কুরাআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৩
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্ব-১
উলুমুল কুরআন বা কুরআন বিষয়ক মৌলিক জ্ঞান
সাত হরফ, সাত কেরাআত ও সাত কারী-
কুরআন প্রথমে আরবীতে কুরাইশদের আঞ্চলিক ভাষায় নাযিল হচ্ছিল, কিন্তু বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে রাসূলুল্লাহ(সা.) একাধিক উপায় কুরআন পড়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। এর প্রেক্ষিতে কুরআন সাত হরফে নাযিল হতে থাকে।
কুরআন মাজীদের কালেমাগুলো উচ্চারণ ও তা আদায়ের সঠিক পদ্ধতিকে কেরাআত বলে।
সাত কেরাআত বলতে প্রসিদ্ধ সাত জন কারীর প্রতি সম্পর্কিত কেরাআতকে বুঝায়।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত:
রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেন, “জিব্রাইল (আঃ) আমার কাছে এক হরফে কুরআন তিলাওয়াত করলেন, আর আমি তাকে ভিন্ন ভিন্ন হরফে তিলাওয়াত করতে বলতে লাগলাম যতক্ষণ না, তিনি সাতটি ভিন্ন হরফে তিলাওয়াত করলেন।” [সূত্র: সহিহ বুখারি, ৩২১৯]
কিরাতের বিখ্যাত সাত ইমামদের নাম নিম্নরুপঃ-
১. নাফে মাদানী (র.)
২. ইবনে কাছীর (র.)
৩. আসিম কুফী (র.)
৪. হামযা বিন হাবীব আল কুফী (র.)
৫. আলী বিন হামযা আল কিসাঈ (র.)
৬. আবূ আমর আল মাযিনী (র.)
৭. ইবনে আমির আশ শামী (র.)
তাফসীরের উৎস
১. আল কুরআনুল কারীম
২ আল হাদীস
৩. সাহাবায়ে কেরামদের মতামত।
৪. তাবেয়ীনদের মতামত।
৫. আরবী ভাষা।
৬. ইজতেহাদ/ আক্বলে সালিম (শান্ত ও পরিশুদ্ধ বিবেক বুদ্ধি)
তাফসীরের শর্ত
তাফসীরের শর্ত বলতে বুঝায় যিনি তাফসীর করবেন তার কি কি জিনিস জানা থাকতে হবে।
কুরআনের তাফসীর বিষয়ের পণ্ডিতগণ কুরআনের ব্যাখ্যা করতে ও এর তাফসীর করার জন্য পনের প্রকার বিদ্যায় পারদর্শী হওয়া জরুরী ।
১। ইলমুল লুগাহ (علم اللغة) ভাষা জ্ঞান।
২। ইলমুস সরফ (علم الصرف) আরবী শব্দ প্রকরণ সম্পর্কীয় জ্ঞান।
৩। ইলমুন নাহু (علم النحو) আরবী বাক্য প্রকরণ সম্পর্কীয় জ্ঞান।
৪। ইলমুল ইশতিকাক (علم الاشتقاق) শব্দের ব্যুৎপত্তিগত জ্ঞান।
৫। ইলমুল মা’আনী (علم المعانى) শাব্দিক অলংকরণ।
৬। ইলমুল বয়ান (علم البيان) বাক্য প্রয়োগ অলংকরণ।
৭। ইলমুল বদী (علم البديع) ছন্দ প্রয়োগ অলংকরণ।
৮। ইলমুল কিরাআত (علم القرأة) আল কুরআন পঠনরীতি জ্ঞান।
৯। উছুলুদ্দীন (علم اصول الدين) দীনের মৌলিক ভিত্তি ও মূলনীতির জ্ঞান।
১০। উসুলুল ফিকহ (علم اصول الفقه) ফিকহের মূলনীতির জ্ঞান।
১১। আসবাবুন নুযূল ওয়াল কাসাস (اسباب النزول و القصص) সুরা ও আয়াত সমূহ নাযিল হওয়ার কাল-প্রেক্ষিত, কারণ ও ঘটনাবলীর সম্পর্কীত জ্ঞান।
১২। আন নাসিখ ওয়াল মানসূখ (الناسخ و المنسوخ) রহিতকারী আয়াত ও রহিত আয়াত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভ।
১৩। ইলমুল ফিকহ (علم الفقه) আইন বিষয়ক জ্ঞান।
১৪। উলুমুল হাদীস (علوم الحديث) হাদীস সম্পর্কীয় জ্ঞান।
১৫। ইলমুল মাওহাবাহ (علم الموهبة) আল্লাহ প্রদত্ত সরাসরি জ্ঞান যার অপর নাম ইলমুল লাদুন্নী (علم اللدنى)
তাফসীর গ্রন্থের প্রকারভেদঃ
পৃথিবীর সকল তাফসীর গ্রন্থকে প্রাথমিকভাবে দুই ভাগে ভাগ করা হয়;
১। তাফসীর বির-রিওয়ায়াহ বা তাফসীর বিল-মা’ছুর; (অর্থাৎ তাফসীরের মূলনীতি অনুসরণ করে যে সকল তাফসীর গ্রন্থ রচিত হয়)
২। তাফসীর বিদ-দিরায়াহ বা তাফসীর বির-রায়। (অর্থাৎ তাফসীরের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করে কিংবা নব উদ্ভাবিত কোনো পদ্ধতি অনুযায়ী যে সকল তাফসীর গ্রন্থ রচিত হয়)
সত্তাগত দিক থেকে তাফসীর চার প্রকার ৷ যথা:
০১. যে তাফসীর সকলের জন্য জানা ফরজ বা আবশ্যক ৷
০২. যে তাফসীর আরবীভাষি ব্যক্তিবর্গ সাধারণভাবে জানেন ৷
০৩. যে তাফসীর আলিমগন বা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিবর্গ জানেন ৷
০৪. যে তাফসীর আল্লাহ ব্যতিত আর কেউ জানেন না ৷
প্রসিদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য কয়েকটি তাফসীর গ্রন্থ
সাহাবাদের পরবর্তী যুগ সমূহে তাফসীরের সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে এককভাবে বেশকিছু তাফসীর গ্রন্থ রচিত হয়।
১। জামিউল বায়ান ফী তাফসিরুল কুরআন: আল্লামা আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারীর আত-তাবারি (মৃত্যু ৩১০ হি:) এটি “তাফসীর আত-তাবারী” নামে প্রসিদ্ধ। বর্তমানে যেসকল তাফসীর বিদ্যমান রয়েছে, তন্মধ্যে এই তাফসীরটি সবচেয়ে প্রাচীন।
২। আল-মুহাররার আল-ওয়াজিয: ইবনে আতিয়া (মৃত্যু ৫৪০ হি:) এটি “তাফসীর ইবনে আতিয়া’ নামে প্রসিদ্ধ। ২০ খন্ডে রচিত গ্রন্থটির তাফসীরে সঠিক পদ্ধতি অনুসারে রচিত হয়েছে।
৩। বাহরুল উলূম: আবু লাইস সামারকান্দী (মৃত্যু ৩৭২ হি:) এটি চার খন্ডে রচিত, “তাফসীরে আবু লাইস সামারকান্দী” নামে প্রসিদ্ধ।
৪। আল-কাশফু ওয়াল বায়ান আন তাফসিরুল কুরআন: ইমাম আবু ইসহাক (মৃত্যু ৪২৭ হি:) এটি “তাফসীরে আবূ ইসহাক” নামে প্রসিদ্ধ
৫। মা’আলিমুত তানযীল: ইমাম বাগাবী (মৃত্যু ৫১০ হি:) এটি “তাফসীরে বাগাবী” নামে প্রসিদ্ধ।
৬। তাফসীরুল কুরআনুল আযীম: ইমাম ইবনে কাসীর (মৃত্যু ৭৭৪ হি:) এটি “তাফসিরে ইবনে কাসির” নামে প্রসিদ্ধ।
৭। আল জাওয়াহিরুল হিসান ফী তাফসিরুল কুরআন: ইমাম সা’লাবী (মৃত্যু ৮৭৭ হি:) এটি “তাফসীরে সা’লাবী” নামে প্রসিদ্ধ।
৮। আদ-দুররুল মনসূর ফী তাফসিরুল বিল-মা’ছূর: জালাল উদ্দিন আস-সুয়ূতী (মৃত্যু ৯১০ হি:) এটি “আদ-দুররুল মনসূর” নামে প্রসিদ্ধ।
৯। ফাতহুল কাদীর: ইমাম আশ-শাওকানী (মৃত্যু ১২৫৫ হি:) এটি “তাফসির আশ-শাওকানী” নামেও পরিচিত।
১০। তাফসীরে ইবনে আব্বাস: এ তাফসীরটি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (র:) নিজে কিংবা তাঁর ছাত্ররা কেউ সংকলন করেননি। বরং বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (র:) থেকে বিভিন্ন রেওয়াতের যে ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, সেগুলোকে সংকলন করে, মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব ফিরোজাবাদী (মৃত্যু ৮১৭ হি:) “তাফসীরে ইবনে আব্বাস” নামে তাফসীর গ্রন্থটি রচনা করেন।