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার তারিখ সম্পর্কিত বিষয়টি৷ কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার আলোচনায় কোন অকাট্য মুর্খই কেবল এ প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে৷ কারণ, দিন তারিখ বলে দিলেও তাতে কোন পার্থক্য সূচিত হবে না৷ অস্বীকারকারী তখন বলবে, যখন তা তোমাদের দেয়া নির্দিষ্ট তারিখে সংঘটিত হবে তখন মেনে নেবো৷ আজ আমি কি করে একথা বিশ্বাস করবো যে, তোমার দেয়া নির্দিষ্ট তারিখে তা অবশ্যই সংঘটিত হবে৷
অর্থাৎ একথা তো আমার জানা যে, কিয়ামত অবশ্যই আসবে৷ আর তার আসার আগে মানুষকে সাবধান করে দেয়ার জন্য এতোটুকু জানাই যথেষ্ট৷ তবে কখন আসবে তা একমাত্র আল্লাহ তা”আলাই জানেন৷ আমি সে সম্পর্কে কিছু জানি না৷ আর সাবধান করে দেয়ার জন্য সে বিষয়ে জ্ঞান থাকার কোন প্রয়োজন নেই৷ এ বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে ভালভাবে বুঝা যেতে পারে৷ কোন ব্যক্তি কখন মারা যাবে একমাত্র আল্লাহ তা”আলা ছাড়া আর কেউ তা জানে না৷ তবে আমরা এতোটুকু জানি যে, প্রত্যেককেই এক সময় মৃত্যুবরণ করতে হবে৷ এখন আমাদের এ জ্ঞানটুকু আমাদের কোন অসতর্ক প্রিয়জনকে মৃত্যু সম্পর্কে সতর্কীকরণের জন্য যথেষ্ট৷ যাতে সে যথাযথভাবে তার স্বার্থের হিফাযত করতে পারে৷ এতোটুকু সাবধান করে দেয়ার জন্য সে কোনদিন মারা যাবে তা জানা জরুরী নয়৷
মক্কা নগরীতে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আন্দোলনের সূচনা হলে কুরাইশদের বিভিন্ন গোত্রভুক্ত ব্যক্তিবর্গ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করলো৷ এতে মক্কার প্রতিটি পরিবার থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদেরকে অভিশাপ দেয়া শুরু হলো৷ তাঁর বিরুদ্ধে যাদুটোনা বা তন্ত্রমন্ত্রের প্রয়োগ শুরু হলো, যাতে তিনি ধ্বংস হয়ে যান৷ এমনকি হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কেও চিন্তা-ভাবনা চলতে থাকলো৷ তাই এখানে বলা হয়েছে এদের বলো, আমরা ধ্বংস হয়ে যাই বা আল্লাহর রহমতের বেঁচে থাকি তাতে তোমাদের কি লাভ? আল্লাহর আযাব এলে তোমরা নিজেরা কিভাবে নিষ্কৃতি পাবে সে চিন্তা করতে থাক৷
অর্থাৎ আমরা আল্লাহর ওপরে ঈমান এনেছি আর তোমরা তাঁকে অস্বীকার করে চলছো৷ আমরা ভরসা করি একমাত্র আল্লাহর ওপর আর তোমরা ভরসা করো তোমাদের দল, পার্থিব উপায়-উপকরণ এবং আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য সব উপাস্য দেব-দেবীদের ওপর৷ তাই আমরাই আল্লাহর রহমত লাভের উপযুক্ত, তোমরা নও৷
غَوْرٌ শব্দের অর্থ হল শুকিয়ে যাওয়া অথবা পানির এত গভীরে চলে যাওয়া যে, সেখান হতে তা বের করা অসম্ভব হয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তাআলা যদি পানি শুকিয়ে দিয়ে তার অস্তিত্বই শেষ করে দেন অথবা মাটির এত গভীরে করে দেন, যেখান থেকে পানি বের করতে সর্বপ্রকার যন্ত্র ব্যর্থ সাব্যস্ত হয়, তাহলে বল, কে আছে এমন, যে তোমাদের জন্য প্রবহমান ও নির্মল পানির ব্যবস্থা করে দেবে? অর্থাৎ, কেউ নেই। এটা মহান আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ যে, তোমাদের অবাধ্যতা সত্ত্বেও তিনি তোমাদেরকে পানি থেকে বঞ্চিত করেননি।
ফুটনোট
- আল্লাহ্ আমাদেরকে অনেক অনেক নেয়ামত দিয়ে সমৃদ্ধ করেছেন। সমস্ত ‘নিয়ামত, বারাকাহ, বৃদ্ধি’ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে, তিনিই মহান। তিনি নিয়ামতের সবচেয়ে বরকতময় উৎস।
- কেয়ামতের জ্ঞান একান্তভাবে আল্লাহর কাছে।
- ভরণপোষণ এবং সম্পূর্ণ সুরক্ষা আল্লাহর কাছ থেকে আসে। তিনি একাই সমস্ত ভরণ-পোষণের উৎস– বস্তুগত এবং আধ্যাত্মিক। তিনি আমাদেরকে অনেক নিয়ামত দিয়েছেন তাই আমাদের কর্তব্য তাকে খুশি করা, শুকরিয়া আদায় করা, আনুগত্য করা।
- সর্বদা মৃত্যুকে স্মরণ করা আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য হল পরকাল। সুতরাং মৃত্যুর স্মরণ আমাদের জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক হওয়া উচিত। যাতে আমরা যতটা পারি উভয় জগতের হাসানাহ (সর্বোত্তম) জন্য চেষ্টা করা। মৃত্যুকে অস্বীকার করবেন না বা ভুলে যাওয়া যাবে না।
- আমাদের হৃদয় সবসময় পরিষ্কার রাখার জন্য কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। কারণ আমরা যা করি, বলি, বিশ্বাস করি এবং চিন্তা করি সবকিছু সম্পর্কে আমাদের সৃষ্টিকর্তা সম্পূর্ণ অবগত।
- রবকে খুঁজে পাওয়া, চেনার জন্য সময় দিতে হবে – আমাদের চারপাশে এবং আমাদের নিজেদের মধ্যে চিন্তা করার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এই ধরনের প্রতিফলন আপনাকে জীবনে অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের রবকে খুঁজতে পেতে সহযোগিতা করবে।
- সবসময় আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। তাঁর করুণা এবং সাহায্যের সন্ধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, যে তিনিই সমস্ত মঙ্গলের চূড়ান্ত উৎস। তাঁরই উপর তাওয়াক্কুল করতে হবে।