কুরআন অধ্যয়ন প্রতিযোগিতা ২০২৫
প্রস্তুতি সহায়ক তাফসীর নোট পর্বঃ ২০
সূরা আল ইনশিকাক কুরআনের ৮৪ তম সূরা, এর আয়াত সংখ্যা ২৫; রূকু সংখ্যা ১। সূরাটিতে ১টি সিজদাহ রয়েছে। সূরা আল ইনশিকাক মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। ইনশিকাক মানে ফেটে যাওয়া।
নামকরণ
প্রথম আয়াতের اِنْشَقَّتْ শব্দটি থেকে এই নামকরণ করা হয়েছে। এর মূলে রয়েছে اِنْشَقَّاق শব্দ। ইনশিকাক মানে ফেটে যাওয়া। অর্থাৎ এ নামকরণের মাধ্যমে একথা বলতে চাওয়া হয়েছে যে, এটি এমন একটি সূরা যাতে আকাশের ফেটে যাওয়ার উল্লেখ আছে।
নাযিল হওয়ার সময়-কাল
এটি মক্কা মু’আয্যমার প্রথম যুগে অবতীর্ণ সূরা গুলোর অন্তর্ভুক্ত। এ সূরার মধ্যে যেসব বিষয়ের আলোচনা করা হয়েছে তার আভ্যন্তরীণ বক্তব্য ও প্রমাণপত্র থেকে একথা জানা যায় যে, যখন এ সূরাটি নাযিল হয় তখন জুলুম-নিপীড়নের ধারাবাহিকতা শুরু হয়নি। তবে কুরআনের দাওয়াতকে তখন মক্কায় প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছিল। একদিন কিয়ামত হবে এবং সমস্ত মানুষকে আল্লাহর সামনে হাযির হতে হবে একথা মেনে নিতে লোকেরা অস্বীকার করছিল।
বিষয়বস্তু ও মূল বক্তব্য
এ সূরাটির বিষয়বস্তু হচ্ছে কিয়ামত ও আখেরাত। প্রথম পাঁচটি আয়াতে কেবল কিয়ামতের অবস্থা বর্ণনা করা হয়নি। বরং এ সংগে কিয়ামত যে সত্যিই অনুষ্ঠিত হবে তার প্রমাণ পেশ করা হয়েছে। তার অবস্থা বর্ণনা করে বলা হয়েছে: সেদিন আকাশ ফেটে যাবে পৃথিবীকে ছড়িয়ে দিয়ে একটি সমতল ময়দানে পরিণত করা হবে। পৃথিবীর পেটে যা কিছু আছে (অর্থাৎ মৃত মানুষের শরীরের অংশসমূহ এবং তাদের কার্যাবলীর বিভিন্ন সাক্ষ্য প্রমাণ) সব বের করে বাইরে ফেলে দেয়া হবে। এমনকি তার মধ্যে আর কিছুই থাকবে না। এর সপক্ষে যুক্তি পেশ করে বলা হয়েছে, আকাশ ও পৃথিবীর জন্য এটিই হবে তাদের রবের হুকুম। আর যেহেতু এ দু’টি আল্লাহর সৃষ্টি, কাজেই তারা আল্লাহর হুকুম অমান্য করতে পারবে না। তাদের জন্য তাদের রবের হুকুম তামিল করাটাই সত্য।
এরপর ৬ থেকে ১৯ পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ সচেতন বা অচেতন যে কোনভাবেই হোক না কেন সেই মনযিলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে যেখানে তার নিজেকে তার রবের সামনে পেশ করতে হবে। তখন সমস্ত মানুষ দু’ভাগে ভাগ হয়ে যাবে। এক, যাদের আমলনামা ডান হাতে দেয়া হবে। তাদেরকে কোন প্রকার কঠিন হিসেব-নিকেশের সম্মুখীন হওয়া ছাড়াই সহজে মাফ করে দেয়া হবে। দুই, যাদের আমলনামা পিঠের দিকে দেয়া হবে। তারা চাইবে, কোনভাবে যদি তাদের মৃত্যু হতো। কিন্তু মৃত্যুর বদলে তাদেরকে জাহান্নামে ঠেলে দেয়া হবে। তারা দুনিয়ায় এই বিভ্রান্তিতে ডুবে ছিল যে, তাদেরকে কখনো আল্লাহর সামনে হাযির হতে হবে না। এ কারণে তারা এ পরিণতির সম্মুখীন হবে। অথচ তাদের রব তাদের সমস্ত কার্যক্রম দেখছিলেন। এসব কার্যক্রমের ব্যাপারে জবাবদিহি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার তাদের কোন কারণ ছিল না। দুনিয়ার কর্মজীবন থেকে আখেরাতের শাস্তি ও পুরস্কারের জীবন পর্যন্ত তাদের পর্যায়ক্রমে পৌঁছে যাওয়ার ব্যাপারটি ঠিক তেমনই নিশ্চিত যেমন সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পশ্চিম আকাশে লাল আভা দেখা দেয়া, দিনের পরে রাতের আসা, সে সময় মানুষ ও সকল প্রাণীর নিজ নিজ ডেরায় ফিরে আসা এবং একাদশীর একফালি চাঁদের ধীরে ধীরে চতুরদশীর পূর্ণচন্দ্রে পরিণত হওয়ার ব্যাপারটি নিশ্চিত।
সবশেষে কাফেরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির খবর শুনানো হয়েছে। কারণ তারা কুরআনের বাণী শুনে আল্লাহর সামনে নত হওয়ার পরিবর্তে তার প্রতি মিথ্যা আরোপ করে। এ সংগে যারা ঈমান এনে নেক আমল করে তাদেরকে অগণিত পুরস্কার ও উত্তম প্রতিদানের সুখবর শুনানো হয়েছে।
গুরুত্ব:
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেছেন যে, ‘যদি কেউ চোখের সামনে ক্বিয়ামতের দৃশ্য অবলোকন করে খুশী হ’তে চায়, তবে সে যেন সূরা তাকভীর, ইনফিত্বার ও সূরা ইনশিক্বাক্ব পাঠ করে’। (আহমাদ হা/৪৯৩৪)
আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন,– ‘আমরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে (সালাতের মধ্যে) সূরা ইনশিক্বাক্ব ও সূরা ‘আলাক্বে সিজদা করেছি’। (বুখারী হা/১০৭৪)
انْشَقَّتْ অর্থাৎ আকাশ কিয়ামতের দিন চূর্ণ-বিচূর্ণ ও বিদীর্ণ হয়ে যাবে। এর দ্বারা আকাশ যে মজবুত তার প্রমাণ পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন : “আর নির্মাণ করেছি তোমাদের ওপর সাতটি মজবুত আসমান।” (সূরা নাবা ৭৮ : ১২)
এখানে কেয়ামতের দিন আকাশ ও পৃথিবীর উপর আল্লাহ্ তা’আলার কর্তৃত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, (وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ) এর মধ্যে أَذِنَتْ অর্থ শুনেছে তথা আদেশ পালন করেছে। সে হিসেবে (وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا) এর শাব্দিক অর্থ হয়, “সে নিজের রবের হুকুম শুনবে।” এর মানে শুধুমাত্র হুকুম শুনা নয় বরং এর মানে সে হুকুম শুনে একজন অনুগতের ন্যায় নির্দেশ পালন করেছে এবং একটুও অবাধ্যতা প্রকাশ করেনি। [সা’দী] আর حُقَّتْ এর অর্থ “আদেশ পালন করাই তার ওয়াজিব কর্তব্য ছিল”। কারণ সে একজন মহান বাদশার কর্তৃত্বাধীন ও পরিচালনাধীন। যাদের নির্দেশ অমান্য করা যায় না, আর তার হুকুমের বিপরীত করা যায় না। [ইবন কাসীর; সা’দী]
مُدَّتْ এর অর্থ টেনে লম্বা করা, ছড়িয়ে দেয়া। [ইবন কাসীর] পৃথিবীকে ছড়িয়ে দেবার মানে হচ্ছে, সাগর নদী ও সমস্ত জলাশয় ভরে দেয়া হবে। পাহাড়গুলো চুৰ্ণবিচূর্ণ করে চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়া হবে। পৃথিবীর সমস্ত উঁচু নীচু জায়গা সমান করে সমগ্ৰ পৃথিবীটাকে একটি সমতল প্রান্তরে পরিণত করা হবে। কুরআনের অন্যত্র এই অবস্থাটিকে নিম্নোক্তভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, মহান আল্লাহ “তাকে একটা সমতল প্রান্তরে পরিণত করে দেবেন। সেখানে তোমরা কোন উচু জায়গা ও ভাঁজ দেখতে পাবে। না।” [সূরা ত্ব-হা: ১০৬–১০৭] হাদীসে এসেছে, ‘কেয়ামতের দিন পৃথিবীকে চামড়ার ন্যায় টেনে সম্প্রসারিত করা হবে। তারপর মানুষের জন্য সেখানে কেবলমাত্র পা রাখার জায়গাই থাকবে।” [মুস্তাদরাকে হাকিম: ৪/৫৭১]
একথাটি ভালোভাবে বুঝে নেয়ার জন্য এ বিষয়টিও সামনে রাখতে হবে যে, সেদিন সৃষ্টির প্রথম দিন থেকে নিয়ে কিয়ামত পর্যন্ত যত মানুষের জন্ম হয়েছে ও হবে সবাইকে একই সংগে জীবিত করে আল্লাহর আদালতে পেশ করা হবে। এ বিরাট জনগোষ্ঠীকে এক জায়গায় দাঁড় করাবার জন্য সমস্ত সাগর, নদী, জলাশয়, পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, মালভূমি, তথা উঁচু-নীচু সব জায়গা ভেঙ্গে-চুরে ভরাট করে সারা দুনিয়াটাকে একটি বিস্তীর্ণ প্রান্তরে পরিণত করা হবে। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর; সা’দী]
যেমন আল্লাহ বলেন, ‘যেদিন আকাশসমূহ ও পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হয়ে যাবে এবং লোকেরা পরাক্রমশালী একক আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হবে’ (ইবরাহীম ১৪/৪৮)। পৃথিবী ঐদিন একাট্টা হয়ে যাবে এবং একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত দেখা যাবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তাদেরকে ঐদিন একে অপরের দৃষ্টিগোচর করা হবে’ (মা‘আরিজ ৭০/১১)। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এরশাদ করেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ পূর্বের ও পরের সবাইকে একটি মাটিতে একত্রিত করবেন। ফলে তারা একে অপরের কথা শুনতে পাবে ও একে অপরকে দেখতে পাবে’।[ বুখারী হা/৪৭১২; মুসলিম হা/১৯৪]
অর্থাৎ পৃথিবী তার গর্ভস্থত সবকিছু উদগিরণ করে একেবারে শূন্যগর্ভ হয়ে যাবে। পৃথিবীর গর্ভে গুপ্ত ধন-ভাণ্ডার, খনি এবং সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মৃত মানুষের দেহকণা ইত্যাদি রয়েছে। যমীন এসব বস্তু আপন গৰ্ভ থেকে বাইরে নিক্ষেপ করবে। অনুরূপভাবে যত মৃত মানুষ তার মধ্যে রয়েছে সবাইকে ঠেলে বাইরে বের করে দেবে। [ফাতহুল কাদীর; সা’দী] একথাই আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন: “এবং যখন পৃথিবী তার বোঝা বের করে দেবে”। (সূরা যিলযাল ৯৯: ২)
একথার মধ্যেও দলীল রয়েছে যে, আকাশের ন্যায় পৃথিবীও আপনা-আপনি সৃষ্টি হয়নি। বরং তারও একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন এবং তাঁর হুকুমেই তার পূর্বের রূপ বিনষ্ট হয়ে আজ নতুন রূপ ধারণ করেছে। আর সর্বাবস্থায় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর হুকুম পালন করাই তার প্রধান কর্তব্য এবং হুকুম পাওয়ার পর সে কাজটিই সে করবে ক্বিয়ামতের দিন।
كدح এর অর্থ কোন কাজে পূর্ণ চেষ্টা ও শক্তি ব্যয় করা। [ফাতহুল কাদীর] মানুষের প্রত্যেক চেষ্টা ও অধ্যবসায় আল্লাহর দিকে চূড়ান্ত হবে। অর্থাৎ মানুষ দুনিয়ায় যা কিছু কষ্ট-সাধনা প্ৰচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে সে সম্পর্কে সে মনে করতে পারে যে তা কেবল দুনিয়ার জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ এবং দুনিয়াবী স্বাৰ্থ লাভ করাই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু আসলে সে সচেতন বা অচেতনভাবে নিজের রবের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে এবং অবশেষে তাকে তার কাছেই পৌছতে হবে। মানুষ এখানে যে চেষ্টা-চরিত্র করছে, পরিশেষে তার পালনকর্তার কাছে পৌছে এর সাথে তার সাক্ষাৎ ঘটবে এবং এর শুভ অথবা অশুভ পরিণতি সামনে এসে যাবে। অথবা এর অর্থ প্রত্যেক মানুষ আখেরাতে তার পালনকর্তার সাথে সাক্ষাৎ করবে এবং হিসাবের জন্যে তার সামনে উপস্থিত হবে। [দেখুন: কুরতুবী]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত করতে চায়, আল্লাহও তার সাক্ষাত করতে পছন্দ করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাক্ষাত করতে চায় না, আল্লাহও তার সাথে সাক্ষাত করতে অপছন্দ করেন।” আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা (অথবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্য কোন স্ত্রী) বলেন, “আমরা তো মৃত্যুকে অপছন্দ করি।” রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “তা নয়। কিন্তু মুমিন ব্যক্তির যখন মৃত্যু ঘণিয়ে আসে, তখন তাকে আল্লাহ তা’আলার সস্তুষ্টি ও সম্মানের সুসংবাদ দেওয়া হয়। তখন তার কাছে মৃত্যু অপেক্ষা অন্য কিছু প্রিয় হতে পারে না। এভাবে সে আল্লাহর সাক্ষাত করতে পছন্দ করে, তাই আল্লাহ্ তা’আলাও তার সাথে সাক্ষাত করতে পছন্দ করেন। আর কাফির ব্যক্তিকে মৃত্যুর সময় আল্লাহর আযাব ও শাস্তির সংবাদ দেওয়া হয়, তখন মৃত্যু অপেক্ষা অপ্রিয় আর কিছু থাকে না। সে আল্লাহর সাক্ষাত অপছন্দ করে বিধায় আল্লাহ্ তা’আলা তার সাথে সাক্ষাত অপছন্দ করেন”। [বুখারী: ৬৫০৭, মুসলিম: ২৬৮৩]
এতে মুমিনদের অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে যে, তাদের আমলনামা ডান হাতে আসবে। এবং তাদের সহজ হিসাব নিয়ে জান্নাতের সুসংবাদ দান করা হবে। তারা তাদের পরিবার-পরিজনের কাছে হৃষ্টচিত্তে ফিরে যাবে। তার হিসেব নেয়ার ব্যাপারে কড়াকড়ি করা হবে না। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে না, ওমুক ওমুক কাজ তুমি কেন করেছিলে? ঐসব কাজ করার ব্যাপারে তোমার কাছে কি কি ওযর আছে? নেকীর সাথে সাথে গোনাহও তার আমলনামায় অবশ্যি লেখা থাকবে। কিন্তু গোনাহের তুলনায় নেকীর পরিমাণ বেশী হবার কারণে তার অপরাধগুলো উপেক্ষা করা হবে এবং সেগুলো মাফ করে দেয়া হবে। কুরআন মজিদে অসৎকর্মশীল লোকদের কঠিন হিসেবা-নিকেশের জন্য “সু-উল হিসাব” (খারাপভাবে হিসেব নেয়া) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। [সূরা আর-রা’দ ১৮]
সৎ লোকদের সম্পর্কে বলা হয়েছেঃ “এরা এমন লোক যাদের সৎকাজগুলো আমি গ্ৰহণ করে নেবো এবং অসৎকাজগুলো মাফ করে দেবো।” [সূরা আল-আহকাফঃ ১৬] আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কেয়ামতের দিন যার হিসাব নেয়া হবে, সে আযাব থেকে রক্ষা পাবে না। এ কথা শুনে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা প্রশ্ন করলেন, কুরআনে কি (فَسَوْفَ يُحَاسَبُ حِسَابًا يَسِيرًا) বলা হয়নি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এই আয়াতে যাকে সহজ হিসাব বলা হয়েছে, সেটা প্রকৃতপক্ষে পরিপূর্ণ হিসাব নয়; বরং কেবল আল্লাহ রাব্বুল আলমীনের সামনে পেশ করা। যে ব্যক্তির কাছ থেকে তার কাজকর্মের পুরোপুরি হিসাব নেয়া হবে, সে আযাব থেকে কিছুতেই রক্ষা পাবে না। [বুখারী: ৪৯৩৯, মুসলিম: ২৮৭৬l
অর্থাৎ ‘সে জান্নাতে তার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে’। মুমিন বান্দা ডান হাতে আমলনামা পাওয়ার পর খুশীতে বাগবাগ হয়ে তার পরিবারের কাছে ফিরে যাবে। এর সহজ ব্যাখ্যা এই যে, দুনিয়ায় যারা তার পরিবার ছিল, তাদের কাছে ফিরে গিয়ে হৃষ্টচিত্তে নিজের সুন্দর কর্মফল জানাবে। যেভাবে দুনিয়ায় কোন পরীক্ষার সুন্দর রেজাল্ট হলে সন্তানেরা ছুটে গিয়ে তাদের পিতা-মাতাকে জানায়। তবে ক্বাতাদাহ বলেন, এর অর্থ ‘জান্নাতে তার স্ত্রীগণ, যারা হবেন আনতনয়না সুন্দরী তন্বী হূরগণ’ (কুরতুবী, ইবনু কাছীর)। এই ‘হূর’ তাদের দুনিয়ার স্ত্রীগণও হতে পারেন, যদি তারা জান্নাতী হন। তাছাড়া أهله অর্থাৎ ‘তার পরিবার’ বলতে কেবল স্ত্রী বুঝায় না। বরং স্ত্রী ও সন্তান সবাইকে বুঝায়। অতএব দুনিয়ার স্ত্রী ও সন্তানেরা জান্নাতী হলে তারাও তাদের স্বামী ও পিতা-মাতাদের সঙ্গে থাকবে ও তাদেরকে আমলনামা দেখিয়ে আনন্দ করবে।
ঈমানদার পুরুষগণের ঈমানদার স্ত্রীগণ যে জান্নাতে তাদের স্ত্রী হিসাবে সাথী হবে, সে বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘(অতএব) জান্নাতে প্রবেশ কর তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীগণ সানন্দে’ (যুখরুফ ৪৩/৭০)। অনুরূপভাবে ঈমানদার সন্তানগণ যে ঈমানদার পিতা-মাতার সাথে জান্নাতে থাকবে, সে বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা ঈমানদার এবং যাদের সন্তানেরা ঈমানে তাদের অনুগামী, আমরা তাদের সাথে মিলিত করব তাদের সন্তানদের। আর আমরা তাদের কর্মফলে বিন্দুমাত্র হরাস করব না। বস্ত্ততঃ প্রত্যেক ব্যক্তি স্ব স্ব কৃতকর্মের জন্য দায়ী’ (তূর ৫২/২১)।
সূরা আল হাক্কায় বলা হয়েছে, যার আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে। আর এখানে বলা হয়েছে, তার পেছন দিক থেকে দেয়া হবে। সম্ভবত এটা এভাবে হবে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ডান হাতে আমলনামা পাবার ব্যাপারে প্রথম থেকে নিরাশ হয়ে থাকবে। কারণ নিজের কার্যক্রম তার ভালোভাবেই জানা থাকবে। ফলে সে নিশ্চিতভাবে মনে করবে যে, তাকে বাম হাতে আমলনামা দেয়া হবে। তাই সে নিজের হাত পেছনের দিকে রাখবে। কিন্তু এই চালাকি করে সে নিজের কৃতকর্মের ফল নিজের হাতে তুলে নেবার হাত থেকে বাঁচতে পারবে না। সে হাত সামনের দিকে রাখুক বা পেছনের দিকে অবশ্যি তার আমলনামা তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হবে। [তাফহীমুল কুরআন]
ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ঐ ব্যক্তি ডানহাতে নেবার জন্য চেষ্টা করেও ব্যর্থ হবে এবং অবশেষে পিছন দিকে বাম হাতে নিতে বাধ্য হবে [কুরতুবী]
অন্যত্র বলা হয়েছে, “এবং যখন তাদেরকে শৃংখলিত অবস্থায় কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা তথায় ধ্বংস কামনা করবে। (তাদেরকে বলা হবে) ‘আজ তোমরা একবারের জন্য ধ্বংস কামনা কর না; বহুবার ধ্বংস হবার কামনা করতে থাক।’ (সূরা ফুরকান ২৫: ১৩-১৪)। কিন্তু তাতে কোন কাজ হবেনা। কেননা সেখানে কারু মৃত্যু হবেনা (আ‘লা ৮৭: ১৩)। বরং তাকে বাঁচিয়ে রেখে কেবল শাস্তিই বৃদ্ধি করা হবে (নাবা ৭৮: ৩০)।
ثُبُوْراً অর্থ هلاك ধ্বংস অর্থাৎ মৃত্যু। চূড়ান্তভাবে অপদস্থ ও শাস্তিপ্রাপ্ত হ’লে মানুষ নিজের ধ্বংস ও মৃত্যু কামনা করে থাকে। এখানে সেটাই বলা হয়েছে।
অর্থাৎ বাম হাতে আমলনামা পাওয়ার পরিণতি হিসাবে সে জাহান্নামের প্রজ্বলিত হুতাশনে প্রবেশ করবে। অবশ্য সে ইচ্ছা করে প্রবেশ করবে না। বরং তাকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে (যুমার ৩৯:৭১; ক্বাফ ৫০:২১)। সেটার ধরন কেমন হবে সে বিষয়ে আল্লাহ বলেন, ‘(ফেরেশতাদের বলা হবে) একে ধর, গলায় বেড়ী পরাও’। ‘অতঃপর জাহান্নামে নিক্ষেপ কর’। ‘অতঃপর সত্তর গজ দীর্ঘ শিকলে একে আচ্ছামত বাঁধো’ (হা-ক্কাহ ৬৯:৩০-৩২)।
অর্থাৎ তার অবস্থা ছিল আল্লাহর সৎবান্দাদের থেকে আলাদা। আল্লাহর এই সৎ বান্দাদের সম্পর্কে সূরা ত্বা-হা’র ২৬ আয়াতে বলা হয়েছেঃ তারা নিজেদের পরিবারের লোকদের মধ্যে আল্লাহর ভয়ে ভীত লোকদের জীবন যাপন করতো। অর্থাৎ সবসময় তারা ভয় করতো নিজেদের সন্তান ও পরিবারের লোকদের প্রতি ভালবাসায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের দুনিয়ার স্বার্থ উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের পরকাল বরবাদ না করে ফেলে। বিপরীত পক্ষে সেই ব্যক্তির অবস্থা ছিল এই যে, সে নিজের ঘরে আরামে সুখের জীবন যাপন করছিল। সন্তান-সন্তুতি ও পরিবারের লোকজনদের বিলাসী জীবন যাপনের জন্য যতই হারাম পদ্ধতি অবলম্বন এবং অন্যের অধিকার হরণ করার প্রয়োজন হোক না কেন তা তারা করে চলছিল। এই বিলাসী জীবন যাপন করতে গিয়ে আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখাগুলোকে সে চোখ বন্ধ করে ধ্বংস করে চলছিল। দুনিয়ার সেই সাময়িক অপরিণামদর্শী আনন্দ-ফূর্তির প্রতিফল স্বরূপ সে আজ আখেরাতে চিরস্থায়ী দুঃখে নিপতিত হল এবং জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হল।
অর্থাৎ ‘সে কখনোই জীবন্ত পুনরুত্থিত হয়ে ফিরে যাবে না এবং তাকে হিসাব দিতে হবে না’। তার ধারণা ছিল যে, সে প্রাকৃতিক নিয়মেই পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। বড় হয়েছে। আবার প্রাকৃতিক নিয়মেই মারা যাবে। তার কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। তার রূহ কারু কাছ থেকে প্রেরিত হয়নি এবং কারু কাছে তা প্রত্যাবর্তিত হবে না। দুনিয়াতেই তার চাওয়া-পাওয়া শেষ। আখেরাত বলে কিছু নেই এবং তার কোন কাজের হিসাবও কাউকে কখনো দিতে হবে না। সে বিশ্বাস করত, কখনও সে আল্লাহ তা’আলার কাছে ফিরে যাবে না এবং পুনরুত্থিত হবে না। এটাই ছিল দুনিয়াতে অন্যায়ে মত্ত ও আনন্দিত হওয়ার কারণ।
حور শব্দের অর্থ হল ফিরে যাওয়া। নবী (সাঃ) দু’আ করে বলতেন : اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْحَوْرِ بَعْدَ الْكَوْر হে আল্লাহ তা‘আলা! আমি ঈমান ও আনুগত্যের পর যেন কুফরী ও অবাধ্যতায় ফিরে না যাই এ ব্যাপারে আশ্রয় চাচ্ছি। (সহীহ মুসলিম হা. ১৩৪৩)
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, সে যা ভেবেছিল, তা সঠিক ছিল না। বরং তাকে তার প্রতিপালকের কাছে ফিরে আসতেই হবে। কেননা তার সৃষ্টি থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সব খবরই আল্লাহ জানেন। সে যে এরূপ হঠকারিতা করবে সেকথাও তিনি আগে থেকে জানতেন।
এখানে فَلاَ أُقْسِمُ এখানে لاَ অতিরিক্ত, যা বাক্যের মধ্যে সংযোগের জন্য ও শ্রোতাকে সতর্ক (تنبيه) করার জন্য আনা হয়েছে। যেমন অন্যত্র আল্লাহ বলেন, فَلاَ أُقْسِمُ بِمَا تُبْصِرُوْنَ (আল-হা-ক্কাহ ৬৯/৩৮), لاَ أُقْسِمُ بِهَذَا الْبَلَدِ (বালাদ ৯০/১), لاَ أُقْسِمُ بِيَوْمِ الْقِيَامَةِ (ক্বিয়ামাহ ৭৫/১) ইত্যাদি।
অত্র আয়াতে শপথকারী হলেন আল্লাহ এবং শপথকৃত বস্ত্ত হল অস্ত যাওয়া সূর্যের লালিমা। শপথের মাধ্যমে পরবর্তী বক্তব্যের বিষয়বস্ত্তকে যোরদার করা হয়েছে। الشفق অর্থ ‘অস্ত যাওয়া সূর্যের লালিমা’। মুজাহিদ বলেন, প্রভাত সূর্যের লালিমা। ইমাম আবু হানীফা (রহঃ) বলেন,‘শাফাক্ব’ অর্থ সান্ধ্য লালিমার পরবর্তী শুভ্রতা (কুরতুবী)। ইবনু জারীর ত্বাবারী বলেন, ‘আল্লাহ এখানে বিদায়ী দিবসের ও আগমনকারী রাত্রির শপথ করেছেন’ (ইবনু কাছীর)।
অর্থাৎ তারকারাজি ও প্রাণীকুল। কেননা রাতের আগমনে একদিকে যেমন আকাশে নক্ষত্ররাজির সমাবেশ ঘটে, অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীতে মানুষ ও পশু-পক্ষী সবাই স্ব স্ব আশ্রয়ে ফিরে আসে। যারা দিনের বেলায় বিভিন্ন কাজে-কর্মে চারিদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ফলে চূড়ান্ত বিচারে রাত্রিই এদেরকে জমা করে।
إذا اتسق এর অর্থ হল, যখন সে পূর্ণিমাতে পরিপূর্ণতা লাভ করে। যেমন ১৩ তারীখের রাত্রি থেকে নিয়ে ১৬ তারীখের রাত্রি পর্যন্ত তার উক্ত অবস্থা বিদ্যমান থাকে।
উপরের তিন আয়াতে তিনটি জিনিসের কসম খাওয়া হয়েছে। সূর্য অস্ত যাবার পর পশ্চিম আকাশের লালিমার, দিনের পর রাত্রির আঁধারও তার মধ্যে দিনের বেলা যেসব মানুষ ও অন্যান্য প্রাণী পৃথিবীর চারদিকে বিচরণ করে তাদের একত্রে হওয়ার এবং চাঁদের সরু কাস্তের মতো অবস্থা থেকে পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়ে পূর্ণ চন্দ্রে পরিণত হওয়ার। অন্য কথায় বলা যায়, এ জিনিসগুলো প্রকাশ্যে সাক্ষ্য প্রদান করছে যে, মানুষ এক অবস্থার উপর স্থিতিশীল থাকে না বরং তার অবস্থা প্রতিনিয়তই পরিবর্তিত হতে থাকে। যৌবন থেকে বাৰ্ধক্য, বাৰ্ধক্য থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে বরযখ (মৃত্যু ও কিয়ামতের মাঝখানের জীবন), বরযখ থেকে পুনরুজ্জীবন, পুনরুজ্জীবন থেকে হাশরের ময়দান তারপর হিসেব-নিকেশ এবং শাস্তি ও পুরস্কারের অসংখ্য মনযিল মানুষকে অতিক্রম করতে হবে। সর্বত্র একটি নিরন্তর পরিবর্তন ও ধারাবাহিক অবস্থান্তর প্রক্রিয়া কার্যকর রয়েছে। কাজেই শেষ নিঃশ্বাসটা বের হয়ে যাবার সাথে সাথে সবকিছু শেষ হয়ে যাবে, মুশরিকদের এ ধারণা ঠিক নয়। একমাত্র আল্লাহই তার মা’বুদ, তিনি বান্দাদের কর্মকাণ্ড নিজস্ব প্রজ্ঞা ও রহমতে নিয়ন্ত্রণ করেন। আর বান্দা মুখাপেক্ষী, অপারগ, মহান প্রবল পরাক্রমশালী দয়ালু আল্লাহর কর্তৃত্বাধীন।
طبق এর অর্থ অবস্থা, স্তর, পর্যায় ইত্যাদি। تَرْكَبُنَّ শব্দটি ركوب থেকে। এর অর্থ আরোহণ করা। অর্থ এই যে, হে মানুষ, তোমরা সর্বদাই এক স্তর থেকে অন্য স্তরে আরোহণ করতে থাকবে। উদ্দেশ্য এই যে, সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত পর্যন্ত মানুষ কোন সময় এক অবস্থায় স্থির থাকে না, বরং তার ওপর পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন আসতে থাকে। স্বাভাবিকভাবে যে সমস্ত পরিবর্তন হয় তা তো লক্ষণীয়।
পূর্বের তিনটি আয়াতে বর্ণিত তিনটি বস্ত্তর শপথের জওয়াব হিসাবে অত্র আয়াতটি এসেছে। এখানে বলা হয়েছে যে, হে মানুষ! অবশ্যই তোমাদের এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় উত্তরণ ঘটবে। যেমন- তোমরা প্রথমে মাতৃগর্ভে ছিলে শুক্রবিন্দু আকারে, তারপর জমাট রক্তবিন্দু, তারপর গোশতপিন্ড, তারপর জীবন্ত শিশু হয়ে ভূমিষ্ঠ হলে। তারপর মায়ের দুধ ছেড়ে শক্ত খাবার খেতে শিখলে। অতঃপর আস্তে আস্তে শক্ত-সমর্থ জোয়ান হলে। তারপর বার্ধক্যে উপনীত হলে ও মৃত্যুবরণ করলে। জীবনকালে তোমরা কখনো ধনী ও সচ্ছল ছিলে, কখনো গরীব ও অসচ্ছল ছিলে। তোমরা রোগী হলে, অতঃপর সুস্থ হলে। বিপদগ্রস্ত হলে আবার বিপদমুক্ত হলে। তোমরা কষ্টে পড়লে, আবার সুখী হলে। এভাবে অবস্থার পরিবর্তন আমি ঘটিয়ে থাকি এবং জীবনের এই উত্থান-পতন ও অবস্থান বৈচিত্র্য তোমাদের ঘটবেই। আর এ থেকে তোমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে, নিজের জীবনকালে চাক্ষুষভাবে যখন এইসব উত্থান-পতন তোমরা দেখছ এবং জীবনের একেকটি স্তর অতিক্রম করছ, তখন অবশ্যই মৃত্যুর পর তোমার পুনরুত্থান ঘটবে এবং সেটাই হবে তোমার জীবনের সফরসূচীর চূড়ান্ত পর্ব। তারপরে আর কোন গন্তব্য নেই।
অনেকের ধারণা মৃত্যুই সবকিছুর শেষ এবং কবরই শেষ আশ্রয়স্থল। এই ধারণা ভুল। কেননা আল্লাহ বলেন, حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ ‘যতক্ষণ না তোমরা কবরে উপনীত হও’ (তাকাছুর ১০২/২)। এখানে ‘যিয়ারত’ শব্দ বলা হয়েছে। আর যিয়ারতকারী কখনো সে স্থানে স্থায়ী হয় না। অতএব তার স্থায়ী ঠিকানা হল কবরের জীবন শেষে পুনরুত্থানের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম।
‘মৃত্যুর পরে ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষের ইহকালীন জীবনের উপর পর্দা পড়ে যাবে’ (মুমিনূন ২৩/১০০)। অতঃপর পরকালীন জীবনের দৃশ্যাবলী তার সামনে উদ্ভাসিত হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তুমি ছিলে এদিন সম্পর্কে উদাসীন। আজ আমরা তোমার চক্ষু থেকে পর্দা সরিয়ে দিয়েছি। ফলে আজ তোমার দৃষ্টি সুতীক্ষ্ণ’ (ক্বাফ ৫০/২২)।
উল্লেখ্য যে, জীবনচক্রের এই পরিবর্তন কেবল মানুষের ক্ষেত্রে নয়, বরং পশু-পক্ষী, উদ্ভিদরাজি, সাগর-নদী, সূর্য-চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজি সকল সৃষ্টবস্ত্তর মধ্যে রয়েছে। নদীর জোয়ার-ভাটা চন্দ্র ও সূর্যের উদয়-অস্ত, উদ্ভিদের উদ্গম-বৃদ্ধি ও মৃত্যু এরই প্রমাণ বহন করে।
অর্থাৎ যাবতীয় নিদর্শন ও প্রমাণাদি স্পষ্ট হওয়া সত্ত্বেও কোন্ বস্ত্ত তাদেরকে ঈমান আনতে বাধা দিচ্ছে? এটি ইনকার অথবা বিস্ময়পূর্ণ প্রশ্নবোধক বাক্য।
হযরত জাবির ইবনে আবদিল্লাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “আদম সন্তান গাফলতী বা উদাসীনতার মধ্যে রয়েছে। তারা যে কি উদ্দেশ্যে সৃষ্ট হয়েছে তার পরোয়া তারা মোটেই করে না।
অর্থাৎ যখন তাদের সামনে সুস্পষ্ট হেদায়েত পরিপূর্ণ কুরআন পাঠ করা হয়, তখনও তারা আল্লাহর দিকে নত হয় না। سجود এর আভিধানিক অর্থ নত হওয়া, আনুগত্য করা। বলাবাহুল্য, এখানে পারিভাষিক সাজদার পাশাপাশি আল্লাহর সামনে আনুগত্য সহকারে নত হওয়া তথা বিনীত হওয়াও উদ্দেশ্য। আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু এ সূরা পড়ে সাজদাহ করলেন, তারপর লোকদের দিকে ফিরে জানালেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বয়ং এ সূরা পড়ার পরে সাজদাহ করেছেন। [মুসলিম: ৫৭৮]
অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি এশার সালাতে এ সূরা পাঠের পর সাজদাহ করলেন, এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হওয়ার পর বললেন, আমি আবুল কাসেম (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর পিছনে সাজদাহ করেছি, সুতরাং তার সাথে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত সাজদাহ করবই।” [বুখারী: ১০৭৮, মুসলিম: ৫৭৮]
অর্থাৎ কাফেররা মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর আনীত শরী‘আতে মিথ্যারোপ করে এবং কুরআনের অকাট্য সত্যকে মিথ্যা সাব্যস্ত করে। মূলতঃ স্বার্থান্ধ হঠকারী ব্যক্তিরা কখনো এলাহী সত্যকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনা। আর সেকারণেই এরা তাতে সর্বদা মিথ্যারোপ করে এবং এক ধরনের সান্ত্বনা খুঁজে পায়।
অর্থাৎ নবী ও কুরআন বিষয়ে যে মিথ্যারোপ এবং শত্রুতা তাদের অন্তরে লুক্কায়িত রয়েছে, আল্লাহ তা ভালভাবে জানেন। يُوْعُوْنَ ক্রিয়াটির মাদ্দাহ হ’ল الوِعَاءُ অর্থাৎ পাত্র, যাতে কিছু সঞ্চিত থাকে’। এর অর্থ স্মৃতিতে ধারণ করাও হয়ে থাকে।
আলোচ্য আয়াতের অর্থ দু’প্রকারের হতে পারে। ১- তারা মুহাম্মাদ (সাঃ) ও কুরআনের সত্যতার বিষয়টি বুকের মধ্যে লুকিয়ে রাখে। যদিও মুখে তা অস্বীকার করে। ২- উক্ত দু’টি বিষয়ে আক্রোশ ও বিদ্বেষ হৃদয়ে সঞ্চিত রাখে। দু’টিরই প্রতিফল পরবর্তী আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।–
অর্থাৎ যারা আল্লাহ, রাসূল, কুরআন ও আখেরাতকে অবিশ্বাস করে ও হৃদয়ে বিদ্বেষ পোষণ করে, হে রাসূল! তুমি তাদের এ খবরটি জানিয়ে দাও যে, আল্লাহ তাদের জন্য জাহান্নামের মর্মান্তিক আযাব প্রস্ত্তত করে রেখেছেন। এটি নিঃসন্দেহে কঠিন দুঃসংবাদ। কিন্তু আল্লাহ একে ‘সুসংবাদ’ বলেছেন অবিশ্বাসীদের তাচ্ছিল্য করার জন্য।
এখানে إلا (ব্যতীত) অর্থلكن (কিন্তু)। কেননা বাক্যটি استثناء منقطع অর্থাৎ পূর্বের বাক্য থেকে বিছিন্ন একটি পৃথক বাক্য হিসাবে এসেছে। অর্থাৎ অবিশ্বাসীদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি প্রস্ত্তত রয়েছে। কিন্তু তাদের জন্য নয়, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে।
উল্লেখ্য যে, আখেরাতের পুরস্কার সদা বর্ধমান। তা দুনিয়ার মত নয় যে, গাছে কখনো ফল হয় কখনো হয় না। আল্লাহ বলেন,‘সেখানে তাদের জন্য রিযিক থাকবে সকালে ও সন্ধ্যায়’ (মারিয়াম ১৯/৬২)। তিনি বলেন,‘কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করবে। অতঃপর তিনি তাকে বহুগুণ দান করবেন’? (বাক্বারাহ ২/২৪৫)। আর উত্তম ঋণ অর্থ অগ্রিম নেক আমল সমূহ।
তবে হাদীসে এসেছে যে, শুধুমাত্র ‘আমল’ দ্বারা কেউ জান্নাত পাবে না। যদি না আল্লাহর রহমত শামিল হয়। কেননা রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন,‘তোমাদের আমল তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না বা জাহান্নাম থেকে বাঁচাতে পারবে না এবং আমিও বাঁচতে পারব না, আল্লাহর রহমত ব্যতীত’।[মুসলিম হা/২৮১৬] তাছাড়া আল্লাহ বলেন, ‘তিনি যাকে ইচ্ছা স্বীয় রহমতের মধ্যে দাখিল করে নেন’ (দাহর ৭৬/৩১)। তিনি আরও বলেন, ‘আল্লাহ যাকে খুশী স্বীয় রহমতের জন্য খাছ করে নেন’ (বাক্বারাহ ২/১০৫)।
বস্ত্ততঃ ঈমানদারগণের উপরে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ আছে বলেই তারা ঈমান আনার ও সৎকর্ম করার তাওফীক লাভে ধন্য হয়েছে। অতএব তারা মূলতঃ আল্লাহর রহমতে জান্নাতে প্রবেশ করবে, কেবলমাত্র তাদের আমলের কারণে নয়। কেননা ঈমান ও আমল তাদের জান্নাত লাভের অসীলা হতে পারে। কিন্তু মূল কারণ হল আল্লাহর রহমত।
অর্থাৎ ‘সে কখনোই জীবন্ত পুনরুত্থিত হয়ে ফিরে যাবে না এবং তাকে হিসাব দিতে হবে না’। তার ধারণা ছিল যে, সে প্রাকৃতিক নিয়মেই পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে। বড় হয়েছে। আবার প্রাকৃতিক নিয়মেই মারা যাবে। তার কোন সৃষ্টিকর্তা নেই। তার রূহ কারু কাছ থেকে প্রেরিত হয়নি এবং কারু কাছে তা প্রত্যাবর্তিত হবে না। দুনিয়াতেই তার চাওয়া-পাওয়া শেষ। আখেরাত বলে কিছু নেই এবং তার কোন কাজের হিসাবও কাউকে কখনো দিতে হবে না। সে বিশ্বাস করত, কখনও সে আল্লাহ তা’আলার কাছে ফিরে যাবে না এবং পুনরুত্থিত হবে না। এটাই ছিল দুনিয়াতে অন্যায়ে মত্ত ও আনন্দিত হওয়ার কারণ।
حور শব্দের অর্থ হল ফিরে যাওয়া। নবী (সাঃ) দু’আ করে বলতেন : اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ الْحَوْرِ بَعْدَ الْكَوْر হে আল্লাহ তা‘আলা! আমি ঈমান ও আনুগত্যের পর যেন কুফরী ও অবাধ্যতায় ফিরে না যাই এ ব্যাপারে আশ্রয় চাচ্ছি। (সহীহ মুসলিম হা. ১৩৪৩)
ফুটনোট
➤ কেয়ামতের দিন আকাশ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। এর থেকে বোঝা যায় আকাশ অত্যন্ত মজবুত। আকাশ তার প্রভুর আদেশ পালন করবে। আল্লাহর আদেশ মান্য করা আকাশের জন্য আবশ্যক ও স্বাভাবিক।
➤ যমীন সমতল ও প্রসারিত করা হবে। উঁচু-নিচু স্থান মসৃণ করা হবে, নদী, সাগর ভরাট করা হবে। এটা কেয়ামতের দিনের জনসমাবেশের প্রস্তুতি।
➤ যমীন তার ভিতরে যা কিছু আছে, তা বাইরে নিক্ষেপ করবে। এতে মৃতদের পুনরুত্থান এবং ভূপৃষ্ঠের ধন-সম্পদ সব প্রকাশিত হবে।
➤ যমীন আল্লাহর আদেশ পালন করবে। এ থেকে বোঝা যায়, আকাশ ও পৃথিবী স্বতন্ত্র সৃষ্টি নয়, বরং তারা স্রষ্টার নির্দেশে চলে।
➤ মানুষের জীবন একটি নিরন্তর সংগ্রাম। এই সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ। মানুষ তার কাজের পূর্ণ প্রতিফল লাভ করবে।
➤ যার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে, তার সহজ হিসাব হবে। সে তার পরিবারের কাছে খুশি হয়ে ফিরে যাবে। পেছনের হাতে আমলনামা প্রাপ্তি
➤ যারা পেছনের হাতে আমলনামা পাবে, তারা ধ্বংস ও হতাশা ডাকবে। তারা চিরস্থায়ী আগুনে দগ্ধ হবে।
➤ যারা পরিবারে আনন্দ-ফূর্তিতে মত্ত ছিল, তারা আখিরাতে শাস্তি পাবে। কারণ, তারা আল্লাহর হুকুম ও আখিরাতের কথা ভুলে গিয়েছিল।
➤ যারা মনে করত, তারা কখনো পুনরুত্থিত হবে না, তাদের ভুল ধারণার জন্য তারা শাস্তি পাবে। আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আখিরাতের ধারণা জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।
➤ আয়াতে আল্লাহ তিনটি জিনিসের শপথ করেছেন:
- অস্ত যাওয়া সূর্যের লালিমা।
- রাত এবং রাতের মধ্যে যা কিছু জমায়েত হয়।
- পূর্ণিমার চাঁদ।
এই শপথগুলো থেকে বোঝা যায় যে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মাঝে থাকা নিদর্শন দিয়ে আমাদের সচেতন করতে চান।
➤ মানুষ এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় পরিবর্তিত হতে থাকে। জন্ম, শৈশব, যৌবন, বার্ধক্য এবং মৃত্যু—সবই জীবনের পরিবর্তনশীল চক্রের অংশ। এই পরিবর্তনশীলতা আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার নিদর্শন এবং মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের বিষয়টি প্রমাণ করে।
➤ মানুষের ধারণা যে মৃত্যু চূড়ান্ত পর্যায়, তা ভুল। কবর একটি অস্থায়ী স্থান, চূড়ান্ত গন্তব্য হলো জান্নাত বা জাহান্নাম। মৃত্যুর পর পুনরুত্থান এবং বিচার দিবস অবশ্যম্ভাবী।
➤ কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা ও নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও কাফিররা ঈমান আনে না এবং মিথ্যারোপ করে। তাদের অন্তরের বিদ্বেষ ও অবিশ্বাস আল্লাহ জানেন এবং এর উপযুক্ত শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে।
➤ যারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে তাদের জন্য নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার প্রস্ত্তত রয়েছে। আখিরাতের পুরস্কার কখনো বন্ধ হবে না; এটি চিরস্থায়ী।
➤ মানুষের সৎকর্ম একমাত্র জান্নাতে প্রবেশের কারণ নয়; আল্লাহর রহমতই মূল। ঈমান ও সৎকর্ম আল্লাহর রহমত লাভের মাধ্যম।
➤ জীবনের উত্থান-পতন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা জরুরি। চূড়ান্ত গন্তব্যের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যশীল হওয়া প্রয়োজন।
➤ কুরআন শ্রবণের পরে সিজদাহ এবং আনুগত্য আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের প্রতীক। কাফিরদের অবস্থা বিপরীত, যারা কুরআন শ্রবণেও আল্লাহর সামনে নত হয় না।
➤ মানুষের জীবনচক্রের মতোই পশু-পাখি, উদ্ভিদ এবং প্রকৃতির মধ্যেও পরিবর্তনের প্রক্রিয়া কাজ করে। এটি আল্লাহর সৃষ্টির অন্যতম নিদর্শন।
➤ আল্লাহ মানুষের প্রকাশ্য ও লুকায়িত সব কিছু জানেন। অবিশ্বাসীদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নির্ধারিত আছে।