কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৬
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্বঃ ৮
পবিত্র কুরআনের ৩১তম সূরা, যা মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে এবং এতে ৩৪টি আয়াত এবং ৪টি রুকু রয়েছে।। হযরত লুকমান (আ.)-এর জ্ঞানগর্ভ উপদেশ ও তাঁর পুত্রের প্রতি নসীহতের ওপর ভিত্তি করে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে। এই সূরাটি তাওহীদ, শিরক বর্জন, পিতা-মাতার অধিকার এবং নৈতিকতার ওপর বিশেষ জোর দেয়, বিশেষ করে ১২-১৯ নং আয়াতে লুকমানের উপদেশের মাধ্যমে।
নামকরণঃ
এ সূরার দ্বিতীয় রুকুতে লুকমান হাকীমের উপদেশাবলী উদ্ধৃত করা হয়েছে। তিনি নিজের পুত্রকে এ উপদেশ দিয়েছিলেন। এই সুবাদে এ সূরার লুকমান নামকরণ করা হয়েছে।
নাযিলের সময়কালঃ
এ সূরার বিষয়বস্তু সম্পর্কে চিন্তা করলে পরিষ্কার বুঝা যায়, এটি এমন সময় নাযিল হয় যখন ইসলামের দাওয়াতের কণ্ঠরোধ এবং তার অগ্রগতির পথরোধ করার জন্য জুলুম-নিপীড়নের সূচনা হয়ে গিয়েছিল এবং এ জন্য বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করা হচ্ছিল। কিন্তু তখনও বিরোধিতা তোড়জোড় ষোলকলায় পূর্ণ হয়নি। ১৪ ও ১৫ আয়াত থেকে এর আভাস পাওয়া যায়। সেখানে নতুন ইসলাম গ্রহণকারী যুবকদের বলা হয়েছে, পিতা-মাতার অধিকার যথার্থই আল্লাহর পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তারা যদি তোমাদের ইসলাম গ্রহণ করার পথে বাধা দেয় এবং শিরকের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য করে তাহলে তাদের কথা কখনোই মেনে নেবে না। একথাটাই সূরা আনকাবুতেও বলা হয়েছে। এ থেকে জানা যায় যে, দুটি সূরাই একই সময় নাযিল হয়। কিন্তু উভয় সূরার বর্ণনা রীতি ও বিষয়বস্তুর কথা চিন্তা করলে অনুমান করা যায় সূরা লোকমান প্রথমে নাযিল হয়। কারণ এর পশ্চাতভূমে কোন তীব্র আকারের বিরোধিতার চিহ্ন পাওয়া যায় না। বিপরীত পক্ষে সূরা আনকাবুত পড়লে মনে হবে তার নাযিলের সময় মুসলমানদের ওপর কঠোর জুলুম নিপীড়ন চলছিল।
বিষয়বস্তু
১-৭ আয়াত – ভূমিকা, কুরআন হেদায়াত ও রহমত এবং কাফিরদের ঔদ্ধত্য
কুরআনের প্রজ্ঞাপূর্ণ আয়াত, সৎকর্মশীলদের জন্য হেদায়াত ও রহমত (যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় ও আখেরাতে বিশ্বাস রাখে), কিছু মানুষ অজ্ঞতাবশত মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অনর্থক কথাবার্তা ক্রয় করে।
৮-১৯ আয়াত – আল্লাহর সৃষ্টিতে নিদর্শন এবং লুকমান (আ.)-এর তাঁর পুত্রকে প্রদত্ত উপদেশ
মুমিনদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি, আকাশ সৃষ্টি, পৃথিবীতে পাহাড় স্থাপন, বিভিন্ন প্রকার প্রাণী বিস্তার, বৃষ্টি বর্ষণ ও উদ্ভিদ উৎপাদন আল্লাহর নিদর্শন, লুকমান (আ.)-এর তাঁর পুত্রকে প্রদত্ত গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ (শিরক না করা, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার, সরিষার দানা পরিমাণ আমলও আল্লাহর জ্ঞানে থাকা, সালাত কায়েম, সৎকাজের আদেশ, অসৎকাজে নিষেধ, বিপদে ধৈর্যধারণ, অহংকার না করা, নম্রভাবে চলাফেরা, কণ্ঠস্বর নিচু রাখা)।
২০-২৯ আয়াত – আল্লাহর নিয়ামত, তাঁর জ্ঞানের বিশালতা এবং মুশরিকদের স্ববিরোধিতা
আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবীর সবকিছু মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, মানুষ জ্ঞান ছাড়াই আল্লাহ সম্পর্কে বিতর্ক করে, পৃথিবীর সমস্ত বৃক্ষ যদি কলম হয় এবং সমুদ্র কালি হয় তবুও আল্লাহর বাণী লিখে শেষ করা যাবে না, রাত-দিনের আবর্তন, সূর্য-চন্দ্রের পরিভ্রমণ আল্লাহর নিয়ন্ত্রণাধীন।
৩০-৩৪ আয়াত – আল্লাহই সত্য, কিয়ামতের জ্ঞান এবং মানুষের অজ্ঞতা
আল্লাহই সত্য এবং তিনি ব্যতীত যাদের ডাকা হয় তারা সবই বাতিল, সমুদ্রে চলমান জাহাজ আল্লাহর নিদর্শন, মানুষ বিপদে পড়লে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে এবং উদ্ধার পেলে কেউ কেউ মধ্যপন্থা অবলম্বন করে, আল্লাহর অঙ্গীকার সত্য, দুনিয়ার জীবন যেন ধোঁকা না দেয়, পাঁচটি বিষয়ের জ্ঞান কেবল আল্লাহর কাছে (কিয়ামত, বৃষ্টি, মাতৃগর্ভে যা আছে, আগামীকাল কী উপার্জন করবে, কোথায় কার মৃত্যু হবে)।
এই সূরার শুরুতেও ‘হরূফে মুক্বাত্ত্বাআত’ (বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা) আছে। যার অর্থ আল্লাহ ছাড়া কেউ অবগত নয়। এর পরেও কোন কোন মুফাস্সির এর দুটো বড় গুরুত্বপূর্ণ যৌক্তিকতা বর্ণনা করেছেন। প্রথম এই যে, এই কুরআন এই শ্রেণীরই বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা দ্বারা সুবিন্যস্ত ও লিপিবদ্ধ, যার অনুরূপ কোন লিপি পেশ করতে আরববাসীরা অসমর্থ হয়েছে। সুতরাং এ কথা প্রমাণ দেয় যে, এই কুরআন আল্লাহরই অবতীর্ণ করা একটি গ্রন্থ এবং যার প্রতি তা অবতীর্ণ করা হয়েছে তিনি সত্যই রসূল। তিনি যে শরীয়ত নিয়ে এসেছেন মানুষ তার মুখাপেক্ষী এবং মানুষের পরিশুদ্ধি ও সৌভাগ্যের পরিপূর্ণতা একমাত্র এই শরীয়ত দ্বারাই সম্ভব। দ্বিতীয় এই যে, কাফেররা নিজেদের সাথীদেরকে এই কুরআন শ্রবণ করা থেকে বিরত রাখত এই ভয়ে যে, তারা তা শ্রবণ করে প্রভাবিত হয়ে মুসলমান হয়ে যাবে। আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সূরা বিচ্ছিন্ন অক্ষরমালা দ্বারা আরম্ভ করেছেন, যাতে তারা তা শ্রবণ করতে বাধ্য হয়। কারণ এই বর্ণনা-ভঙ্গি অভিনব ও নতুন ছিল। (আইসারুত তাফাসীর) আর আল্লাহই অধিক জানেন।
আল্লাহ তা‘আলা এখানে অত্যন্ত সম্মানসূচক ভঙ্গিতে ইঙ্গিত করছেন: {آيَاتُ الْكِتَابِ الْحَكِيمِ} (এগুলো প্রজ্ঞাময় কিতাবের আয়াত)। অর্থাৎ, এর আয়াতসমূহ ‘মুহকাম’ বা সুপ্রতিষ্ঠিত ও নিখুঁত, যা এক প্রজ্ঞাময় ও সর্বজ্ঞ সত্তার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ হয়েছে।
এর প্রজ্ঞাপূর্ণ হওয়ার কিছু দিক হলো:
১. এর শব্দগুলো সবচেয়ে সম্মানিত, প্রাঞ্জল ও সুস্পষ্ট, যা সবচেয়ে মহৎ ও সুন্দর অর্থ প্রকাশ করে।
২. এটি পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন, বিয়োজন ও বিকৃতি থেকে সংরক্ষিত।
৩. এতে বর্ণিত অতীত, ভবিষ্যৎ এবং গায়েবের সকল সংবাদ বাস্তবতার সাথে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ এবং বাস্তবতাও এর অনুরূপ। কোনো ঐশী গ্রন্থ বা কোনো নবী এর বিপরীত কিছু বলেননি এবং কোনো প্রমাণিত জ্ঞান বা সঠিক যুক্তি এর বিরোধী হতে পারে না, আর ভবিষ্যতেও পারবে না।
৪. এটি এমন কোনো কিছুরই আদেশ দেয়নি যা নির্ভেজাল বা অধিকতর কল্যাণকর নয়, এবং এমন কোনো কিছু থেকে নিষেধ করেনি যা নির্ভেজাল বা অধিকতর ক্ষতিকর নয়। প্রায়শই এটি কোনো কিছুর আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি তার প্রজ্ঞা ও উপকারিতা উল্লেখ করে এবং কোনো কিছু থেকে নিষেধ করার সাথে তার ক্ষতিও বর্ণনা করে।
৫. এটি ‘তারগীব’ (উৎসাহ) ও ‘তারহীব’ (ভীতি প্রদর্শন) এবং এমন মর্মস্পর্শী উপদেশকে একত্রিত করেছে, যা সৎকর্মশীল আত্মাকে ভারসাম্যপূর্ণ ও নিয়ন্ত্রিত করে, ফলে তারা দৃঢ়তার সাথে কাজ করে।
৬. আপনি এর বারবার আসা আয়াতসমূহ, যেমন—কাহিনী, বিধান ইত্যাদি—সবকিছুকে সামঞ্জস্যপূর্ণ ও সঙ্গতিপূর্ণ পাবেন। এগুলোর মধ্যে কোনো বৈপরীত্য বা اختلاف (অমিল) নেই। একজন অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি যতই এর গভীরে تدبر (চিন্তা-ভাবনা) করে এবং বিবেককে কাজে লাগায়, ততই তার বুদ্ধি এর সামঞ্জস্য দেখে বিস্মিত ও হতবাক হয়ে যায় এবং নিঃসংশয়ে বিশ্বাস করে যে, এটি এক প্রজ্ঞাময়, প্রশংসিত সত্তার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
কিন্তু এই কিতাব প্রজ্ঞাময় হওয়া সত্ত্বেও—যা প্রতিটি মহৎ চরিত্রের দিকে আহ্বান করে এবং প্রতিটি নীচ চরিত্র থেকে নিষেধ করে—অধিকাংশ মানুষই এর দ্বারা হিদায়াত লাভ থেকে বঞ্চিত এবং এর প্রতি ঈমান ও আমল থেকে বিমুখ। তবে তারা ব্যতীত, যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা তাওফীক দিয়েছেন ও রক্ষা করেছেন; আর তারাই হলো ‘মুহসিনূন’ (সৎকর্মশীল), যারা তাদের রবের ইবাদতে এবং সৃষ্টির প্রতি আচরণে ইহসান অবলম্বনকারী।
مُحسِن এক অর্থ হল, পিতা-মাতা, আত্মীয়, হকদার ও অভাবীদের সাথে সদ্ব্যবহারকারী। দ্বিতীয় অর্থ হল, সৎকর্মপরায়ণ; অর্থাৎ অসৎকর্ম থেকে দূরে থেকে সৎকর্ম সম্পাদনকারী। তৃতীয় অর্থ হল, আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে ইখলাস (আন্তরিকতা) ও একাগ্রতার সাথে আল্লাহর ইবাদতকারী। যেমন হাদীসে জিবরীলে বর্ণনা হয়েছে; ‘ইহসান’ হল এমনভাবে ইবাদত করা, যাতে মনে হয়, যেন আল্লাহকে দেখছি অথবা তিনি আমাকে দেখছেন। প্রকৃতপক্ষে কুরআন সারা পৃথিবীর জন্য করুণা ও পথপ্রদর্শক; কিন্তু তা হতে প্রকৃত উপকৃত হয়ে থাকে শুধুমাত্র পরহেযগার ও সৎকর্মপরায়ণগণই, তাই এখানে তাঁদের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা সৎকর্মশীলদের (মুহসিনীন) গুণ বর্ণনা করেছেন। তাদের রয়েছে পরিপূর্ণ জ্ঞান, যা হলো এমন দৃঢ় বিশ্বাস (ইয়াকীন), যা কর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং আল্লাহর শাস্তির ভয় সৃষ্টি করে, ফলে তারা তাঁর অবাধ্যতা ত্যাগ করে। আল্লাহ তাদের কর্মের দ্বারাও গুণান্বিত করেছেন এবং কর্মসমূহ থেকে দুটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ আমলকে নির্দিষ্ট করেছেন: একটি হলো সালাত, যা ইখলাস (একনিষ্ঠতা), আল্লাহ তা‘আলার সাথে একান্তে কথোপকথন (মুনাজাত) এবং অন্তর, জিহ্বা ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সার্বিক ইবাদতকে অন্তর্ভুক্ত করে, যা অন্যান্য সকল কাজে সহায়ক হয়। আর দ্বিতীয়টি হলো যাকাত, যা এর প্রদানকারীকে নীচ স্বভাব থেকে পবিত্র করে, তার মুসলিম ভাইয়ের উপকার করে, তার প্রয়োজন মেটায় এবং এর মাধ্যমে এটিও প্রকাশ পায় যে, বান্দা সম্পদের ভালোবাসার উপর আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রাধান্য দেয়। তাই সে তার প্রিয় সম্পদ এমন এক সত্তার জন্য খরচ করে, যিনি তার কাছে অধিক প্রিয়, আর তা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।
সুতরাং { أُولَئِكَ } (তারাই) হলো সেই সৎকর্মশীল, যারা পরিপূর্ণ জ্ঞান ও কর্মকে একত্রিত করেছে। তারা { عَلَى هُدًى } (পথনির্দেশের উপর রয়েছে)—অর্থাৎ এক মহান হিদায়াতের উপর, যেমনটি আরবি ব্যাকরণের التنكير (অনির্দিষ্টবাচক বিশেষ্য) দ্বারা বোঝানো হয়েছে। আর সেই হিদায়াত তাদের জন্য অর্জিত হয়েছে এবং তাদের কাছে পৌঁছেছে { مِنْ رَبِّهِمْ } (তাদের রবের পক্ষ থেকে), যিনি তাদেরকে সর্বদা নিয়ামত দ্বারা লালন-পালন করেন এবং তাদের থেকে বিপদাপদ দূর করেন। এই হিদায়াত, যা তিনি তাদের কাছে পৌঁছিয়েছেন, তা তাঁর প্রিয় বান্দাদের (আউলিয়া) জন্য বিশেষ তরবিয়ত বা প্রতিপালনের অংশ, যা সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিপালন। { وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ } (এবং তারাই হলো সফলকাম)—যারা তাদের রবের সন্তুষ্টি এবং তাঁর দুনিয়া ও আখিরাতের প্রতিদান লাভ করেছে এবং তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে রক্ষা পেয়েছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে তাদের সফলতার পথ (ফালাহ) অবলম্বনের কারণে, যা ব্যতীত সফলতার আর কোনো পথ নেই।
যখন আল্লাহ তা‘আলা কুরআনের মাধ্যমে হিদায়াতপ্রাপ্ত ও এর প্রতি অনুরাগী ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করলেন, তখন তিনি তাদের কথাও উল্লেখ করলেন, যারা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং এর প্রতি কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না। আর এর শাস্তি হিসেবে সে সব ধরনের বাতিল কথাকে গ্রহণ করে নেয়। সে সর্বোচ্চ ও সর্বোত্তম বাণীকে ত্যাগ করে এবং তার পরিবর্তে সর্বনিম্ন ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট কথাকে বেছে নেয়।
(لَهْوَ الْحَدِيثِ) বাক্যটিতে حديث শব্দের অর্থ কথা, কিসসা-কাহিনী এবং لَهْوَ শব্দের অর্থ গাফেল হওয়া। যেসব বিষয় মানুষকে প্রয়োজনীয় কাজ থেকে গাফেল করে দেয় সেগুলোকে لَهْوَ বলা হয়। মাঝে মাঝে এমন কাজকেও لَهْوَ বলা হয়, যার কোন উল্লেখযোগ্য উপকারিতা নেই, কেবল সময় ক্ষেপণ অথবা মনোরঞ্জনের জন্যে করা হয়। আলোচ্য আয়াতে (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর অর্থ ও তফসীর কি, এ সম্পর্কে তাফসীরবিদগণের উক্তি বিভিন্নরূপ। ইবনে মাসউদ্দ, ইবনে আব্বাস ও জাবের রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর মতে এর অর্থ, গান-বাদ্য করা। অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও তফসীরবিদগণের মতে এর অর্থ গান, বাদ্যযন্ত্র ও অনর্থক কিসসা-কাহিনীসহ যেসব বস্তু মানুষকে আল্লাহর ইবাদত ও স্মরণ থেকে গাফেল করে, সেগুলো সবই (لَهْوَ الْحَدِيثِ)। ইমাম বুখারী তার কিতাবে (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর এ তাফসীরই অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, لَهْوَ الْحَدِيثِ هُوَ الْغِنَاءُ وَأشْبَاهُه অর্থাৎ, (لَهْوَ الْحَدِيثِ) বলে গান ও অনুরূপ অন্যান্য বিষয় বোঝানো হয়েছে যা আল্লাহর ইবাদত থেকে গাফেল করে দেয়।
পূর্বেই বলা হয়েছে যে, অধিকাংশ সাহাবী উল্লেখিত আয়াতে (لَهْوَ الْحَدِيثِ) এর তাফসীর করেছেন গান-বাজনা করা। তবে কোন কোন সাহাবী আয়াতের ব্যাপক তাফসীর করে বলেছেন যে, আয়াতে এমন যে কোন খেলা বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহ থেকে গাফেল করে দেয়। আলেমগণ পবিত্র কুরআনের (لَا يَشْهَدُونَ الزُّورَ) আয়াতের শব্দের তাফসীর করেছেন গান-বাজনা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “আমার উম্মতের কিছু লোক মদের নাম পাল্টিয়ে তা পান করবে। তাদের সামনে গায়িকারা বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র সহকারে গান করবে। আল্লাহ্ তা’আলা তাদেরকে ভূ-গর্ভে বিলীন করে দেবেন এবং কতকের আকৃতি বিকৃত করে বানর ও শূকরে পরিণত করে দেবেন। [বুখারী: ৫৫৯০, আবু দাউদ: ৪০৩৯]
ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা মদ, জুয়া, তবলা ও সারেঙ্গী হারাম করেছেন। তিনি আরও বলেন, নেশাগ্ৰস্ত করে এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম। [আহমদ: ১/৩৫০, আবু দাউদ: ৩৬৯৮] এতদ্ভিন্ন বহু প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হাদীস রয়েছে, যাতে গান-বাদ্য হারাম ও না-জায়েয। বলা হয়েছে, এ ব্যাপারে বিশেষ সতর্কবাণী রয়েছে এবং কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে।
সারকথা এই যে, যেসব কাজ প্রকৃতপক্ষে খেলা; অর্থাৎ যাতে কোন দ্বীনী বা পার্থিব উপকারিতা নেই, সেগুলো অবশ্যই নিন্দনীয় ও মাকরূহ। তবে কতক একেবারে কুফর পর্যন্ত পৌছে যায়, কতক প্রকাশ্য হারাম এবং কতক কমপক্ষে মাকরূহ। যেসব কাজ প্রকৃতই খেলা, তার কোনটিই এ বিধানের বাইরে নয়। বর্তমান যুগে অধিকাংশ যুবক-যুবতী অশ্লীল উপন্যাস, পেশাদার অপরাধীদের কাহিনী অথবা অশ্লীল কবিতা পাঠে অভ্যস্ত। এসব বিষয় উপরোক্ত হারাম খেলারই অন্তর্ভুক্ত। অনুরূপভাবে পথভ্রষ্ট বাতিলপন্থীদের চিন্তাধারা অধ্যায়ন করাও সর্বসাধারণের জন্যে পথভ্রষ্টতার কারণ বিধায় না-জায়েয। তবে গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণ জওয়াব দানের উদ্দেশ্যে এগুলো পাঠ করলে তাতে আপত্তির কারণ নেই।
খেলার সাজ-সরঞ্জাম ক্ৰয়-বিক্রয়ের বিধান হলো, যেসব সাজ-সরঞ্জাম কুফর অথবা হারাম খেলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলো ক্ৰয়-বিক্রয় করাও হারাম এবং যেগুলো মাকরূহ খেলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর ব্যবসা করাও মাকরূহ। পক্ষান্তরে যেসব সাজ-সরঞ্জাম বৈধ ও ব্যতিক্রমভুক্ত খেলায় ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর ব্যবসাও বৈধ এবং যেগুলো বৈধ ও অবৈধ উভয় প্রকার খেলায় ব্যবহার করা হয়; সেগুলোর ব্যবসাও অবৈধ।
এর বাইরে এমনও কতক খেলা রয়েছে যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, যদিও সেগুলোতে কিছু কিছু উপকারিতা আছে বলেও উল্লেখ করা হয়, যেমন দাবা, চওসর ইত্যাদি। এগুলোর সাথে হারজিত ও টাকা-পয়সার লেনদেন জড়িত থাকলে এগুলো জুয়া ও অকাট্য হারাম। অন্যথায় কেবল চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা হলেও হাদীসে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি চওসর খেলায় প্রবৃত্ত হয়, সে যেন তার হাতকে শূকরের রক্তে রঞ্জিত করে। [মুসলিম: ২২৬০] এমনিভাবে কবুতর নিয়ে খেলা করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবৈধ সাব্যস্ত করেছেন। [আবু দাউদ: ৪৯৪০]
এই নিষেধাজ্ঞার বাহ্যিক কারণ এই যে, সাধারণভাবে এসব খেলায় মগ্ন হলে মানুষ জরুরী কাজকর্ম এমন কি সালাত, সাওম ও অন্যান্য ইবাদত থেকেও অসাবধান হয়ে যায়। তাই সংক্ষেপে এটাই বলা যায় যে, যে খেলায় কোন ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা নেই, সেসব খেলাই নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ। যে খেলা শারীরিক ব্যায়াম তথা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে অথবা অন্য কোন ধর্মীয় ও পার্থিব উপকারিতা লাভের জন্যে অথবা কমপক্ষে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্যে খেলা হয়, সে খেলা শরীয়ত অনুমোদন করে, যদি তাতে বাড়াবাড়ি না করা এবং এতে ব্যস্ত থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বিঘ্নিত না হয়। আর ধর্মীয় প্রয়োজনের নিয়তে খেলা হলে তাতে সওয়াবও আছে। হাদীসে তিনটি খেলাকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে তীর নিক্ষেপ, অশ্বারোহণ এবং স্ত্রীর সাথে হাস্যরস করা। [সাঈদ ইবন মানসূর: ২৪৫০, ইবন আবি শাইবাহঃ ৫/৩২০,৩২১ নাসায়ী: আস সুনানুল কুবরা ৪৩৫৪, ৮৯৩৮, ৮৯৩৯, ৮৯৪০, আস-সুগরা: ৬/২৮, ত্বাবরানী: আল-মুজামুল কবীর ১৭৮৫, আবু দাউদ: ২৫১৩, আল-মুনতাকা: ১০৬২, মুসনাদে আহমাদ ৪/১৪৪, ১৪৬, ১৪৮]
কোন কোন বর্ণনায় এর সাথে যোগ করা হয়েছে, সাঁতার কাটা। [ত্ববারানী: মুজামুল কাবীর ২/১৯৩, (১৭৮৬)]। অপর বর্ণনায় এর সাথে যোগ করা হয়েছে, দৌড় প্রতিযোগিতা করা। [নাসায়ী: সুনানুল কুবরা ৫/৩০২, (৮৯৩৯)]। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সালামাহ ইবনে আকওয়া রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, জনৈক আনসারী দৌড়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। প্রতিযোগিতায় কেউ তাকে হারাতে পারত না। তিনি একদিন ঘোষণা করলেন কেউ আমার সাথে দৌড় প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে প্রস্তুত আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন। অতঃপর প্রতিযোগিতায় আমি জয়ী হয়ে গেলাম। [মুসলিম: ১৮০৭] এ থেকে জানা গেল যে, দৌড় প্রতিযোগিতা বৈধ।
আবিসিনিয়ার কতিপয় যুবক মদীনা তাইয়্যেবায় সামরিক কলা-কৌশল অনুশীলনকল্পে বর্শা ইত্যাদি নিয়ে খেলায় প্রবৃত্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে নিজের পেছনে দাঁড় করিয়ে তাদের খেলা উপভোগ করাচ্ছিলেন। তিনি তাদেরকে বলেছিলেন খেলাধুলা অব্যাহত রাখ৷ [বুখারী: ৪৫৪] অনুরূপভাবে কোন কোন সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, যখন তারা কুরআন ও হাদীস সম্পর্কিত কাজে ব্যস্ততার ফলে অবসন্ন হয়ে পড়তেন, তখন অবসাদ দূর করার জন্যে মাঝে মাঝে আরবে প্রচলিত কবিতা ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলী দ্বারা মনোরঞ্জন করতেন। এক হাদীসে এরশাদ হয়েছে “তোমরা মাঝে মাঝে অন্তরকে বিশ্রাম ও আরাম দিবে।” [আবু দাউদ: ১৫২৮] এ থেকে অন্তর ও মস্তিষ্কের বিনোদন এবং এর জন্যে কিছু সময় বের করার বৈধতা প্রমাণিত হয়।
“জ্ঞান ছাড়াই” শব্দের সম্পর্ক “কিনে নেয়।” এর সাথেও হতে পারে আবার “বিচ্যুত করে” এর সাথেও হতে পারে। যদি প্রথম বাক্যাংশের সাথে এর সম্পর্ক মেনে নেয়া হয়, তাহলে এর অর্থ হবে, সেই মূর্খ অজ্ঞ লোক এই মনোমুগ্ধকর জিনিসটি কিনে নেয় এবং সে জানে না কেমন মূল্যবান জিনিস বাদ দিয়ে সে কেমন ধ্বংসকর জিনিস কিনে নিচ্ছে। একদিকে আছে জ্ঞান ও সঠিক পথনির্দেশনা সমৃদ্ধ আল্লাহর আয়াত। বিনামূল্যে সে তা লাভ করছে কিন্তু তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অন্যদিকে রয়েছে সব অর্থহীন ও বাজে জিনিস। সেগুলো চিন্তা ও চরিত্ৰশক্তি ধ্বংস করে দেয়। নিজের টাকা পয়সা খরচ করে সে সেগুলো লাভ করছে। আর যদি একে দ্বিতীয় বাক্যাংশের সাথে সম্পর্কযুক্ত মনে করা হয়, তাহলে এর অর্থ হবে যে, সে জ্ঞান ছাড়াই লোকদের পথ দেখাচ্ছে এবং আল্লাহর সৃষ্টিকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করে সে যে নিজের ঘাড়ে কত বড় জুলুমের দায়ভার চাপিয়ে নিচ্ছে, তা সে জানে না।
এ সকল লোকদের সম্মুখে যখনই কুরআন ও আল্লাহ তা‘আলার নিদর্শনাবলীর আলোচনা করা হয় তখনই তারা দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়। যেন তারা কিছুই শুনতে পায়নি। তাদের কর্ণ যেন বধির, সুতরাং তাদের জন্যই থাকবে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহর আয়াতের তেলাওয়াত শোনে অথচ অহংকারের সাথে অটল থাকে যেন তা সে শোনেনি। তাকে সুসংবাদ দাও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির। যখন আমার কোন আয়াত সে অবগত হয় তখন সে তা ঠাট্টা-বিদ্রƒপচ্ছলে গ্রহণ করে। তাদের জন্য রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি। তাদের পশ্চাতে রয়েছে জাহান্নাম; তাদের কৃতকর্ম তাদের কোন কাজে আসবে না, তারা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে অভিভাবক স্থির করেছে তারাও নয়। তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” (সূরা জাসিয়াহ ৪৫:৭-১০)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “কোন ব্যক্তিকে তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলী স্মরণ করিয়ে দেয়ার পর সে যদি তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং তার কৃতকর্মসমূহ ভুলে যায় তবে তার অপেক্ষা অধিক জালিম আর কে? আমি তাদের অন্তরের ওপর আবরণ দিয়েছি যেন তারা কুরআন বুঝতে না পারে এবং তাদের কানে বধিরতা বদ্ধমূল করে দিয়েছি। তুমি তাদেরকে সৎ পথে আহ্বান করলেও তারা কখনও সৎ পথে আসবে না।” (সূরা কাহফ ১৮:৫৭)
{ فَبَشِّرْهُ } (সুতরাং তাকে ‘সুসংবাদ’ দাও)—এমন এক ‘সুসংবাদ’, যা তার অন্তরে দুঃখ ও বিষাদ সৃষ্টি করবে এবং তার চেহারায় কালিমা, অন্ধকার ও মলিনতা এনে দেবে। তাকে সুসংবাদ দাও { بِعَذَابٍ أَلِيمٍ } (এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির)—যা তার অন্তর ও দেহ উভয়ের জন্য কষ্টদায়ক হবে, যার পরিমাণ অনুমান করা যাবে না এবং যার ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা করা যাবে না। আর এটি হলো দুষ্ট লোকদের জন্য ‘সুসংবাদ’, আর কতই না নিকৃষ্ট এই সুসংবাদ!
অতএব সকল প্রকার গান-বাজনা ও অসার কথাবার্তা থেকে দূরে থাকবে হবে। মু’মিন কখনো অসার কার্যকলাপ ও কথা-বার্তায় জড়িত হতে পারে না।
তাদের জন্য জান্নাতের নিয়ামতসমূহ রয়েছে, একথা বলেননি। বরং বলেছেন, তাদের জন্য রয়েছে নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত। যদি প্রথম কথাটি বলা হতো, তাহলে এর অর্থ হতো, তারা এ নিয়ামতসমূহ উপভোগ করবে ঠিকই কিন্তু এ জান্নাতগুলো তাদের নিজেদের হবে না। এর পরিবর্তে “তাদের জন্য রয়েছে নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাতসমূহ” একথা বলায় আপনা-আপনি একথা প্রকাশ হয়ে গেছে যে, জান্নাত পুরোটাই তাদের হাওয়ালা করে দেয়া হবে এবং তারা তার নিয়ামতসমুহ এমনভাবে ভোগ করতে থাকবে যেমন একজন মালিক তার মালিকানাধীন জিনিস ভোগ করে থাকে। মালিকানা অধিকার ছাড়াই কাউকে কোন জিনিস থেকে নিছক লাভবান হবার সুযোগ দিলে যেভাবে তা ভোগ করা হয় সেভাবে নয়।
অর্থাৎ নিজের প্রতিশ্রুতি পালন থেকে কোন জিনিসই তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারে না এবং তিনি যা কিছু করেন ঠিকমতো জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতার দাবী অনুযায়ীই করেন। “এটা আল্লাহর অকাট্য প্রতিশ্রুতি”-একথা বলার পর আল্লাহর উপরি উক্ত দু’টি বিশেষ গুণের কথা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, একথা বলা যে, মহান আল্লাহ ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না এবং এ বিশ্ব-জাহানে এমন কোন শক্তিই নেই যে তার প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যাপারে তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই ঈমান ও সৎকাজের বিনিময়ে আল্লাহ যা কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা কারো না পাওয়ারআশঙ্কা নেই। তা তা ছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে এ পুরস্কারের ঘোষণা পুরোপুরি তার জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণাতার ওপর নির্ভরশীল। সেখানে হকদারকে বঞ্চিত করে না হকদারকে দান করার কোন কারবার নেই। প্রকৃতপক্ষে ঈমানদার ও সৎকর্মশীল লোকেরাই এ পুরস্কারের হকদার এবং আল্লাহ এ পুরস্কার তাদেরকেই দেবেন।
প্রথমত মহান আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কুদরতের বর্ণনা দিয়ে বলেন: তিনি আকাশমণ্ডলী নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া যা তোমরা স্বচক্ষে দেখতে পারছ। এ সম্পর্কে সূরা রাদের ২ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
এরপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পবর্তমালা যাতে সৃষ্টিজীবকে নিয়ে ঢলে না পড়ে। এ সম্পর্কেও সূরা নাহলের ১৫ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তিনিই পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সর্বপ্রকার জীবজন্তু। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “তাঁর মহা নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত হল আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এতদুভয়ের মধ্যে তিনি যেসব জীবজন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো; তিনি যখন ইচ্ছা তখনই তাদেরকে সমবেত করতে সক্ষম।” (সূরা শূরা ৪২:৯২) এবং একমাত্র তিনিই আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং সেই বৃষ্টির পানি দ্বারা জমিন হতে সর্বপ্রকার কল্যাণকর উদ্ভিদ উৎপন্ন করেন। যেমনটি আলোচনা করা হয়েছে সূরা নাহলের ১০ ও ১১ নং আয়াতে।
এ পৃথিবীতে মানুষ, জীন, গরু-ছাগল, উট, গাছ-পালাসহ যত প্রকার সৃষ্টি রয়েছে সবকিছুই একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন, অন্য কেউ নয়। এ সম্পর্কে সূরা বাকারার ১৬৪ নং আয়াতে আলোচনা করা হয়েছে।
{ هَذَا } (এই)। অর্থাৎ ঊর্ধ্বজগত ও নিম্নজগতের এই সৃষ্টি, জড় ও জীব এবং সৃষ্টির কাছে তাদের রিযিক পৌঁছানো—এসবই { خَلْقُ اللَّهِ } (আল্লাহর সৃষ্টি)। তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। হে মুশরিক সম্প্রদায়, তোমরাসহ সকলেই এটা স্বীকার কর।
{ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَّذِينَ مِنْ دُونِهِ } (সুতরাং আমাকে দেখাও, তাঁকে ছাড়া অন্যরা কী সৃষ্টি করেছে?)। অর্থাৎ, তোমরা যাদেরকে তাঁর শরীক বানিয়েছ, যাদেরকে তোমরা ডাকো এবং ইবাদত করো। (যদি তোমাদের দাবি সত্য হয়) তবে আবশ্যকীয়ভাবে তাদেরও আল্লাহর সৃষ্টির মতো কোনো সৃষ্টি এবং তাঁর রিযিকের মতো কোনো রিযিক থাকতে হবে। যদি তাদের এমন কিছু থাকে, তবে আমাকে তা দেখাও, যাতে তাদের ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতার দাবিটি সঠিক প্রমাণিত হয়।
এটা সর্বজনবিদিত যে, তারা (মুশরিকরা) তাদের উপাস্যদের কোনো সৃষ্টি দেখাতে পারবে না, কারণ উল্লেখিত সকল সৃষ্টি যে কেবল আল্লাহরই, তা তারা স্বীকার করে। আর এগুলো ছাড়া অন্য কোনো সৃষ্টি সম্পর্কেও জানা যায় না। সুতরাং, তাদের উপাস্যদের ইবাদত পাওয়ার যোগ্যতার পক্ষে কোনো প্রমাণ দাঁড় করাতে তাদের অক্ষমতা প্রমাণিত হলো।
বরং তাদের এই উপাসনা কোনো জ্ঞান বা অন্তর্দৃষ্টি থেকে নয়, বরং অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতা থেকে উৎসারিত। এ কারণেই আল্লাহ বলেছেন: { بَلِ الظَّالِمُونَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ } (বরং যালিমরা সুস্পষ্ট পথভ্রষ্টতায় রয়েছে)। অর্থাৎ, এমন সুস্পষ্ট ও প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় রয়েছে যে, তারা এমন কিছুর ইবাদত করে, যা কোনো উপকার, ক্ষতি, জীবন, মৃত্যু বা পুনরুত্থানের মালিক নয়। আর তারা সকল বিষয়ের মালিক, সৃষ্টিকর্তা ও রিযিকদাতা আল্লাহর প্রতি ইখলাস (নিষ্ঠা) পরিত্যাগ করেছে।
ফুটনোট
প্রথম পর্ব: এক প্রজ্ঞাময় কিতাব এবং অনর্থক কথাবার্তায় নিমগ্ন এক শ্রেণী
সূরার সূচনা হয় প্রজ্ঞাময় কিতাব—কুরআনের—পরিচয়ের মাধ্যমে। আল্লাহ বলছেন, “আলিফ-লাম-মীম। এগুলো প্রজ্ঞাপূর্ণ কিতাবের আয়াত। এটি সৎকর্মশীলদের জন্য পথনির্দেশ ও রহমতস্বরূপ।” কারা এই সৎকর্মশীল? যারা সালাত কায়েম করে, যাকাত আদায় করে এবং পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।
এই আলোকিত পথের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে আরেক শ্রেণীর মানুষ। আল্লাহ তাদের চিত্র তুলে ধরেন:
- বিভ্রান্তির ব্যবসায়ী:
“মানুষের মধ্যে এমন লোকও আছে, যে মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য অজ্ঞতাবশত অনর্থক কথাবার্তা ক্রয় করে এবং আল্লাহর পথকে ঠাট্টা-বিদ্রূপের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে।” তারা গান-বাজনা, অর্থহীন গল্প-গুজব এবং বিনোদনের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
- অহংকারী মনোভাব:
যখন তাদের কাছে আল্লাহর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, তখন তারা দম্ভভরে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যেন তারা তা শুনতেই পায়নি বা যেন তাদের কানে বধিরতা রয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এক যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সুসংবাদ (?) দিচ্ছেন।
দ্বিতীয় পর্ব: মহাবিশ্বের বিশাল প্রেক্ষাপটে আল্লাহর ক্ষমতা ও জ্ঞান
অবিশ্বাসীদের এই সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে, আল্লাহ এবার তাদের মনোযোগ মহাবিশ্বের বিশাল সৃষ্টিজগতের দিকে আকর্ষণ করেন, যা তাঁর ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও একত্বের অকাট্য প্রমাণ।
- দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সৃষ্টি:
“তিনি আকাশমণ্ডলীকে কোনো দৃশ্যমান স্তম্ভ ছাড়াই সৃষ্টি করেছেন এবং পৃথিবীতে সুদৃঢ় পর্বতমালা স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে। আর তাতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীবজন্তু।”
- প্রকৃতির ভারসাম্য:
“আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি, অতঃপর তাতে সব ধরনের উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি।”
- আল্লাহ এরপর এক শক্তিশালী প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন: “এসব তো আল্লাহর সৃষ্টি। সুতরাং, তিনি ছাড়া অন্যরা যা সৃষ্টি করেছে, তা আমাকে দেখাও।”
- আল্লাহর জ্ঞানের গভীরতা:
আল্লাহর জ্ঞানের বিশালতাকে বোঝানোর জন্য এক অভাবনীয় উপমা দেওয়া হয়: “যদি পৃথিবীর সমস্ত গাছ কলম হয় এবং সমুদ্র হয় কালি, আর তার সাথে আরও সাতটি সমুদ্র যুক্ত হয়, তবুও আল্লাহর বাণী (জ্ঞান) লিখে শেষ করা যাবে না।”
শিক্ষণীয় বিষয়:
১. যারা সৎ কর্মপরায়ণ তারা কুরআন থেকে উপকৃত হয়।
২. মু’মিনদের বৈশিষ্ট্য হলো তারা সালাত আদায় করে, যাকাত প্রদান করে এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে।
৩. পরকালের প্রতি ঈমান না থাকলে কোন প্রকার আমল কবূল করা হবে না।
৪. মানুষকে আল্লাহ তা‘আলার পথ থেকে বাধা দেয় এমন সব কার্যকলাপ হারাম।
৫. গর্ব-অহঙ্কার করা কবীরা গুনাহ।
৬. গান-বাজনা শোনা ও শোনানো এবং তার দ্বারা অর্জিত সমস্ত সম্পদ হারাম। তবে যে সব কথা ও কবিতা উপকারী, কোন প্রকার শির্ক ও অনর্থক কথা নেই তা বলা বৈধ।
৭. ঈমান আনার সাথে সাথে সৎ কাজ করতে হবে।
৮. আল্লাহ তা‘আলা যা ওয়াদা করেন তা সত্য, তিনি কখানো ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
৯. সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা, অন্য কেউ নয়।আল্লাহ তা‘আলার সাথে কাউকে শরীক করা যাবে না। সৃষ্টিকর্তা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই, তাই সকল ইবাদত পাওয়ার হকদার তিনিই।
১০. পর্বতমালা না থাকলে পৃথিবী নড়াচড়া করত, ফলে তখন তাতে বসবাস করা সম্ভব